চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘তাজিন, লক্ষ্মী বোন আমার’

মৃত্যু ছিনিয়ে নিলো অভিনেত্রী তাজিনকে, তাকে নিয়ে স্মৃতিকাতর নির্মাতা কাওসার চৌধুরী

মৃত্যু ছিনিয়ে নিলো অভিনেত্রী তাজিন আহমেদকে। দুদিন হলো তিনি নেই। তার মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় রীতিমত উপচে পড়ছে শোক। যেনো থামছেই না। ছোট পর্দায় তার সহকর্মী থেকে শুরু করে সারা দেশের ভক্ত অনুরাগীরা ব্যথিত হয়েছেন তার হঠাৎ চলে যাওয়ায়। কাছের মানুষেরা তাকে নিয়ে স্মৃতিকাতর। তেমনি তাজিন আহমেদের একজন কাছের মানুষ নির্মাতা কাওসার চৌধুরী।

তাজিন আহমেদের মৃত্যুর পর দিনেই তাকে নিয়ে যেমন শোকে মূহ্যমান তার শুভাকাঙ্ক্ষিরা, তেমনি একটি শ্রেণি সোশাল সাইটে তাজিনকে ঘিরে নানা প্রশ্ন তুলছেন। একজন মৃত মানুষকে জড়িয়ে আপত্তিকর মন্তব্য কতোটা অশালিন, কতোটা কাণ্ডজ্ঞানহীনতার পরিচয় তারই যেনো জবাব দিলেন কাওসার চৌধুরী। ফেসবুকে লম্বা স্ট্যাটাসে কাওসার চৌধুরী যেনো প্রকৃত তাজিন আহমেদকেই তুলে ধরলেন। ‘তারকা কথন’-এর পাঠকদের জন্য কাওসার চৌধুরীর ফেসবুক স্ট্যাটাসটি হুবুহু এখানে তুলে ধরা হলো:

বিজ্ঞাপন

‘‘তাজিন: তোমায় অভিবাদন…

তিরান্নব্বই কিংবা চুরান্নব্বই সালের কথা। আমি তখন গ্রীন রোডে থাকি। আমার মেয়েটির বয়স তখন তিন কি চার! সেদিন ছিল ১২ জুন। আমার প্রয়াত স্ত্রী বললো- চলো, আজকে একটু বাইরে খাওয়াদাওয়া করবো। ঘরে রান্না করতে ইচ্ছে করছে না।

কোন আগপাছ না ভেবেই আমি স্ত্রীর কথায় রাজী হয়ে যাই। একটু সময় নিয়ে কিছুটা প্রস্তুতি নিয়েই আমাদের মেয়েটিসহ আমরা বেরিয়ে পড়ি রেষ্টুরেন্টের সন্ধানে! ধানমন্ডি ছ’নম্বর সড়কের মুখে তখন একটি চৈনিক রেস্তোরাঁ ছিল- ‘ম্যাগডোনালস’ নামে। রাত প্রায় সাড়ে আটটার দিকে আমরা ঢুকে পড়ি ওই রেস্টুরেন্টে।

খাবারের অর্ডার দিয়েই একটু এদিক সেদিক তাকাচ্ছিলাম! হঠাৎ দেখি একটু দূরের একটি টেবিল থেকে হই হই করে এগিয়ে আসছে তাজিন। সাথে মিতা হক (রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী, আমাদের প্রয়াত বন্ধু খালেদ খানের স্ত্রী)! ওরা এসেই আমাদের আড়ষ্টতা ভাঙ্গিয়ে দিল মূহুর্তেই! আমার তিন বছরের মেয়েটি তাজিনকে বলে বসলো- মিমি খালা, কেমন আছো তুমি! ওদের দু’জনের (আফসানা মিমি+তাজিন) সাইজ এবং গড়ন-গাড়ন প্রায় একই রকম ছিল। আর রঙটাও তো ছিল প্রায় একই রকম, দু’জনই বেশ ফর্সা! তাই মেয়ের ভ্রম হয়েছিল হয়তো! তাজিন আমার মেয়েকে শুধরে দিয়ে বললো- আমি মিমি খালা নই বাবু, আমি তাজিন খালা (সাথে ওর কাঁচভাঙ্গা মিষ্টি হাসি)।

এটা ওটার পরে আমার স্ত্রী হঠাৎ বলে বসলো- তাজিন, আজ কিন্তু তোমার ভাইয়ার জন্মদিন! আর যায় কোথা! তাজিন তো প্রায় কঁকিয়ে ওঠলো- শুভ জন্মদিন বলে, মিতা ভাবীও যোগ দিল সাথে। আমিতো বিব্রত প্রায়! আমি আসলে এই দিনটির কথা ভুলেই গিয়েছিলাম বেমালুম! আর, আমার স্ত্রী-কন্যাও নাকি নিরব ছিল রেস্টুরেন্টে গিয়ে আমাকে সারপ্রাইজ দেবে বলে! পরে জেনেছি!

এদিকে এতক্ষণ খেয়ালই করিনি, ওদের (তাজিন- মিতা) টেবিলে একা বসে আছে মিতার মেয়ে জয়িতা। আমি গিয়ে ওকে নিয়ে এলাম আমাদের টেবিলে। আমাদের টেবিলে এসে দেখি তাজিন নেই, কোথায় যেন গিয়েছে। জিজ্ঞেস করায় আমার স্ত্রী বললো- তাজিন ওয়াশরুমে গেছে। ফিরে এলো মিনিট পাঁচেক পরে।

এরমাঝে আমি নির্বোধের মত মিতা ভাবীকে অনুরোধ করে বসি- একটি গান গেয়ে শোনানোর জন্য। মিতা বললো- ধুর, এত লোকের মাঝে রেস্টুরেন্টে বসে গান গাওয়া যায় নাকি! আমি বলি- ঠিক আছে নিচুস্বরে কোন একটি গানের মুখটা শুধু শুনিয়ে দাও! আমার বউ বাচ্চাও তাতে সায় দিল। মিতা বললো- ঠিক আছে গাইবো, তার আগে তুমি তাহলে একটা আবৃত্তি শোনাও নিচুস্বরে! আমি একটু দর বাড়িয়ে গাইগুঁই করে নাজিম হিকমতের ‘জেলখানার চিঠি’ শুরু করে দেই একেবারে নিচুস্বরে!

আপনারা যারা এই কবিতাটি পড়েছেন- তারা নিশ্চই জানেন এই কবিতাটির দৈর্ঘ্য কতখানি! আমি বোকার মত নিরলসভাবে কবিতাটি আবৃত্তি করতে থাকি। প্রায় শেষের দিকে এসে আমি আবেগবশে চোখ মুদে আওড়াতে থাকি-‘…জেলখানার দশটি বছরে যা লিখেছি সব তাদের জন্য, যারা মাটির পিঁপড়ের মত…’! আরো প্রায় মিনিট দুই পরে আবৃত্তি সমাপ্ত করি! মিতা আর তাজিনের পিঠ চাপড়ানোতে আমার খুশী আর দেখে কে! প্রশংসা শেষে হঠাৎ টেবিলে তাকিয়ে দেখি, আমাদের টেবিলে মাঝারি সাইজের একটি কেক, এবং কেকটির ওপরে লেখা- “শুভ জন্মদিন কাওসার ভাই”! আমার তো মাথা ঘুরে যাবার দশা! মিতা বললো- ওটা তাজিনের কম্ম! ওয়াশরুমে যাবার নাম করে ওদিকে গিয়ে রেস্টুরেন্টের কোন এক বেয়ারাকে দিয়ে কলাবাগানের ‘কুপারস’ থেকে সুপারসনিক গতিতে আনিয়েছে এই কেক!

ঘটনার আকস্মিকতায় আমি তখন বিস্মিত, আপ্লুত, বিমোহিত। এই-ই ছিল তাজিন, তাজিন আহমেদ। একজন অভিনয় শিল্পী, প্রেম-ভালোবাসায় টইটম্বুর একজন ‘মানুষ’। তাজিন ফেরেশতা ছিলনা, মানুষ ছিল! একজন খাঁটি মানুষ! আমি আপনি যদি ফেরেশতা না হয়ে থাকি তাহলে তাজিন কেন ফেরেশতা হতে যাবে! তার ভুলভ্রান্তি থাকতেই পারে! কিন্তু মানুষের প্রতি তাজিনের যে শ্রদ্ধা-ভালোবাসা, তার তো কোন তুলনা নেই!

সঞ্জীব চৌধুরী (গায়ক-সাংবাদিক) যখন অ্যাপোলো হাসপাতালে শেষ শয্যা পেতেছে, তখনো তাজিন কিন্তু সঞ্জীবের চারপাশেই ঘুরেছে চরকীর মত। ঢাকার সব শিল্পী সাহিত্যিক আর সাংবাদিকরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এই হাসপাতালে। সঞ্জীব যে ক’দিন এই হাসপাতালে শুয়ে ছিল, আমিও যেতাম নিয়মিত! সেই সময়ে তাজিনকে দেখতাম চিকিৎসার টাকা যোগাড় করা থেকে আরো অনেক বৈষয়িক কাজে টুকটুক করে দৌড়াচ্ছে এদিক সেদিক। তাজিন আবার সঞ্জীবের শিষ্য। ভোরের কাগজে ‘মেলা’ আর সংস্কৃতির পাতায় লিখবার জন্য সঞ্জীবের যে বিশাল বাহিনী ছিল তাজিন তার অন্যতম সৈনিক! সুতরাং গুরুর বিপদে শিষ্য দৌড়াবে সেটাই তো সঙ্গত।

আমি তখোন মোহাম্মদপুর আদাবরে ১২ নম্বর সড়কে থাকি। তাজিনও থাকতো আদাবরে আমাদের বাসার কয়েকটি সড়ক পরে। সেই সময়ে আমার ছোট্ট একটি গাড়ি ছিল, স্টেশন ওয়াগন। আমি নিজেই ড্রাইভ করতাম। সঞ্জীবকে ‘পাহারা’ দিয়ে হাসপাতাল থেকে ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় ১১টা কি ১২টা বেজে যেতো। তাজিন আমার গাড়িতেই ফিরতো আদাবরে। পরদিন সকালে আবার আমরা ওই একই গাড়িতেই এপলোতে চলে যেতাম। দু’দিন টানা ‘ডিউটি’ করার পরে তৃতীয় দিনে একটু বেলা করেই ঘুম থেকে ওঠলাম। খবর পেলাম ততক্ষণে তাজিন এসে বসার ঘরে আমার জন্য অপেক্ষা করছে! আমি ব্যস্তসমস্ত হয়ে তাজিনকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি অ্যাপোলোর উদ্দেশ্যে।

আমি ড্রাইভ করছি, তাজিন আমার পাশের সিটে বসে আছে। গাড়ি প্রায় জাহাঙ্গীর গেট (ক্যান্টনমেন্ট) ক্রস করছে। এমন সময় লক্ষ্য করি তাজিনের হাতদু’টো ন্যাংটো! অথচ এর আগের দিনও দেখেছি ওর হাতভর্তি সোনার চুড়ি। আমি একটু অপ্রস্তুতভাবে জিজ্ঞেস করে বসি- কীরে তাজিন, তোর হাতের চুড়িগুলো কোথায়! তাজিন হেসে বলে- কেনো, হাইজ্যাক করবেন নাকি (হাসি)! প্রত্যেকদিন রাত করে আপনার সাথে ফিরি তো, ভাবলাম, কোনদিন না আবার হাইজ্যাক করে বসেন (হাসি)! না বাবা, পুরুষ মানুষের বিশ্বাস নেই (আবারো হাসি)! সে হাসতেই থাকে।

ওর হাসিতে আমার গায়ে জ্বালা ধরে যায়! বলি- ফাজলামো করিস না। বল কি হয়েছে! তাজিন ঠাণ্ডা মাথায় বললো- না, চুড়িগুলো মা’র কাছে রেখে এসেছি। দাদা (সঞ্জীব) অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে, বাঁচা-মরার মাঝখানে দুলছে, এমন সময়ে অলংকার পরে দাদার পাশে যেতে ইচ্ছে করছেনা! তাই আম্মার কাছে রেখে এসেছি। আমি আপাতত মাথা নেড়ে সায় দেই ওর কথায়, কিন্তু মনের ভেতরে কী একটা যেনো খচখচ করে বিধতে থাকে!

ওইদিন বিকেলে খুব ক্লান্ত হয়ে বাপ্পা (বাপ্পা মজুমদার) আর তুষারকে (আব্দুন নূর তুষার) নিয়ে এপলো হাসপাতালের ফুডকোর্টে গিয়ে একটু গরম চা পান করছিলাম। তুষার যেহেতু ডাক্তার মানুষ, ও বেশ স্বাভাবিক আচরণ করছিল সবার সাথে। ওর কথায় অনেক বেশী আত্মবিশ্বাস আর অনেক দৃঢ়তা! কিন্তু বাপ্পাকে দেখি অনেক বেশী ঝুলে আছে, ভেঙ্গে পড়েছে প্রায়! চা পানের একফাঁকে আমার কানের কাছে মুখ এনে বললো- তাজিনের কাণ্ডটা দেখেছেন! আমি চমকে ওর মুখের দিকে তাকাই। বাপ্পা বলে- তাজিন তার হাতের চুড়িগুলো বিক্রী করে সঞ্জীব’দার চিকিৎসার জন্য টাকা নিয়ে এসে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়েছে!

আমার সারা গায়ে বাজ পড়লো যেন! এই বয়সের একটি মেয়ে এমন ভালোবাসার, শ্রদ্ধার একটি নজির স্থাপন করতে পারে, সেটা ভাববার মত মনের প্রসারতা আমার মনে তখনো হয়নি! গুরুর জন্য একজন মানুষ এই যুগে এতটা ত্যাগ করতে পারে? অবিশ্বাস্য!

সঞ্জীবের চিকিৎসা খরচের কোন সমস্যা হচ্ছিল- তেমন কিন্তু নয়। কিন্তু তারপরেও তাজিনের বয়েসী একটি মেয়ে এভাবে হৃদয় খুলে এগিয়ে আসা, এ যে কত মহৎ হৃদয়ের ব্যাকুলতা, সেটা বুঝবার ক্ষমতা কি এখনকার মানুষগুলোর নেই?

আজ বিকেলে দেওয়া আমার একটি স্ট্যাটাসে তাজিনকে নিয়ে নানা অপ্রাঙ্গিক কথাবার্তা বলছেন কেউ কেউ! কয়েকজন এমন সব কথা লিখেছেন, যাদের কথায় কোন যুক্তি নেই। তাদের উদ্দেশ্য কিন্তু একটাই, শিল্পী-সমাজকে হেয় প্রতিপন্ন করা! আমাদের সমাজ, এই রাষ্ট্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।

একজন লিখেছেন ‘ভক্ত’রা নাকি শিল্পীদের সবকিছু জানতে আগ্রহী। আরে ভাই, আপনি যদি একজন শিল্পীর ভক্তই হোন তাহলে মৃত্যুর পরেও তাঁকে ‘ভক্তবাজির’ নামে আক্রমন করছেন কেনো? তাজিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্নালিজমের শিক্ষার্থী ছিল কি ছিলনা তা নিয়ে তার মৃত্যুর পরে আপনার কিংবা এই সমাজের কী আসে যায়! তাজিন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন বিষয়ের ছাত্রী ছিলেন- তার চাইতেও বড়ো কথা তাজিন আদৌ সাংবাদিক ছিলেন কীনা! ভোরের কাগজ আর প্রথম আলোর পাতা খুলে দেখুন- তাজিন কি ছিল।

তাজিনের লেখা নাটকে আমি নিজেও অভিনয় করেছি ২০০৫ সালে। স্কুলগামী ছেলেমেয়েদের নিয়ে প্রায় তিন শতাধিক এপিসোডের একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছেন তাজিন, সফলতার সাথে। সেগুলোর কথা বলুন। মৃত মানুষের প্রশংসা করতে শিখুন ভাইয়েরা!

জানি, এরপরে আমায় নিয়ে পড়বেন কেউ কেউ। আমার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধারের চেষ্টা করবেন! তাতে কিছু আসে যায়না। আগেই বলেছি আমরা সবাই মানুষ। আমাদের প্রত্যেকের ভুলভ্রান্তি থাকতেই পারে। তাই বলে ‘ভক্তগিরির’ নামে মৃত মানুষকে ছোট করতে যাবেন না প্লিজ! মনে রাখবেন আপনার আমার ঘরেও কিন্তু মা-বোন আছে! আল্লা’র হুকুমে কার পরিনতি কখন যে কি হয়ে যায় কেউই জানিনা! একটু ভেবে দেখবেন প্লিজ। গায়ের জোরে জিতে গিয়ে লাভ নেই।

জগতে দুইটি ‘কায়দায়’ জয়লাভ করা যায়! একটি যুক্তির জোরে, অন্যটি জোরের যুক্তি দিয়ে! ‘জোরের যুক্তি’ দিয়ে আর কথা বাড়াবেন না প্লিজ। আল্লা’র দোহাই। মৃত মানুষকে শান্তিতে থাকতে দিন।

তাজিন, লক্ষী বোন আমার। তুমি যেখানেই থাকো- শান্তিতে থাকো। কে তোমাকে কি ভাবে না ভাবে তাতে আমার কিছু আসে যায়না! আমি তোমাকে শ্রদ্ধা করি, ভালোবাসি। তোমাকে আমার আজানুলম্বা অভিবাদন।’’

Bellow Post-Green View