চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

যতদিন আমরা থাকবো ততদিন সব উৎসব চলবে

৪৭ এ দেশ ভাগে হিন্দু মুসলিম আলাদা হবার পর এ অঞ্চলের মানুষ বেশ বিপাকেই পড়েছিলো। তবে সময় মহাঔষধ। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে নতুন এক জাতিস্বত্তা। আমি বলি আধুনিক বাঙালি মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবার। তাদেরই এক প্রজন্ম আমি বা আমরা। আমাদের সারা বছরই উৎসব লেগে থাকে। শবে বরাতে বোমা ফাটিয়ে, আলো জ্বালিয়ে শহর-গঞ্জ-গ্রাম এক সময় অস্থির বানিয়ে ফেলতাম আমরা। খাওয়া দাওয়ায় একেবারে হুলুস্থুল অবস্থা। রমজান ইবাদতের মাস। সেখানেও খুব গোপনে আমরা আনন্দ খুঁজে নিয়েছি। এই যেমন সেহেরিতে ডাকাডাকি, ভ্রাম্যমাণ ইফতারের দোকান, ঈদ কার্ডের দোকান ইত্যাদি ইত্যাদি। আর ঈদের চেয়ে বড় কোন উৎসব তো হতেই পারে না। আরো রয়েছে শবে কদর, ঈদে মিলাদুন্নবী। আর প্রতি সপ্তাহে তো আছেই জুম্মা।

রাস্তাঘাট তুলনামুলক কিছুটা ফাঁকা থাকায় শুক্রবারের উৎসবের আমেজ আরো বেড়েছে। এতো গেল ধর্মীয় উৎসব। সামাজিক উৎসব তো পড়েই রইলো। আজ এর জন্মদিন তো কাল ওর বিয়ে। ইংরেজী বছর শেষ হলে আবার বাংলা বছর। আর এই সব উৎসব আমাদের ফুর্তিবাজ এক জাতি বানিয়েছে। থাক না একটু অভাব-অনটন, আনন্দ উৎসব চালু থাকে বাঙালি মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে। আর এ সব উৎসবের অন্যতম বাংলা বর্ষবরণ। ছোটবেলা থেকেই পহেলা বৈশাখে ধর্ম গোত্র নির্বিশেষে সবাইকে মেতে উঠতে দেখেছি বৈশাখের প্রথম ভোর থেকে।

বিজ্ঞাপন

এর মধ্যে দেশে এসেছে নতুন স্কুল ফেসবুক। যেখানে রাত দিন ২৪ ঘন্টা ক্লাস নেন এ্যাকাউন্ট হোল্ডাররা। ফেসবুকে সবাই ছাত্র আবার সবাই শিক্ষক। জ্ঞানে জ্ঞানে ছয়লাব ফেসবুক। সেই ফেসবুকের কল্যাণে গত কয়েক বছর ধরে জানতে পারছি, বাংলা নতুন বছর উদযাপন নাকি আমাদের উৎসব না। এটা সনাতন ধর্মীয়দের। কী বলবো এই শ্রেণির মানুষকে!!! এরা বাংলা নতুন বছর উদযাপন করতে দেবে না, অথচ বোমা মারলেও পেট থেকে বাংলার বাইরে অন্য কোন শব্দ বের হবে না। তাও আবার অশুদ্ধ উচ্চারণে।

বিজ্ঞাপন

আমার মেয়ের ডাক নাম জল। এই নিয়ে আমাকে বহুজনে বলেছেন জল নাকি হিন্দু নাম। কেন তার কোন জবাব নেই। অথচ সারা পৃথিবীর অধিকাংশ হিন্দু বসবাসকারী দেশ ভারতের এক পশ্চিম বাংলা ছাড়া প্রায় সব স্থানেই পানি বলা হয়। তাহলে পানি কেন হিন্দু শব্দ না হয়ে জল হলো? জানি এগুলো একেবারেই শিশু মস্তিকের আলোচনা। তবু করতে হচ্ছে। কারণ ভীষণ কষ্ট হয় যখন দেখি পহেলা বৈশাখ উদযাপনের বিপক্ষেও আমাদেরই অনেক ভাই-বন্ধু। পহেলা বৈশাখ আমার কাছে পাঞ্জাবির মতো। যে পোশাক পরে আমরা মসজিদেও যাই আবার মন্দিরেও যাই।

আসলে পাঞ্জাবি দেখতে সুন্দর, আরামদায়ক যে কোন পরিস্তিতিতে মানানসই। একটি বছর শেষে নতুন বছর আসবে তাকে তো অবশ্যই বরণ করে নিতে হবে। আপনি আমি কি আমাদের সার্মথ্য অনুযায়ী বছরের প্রথম দিন ভালো খাবার খাবো না!! আমার শিশুকে কি ২০/২৫ টাকা দিয়ে একটা ডুকি কিনে দিবো না!! আশ্চর্য এ কেমন কথা। কোটা নিয়ে আন্দোলন করছেন ভালো কথা। তাই বলে চারুকলার ওপর হামলে পড়তে হবে কেন? নিজেদের টাকা দিয়ে নিজেরা একটু রঙের খেলায় মাতবে বছরের প্রথম দিন এতে এতো আপত্তি কিসের?

বিশ্ব ইজতেমায় যে লাখ লাখ মানুষ দেখতে পান তারা আর পহেলা বৈশাখ উদযাপনের মানুষ কিন্তু একই। এই আমরাই যাই জানাযায় এই আমরাই যাই সিনেমায়। ভোরে ঘুম ভেঙ্গে আমরাই মসজিদের পানে ছুটি। আবার ঘুম ভাঙতে দেরি হলে পরে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নেই। অন্য জাতের প্রেতাত্মা তুমি আমাকে নিয়ে শঙ্কিত হয়ো না। আমি আমার মতো ভালোই আছি। আমি আধুনিক বাংলা মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান। আমি আমার সংস্কৃতির একটি কণাও ছেড়ে দেবো না। আমি আমার গৌরবের ইতিহাস সংরক্ষণ করবো। আমি চৈত্র সংক্রান্তি উদযাপন করবো। পরদিন বর্ষবরণ। যতদিন আমরা থাকবো ততদিন সব উৎসব চলবে। সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)