চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ঢাকা শহরের যানজটের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ কম

একটি আধুনিক নগরীতে মোট আয়তনের ২০ থেকে ২৫ ভাগ রাস্তা বা সড়ক থাকা প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকায় আছে মাত্র সাত থেকে আটভাগ। তার মানে হলো, প্রয়োজনের মাত্র এক তৃতীয়াংশ সড়ক আছে এই শহরে। ঢাকা শহরের মোট এলাকা ১৩৫৩ বর্গ কিলোমিটার আর ঢাকার বর্তমান রাস্তার আয়তন ২,২০০ কিলোমিটার, যার মধ্যে ২১০ কিলোমিটার প্রধান সড়ক। ট্রাফিক বিভাগের হিসাব মতে, সেই সড়কের কম করে হলেও ৩০ ভাগ বা তারও বেশি দখল হয়ে আছে অবৈধ পার্কিং এবং নানা ধরনের দখলদারদের হাতে। এছাড়া ফুটপাত হকারদের দখলে থাকায় প্রধান সড়কেই পায়ে হেঁটে চলেন নগরবাসী। ফলে যানজটের সঙ্গে আছে জনজট সমস্যা!

রাজধানী ঢাকায় যানজটের কারণে প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। ভেবে দেখার কেউ কি আছেন? ভেবে দেখার প্রয়োজন নেই কারণ যা ক্ষতি হচ্ছে সাধারণ জনগণের। আর বছরে যে আর্থিক ক্ষতি হয়, তার পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। ২০৩৫ সাল নাগাদ ঢাকার উন্নয়ন সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক। আমরা মনে করি, এর বাইরেও যানজটের আরও ক্ষতি আছে এবং সেসবও কম উদ্বেগজনক নয়। যানজটের কারণে অনেক মরণাপন্ন রোগীকে সময়মত হাসপাতালে নেয়া সম্ভব হয় না। এ পরিস্থিতি যে কত মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই। তাছাড়া রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকার ফলে সৃষ্ট ভোগান্তিতে অনেক সুস্থ মানুষ ও শারীরিক বা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে।এ রকম অনেক নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী। যানজটের কারণে মানুষের পক্ষে নির্ধারিত সময়ে ডাকার ভিতরেই কোনো গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নগরীতে বায়ুদূষণের বড় কারণ যানজট। এর পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যে হুমকি পড়ছে। দিন দিন বাড়ছে অসংক্রামক ব্যাধি। কাজেই যানজটের ক্ষতি শুধু কর্মঘণ্টা বা অর্থমূল্য দিয়ে নিরূপণ করলে চলবে না, সামগ্রিকভাবে বিবেচনায় নিয়ে একে মোকাবেলা করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

বস্তুত যানজট এখন ঢাকা মহানগরীর প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ সমস্যা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। নগরীর লোকসংখ্যা বেড়েছে, বেড়েছে যানবাহনের সংখ্যাও। কিন্তু সে তুলনায় বাড়েনি সড়কের সংখ্যা ও পরিধি। এজন্য নীতিনির্ধারকরাই দায়ী বলে মনে করি। তারা সময় থাকতে দূরদৃষ্টি নিয়ে নগর পরিকল্পনাকারীদের কাজে লাগালে যানজট পরিস্থিতি মনে হয় আজ এতটা জটিল আকার ধারণ করতো না। সুষ্ঠু পরিকল্পনা না থাকায় নগরীতে গাড়ির সংখ্যা বাড়লেও গণপরিবহন সংকট তীব্র। গণ পরিবহনের সংখ্যা ও সেবার মান বাড়লে এবং এ খাতে অরাজকতা আজো বন্ধ হয়নি। বস্তুত পরিবহন খাতে বিদ্যমান ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা যানজটের একটি বড় কারণ, যার পেছনে কাজ করছে অর্থ লোভীদের গোষ্ঠীস্বার্থ। সরকার এদিকে নজর দিলে এখনও যানজটের তীব্রতা কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব বলে আমরা মনে করি।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, যানজটের কারণে রাজধানীতে এখন ঘণ্টায় গড়ে প্রায় সাত কিলোমিটার গতিতে চলছে যানবাহন। এভাবে চলতে থাকলে আর কিছুদিন পর হেঁটেই গাড়ির আগে যেতে পারবে মানুষ। যানবাহনের সংখ্যা যদি একই হারে বাড়তে থাকে এবং তা নিরসনের কোনো উদ্যোগ না নেয়া হয়, তাহলে ২০২৫ সালে এ নগরীতে যানবাহনের গতি হবে ঘণ্টায় চার কিলোমিটার, যা মানুষের হাঁটার গতির চেয়েও কম। আমরা বলব, কেন্দ্রীভূত প্রশাসন ব্যবস্থাও এ অবস্থার জন্য দায়ী। দেশের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়ের অবস্থান ঢাকায় হওয়ার কারণে রাজধানীর ওপর চাপ বেড়েছে। প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে এ অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব। একইভাবে ঢাকা ও এর আশপাশে অবস্থিত কলকারখানাগুলোও দূরবর্তী সুবিধাজনক স্থানে সরিয়ে নেয়া দরকার। উল্লেখ্য, এসব কারখানায় বিপুল সংখ্যক কাজের সন্ধানে গ্রাম থেকে আসা শ্রমিকেরা কাজ করেন।

ভয়াবহ যানজট রাজধানীর বাসযোগ্যতা ক্রমেই কমিয়ে দিচ্ছে। এ সমস্যা নিরসনে অনেক সভা-সেমিনার হয়েছে, হয়েছে গবেষণা। দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চালানো হয়েছে সমীক্ষা। কিন্তু সমস্যা নিরসনে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে সামান্যটুকুই। কিছু নতুন সড়ক ও ফ্লাইওভার নির্মাণ করে যে রাজধানীর যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, এটা এখন পরিষ্কার নয় কি? । বাংলাদেশের এই জনসংখ্যার ঘনত্ব সমস্যা ঢাকায় আরও ঘনীভূত হয়েছে। বাস্তবিক পক্ষে,অনেকেই মনে করেন যে ঢাকাই হচ্ছে বাংলাদেশ- এটাই এই সমস্যার একটা কারণ। দেশের সরকারি কার্যক্রম, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও চাকরির সিংহভাগ ঢাকায় কেন্দ্রীভূত। প্রতিবছর প্রায় চার লাখ মানুষ ঢাকায় আসছে। এই বিপুল অভিবাসনের কারণে ঢাকা এখন বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ মেগাসিটি, সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল শহরগুলোর মধ্যে একটি। যে শহরে এক কোটির বেশি মানুষ বসবাস করে, সেখানে মৌলিক অবকাঠামো নেই বললেই চলে। সঙ্গে রয়েছে আইনের শাসনের নাজুক অবস্থা। অথচ একটি শহর বসবাসযোগ্য হতে হলে এগুলো প্রয়োজন। ঢাকায় ট্রাফিক বাতির সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। যদিও এগুলো কমবেশি আলংকারিক। খুব কম চালকেই দেখি এই বাতির সংকেত মেনে চলেন। ঢাকার নৈরাজ্যকর রাস্তার প্রধান সমস্যাই হচ্ছে এখানে রাস্তার পরিমাণ কম। পত্রিকার প্রতিবেদন অনুসারে, ঢাকায় রাস্তার পরিমাণ শহরের মোট আয়তনের মাত্র ৭ ভাগ ফুটপাতও একটা সমস্যা। ঢাকায় হাঁটার রাস্তা খুব কম। যাও আছে তাও হাঁটার অযোগ্য, হকার ও গরিব মানুষের দখলে চলে গেছে। তাহলে উত্তরণের উপায় কি? আসলে ঢাকার মতো শহরের ভিড় ভাট্টা দূর করার পথ হচ্ছে, পথচারীদের রাস্তার নিচ দিয়ে চলাচল করানো, রাস্তার ওপর দিয়ে নয়। কিন্তু ঢাকায় কোনো বিকল্প পথ নেই। এমনকি সে রকম কিছু বানানোর পরিকল্পনাও সরকারের নেই। আর ব্যক্তিগত গাড়ি ক্রমবর্ধমান হারে মর্যাদার প্রতীকে পরিণত হওয়ায় সমস্যা আরও বেড়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ি মধ্যবিত্তের কাছে ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে প্রতিবছরই ঢাকার রাস্তায় হাজার হাজার ব্যক্তিগত গাড়ি নামছে। যানজট মানুষকে বানাচ্ছে অসামাজিক মানুষ হিসেবে তৈরি করছে। যানজট জাতীয় অগ্রগতির পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদনের জন্য যে সময় ব্যয় হওয়ার কথা তা গিলে খাচ্ছে এ সমস্যা। গত এক দশকে যানজটে অপচয় হওয়া সময় ব্যবহৃত হলে বাংলাদেশ বহু আগেই মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতো। ফলে এ সমস্যার সমাধানে আন্তরিক প্রয়াসই এখন সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
রাজধানীর যানজট নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে একের পর এক পদক্ষেপ নেয়া হলেও তা তেমন কোনো কাজে আসছে না।আবার ও বলছি যানজট নিরসনে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপের বিকল্প নেই। বিচ্ছিন্নভাবে একক পদক্ষেপ নিয়ে এ সর্বগ্রাসী সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। রাজধানীর রাস্তার তুলনায় যানবাহনের আধিক্য যানজটের জন্য অন্যতম দায়ী। এর পাশাপাশি রয়েছে ট্রাফিক নিয়ম না মেনে চলার প্রবণতা। ফুটপাত অপদখল, রাস্তার অব্যবহারও যানজটের অন্যতম কারণ।

বিশাল ঢাকা মহানগরীতে ট্রাফিক পুলিশ রয়েছে প্রায় তিন হাজারের মতো। রাজধানীর ৫৯ পয়েন্টে বৈদ্যুতিক ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করা হলেও যান্ত্রিক ত্রুটি তার একটা অংশকে অচল করে রেখেছে। মাত্রাতিরিক্ত যানবাহনের চাপে কোনো কোনো এলাকায় যান্ত্রিক ট্রাফিক সিগন্যাল অকার্যকর হয়ে পড়েছে। রাজধানীর ২ হাজার ১০০ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে মোটরযান চলে মাত্র ২৮০ কিলোমিটার রাস্তায়। এর এক বড় অংশ হকার এবং অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। আমাদের মতে, যানজট নিরসনে রাজধানীর রাস্তাগুলো প্রশস্ত করণ, ব্যাপকহারে ফ্লাইওভার নির্মাণ, রাজপথ থেকে হকার উচ্ছেদ এবং অবৈধ পার্কিংয়ের অবসান ঘটাতে হবে। ট্রাফিক আইন মেনে চলার ক্ষেত্রেও আরোপ করতে হবে কঠোর আইন শৃঙ্খলা ব্যবস্থা। এ নগরীকে বাসযোগ্য রাখতে প্রয়োজন ব্যাপক ভিত্তিক পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়নের উদ্যোগ। এজন্য সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সবার উদ্যোগী ভূমিকা কাম্য বলে মনে করি

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View