চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ড. কামাল হোসেন হারবেন না জিতবেন?

কথায় আছে রাজনীতির শেষ বলে কিছু নেই। সেই মহা সত্যটা সম্প্রতি হাতে-নাতে প্রমাণ দিলেন গণফোরামের সভাপতি, বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য খ্যাত ড. কামাল হোসেন। সব অতীত পেছনে ফেলে তিনি এবার সত্যিই অবিশ্বাস্যভাবে গাঁটছড়া বেঁধেছেন বিএনপির সাথে। তার নেতৃত্বেই এখন তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক জোট ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’। বিএনপি ছাড়াও এই ফ্রন্টে রয়েছে আ স ম আব্দুর রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডি, মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্যসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল। সাবেক ডাকসু ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুরও রয়েছেন এই জোটে। শুরুতে সাবেক প্রেডিডেন্ট বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে বিকল্প ধারা থাকলেও এখন বিকল্প ধারা এই জোটে আর নেই।

ড. কামাল হোসেন জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের হয়ে রাজনীতির ময়দানে এখন সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। তিনি বলছেন, অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে তিনি লড়াই শুরু করেছেন। এ লড়াই থেকে তিনি সরবেন না, তাতে যদি তাকে গুলিও করা হয়, তাও তিনি পিছপা হবেন না। আগামী ২৩ অক্টোবর এই জোট সিলেটে আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মসূচি পালন করবে। এরপর ধারাবাহিকভাবে তারা অন্যান্য কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করবে। অনেক আগেই ড. কামাল হোসেন আওয়ামী লীগ ত্যাগ করলেও বঙ্গবন্ধুর স্নেহ-ভালোবাসা, আদর্শ কখনই ত্যাগ করেননি-একথা তিনি প্রায়শই বলে থাকেন। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে খালেদা জিয়ার কেক কাটা, জঙ্গীদের মদদ ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া- ইত্যকার সব স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হওয়ার কারণে আওয়ামীপন্থীদের বিশ্বাস ছিল ড. কামাল হোসেন শেষ মেষ বিএনপির ফাঁদ বা বন্ধনে আটকা পড়বেন না।

এ ছাড়া ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি কর্তৃক নির্বিচারে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করার যে অভিযোগ সে দায় এখনও ঝুলছে। এই দায়ের ভাগীদার তিনি হবেন না। কিন্তু ১৩ অক্টোবর ড. কামাল হোসেন নিজেই এসব আবেগ এবং প্রশ্নের সমাধান দিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে ঐক্যফ্রন্টের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। এ কারণেই নতুন জোট তৈরি ও নেতৃত্বে আসার পর ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে চলছে নানান আলোচনা-সমালোচনা। কামাল হোসেনকে কাছে পেয়ে বিএনপিপন্থীরা যে মারাত্মক খুশি হয়েছেন তা তাদের কথাবার্তাতে স্পষ্ট প্রতীয়মান। অনেকের মতে, বিএনপি এবার কিছুটা হলেও পায়ের তলায় মাটি খুঁজে পেয়েছে। 

ড. কামাল হোসেন একদা আওয়ামী লীগে নিবেদিত প্রাণ হিসেবে চিহ্নিত হলেও  আওয়ামী লীগ থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছিন্ন হন ১৯৯২ সালে। আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে সেসময় গড়ে তোলেন ‘গণফোরাম’ নামে আলাদা রাজনৈতিক দল। প্রথম প্রথম ড. ইউনুস, সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিকসহ অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে এই দলে যুক্ত করতে পারলেও পরবর্তীতে এক এক করে সবাইই গণফোরাম ছেড়ে চলে যান। রাজনীতির ময়দানে সেই অর্থে গণফোরাম কোনো রাজনৈতিক শক্তিই না। একেবারেই ব্যক্তি নির্ভর একটি দল। দেশের কোথাও এই দলের সাংগঠনিক শক্তি বলে কিছু নেই। আবার নির্বাচনী লড়াইয়ে বরাবরই ড. কামাল হোসেন সবসময় ব্যর্থ হয়েছে। কখনই কোনো আসনে জয়ী হতে পারেননি, শুধু পরাজিত হয়েছেন।

৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর একটি ছেড়ে দেওয়া আসনের উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি প্রথম সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। এরপর প্রতিটি নির্বাচনেই হেরেছেন। তবে ৯১ এর নির্বাচনে ঢাকার আসনগুলোতে শেখ হাসিনাসহ অন্যরা বড় ভোটের ব্যবধানে হারলেও মিরপুর আসনে তিনিই কেবল সবচেয়ে কম ভোটে হেরেছিলেন। ৮১ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি পদে দাঁড়িয়েছিলেন। বিএনপি প্রার্থী আব্দুস সাত্তারের কাছে হেরেছিলেন বিপুল ভোটে। আব্দুস সাত্তারের ৬৫ শতাংশের বিপরীতে পেয়েছিলেন মাত্র ২৬ শতাংশ ভোট। ৯৬ থেকে সর্বশেষ জাতীয় সংসদের আগ পর্যন্ত নির্বাচনে গণফোরাম দলীয়ভাবে কখনই বিন্দুমাত্র সাফল্য দেখাতে পারেনি।

কথায় কথায় ড. কামাল হোসেন বঙ্গবন্ধুর কথা বলেন। অবশ্যই এ অধিকার তার রয়েছে। ১৩ অক্টোবর প্রেসক্লাবে বসেও বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যের উদাহরণ টানতে ভুল করেননি। সেদিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করে বলেন, বঙ্গবন্ধু আমাকে কিছু না দিলেও স্বৈরাচারীদের বিরুদ্ধে লড়াই করার শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে পারি। তাই ভয় দেখিয়ে কাজ হবে না। কেউ যদি গুলি করতে চায়, তাহলে করুক। আমাদের কোটি কোটি জনগণ। কার কাছে কতো গুলি, কতো ট্যাংক আছে নিয়ে আসুক। বঙ্গবন্ধুর সৈনিকরা ভয় পায় না।

Advertisement

তিনি আরও বলেন, অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনে যারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করবে তারাই সরকার গঠন করবে। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে তাদের সবাইকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি ঐক্যফ্রন্টে। যারা দেশে লুটতরাজ করেছে তারা ঐক্যবদ্ধ জনগণকে দেখলে পালাবে। আমাদের কোনো কথা নেই। তারা চলে যাক। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। এ দিন তিনি আরো বলেন, সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলতে চাই, মানুষের ভোটাধিকারের জন্য নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। দেশের মালিক জনগণ৷ কালো টাকার বিনিময়ে, সাম্প্রদায়িকতার বিনিময়ে, পেশীশক্তির বিনিময়ে যারা ক্ষমতায় আসতে চায় তাদেরকে নয়, আমরা জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে চাই৷(১৩ অক্টোবর প্রথম আলো)

পত্রিকায় ছাপা হওয়া ড. কামাল হোসেনের এই বক্তব্যগুলো চুলচেরা বিশ্লেষণ করলে তার বক্তব্যে কতগুলো মারাত্মক ত্রুটি, ভণ্ডামি ও স্ববিরোধিতা ধরা পড়ে। প্রথমত তিনি বলেছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যারা বিশ্বাস করে তাদেরকে ঐক্যফ্রন্টে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। খুব ভালো কথা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় কোথায় বলা আছে যে সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম’ স্থাপিত করতে হবে? অথচ বিএনপি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এই বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি করে আসছে। ড. কামাল হোসেনের কাছে নিশ্চই এটি অজানা নয়। একইভাবে বিএনপি এবং তাদের পুরনো মিত্ররা বরাবরই কালো টাকা, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি করেছে।

অথচ কামাল হোসেন বিএনপির সাথে জোট করে একই মঞ্চে বসে বলছেন, কালো টাকার বিনিময়ে, সাম্প্রদায়িকতার বিনিময়ে, পেশীশক্তির বিনিময়ে যারা ক্ষমতায় আসতে চায় তাদেরকে নয়, আমরা জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে চাই। বিএনপির সাথে একই মঞ্চে বসে এ ধরনের কথাবার্তা বলা যে কতোটা স্ববিরোধীতা তা বলে শেষ করবার নয়। বিগত দিনে বিএনপি কি এসব করেনি? এভাবে প্রতিটি বিষয় আলোচনা করলে এই সত্যই বেরিয়ে আসবে যে কোনোভাবেই বিএনপির সাথে একমঞ্চে বসে ঐক্য করা ড. কামাল হোসেনের রাজনৈতিক চেতনার সাথে মানায় না। তিনি যত যুক্তিই দিন, কেবল ক্ষমতায় যাবার লোভেই যে তিনি এই কাজটি করেছেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। 

ড. কামাল হোসেন দেশের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, আইনজ্ঞ, অক্সফোর্ডের সাবেক শিক্ষার্থী। সংবিধান প্রণেতা হিসেবে তার যে মর্যাদাময় পরিচয় তা কোনোদিন আড়াল হয়নি। সেই পরিচয় এখনও অটুট রয়েছে। ঘোর নিন্দুকেরাও মনে করেন সাবেক এই আওয়ামী লীগ নেতার এই পরিচয়টি এখনও অন্যরকম অর্থবহন করে। তরুণ বয়সে অন্যদের সাথে সমপরিশ্রম করে সংবিধান উপহার দেওয়ার অনন্য কৃতিত্ব তার অক্ষত। আবার মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশ্বস্ত বলে যারা পরিচিত ছিলেন ড. কামাল হোসেন অবশ্যই তাদেরই একজন।

ড. কামাল হোসেনের বয়স ৮০ পেরিয়ে গেছে। রাজনীতিতে তিনি অসফল হলেও আইন ও সংবিধানে বিশেষজ্ঞ হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তিনি বহু আগেই অনন্য পরিচয়ের অধিকারী। একজন প্রাজ্ঞ আইনবিদ হিসেবে তার প্রতিদিনের পারিশ্রমিক কয়েক লাখ টাকা। কিন্তু প্রখর জ্ঞানসম্পন্ন এই রাজনীতিবিদ সবাইকে অবাক করে এবং শত বিতর্কের জন্ম দিয়ে রাজনীতিতে যে মিত্র বেছে নিলেন সেখানে কি সাফল্য পাবেন? বিএনপির শত দায়ই বা কেন তিনি কাঁধে নেওয়ার ঝুঁকি নিলেন? রাজনীতির নতুন মারপ্যাঁচ আর জটিল সমীকরণে তিনি কী জিতবেন না হারবেন?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)