চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ডেডলি কার্গো থেকে কিলিং মিশন

কক্সবাজারের একটি মাঝারি মানের হোটেলে আমি আর অ্যালেক্স পেরী মুখোমুখি বসে পরের দিনের কাজের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছি। সেসময় দরোজায় কড়া নাড়ার শব্দ। দরজা খুলতেই আমাদের এক সোর্স রুমে ঢুকলেন রোহিঙ্গা আন্দোলনের এক নেতাকে নিয়ে। তিনি জানেন, আমরা অস্ত্র কিনতে চাই। দাম রফা হলে কাংখিত অস্ত্র একে ৪৭ দেখা যাবে। আর টাকা মিটিয়ে দিলে তা পৌঁছে দেয়া হবে কক্সবাজার বা চট্টগ্রামের কোনো ঠিকানায়। ছদ্মপরিচয়ে আলাপ শেষে আমরা তাদের বিদায় দিয়ে আবার কাজ নিয়ে বসলাম।

পেরী একটা কাগজ বের করে দিলেন। এটা কাস্টমসের একটি সিজার লিস্ট। কক্সবাজারের এক চেক পোষ্টে মায়ানমার থেকে আসা একজনের ব্যাগে পাওয়া যায় একটি ওষুধ। এটা কিডনি রোগের জন্য, আর এই বিশেষ ওষুধটি ব্যবহার করতেন আল কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেন। পেরীর জিজ্ঞাসা ছিল তা হলে কি লাদেন বাংলাদেশে এসেছিলেন? হুজিসহ নানা উগ্রবাদী সংগঠনের বেশ কিছু সোর্সের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হতে পারিনি। আবার ওষুধসহ গ্রেফতার ওই ব্যক্তিরও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

এর আগে আমরা চট্টগ্রামে ব্যাপকভিত্তিক কাজ করি একটি জাহাজে করে তালেবানদের একটি দলের চট্টগ্রামে আসা এবং দেশ থেকে বেরিয়ে যাওয়া নিয়ে। এই অনুসন্ধান নিয়ে ২০০২ সালে ১৪ অক্টোবর সংখ্যায় টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ছিল ‘ডেডলি কার্গো: বাংলাদেশ হ্যাজ বিকাম এ সেফ হ্যাভেন ফর আল কায়েদা’। অবশ্য সেসময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বিএনপি-জামায়াত জোট থাকায় পরিস্থিতি বিবেচনায় ওই প্রতিবেদনে লেখক হিসেবে পেরীর সাথে আমার নাম ছাপা হয়নি।

আমরা অনুসন্ধানে জানতে পারি, ২০০১ সালের ডিসেম্বর মাসে কোনো এক সময় এমভি মাক্কা নামের একটি মাছ ধরা ট্রলারে করে তালেবানের ৫০ জনের একটি দল চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। তারা নিরাপদে নামার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। চট্টগ্রাম বন্দরে কর্মরত শ্রমিক এবং শ্রমিক নেতাদের সাথে কথা বলে আমরা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করতে সক্ষম হই। কিন্তু তারা বাংলাদেশে থেকে গেছে নাকি অন্য কোথাও চলে গেছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় না।

সেসময়ের একটি ঘটনা আমাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে যে ওই তালেবান বা আল কায়েদা সদস্যরা বাংলাদেশ হয়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার বিষয়টি সরকারের একটি পক্ষের গোচরে ছিলো। সেসময় চট্টগ্রাম পাসপোর্ট অফিস থেকে ১২টি পাসপোর্ট ইস্যু হয়। বিষয়টি পাসপোর্ট অফিসের প্রধানের নজরে আসলে তিনি সাথে সাথে স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেন। একইসঙ্গে স্থলপথ বা বিমান বন্দরে এই পাসপোর্ট ব্যবহার করে কেউ যেতে দেশত্যাগ করতে না পারে তার উদ্যোগ নেয়ার অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু সেটা করা হয়নি। তব চট্টগ্রাম পাসপোর্ট অফিসের ওই কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

‘টাইম’ ম্যাগাজিনের হয়ে কাজ করার সময় আমরা ঢাকার পাশের ডেমরার একটি এবং হাটহাজারিতে হেফাজত নেতা মাওলানা শফির মাদ্রাসা পরিদর্শনের চেষ্টা করি। অভিযোগ ছিলো, আফগানিস্তানে যুদ্ধে অংশ নেয়া এবং প্রশিক্ষিত কয়েকজন এই দুই মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন। একই সাথে তারা জিহাদি প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন ছাত্রদের। কিন্তু আমরা পুরো মাদ্রাসা পরিদর্শন এবং ছাত্রদের সাথে কথা বলতে চাইলে তাতে বাধা দেয়া হয়।

বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার আগে এনএসআই এর ওইসময়ের প্রধান মাদ্রাসাকেন্দ্রিক জিহাদি গ্রুপের উত্থানের উপর একটি প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছিলেন। কিন্তু বিএনপি দায়িত্ব নেয়ার পর এ বিষয়ক কাজ বন্ধ হয়ে যায় বলে তিনি জানান।

এই সময়কালে জিহাদি গ্রুপগুলোর সোর্স এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা রিপোর্ট থেকে জানা যায়, আল-কায়েদার তৎকালীন উপ-প্রধান এবং বর্তমান প্রধান আয়ামান আল জাওয়াহিরি আফগানিস্তানে তালেবানদের পতনের পর বাংলাদেশ হয়ে অন্য কোনো দেশে চলে গেছেন।

এরপর বাংলাভাই ও জেএমবি এবং হুজিসহ কয়েকটি জঙ্গি গ্রুপ সক্রিয় হয়ে উঠে। আনসারউল্লাহ বাংলা সেভেনসহ নানা গ্রুপ এখনো সক্রিয়। বিশেষ করে ৭৫ পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যারা ৯৬ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন তাদের পরোক্ষ মদদে এগুলোর বিস্তার ঘটেছে। আর এতে যে সরাসরি জামায়াতের মদদ আছে তারও প্রমাণ আছে অনেক। এর সাথে জড়িত আছে বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের একটি অংশ। বিষয়টি নির্মূলে আওয়ামী লীগ সব সময় কঠোর থাকার কারণে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার চেষ্টাও করে হুজি-বি। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায়ও এই উগ্রবাদীদের ব্যবহার করা হয়েছে।

১৩ বছর আগে টাইম তার প্রতিবেদনে দাবি করেছিলো, আল-কায়েদার নিরাপদ রুট বাংলাদেশ। ওয়ান ইলেভেনের পর থেকে পরিস্থিতি বদলে গেছে। কিন্তু তাদের স্বজন হিসেবে যারা সক্রিয় তারাই যে বিজ্ঞান লেখক ও ব্লগার অভিজিত রায়, রাজিব হায়দার এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শফিউল ইসলাম লিলনকে হত্যা করেছে সেটা প্রমাণ হয়েছে আল-কায়েদা ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার দায় স্বীকারে।

বিজ্ঞাপন