চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ডা. মুকুট: বিদায় রাজপথের প্রিয় সহযোদ্ধা

বিশিষ্ট চক্ষুবিশেষজ্ঞ, ফ্যাকো সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম মুকুট আমাদের প্রিয় এক অনুজ। ছাত্রজীবনের আন্দোলন-সংগ্রাম পেরিয়ে যে তরুণ চোখের ডাক্তার হিসেবে সবার কাছে বড় প্রিয় ও ভরসার জায়গা হিসেবে খ্যাত হয়ে উঠেছিলেন। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক নেতাকর্মী, সহযোদ্ধাদের কাছে চোখের বিপদে-আপদে প্রিয় মুকুটের বিকল্প বোধ হয় আর কেউ ছিল না। আমাদের অনেকেরই মা, বাবা, দাদা-দাদী, চাচা-চাচীর চোখে অপারেশন করে নতুন করে আলো ফুটিয়েছেন তিনি। রাজনীতির সাথী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্ত্বরের সাথী ডা. জাহাঙ্গীর আলম মুকুট একেবারেই অপরিণত বয়সে সবাইকে অবাক করে দিয়ে চিরবিদায় নিয়ে চলে গেলেন।

সোমবার ভোর রাতে মুকুট শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কাল রাত (২১ জুন) সাড়ে দশটার দিকে মুকুটের হার্ট অ্যাটাক হলে শ্যামলীস্থ স্পেশালাইলজড হাসপাতালে নেওয়া হয়। মুকুট নিজেও ঐ হাসপাতালের অন্যতম পরিচালক। ওখানেই রাতে স্টেন্টিং (রিং) পরানো হয়। কিন্তু শেষরাতে মুকুট সবাইকে কাঁদিয়ে চলে যান। মুকুট ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৪৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী। সকালবেলা জাসদ ছাত্রলীগের সাবেক জনপ্রিয় নেতা শফী ভাই-এর ফেসবুক ওয়াল থেকেই মুকুটের মৃত্যুর সংবাদটা পড়তেই বিস্মিত হই। একেবারে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। শফী ভাই লিখেছেন, ‘এই কী দুঃসংবাদ…মুকুট আমার চোখের ডাক্তার মুকুট আমার অতি বিশ্বস্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রনেতা….আমি কত রুগী পাঠিয়েছি মুকুটের কাছে, ছাত্রজীবনে কত শাসন করেছি, আমি নির্বাক…..ডা. জাহাঙ্গীর আলম মুকুট বাংলাদেশ আই হসপিটালের স্বনামধন্য চক্ষুবিশেষজ্ঞ। একসময়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র)-এর কেন্দ্রীয় নেতা, আমাদের সকলের প্রাণের মানুষ, জীবনের অনেক স্মৃতি যাদের সাথে তাদের অন্যতম মুকুট ভোর ৪ টায় ইন্তেকাল (ইন্নালিল্লাহি…..রাজিউন) করেছেন। শফী ভাই এর স্ট্যাটাস পড়ে থমকে থাকি। এও কী সম্ভব? আই হসপিটালে যে মুকুটের সাথে ১৮ জুন বৃহস্পতিবারে দেখা করে এলাম তার এত কম বয়সে চলে যাওয়া। বুকের ভেতরটা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে থাকলো।

বিজ্ঞাপন

করোনাকালে অনেক মৃত্যুসংবাদই নিত্য আমাদের শুনতে হচ্ছে। কিন্তু মুকুটের অকাল প্রয়াণে মুকুটের রাজনৈতিক সাথী থেকে শুরু করে তাঁর শত শত নিয়মিত পেশেন্ট চমকে না উঠে পারেননি। এভাবে অকস্মাৎ এক প্রগিতশীল দরদী তরুণের চলে যাওয়া মেনে নেওয়ার বড় কঠিন। মুকুট শুধু একজন চিকিৎসক ছিলেন না। চিকিৎসকের বাইরেও যে তিনি অনেককিছু ছিলেন। নব্বই-এ এরশাদ সরকার বিরোধী আন্দোলনে মুকুট সামনের সারির সাহসী এক যোদ্ধা। মুকুট তখন জাসদ ছাত্রলীগের ঢাকা মেডিকেল কলেজ শাখার নেতা। অনেকের মতো সমাজ পরিবর্তনের অদম্য নেশা মুকুটের ভেতরেও প্রোথিত। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী এক স্বাপ্নিক সাহসী তরুণ। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের শেষলগ্নে মুকুট চোখের সামনে হারান প্রিয় নেতা ডা. শামসুল আলম খান মিলনকে। তাঁর আদর্শ আর অহংকারের আরেক স্বপ্নময় মানুষ ছিলেন শহীদ ডা. মিলন। ডা. মিলনকে হারানোর সেই বেদনা মুকুট সারাজীবন বয়ে বেরিয়েছেন। বজ্রমুষ্ঠি উঁচিয়ে ডা. মিলন হত্যার বিচার চেয়েছেন শতসহ¯্রবার। আর মৃত্যুঅব্দি ডা. মিলনের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি কোনোদিন, আদর্শকে বুকে লালন করেই চলেছেন। এ কারণেই মুকুট শহীদ ডাক্তার মিলনের মতোই গণমানুষের ডাক্তার হিসেবে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন।

বিজ্ঞাপন

ডা. মুকুট হয়েছিলেনও তাই। মানুষকে চিকিৎসাসেবা দেওয়াটাকে মুখ্য মনে করতেন। আর তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিজের পাওনাটা ছেড়ে দিতেন। সহাস্যে বলতেন ‘আমার ফি নেব না’। এইতো ১০ জুন আমার আম্মার ডান চোখের ক্যাটারাক্ট অপারেশন করেন মুকুট। বাংলাদেশ আই হসপিটালের প্যাকেজ অনুযায়ী লেন্স ক্রয় আর সব চার্জ মিলিয়ে মোট ৭৫ হাজার টাকার প্যাকেজ । মুকুট ফাইল হাতে করে বলেন, ‘আমার দশহাজার টাকা দেওয়া লাগবে না। ৬৫ হাজার টাকা জমা দিলেই হবে।’ ১০ জুন আম্মার চোখ অপারেশনের পর ফলোআপ করতে পরেরদিন ১১ জুন মুকুটের কাছে যাই। আবার এক সপ্তাহ পূরণ হলে নিয়ম মতে ১৮ জুন মুকুটের কাছে মাসহ দেখা করি। মায়ের অপারেশন করা ডানচোখ ভাল করে পরীক্ষা করে বলেন, কোনো অসুবিধা নেই। করোনা কমে এলে বাম চোখটা অপারেশন করে যাবেন। মুত্যুর তিন দিন আগে ডা. মুকুটের সাথে এই শেষ দেখা, শেষ কথা। ঐদিন মুকুটকে বলি আজকেও কী ফি নেবেন না। মুকুট হেসে বলে, জাহিদ ভাই লাগবে না। আমি বলি, ‘মুকুট আমি টাকা আজ দিতে চাই’। মুকুট আবার বলে না, ‘না দেওয়া লাগবে না।’

বিজ্ঞাপন

শুধু আমি বলে নই, রাজনীতির ময়দানের সহযোদ্ধা থেকে শুরু করে পরিচিত সবার সাথেই মুকুট এমনটিই ছিলেন। পেশার চেয়ে মানুষের সাথের সম্পর্কটাকে বড় করে দেখতেন। আর তাই টাকা বা ভিজিট এর কথা চিন্তা করতেন না। মুকুট জাসদ রাজনীতির সাথে দীর্ঘদিন জড়িত ছিলেন বলে জাসদের ঘরানার কম-বেশি সবাই চোখের বিপত্তিতে মুকুটের দ্বারস্থ হতেন। পার্টি প্রেম বলে কথা। মুকুট কাউকে কোনোদিন নিরাশ বা হতাশ করেনি। সহযোগিতা করেছেন অন্তর থেকে। মুকুটের অন্যতম বন্ধু জিয়াউল হক মুক্তা লিখেছেন, মুকুট অনেক গরিব রুগিকে পকেট থেকে যাতায়াত ভাড়া পর্যন্ত দিয়ে দিয়েছেন।

মুকুট ছিলেন উচ্চতরো মানবিক গুণাবালী সম্পন্ন একজন। আবার রাজপথে দেওয়া সেই শ্লোগান ‘প্রতিশোধ-প্রতিরোধ’ অন্তরে ধারণ করতেন। এ কারণেই পেশাগত জীবন শুরু করার পরও রাষ্ট্রের অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপকে মুকুট প্রতিবাদ করতে ছাড়েননি। অনেকেরই মনে থাকার কথা ২০০৮ সালের ২৭ জুলাই পূর্ব বাংলার কমিউনিষ্ট পার্টি (এমএল লাল পতাকা) শীর্ষনেতা ডা. মিজানুর রহমান টুটুলকে ক্রসফায়ারে দেয় বিশেষ বাহিনী। এই হত্যাকান্ড নিয়ে আলোচনার ঝড় ওঠে। সেসময় যে কয়জন চিকিৎসক এই হত্যাকান্ডের বিচারবিভাগীয় তদন্ত চেয়ে প্রতিবাদ করেছিল এর মধ্যে ডা. জাহাঙ্গীর আলম মুকুট ছিলেন অন্যতম। ২০০৮ সালের ১৪ আগস্ট অন্যান্য চিকিৎসকের সাথে দেওয়া যৌথ বিবৃতিটি দেশের শীর্ষ পত্রিকাগুলোতে ছাপা হয়েছিল।

মুকুটের অকস্মাৎ মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে জাসদ এবং সহযোগী সংগঠনসমূহ। ফেসবুক নিউজ ফিডে আজ সারাদিনই ডা. মুকুটের ছবি ভেসে উঠেছে। শত সহস্র জন মুকুটের জন্য শোক প্রকাশ করেছে, স্মৃতিচারণ করেছে। জাসদ ছাত্রলীগের সাবেক নেতারাই বেশি। মুকুটকে দাফন করা হয়েছে গাইবান্ধা জেলার সাঘাটার চন্দনপাটে, মায়ের পাশে।

নব্বই এর আন্দোলনের সাহসী যোদ্ধা মেধাবী ডা. মুকুটের অকস্মাৎ অকাল প্রয়াণ আমাদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। মুকুট বেঁচে থাকলে আরও কতো না জন উপকৃত হতো, সহযোগিতা পেত। সত্যিই, রাজপথের সহযোদ্ধাদের এ বিদায় বড় বেদনার, বড় কষ্টের। মুকুট, আপনার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)