চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে পুরস্কৃত করা উচিত

করোনা মহামারির কারণে মানুষকে বাঁচাতে শুরুতেই সরকার সারাদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা এবং একই সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দোকান-পাট, শপিং মল এবং গণপরিবহনও বন্ধ ঘোষণা করে। এটি মার্চের শেষ সপ্তাহের কথা। সেসময়ে সারাদেশেই অলিখিত লকডাউন শুরু হয়। একবারেই প্রয়োজন ছাড়া বাসার বাইরে আসতে মানা করা হয়। স্বভাবতই রাস্তাঘাটে মানুষের চলাচল একেবারেই কমে যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলের উপরও কঠোর নজরদারি রাখা হয় আর তাই দ্রুতই কোলাহল মূখর চির ব্যস্ত রাজধানী ঢাকার চিত্রও পাল্টে যেতে থাকে। কিন্তু সে সময় থেকেই আশ্চর্যজনকভাবে দেশের বড় বড় বেসরকারি হাসপাতালগুলোও কার্যত তাদের সমস্ত ধরনের চিকিৎসা সেবা প্রদান বন্ধ করে দেয়।

কোনো কোনো বেসরকারি হাসপাতাল নামকাওয়াস্তে জরুরি বিভাগ খোলা রাখলেও রোগী দেখা, ভর্তি করা থেকে বিরত তাকে। বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করলেও করোনা মহামারির শুরুতে তাদের অমানবিক নিষ্ঠুর এই আচারণ সবাইকে বিস্মিতই করে। এখন পর্যন্ত বেশীরভাগ বেসরকারি হাসপাতাল কার্যত বন্ধই। ফলে করোনা আক্রান্ত অনেক রোগীও বিভিন্ন হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘুরে সেবা পাননি। সুচিকিৎসার অভাবে অনেককেই মারাও যেতে হয় অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যেই। এখনও দেশের সব বড় বড় নামী-দামী তারকাখচিত অনেক বেসরকারি হাসপাতালই চিকিৎসাসেবা আগের মতো উন্মুক্ত করেনি।

বিজ্ঞাপন

করোনাকালে দেশের বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতাল যখন চিকিৎসা সেবা না দেওয়া এবং তাদের নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচারণে সমালোচিত হচ্ছিলো ঠিক সে সময়ে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত গণস্বাস্থ্য হাসপাতাল কিডনি  রোগীদের জন্য নিরবিচ্ছিন্ন ডায়ালাইসিস সেবা দিয়ে ইতিহাস গড়েছে বললে একটুও ভুল হবে না। শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশে যতগুলো বেসরকারি হাসপাতালে ডায়ালাইসিস করার সুযোগ-সুবিধা রয়েছে এর মধ্যে সবচেয়ে কম খরচে ডায়ালাইসিস সেবা দেওয়া হয় গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে। সেই কম কতোটা তা অনেকেই কল্পনাও করতে পারবেন না।

বিজ্ঞাপন

দেশের বেশিরভাগ নামকরা বেসরকারি হাসপাতালে প্রতিবার একজন রোগীর ডায়ালাইসিস বাবদ গড় খরচ পড়ে ৪ থেকে ১০ হাজার টাকা। অর্থাৎ মধ্যবিত্ত পরিবারের কোনো রোগীকে সপ্তাহে যদি দুবার ডায়ালাইসিস করতে হয় তাহলে প্রতিমাসে তাকে কম করে হলেও চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা হাসপাতাল খরচ বাবদ গুনতে হবে। সেখানে গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে একজন নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয়ের রোগীর ডায়ালাইসিস বাবদ প্রতিমাসে খরচ পড়ছে ১৬ থেকে ২০ হাজার টাকা। আবার নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয়ের একজন কিডনি রোগীর প্রতিমাসে ডায়ালাইসিস বাবদ খরচ পড়বে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। আর একজন দরিদ্র বা নিম্ন আয়ের মানুষের ডায়ালাইসিস বাবদ প্রতিমাসে খরচ পড়ছে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা।

গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে শুরু থেকেই ডায়ালাইসিস সেবা দেওয়া হয় একটি পরিকল্পনা মোতাবেক। একজন রোগীর আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়ন করে ডায়ালাইসিস-এর গ্রেড নির্ধারণ করা হয়। এখানে মোট চারটি গ্রেড আছে। গ্রেডগুলো এরকম- দরিদ্র, কম দরিদ্র, মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত। ডায়ালাইসিস করার আগে রোগীর আয় এবং পারিবারিক সক্ষমতা মূল্যায়ন করে রোগীকে গ্রেডভুক্ত করে একটি বই দেওয়া হয়। সেই বই-এ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকে রোগী ডায়ালাইসিস বাবদ কতো টাকা হাসপাতালে জমা করবেন।

এখানেই শেষ নয়, প্রতিদিন অনেক গরিব, অসহায়, অস্বচ্ছল কিডনি রোগীকে এখানে একেবারে বিনা পয়সায় ডায়ালাইসিস করা হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে এসব রোগীর পারিবারিক তথ্য আছে। কর্তৃপক্ষও জানে এই রোগীর আর্থিক অবস্থা কী। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সরাসরি নির্দেশ আছে এ ধরনের দরিদ্র রোগীরা যেদিন টাকা দিতে পারবেন না, সেদিন বিনা পয়সায় তাদের ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থা করতে হবে। গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে তাই কিডনি রোগে আক্রান্ত অসহায়-দরিদ্র দিনমজুর, শ্রমিক, কাজের বুয়ারাও নিয়মিত এখানে ডায়ালাইসিস করার সুযোগ পান। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রেখেছেন।

বিজ্ঞাপন

গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে প্রতিদিন অন্তত তিন শিফটে ডায়ালাইসিস করা হয়। প্রতিদিন গড়ে আড়াই শত থেকে সাড়ে তিনশত জন কিডনি রোগীকে এখানে ডায়ালাইসিস করানো হয়। আমার আপন ভাই যিনি রাজধানীর একটি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ তাঁকেও নিয়মিত ডায়ালাইসিস করতে হয় গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে। ডায়ালাইসিসের সময় আমাকে গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে যেতে হয় তার সাথে। প্রতিবার তার ডায়ালাইসিস বাবদ খরচ হয় ১ হাজার ৭ শত টাকা। বলতে দ্বিধা নেই দেশের অন্যকোনো হাসপাতালে গেলে এই খরচ হতো দুই গুনেরও বেশি।

করোনাকালে হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবারই দেখি কিডনি সমস্যায় আক্রান্ত অসহায় সব রোগীর করুণ মুখ। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় দূরদূরান্ত থেকে রোগীরা রিকশা, ইজিবাইক বা অটোরিকশায় করে আসছেন। বাস না থাকায় অনেকে সাভার, গাজীপুর থেকে বিভিন্নভাবে আসছেন। একমাত্র আশার আলো তাদের কাছে গণস্বাস্থ্য হাসপাতাল। অনেক রোগীকে দেখেছি ডায়ালাইসিস করে বাড়তি রিকশা ভাড়া দিয়ে যাওয়ার টাকা পর্যন্ত তাদের কাছে থাকে না। হাসপাতালের বই হাতে তারা অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকেন। আবার অনেক অসহায় রোগীকে দেখেছি একটু কম টাকায় রিকশায় যাওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাসপাতালের সামনে অপেক্ষারত। রিকসাওয়ালা বেশি টাকা চাওয়ায় তাঁর সামর্থের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে রিকসায় উঠছেন না।

এই করোনা মহামারিতে গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে একদিনের জন্যেও ডায়ালাইসিস সেন্টার বন্ধ হয়নি। সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করেও এই হাসপাতাল রাতদিন ডায়ালাইসিস সেবা অব্যাহত রেখেছে। সত্যিই করোনাকালে নানা ছুঁতোয় যখন বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল শপিং মলের মতো বন্ধ রাখা হয়েছে তখন গণস্বাস্থ্য হাসপাতাল স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। গণস্বাস্থ্য হাসপাতাল সত্যিকার অর্থেই প্রমাণ করেছে এটি গণমানুষের হাসপাতাল। এখানে কোনো শ্রেণীবৈষম্য, ভেদাভেদ নেই- প্রতিটি মানুষেরই বাঁচার অধিকার রয়েছে।

গণস্বাস্থ্য হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে দেখেছি করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আগে প্রতিদিনই হাসপাতালে পায়চারি করতে। মূল গেটে এসে দেখতেন গেটে কেউ জটলা করছে কী না। হাসপাতালে আগতজনেরা সাবান দিয়ে হাত ধুচ্ছে কিনা। আবার গেটে দাঁড়িয়ে হয়ত অচেনা কোনো মানুষের সাথে কথা বলছেন নির্বিঘ্নে। শুনছেন সুবিধা-অসুবিধার কথা। কোনো কাজ পছন্দ না হওয়ায় হয়ত ক্ষ্যাপাটে আচারণ করছেন

করোনাকালে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। তিনি চেয়েছিলেন খুব কম পয়সায় করোনার দ্রুত পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করবেন। সেই উদ্দেশ্য থেকেই তিনি গণস্বাস্থ্য হাসপাতালের ড. বিজন শীলের নেতৃত্বে করোনা কীট নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু সেই কীট এখনও সরকারি অনুমোদনের অপেক্ষায়। আসলে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী স্বাস্থ্য ব্যবসা নয়, স্বাস্থ্যসেবাটাকেই মনে-প্রাণে ধারণ করেন। ‘গণ’ শব্দটা তাঁর আত্মার মধ্যেই প্রোথিত। আর এ কারণেই তিনি ক্ষেপে যান, রাগ করেন।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী এই করোনা কালে শত শত কিডনি রোগীর ডায়ালাইসিস সেবা দিয়ে যে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন তা অতুলনীয়। ভেতরে ভেতরে মহাশক্তি দেখিয়ে অনেকেই বড় বড় হাসপাতাল আর চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে রাখলেও দরিদ্রজনের জন্য গণস্বাস্থ্য হাসপাতাল এখনও উন্মুক্ত। করোনার দুর্যোগে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী দরিদ্র অসহায় রোগীদের জন্য যা করেছেন তাতে করে তাঁকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আরও সম্মানিত করা উচিত, পুরস্কৃত করা উচিত।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)