চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ডাক্তার? সেতো করোনাকালের ভগবান!

অসংখ্য মৃত্যুপথযাত্রীকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে বাঁচিয়ে তুলতে পারেন কেবল চিকিৎসক। মানবসমাজে আর কোনো পেশার মানুষ এই কাজটি করতে পারেন না। তাই সুসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তার এক চিকিৎসক চরিত্রের নাম দিয়েছিলেন জীবনমশায়। অনেকে ডাক্তারকে ভগবানও বলে থাকেন। এর কারণও আছে। মুমূর্ষু সন্তানকে যে ডাক্তার সুস্থ করে তোলেন, বাবা-মার কাছে সেই ডাক্তার ভগবান ছাড়া আর কি?

একজন দার্শনিক মানবসত্তাকে দেখেছিলেন ‘মৃত্যুর দিকে এক নিশ্চিত অথচ গণনার অতীত অনিয়ত যাত্রা’ হিসেবে। আমি মরব এটা জানা, কিন্তু কখন কীভাবে মরব তা বলা যাবে না। মৃত্যু সেই অভিজ্ঞতা যা আসলে অভিজ্ঞতাই নয়। মরার নানা ধরন হতে পারে। যে অভিজ্ঞতা কোনও একজন সেই অবস্থা থেকে ফিরে এসে বর্ণনা করছে তা কি মৃত্যু? মৃত্যু কী রকম তা, সংজ্ঞাগত ভাবেই, জানা অসম্ভব। মৃত্যুর মুহূর্তে মানুষ অভিজ্ঞতার পরিধির বাইরে। পেশাগতভাবে চিকিৎসায় শরীরের সঙ্গে মৃত্যু মোকাবিলায় রত, সব সময়ে। চিকিৎসকের দেবতাসুলভ প্রত্যয়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকে অভাবনীয়ের আশঙ্কা। এই আশঙ্কার সামনে ডাক্তারও কিন্তু অসহায়। চিকিৎসার নিশ্চিত বিজ্ঞান মৃত্যুর অনিশ্চিয়তা দ্বারা সর্বদা আক্রান্ত। তারপরও চিকিৎসকেরাই এখনও মানুষের সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা। করোনা মহামারির ঋতুতে তা আরও একবার উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

সারাবিশ্বের মানুষ যখন করোনার ভয়ে গৃহবন্দি হয়ে পড়ছে, তখন দিনের পর দিন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের চিকিৎসক, চিকিৎসাকর্মীরা করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের সেবা করে যাচ্ছেন। প্রতিদিন শত শত মানুষের মৃত্যু দেখছেন। তাদের মনের উপর কতটা চাপ পড়ছে, সহজেই অনুমেয়। কিন্তু এই অবস্থাতেও তারা শুধু নিজেদেরই নয় সাধারণ মানুষকেও ভরসা যোগাচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

স্পেনে যারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, তার ১৪% মেডিকেল প্রফেশনাল। ইতালির ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ্ এর রিপোর্ট অনুযায়ী, মোট আক্রান্তের ৯% চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী। ভীতিকর হারে আক্রান্ত হওয়ার পরও তারা দিন রাত সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত সেবাদানের মানসিকতা, মানুষকে জীবিত রাখার প্রাণান্ত প্রয়াসের মাধ্যমে তারা পেশাটিকে এক ভিন্ন মর্যাদার স্থানে উন্নীত করেছেন।

গোটা দুনিয়ায় এখন সবচেয়ে নমস্য ব্যক্তি হচ্ছেন চিকিৎসাকর্মীরা। আরও নির্দিষ্ট করে বললে ডাক্তাররা। করোনার বিরুদ্ধে মানবজাতির যে অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ চলছে গত তিন মাস ধরে, এই যুদ্ধের সম্মুখভাবে আছেন ডাক্তাররা। তাদের ত্যাগ-তিতিক্ষা-সেবা-আন্তরিকতা-দায়িত্বশীল ভূমিকা ছাড়া এ যুদ্ধে টিকে থাকা সম্ভব হতো না। কারণ এই যুদ্ধে মাঝখানে আর কেউ নেই। সেনাবাহিনী নয়, সমরাস্ত্র সজ্জিত আধুনিক ট্যাঙ্ক নয়, ভয়ঙ্কর এফ-১৬ যুদ্ধবিমানও নয়, ধর্মগুরুরা নয়। ধর্মগুরুরা তো মিথ্যে বয়ান দিয়েই খালাস। কোনো মানুষকে তারা কোথাও বাঁচাতে পারেনি, পারবেও না। তাদের অনেকে এখন আত্মগোপনে। এখন অসুস্থ্ সংক্রমিত মানুষের সামনে কেউ নেই। শুধু একটা সামান্য স্টেথেস্কোপ গলায় জড়িয়ে মহামানবের মতো মাথা সোজা করে দাঁড়িয়ে আছে ডাক্তারসমাজ। ওই একটা মাত্র অস্ত্র হাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই ভয়ঙ্কর লড়াইয়ে অবতীর্ণ মহামান্য ডাক্তারসাহেবগণ। গায়ে সাদা অ্যাপ্রন, হাতে গ্লাভস, মুখে মাস্ক। দিনরাত এক করে তারা অক্লান্ত লড়াই করছেন রোগীর শিয়রে বসে। তাদের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন অগণিত নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও।

তাদের মহান ভূমিকা ছাড়া এই কঠিন যুদ্ধে আমাদের আরও বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তাই করোনা বিশ্বযুদ্ধের সব স্তরের সৈনিকদের কুর্নিশ করি। বাহবা দিই। এই চরম হতাশা ও আতঙ্কের সময়ে স্বজন-সংসার ছেড়ে তারা মানুষকে সেবা দেওয়ার কাজে নিয়োজিত হয়েছেন, নিজের জীবনকে বিপন্ন করে আরেকজনের জীবন বাঁচানোর ব্রত নিয়েছেন, এ সামান্য কথা নয়! ঈশ্বর যেন তাদের মাধ্যমেই এগিয়ে এসেছেন মর্তের মাটিতে প্রতিটি করোনা রোগীর শুশ্রুষায়। মঠ-মন্দির-ধর্মশালার গায়েবী ঈশ্বর যেন তাদের মাধ্যমেই মূর্তিমান হয়েছেন!

আজ ফুল-মালা-চন্দন নয়, শুধু খোলা মনে তাদের এই ভূমিকাটাকে সম্মান জানাই। কোনো রকম সংকীর্ণতা, ‘যদি-কিন্তু’র মূঢ়তায় আচ্ছন্ন না হয়ে উদারচিত্তে স্বীকৃতি জানাচ্ছি তাদের এই মৃত্যু-স্রোতে বাঁধ নির্মাণের অসম্ভব প্রয়াসকে।

হ্যাঁ, চিকিৎসকদের অবশ্যই ভুল-ভ্রান্তি আছে। সামাজিক মানুষ হিসেবে তাদেরও লোভ-লালসা সংকীর্ণতা থাকা অসম্ভব নয়। ভোগবাদী জীবনের প্রলোভন ও প্রাত্যহিকতার চাপে অনেকে হয়তো টাকার পেছনেও ছোটেন। কিন্তু তাই বলে তাদের কেউ ইচ্ছে করে মুমূর্ষু রোগীকে মেরে ফেলেন, কর্তব্যে অবহেলা করেন, এটা বিশ্বাস করা যায় না। বিশ্বাস করা উচিতও নয়। মাথা ঠাণ্ডা করে এই সরল সত্যটাকে মানতে শিখতে হবে সবাইকে। করোনা মহামারির এটাও একটা বড় শিক্ষা বলে মনে করি।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বব্যাপি করোনা মহামারি রুখতে সামনে থেকে যারা আজ যুদ্ধ করছেন, তাদের যেন আমরা কখনও অপমান না করি। মানুষের চরম বিপদের মুহূর্তে, দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে তারাই আমাদের সবচেয়ে বড় বন্ধু। তাদের উপযুক্ত সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে আমরা যেন সদা-সচেষ্ট থাকি। মুমূর্ষুকে বাঁচিয়ে তোলা, রোগীকে সম্মান করার মাধ্যমে ডাক্তাররাও যেন নিজেদের অনন্য করে তোলার ক্ষেত্রে বিচ্যূত না হন-করোনাকালে এটাও আমাদের প্রত্যাশা।

একই সঙ্গে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই যারা মানবজাতির বর্তমান এই দুঃসময়ে নিজেদের উজাড় করে দিচ্ছেন, তাদের প্রতি। করোনাভাইরাসের মতো মারাত্মক ভাইরাসের কথা আগে কেউ শোনেননি। কেউ দেখেননি। সার্স, মার্স এত ভয়ঙ্কর ছিল না। গোটা পৃথিবীকে সন্ত্রস্ত করেনি। ব্যক্তিগত সতর্কতা অবশ্যই প্রয়োজন। নিজেকে সুস্থ রাখার জন্য, অন্যদের সুস্থ রাখার জন্য। কিন্তু, কঠিন সময়ে যারা আমাদের জন্য প্রাণপণ লড়ছেন, ঝুঁকি নিয়েও নিজেদের ব্রত পালন করে যাচ্ছেন, তাদের কথা কতটা ভাবি?‌ আমাদের দেশে আমরা দেখছি, নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সরকার যথাসাধ্য করছে। প্রশাসনে দায়িত্বপ্রাপ্তরাও নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। পুলিশ কর্মীদের কথা ভাবুন। সারা বছর কাজ, কঠিন সময়ে পরিশ্রম দ্বিগুণ হয়ে যায়, হয়তো তিনগুণ। বাড়িতে বসে থাকার উপায় নেই। সিটি করপোরেশনের অনেক কর্মীকে জরুরি ভিত্তিতে দ্বিগুণ কাজ করে যেতে হচ্ছে। পরিচ্ছন্নকর্মীদের কথা ভাবুন। এই চরম দুর্যাগের মধ্যেও তাদের নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে যেতে হচ্ছে। এমন বিপদেও, বাড়িতে বসে থাকার উপায় নেই। দায়িত্ব-কর্তব্য-আর পেশাগত কারণে তারা ভয়-শঙ্কার মধ্যেও কাজ করে যাচ্ছেন। আমরা কী পারি না, এই সব পেশাজীবীদের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে নিজেদের এবং অন্যদের নিরাপদ রাখতে মাত্র কয়েকটা দিন ঘরে থাকতে? স্বাস্থ্যবিধিসহ শারীরিক দূরত্ব মেনে চলতে?

পুনশ্চঃ বাংলাদেশে অনেক চিকিৎসক করোনা রোগীদের সেবা দিতে আগ্রহী নন-এমন একটা কথা শোনা যাচ্ছে। চিকিৎসকরা অবশ্য এটাকে ‘রটনা’ বলছেন। তাদের ভাষ্য মতে, করোনার বিরুদ্ধে চলমান এই যুদ্ধে একেবারে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে তারা লড়তে রাজি আছেন এবং লড়ছেনও। দাবি শুধু একটাই, বিজ্ঞানসম্মত সুরক্ষা। তাদেরও ঘরে স্ত্রী, সন্তান, বৃদ্ধ বাবা-মা আছেন যে!

এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে মহাভারতের অভিমন্যুর কথা। অভিমন্যু মহাভারত মহাকাব্যের অন্যতম উল্লেখযোগ্য চরিত্র ও অর্জুন-সুভদ্রার পুত্র, কৃষ্ণের ভাগ্নে এবং মৎস্য রাজকন্যা উত্তরার স্বামী। শৌর্যে বীর্যে তিনি তার পিতা অর্জুন ও পিতামহ ইন্দ্রের সমতুল্য।

অভিমন্যু অস্ত্রশিক্ষা লাভ করছিলেন শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের কাছ থেকে। কিন্তু জন্মের আগে মাতৃগর্ভে থাকার সময় চক্রব্যূহে ঢোকার পদ্ধতি শুনে নিয়েছিলেন, কিন্তু বাইরে আসার পদ্ধতিটি শোনা হয়নি। অর্জুন যখন শুভদ্রাকে চক্রব্যূহে ঢোকার পদ্ধতি বর্ণনা করছিলেন, তখন মাঝ পথেই অর্জুনকে থামিয়ে দিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। বলতে দেননি বাইরে আসার পদ্ধতি৷

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের তেরোতম দিনে চক্রব্যূহ তৈরির ফন্দি আঁটেন কৌরবদের অস্ত্র গুরু দ্রোণাচার্য৷ তিনি কৃষ্ণ ও অর্জুনকে ব্যস্ত রেখে চক্রব্যূহ বানিয়ে ফেলেন সেনাদের দিয়ে৷ সে সময় বীর-বিক্রমে যুদ্ধ করছিলেন অভিমন্যু।
ওই পরিস্থিতিতে ধর্মরাজ অভিমন্যুকে বললেন, ব্যুহ ভেদ করো। অভিমুন্য বললেন, পিতার কাছে ভেদ করার কৌশল জেনেছি। বিপদ কালে নিষ্ক্রমণের কৌশল জানা হয়নি। ধর্মরাজ বললেন, তুমি ভেদ করো, আমরা তোমার পেছনে পেছনে প্রবেশ করবো। ধর্মরাজের ভুল সিদ্ধান্ত। ওই সিদ্ধান্তের বলি হন অভিমন্যু!

সত্যিই ‘ধর্মরাজের’ কথা মেনে এগোবেন ‘অভিমন্যু’রা। কিন্তু চক্রব্যূহ থেকে বেরিয়ে আসার অস্ত্রও থাকবে তাদের হাতে। চলমান করোনা প্রতিরোধের যুদ্ধে অভিমন্যুরা ছাড়া কিন্তু আর কেউ চক্রব্যুহ থেকে বের হয়ে আসার কৌশল জানে না। তাদের বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব তাই আমাদের সবার।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)