চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ডাক্তার, শুধু করোনাই তোমার প্রতিপক্ষ নয়

সিক্ত হোক সকল হৃদয়, বলে ওঠো ভালোবাসি তোমায়। ডাঃ রাকিব আমার অনুজপ্রতিম ছোট ভাই। আমি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ১৭তম ব্যাচের ছাত্র আর ডাঃ রাকিব ১৮তম ব্যাচের। আমার জানামতে অত্যন্ত সাধারণ পরিবার থেকে বেড়ে ওঠা। নিজস্ব প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত। কোন আমলাজাত বা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকে বেড়ে উঠা স্বর্ণলতা নয়। তাই ডাঃ রাকিব আপন অহংকারে মহিমান্বিত। রাকিব, তোমার মৃত্যুই তোমার মুক্তি কিনা জানি না। এখানে চিকিৎসক হত্যার কোনো বিচার হয় না। বিচার হয় চিকিৎসকদের। খুলনা মেট্রোপলিটন শহরের নিজ ক্লিনিক-কাম বাসার সামনে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে কি সুন্দরভাবে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায় খুনিরা। অনেকেই ছিলো, এই করোনাকালে তুমিই যাদের শেষ ভরসা ছিলে, হয়তো তোমার চিকিৎসা পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলো। অকৃতজ্ঞ শুধু নয়, কৃতঘ্নও। এই সমাজ প্রভুভক্ত, সেবকভক্ত নয়। তার মধ্যে তুমি আবার চিকিৎসক। চিকিৎসক মারার মহোৎসবে -খুনীদের রাখা হয় অভয়ারণ্যে। যেখানে পশুদের শিকার নিষিদ্ধ। অথচ এ দেশে ৫০০০ টাকার কৃষি ঋণ বরখেলাপের জন্য ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধকে কোমড়ে রশি দিয়ে বানরের মতন খেলাতে খেলাতে হাজার উৎসুক চোখের সামনে দিয়ে থানা হাজতে ঢুকায়।

বিজ্ঞাপন

তোমার মৃত্যু অন্য কারো আবেগ স্পর্শ করে নাই। এ দেশে হাজার হাজার সমিতি- শিক্ষক, সাংবাদিক, আমলা, পুলিশ, ইত্যাদি। এমনকি দিন মজুরদেরও সমিতি আছে। সবাই নিশ্চুপ। যেন তোমার মৃত্যু যথার্থই হয়েছে। সবাইকে আসতে হয়- তোমার আমার কাছে। হয়তো খুলনা, গলাচিপা, বা চিরির বন্দর নয়, তবে অবশ্যই ইউনাইটেড, স্কয়ার, বিএসএমএমইউ বা মাউন্ট এলিজাবেথে। তখন লজ্জা পাবে না? এ দেশে সকলেই চিকিৎসক। অনেকের মেডিকেল ডিগ্রীরও প্রয়োজন নাই, চেম্বারেরও প্রয়োজন নাই। টিভি আর পত্রিকাতে চলে তাদের চিকিৎসা পরামর্শ। তাদের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, জৈববিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, আমলা, সুশীল, ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার অনেকে আরেক ধাপ উপরের, চিকিৎসকদের চিকিৎসক । যেমন- আমাদের সময় সংবাদের সাংবাদিক চিকিৎসকের রিপোর্টঃ ‘চিকিৎসা অবহেলায়’ রোগীর মৃত্যু, স্বজনদের হামলায় প্রবীণ ডাক্তারের মৃত্যু। অর্থাৎ আমাদের সময় সংবাদের ডেস্ক রিপোর্টার নিশ্চিত হয়েছে যে- তোমার ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এই করোনাকালে তুমি নিশ্চিত আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তুমি কেনো এই রোগীর চিকিৎসা করেছিলে? উত্তর, শুধু ঐ রোগীকে হত্যার উদ্দেশ্যে। তাই স্বজনদের হামলায় তোমার মৃত্যু্র যথাযথ রায় দিলেন আমাদের সময় পত্রিকা।

বিজ্ঞাপন

আবার অনেক পত্রিকার লোকেরা করোনার করুনার জন্য কবিতা পড়েন। তাহলে ঝাড়ফুঁকের আর দোষ কোথায়? এই করোনাকালে আরো অনেকরকম চিকিৎসক দেখা যায়। যেমন- সর্বশ্রদ্ধেয় ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধুরীর সুস্থতার দায়বার নিয়ে একজন ড. বিজন কুমার পত্রিকাতে বিবৃতিতে বলেন, ‘গতকাল উনি নমুনা পাঠিয়েছিলেন। আজ সকাল ৭টার দিকে পরীক্ষা করেছি। এখন উনি খুব দুর্বল। তার বিশ্রাম দরকার। তাই তিনি আরও পাঁচ দিন সম্পূর্ণ বিশ্রাম নেবেন। অফিসিয়াল কাজ-কাম করতে পারবেন না। একদম রেস্ট।’ এখন আর পিসিআর টেস্ট দরকার নেই বলেও জানান বিজন কুমার শীল (ঢাকা টাইমস)। তারপর ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধুরী সোজা আমাদের প্রয়াত নেতা, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামের সদস্য, জনাব নাসিমের জানাজায়।

বিজ্ঞাপন

সর্বশ্রদ্ধেয় ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধুরী, আপনি এই করোনা আক্রান্ত শরীরে কেনো প্রয়াত নেতা, জনাব নাসিমের জানাজায়? আপনি আজীবন সমাজসেবক, যেখানে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মঙ্গলই আপনার ধ্যান আর জ্ঞান। আপনি ভালো করেই জানতেন- জ্বর কিংবা শ্বাসকষ্ট কমলেই আপনি SARS-Cov2 জীবাণুমুক্ত নয়। এই কোভিড-১৯ রোগ অতিদ্রুত সংক্রমণশীল বিধায় বিশ্বজুড়ে সবাই বেশী সতর্ক। সবাই নির্দিষ্ট প্রোটোকল মেনে চলেন এবং চলতে বাধ্য করা হয়। বিশ্বের কোনো দেশের প্রোটোকলে আছে- এন্টিজেন/এন্টিবডি টেস্ট করে করোনামুক্ত ঘোষণা করার। বিশ্ব এমন ব্যবস্থা দেখেনি।

আপনিই তো এই দেশের সমাজভিত্তিক চিকিৎসার প্রবর্তক। আপনিই তো দায়িত্ব নিবেন- আমাদের নিরাপত্তার। আপনার কাছেই তো আমরা আশা করবো- জাতীয় ওষুধ নীতির মতন একটা টেকসই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। আপনিই তো বলবেন- করোনার সংক্রমণ এখনো উর্ধ্বগতি। যে কোনো মহামারীর উর্ধ্বগতিতে কেবলমাত্র অত্যন্ত সংবেদনশীল রোগ নির্ণায়ক পদ্ধতিগুলি ব্যবহার করতে হয়। সকল দেশেই মানছে- করোনা রোগ শনাক্তে এন্টিজেন টেস্ট কার্যকরী নয়, কার্যকরী হলো পিসিআর নির্ভর পরীক্ষা। পিসিআর নির্ভর পরীক্ষা দ্বারা খুবই অল্প সংখ্যক ভাইরাসের উপস্থিতি নির্ণয় সম্ভব, যা এন্টিজেন টেস্টের মাধ্যমে সম্ভব নয়। তাই আপনাকেও বলতে হবে- যেকোনো মুল্যে এই পিসিআর নির্ভর পরীক্ষা বাড়াতে হবে।

কেউ দেখার নাই। এই বৈশ্বিক বিপর্যয়, করোনা থেকে উত্তরণের জন্য- সরকার গঠন করেছে চিকিৎসক এবং বিজ্ঞানীদের দিয়ে জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটি। সবাই প্রতিক্ষায় ছিলো- সঠিক পরামর্শে যথাযথ ব্যবস্থাপনায় ফিরবে সবকিছু। অতি তাড়াতাড়িই হাটখোলা জমে উঠবে, বটতলায় জমায়েত হবে। সবই দেখি এখন কল্পনার। এই বিশাল গারমেন্ট সেক্টর, পরিবহন সেক্টর নিজেরাই নিজেদের পরামর্শক। জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটির কি প্রয়োজন? পত্রিকাতে দেখি- করোনা নিয়ন্ত্রনের কৌশলী সভায় আমলা মন্ত্রী সবাই। তবে, সভায় কোনো পেশাজীবি পরামর্শক ছিলেন না।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)