চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘ডাক্তারি পরীক্ষা না হওয়ার অজুহাতে ধর্ষণের আসামি খালাস পেতে পারে না’

খুলনার দাকোপ উপজেলায় এক কিশোরীকে ধর্ষণের মামলায় দেওয়া রায়ে হাইকোর্ট বলেছেন, ‘শুধুমাত্র ডাক্তারি পরীক্ষা না হওয়ার কারণে ধর্ষণ প্রমাণ হয়নি বা ধর্ষণ করেনি- এমন অজুহাতে আসামি খালাস পেতে পারে না।’

আলোচিত এই রায়ে বলা হয়েছে, ‘ভিকটিমের মৌখিক সাক্ষ্য ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য দ্বারা আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার ভিত্তিতেই আসামিকে সাজা প্রদান করা যেতে পারে।’

বিজ্ঞাপন

এই মামলায় আসামি ইব্রাহিম গাজীর যাবজ্জীবন সাজা বহাল রেখে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর হাইকোর্ট বেঞ্চর দেয়া রায় বুধবার প্রকাশিত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আপিল শুনানিতে আসামি পক্ষের যুক্তি ছিল, আদালতের আদেশ থাকার পরেও প্রসিকিউশন ভিকটিমের ডাক্তারি পরীক্ষা করেনি। এছাড়া ভিকটিম তার মা ও দুই বোনকে সাক্ষী করেছিল, তাদের কেউ আদালতে সাক্ষ্য দেয়নি। এ কারণে আসামি খালাস পাবার অধিকারী।

তবে এই যুক্তির প্রসঙ্গে রায়ে বলা হয়েছে, ‘ভিকটিমের বাবা মসজিদের ইমাম। তার স্ত্রী একজন পর্দানশীল মহিলা। তিনি ধর্ষণের মত অপরাধের ক্ষেত্রে সাক্ষী দিতে এসে বিব্রতকর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে চাইবেন না; এটাই স্বাভাবিক। এই মামলার অপর দুজন (ভিকটিমের দুই বোন) গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে বিবেচিত। ঘটনার সময় তাদের বয়স ছিল যথাক্রমে ১৬ ও ১২ বছর। তখন তারা ছিল নাবালিকা ও অবিবাহিতা। এটা স্বাভাবিক যে সামাজিক প্রেক্ষাপটে তারাও অবান্তর অপ্রীতিকর প্রশ্ন ও ঝামেলা এড়ানোর জন্য মামলায় সাক্ষ্য দিতে আসবে না। তারা সাক্ষ্য দিতে না আসার কারণেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে ধরে নেওয়ার কোনো অবকাশ নেই।’

বিজ্ঞাপন

আর ভিকটিমের ডাক্তারি পরীক্ষার না করানোর বিষয় তুলে ধরে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘২০০৬ সালের ১৫ এপ্রিল ঘটনা ঘটে। আর ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য খুলনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদেশ দেন ওই বছরের ১৭ মে। অর্থাৎ ৩২ দিন পরে। তাই ভিকটিমকে যদি ওই দিন (যেদিন ট্রাইব্যুনাল আদেশ দেয়) ডাক্তারি পরীক্ষা করা হতো, তবুও দীর্ঘদিন পর পরীক্ষা করার কারণে ধর্ষণের আলামত না পাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। তাই শুধুমাত্র ডাক্তারি পরীক্ষা না করার কারণে প্রসিকিউশন পক্ষের মামলা অপ্রমাণিত বলে গণ্য হবে না।’

এই মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০০৬ সালের ১৫ এপ্রিল খুলনার দাকোপ উপজেলায় ধর্ষণের শিকার হন এক কিশোরী। ওই ঘটনায় স্থানীয়ভাবে সালিশ-বৈঠক হয়। পরে ১৭ এপ্রিল থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি।

এরপর ২৩ এপ্রিল খুলনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে নালিশী অভিযোগ করেন কিশোরীর বাবা। এরপর ১০ মে আদালত কিশোরীর জবানবন্দি গ্রহণ এবং ঘটনার অনুসন্ধান করতে দাকোপ থানার ম্যাজিস্ট্রেটকে আদেশ দেয়। ১৭ মে কিশোরীর ডাক্তারি পরীক্ষা করতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে নির্দেশ দেয় এবং আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।

পরবর্তীতে খুলনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচার শেষে গত বছর ১৩ মার্চ রায় দেয়া হয়। রায়ে আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও দুই বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়।

তবে ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন আসামি ইব্রাহিম কাজী। সে আপিলের শুনানি শেষে হাইকোর্ট আপিল খারিজ করে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি রায় দেয়। সে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি বুধবার প্রকাশ করা হয়।

হাইকোর্টে এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জান্নাতুল ফেরদৌসি রূপা। আর আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী আমিনুল হক হেলাল।