চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

টিকটকে কী আছে এবং কেনো এতো জনপ্রিয় হয়ে উঠছে?

“এই মনে করেন ভাল্লাগে, খুশির, ঠেলায়, ঘোরতে।” এই ডায়ালগ এখন সামাজিক মাধ্যম মাতাচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি কীভাবে ছড়িয়ে পড়লো?

৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর ছড়িয়ে পড়া আগের একটি নির্বাচনে বেসরকারি একটি টেলিভিশনের একটি লাইভ থেকে বিষয়টির সূত্রপাত। সেখানকার ওই লাইনটি (ভাল্লাগে, খুশির, ঠেলায়, ঘোরতে) নিয়ে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর হালের জনপ্রিয় মাইক্রো-ভিডিও শেয়ারিং সামাজিক মাধ্যম অ্যাপ ‘টিকটক (TicTok)’ এ পারফর্ম করেন একজন ব্যবহারকারী। এরপর সেই বক্তব্য আরও বহু ব্যবহারকারী তাদের ভিডিওতে ব্যবহার করেন। এভাবে টিকটক থেকে ফেসবুকে এসে বাক্যটি ছড়িয়ে পড়ে সব ধরনের সামাজিক মাধ্যমে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

এরকম বহু জনপ্রিয় ভিডিও’র জন্ম দিচ্ছে টিকটক। সামাজিক মাধ্যম সাইট হিসেবে ফেসবুক বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয়, আর অ্যাপ হিসেবে সবচেয়ে জনপ্রিয় একবাক্যে টিকটক।

টিকটক সর্ম্পকে কিছু তথ্য
বেইজিং-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘বাইটড্যান্স’ ২০১৭ সালে অন্যতম জনপ্রিয় অ্যাপ ‘মিউজিক্যালি’ ১ বিলিয়ন ডলারে কিনে নেয়। তারা সেই অ্যাপের নাম দেয় ‘টিকটক’। ডাউনলোডের দিক দিয়ে অ্যাপটি ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট এবং ইউটিউবকে পেছনে ফেলে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তা বিস্ময়কর বলে জানাচ্ছে প্রযুক্তি বিশ্ব। অ্যান্ড্রয়েড এবং আইওএস সংস্করণে রয়েছে অ্যাপটি।

টিকটকের মূল কোম্পানি বাইটড্যান্সের অফিস

মাত্র ১৫ সেকেন্ডে ভিডিও দেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও কিছুটা দীর্ঘ ভিডিও পোস্ট করা যাচ্ছে এখানে। কোনো গান বা প্রচলিত বক্তব্যের সঙ্গে মুখ মেলানো, ইফেক্ট ব্যবহার করে চেহারা পরিবর্তন করে ভিডিও এবং ধারণ করা কোনো ভিডিও এখানে পোষ্ট করা যায়।

বর্তমানে সারাবিশ্বে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ব্যবহারকারী রয়েছে টিকটকের। প্রতিদিন এই সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে অ্যাপটি সারাবিশ্বের সবচেয়ে দামী স্টার্টআপ কোম্পানি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যাদের দাম উবারকে ছাড়িয়ে গেছে। উবারের বর্তমান ভেল্যুয়েশন প্রায় ৭২ বিলিয়ন ডলার, আর টিকটকের ৭৫ বিলিয়ন। টিকটকের মূল কোম্পানি বাইটড্যান্সের অন্য ব্যবসা মিলিয়ে তাদের মোট মূল্য প্রায় ৭৮ বিলিয়ন ডলার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

টিকটকের প্রতিষ্ঠাতা ঝাং ইয়ামিং

টিকটকের প্রতিষ্ঠাতা ঝাং ইয়ামিং ৩৫ বছর বয়সী একজন উদ্যোক্তা। তিনি মূলত একজন অ্যালগরিদম বিশেষজ্ঞ। ‘নিউজ রিপাবলিক’ নামের নামকরা কাস্টমাইজড নিউজ ফিড অ্যাপ তার অন্যতম কাজ। নিউজ নিয়ে কাজ করতে করতে পাঠক/দর্শকের পছন্দ ও কনটেন্টের ক্যাটাগরি নিয়ে তিনি কাজ করতে থাকেন এবং ক্রমবর্ধমান ভিডিও কনটেন্টের বাজারের দিকে লক্ষ্য করে তিনি তার প্রতিষ্ঠানসহ বেশ কয়েকটি মাইক্রো-ভিডিও ভিত্তিক অ্যাপ তৈরি করেন। সর্বশেষ মিউজিক্যালি কিনে নেবার পরে নাটকীয় উত্থান হয় তার প্রতিষ্ঠানের।

টিকটকের মূল কোম্পানি চীনে হওয়াতে তাদের ‘ডাওইন’ নামে আরেকটা আলাদা চাইনিজ ভার্সনও আছে। টিকটক ব্যবহারাকারীরা বর্তমানে ভিডিও দিয়ে কোনো টাকা আয় করতে না পারলেও বিশেষ বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে টিকটক তাদের কিছু বিজনেস মডেল তৈরি করে আয়ের ব্য়বস্থা করছে। ‘মিউজিক্যালি’ থাকাকালীন সময়ে তাদের যে বিজনেস মডেল ছিল, তা কিছু কিছু দেশে বজায় রেখেছে টিকটক।

বাংলাদেশে টিকটক
বাংলাদেশে বহু নামীদামী নায়ক-নায়িকা, গায়ক-গায়িকা আর নানা সেক্টরের সেলিব্রেটি থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের অনেক কিশোর-তরুণের কাছে এই অ্যাপটি বেশ জনপ্রিয়। জনপ্রিয় হয়ে ওঠা একেকজনের অ্যাকাউন্টে রয়েছে লাখ লাখ ফলোয়ার।

রাজনৈতিক কোনো নেতার কোনো বক্তৃতার অংশ থেকে শুরু করে বাংলা সিনেমা শাকিব খান-ডিপজলের ডায়লগ, নয়তো মোশাররফ করিমের নাটকের গান/সংলাপ নিয়ে মেতে উঠছেন দেশের টিকটক ব্যবহারকারীরা। বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল থেকে শুরু করে উল্লেখযোগ্য কোনো সংবাদও বাদ যাচ্ছে না টিকটক ভিডিওতে। এছাড়া ‘আমার স্কুল ভাল্লাগে না, আমি স্কুলে যাব না’, ‘তোমাকে বাবা ড্রেন থেকে কুড়িয়ে আনছে’, ‘বাবা, ওরা কী খায়?’ সহ শিশুদের এরকম নানা কথায় বড়দের পারফর্ম করার বিষয়টিও বেশ জনপ্রিয়। অনেকে পুরো পরিবার নিয়ে পারফর্ম করা ওইসব ভিডিওতে সমাজের নানা বিষয়-অসঙ্গতি ও মজার ঘটনা অভিনয় প্রতিভার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলছেন দারুণভাবে।

রান্না, ভ্রমণ, সাজগোজ ছাড়াও বাংলাদেশী কনটেন্টের মধ্যে আরেকটি জনপ্রিয় বিষয় হচ্ছে ধর্মীয় গান ও স্বল্পকালীন কোনো ধর্মীয় উপদেশ।

ভৌগলিক সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যবহারকারীদের কাছে তার আশেপাশের বা তার ভাষার কনটেন্ট/ভিডিও সামনে আসে। ফলে অপ্রাসঙ্গিক ও অনভিপ্রেত কিছু আসার শঙ্কা বেশ কম। তারপরও গান ও বক্তব্যের উপর ধারণ করা কিছু ভিডিওতে অশ্লীলতার উপস্থিতি রয়েছে। ভাষা এক হওয়ার কারণে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ব্যবহারকারীদের কনটেন্ট আসছে বাংলাদেশে, আর বাংলাদেশের কনটেন্ট যাচ্ছে সেখানে।

বিজ্ঞাপন

টিকটকের ঝুঁকি
মজা করতে করতে বা বেশি বেশি লাইক শেয়ার পাওয়ার আশায় অনেকসময় ব্যবহারকারী অনেক ব্যক্তিগত, ক্ষতিকর ও অশ্লীল কনটেন্ট/ভিডিও পোস্ট করে থাকেন। কোনো ধরণের ভিডিও এডিটিং যোগ্যতা ও জ্ঞান ছাড়াই অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি পোস্ট করার সুবিধা থাকায় সহজেই ওইসব পোস্ট করতে পারছেন তারা। অনেক সময় কেউ কেউ পোস্ট করে তা আবার সরিয়ে নিলেও ডাউনলোড সুবিধা থাকায় যে কেউ তা নামিয়ে নিচ্ছে।

অনেক শিশু-কিশোর ব্যবহারকারী তাদের ব্যক্তিগত তথ্য (ইমেইল, সোশ্যাল লিংক ও অন্যান্য) পোস্ট করে দিচ্ছে না বুঝেই। এছাড়া মন্তব্য করার সুযোগ থাকায় এবং প্রাইভেট মেসেঞ্জারে বার্তা আদান-প্রদানের কারণে অনেকে ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলেও আশঙ্কা করেছে পশ্চিমা টেক সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞরা।

জুলাই ২০১৮তে ইন্দোনেশিয়ান সরকার টিকটকের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। ‘পর্নগ্রাফি, অসংলগ্ন কনটেন্ট এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ এর অভিযোগে  নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। পরে টিকটক কর্তৃপক্ষ কিছু কনটেন্ট সরিয়ে নিলে আবার চালু হয় টিকটক।

জানুয়ারির ২ তারিখে ভারতের পিএমকে পার্টি প্রধান ড. এস রামাদাস এই অ্যাপকে ‘সমাজ ধ্বংস’ করা অ্যাপ বলে উল্লেখ করেছেন।

ফ্রান্সে পুলিশ কর্তৃপক্ষ সেদেশের অভিভাবকদের সাবধান করেছেন। শিশু-কিশোর ব্যবহারকারীরা যৌন হয়রানিতে পড়তে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।

সর্বশেষ ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে যে, পাকিস্তান টেলিকমিউনিকেশন অথরিটি টিকটক ব্যান করতে যাচ্ছে। পাকিস্তানের একজন নাগরিক টিকটককে ‘সামাজিক অসুস্থতা’ দাবি করে থানায় অভিযোগ করলে এই সংবাদের প্রকাশ।

এছাড়া জার্মান নাৎসী পোশাক পরে এক ভিডিওর কারণে বেশ তোলপাড় হয়েছিল টিকটকে। সামাজিক মাধ্যমের বৈশ্বিক নীতিমালাকে অনুসরণ করে টিকটক কর্তৃপক্ষ ৯টি নিয়ম মানতে বলে তাদের ব্যবহারকারীদের, কিন্তু কখনও কখনও কিছু ব্যত্যয় যে ঘটে না এমন নয়। যেহেতু চেহারা দেখিয়ে ও পরিচয় উল্লেখ করে টিকটকে ভিডিও দেয়া হচ্ছে, সেজন্য ব্যবহারকারীরা সচেতন ও শালীন হলে টিকটক কোনো ক্ষতির কারণ হবে না বলে বিভিন্ন সময় টিকটক কর্তৃপক্ষ বলে থাকে।

টিকটক জনপ্রিয় হবার কিছু কারণ
টিকটক ব্যবহারকারীরা অ্যাপের বেঁধে দেয়া কম সময়ের মধ্যে অর্থপূর্ণভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও মজার অনেককিছু দেখান, যা দর্শক/ব্যবহারকারীদের মধ্যে বিরক্তির জন্ম দেয় না। তাছাড়া অল্প সময়ের মধ্যে অনেক ধরণের ভিডিও দেখতে পারার কারণে দর্শকরা একটার পর আরেকটা ভিডিও দেখতেই থাকেন। একবার টিকটক দেখতে থাকলে সময় কোনদিক দিয়ে পার হয়ে যায় তা বোঝাই যায় না।

তবে, টিকটক’কে জনপ্রিয় ফেসবুক, ইউটিউব ও ইন্সটাগ্রামের মিশ্রণ বললে ভুল হবে না। বন্ধু-ফলোয়ার তৈরি করা যাচ্ছে, মন্তব্য করা যাচ্ছে, অন্যান্য বিভিন্ন প্লাটফর্মে শেয়ার করা যাচ্ছে, নোটিফিকেশন আসছে, প্রাইভেট-পাবলিক দুই ধরণের পোস্ট করা যাচ্ছে… এসবই অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমের স্বাদ দিচ্ছে টিকটক ব্যবহারকারীদের।

বিভিন্ন সূত্রমতে টিকটকের ব্যবহারকারীর বেশিরভাগই নারী। কোনো নারী ব্যবহারকারী বা সেলিব্রেটির একাউন্টে থাকে বহু লাইক, ফলোয়ার ও শেয়ার যা সহজেই এই প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারী বাড়াচ্ছে বলেও জানিয়েছে কিছু টেক গণমাধ্যম।

নীতিমালা অনুসারে ক্ষতিকর কনটেন্ট/ভিডিও তৈরি বন্ধ এবং প্রচার বন্ধ হলে টিকটক আরও জনপ্রিয়-নিরাপদ অ্যাপ হিসেবে অবস্থান জোরদার করতে পারবে বলে ধারণা করছে ডিজিটাল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।

জনপ্রিয় কনটেন্ট/ভিডিও মেকারদের আলাদাভাবে টিকটক আয়ের সুযোগ করে দিলেও সব ব্যবহারকারী ও কনটেন্ট মেকারদের জন্য আয় বর্তমানে নেই। তবে সবার জন্য আয়ের বিষয়টি ভাবা হচ্ছে বলে বিভিন্ন টেক গণমাধ্যমে অসমর্থিত সূত্রে খবর বের হয় মাঝে মাঝে। টেক বিজনেস বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ব্যবহারকারীদের জন্য আয়ের ব্যবস্থা করা গেলে বা কোনো অ্যাড নেটওয়ার্কের সঙ্গে টিকটক যুক্ত হলে টিকটকের আয় এবং জনপ্রিয়তা অনেক গুণ বেড়ে যাবে।

প্রযুক্তি মানব সভ্যতার জন্য আশির্বাদ বলেই ধরা হয়। সেই প্রযুক্তির মাধ্যমে টিকটকসহ নানা বিনোদন মাধ্যমে মানুষের প্রকাশ হোক নিরাপদ ও সুন্দর/শালীন, এটাই নিশ্চয়ই সবাই চাইবেন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)