চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

টাঙ্গাইলে ছিন্নমূল মানুষের মাঝে মাসব্যাপী ইফতার বিতরণ

টাঙ্গাইল জেলা সদর বস্তির বাসিন্দা শাহিদা বেগম (৫০)। প্রায় ৩৫ বছর আগে বিয়ে হয় রিক্সা চালকের সাথে। বিয়ের পর থেকে তার সংসারে তেমন সুখ ছিলো না। একে একে তাদের সংসাদের তিন মেয়ে ও এক ছেলের জন্ম হয়। মেয়েদের বিয়ের পর তারা স্বামীর বাড়িতে বসবাস করেন। ছেলেও বিয়ের পর পৃথক হয়েছে। প্রায় ১৫ বছর যাবত তার স্বামী ভরণপোষণ করেন না। নিজে অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোন রকম সংসার চালান। কিন্তু তেমন ভাল মানের খাবার জোটে না তার। কোন রকম সেহরি ও ইফতার খেয়ে রোজা রাখেন। তার এ অবস্থা দেখে প্রতিদিন ‘শিশুদের জন্য ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে তাকে ভাল মানের ইফতার সামগ্রী দেওয়া হয়। তিনবেলা পেটভরে খাবার সংস্থান করা যেখানে যুদ্ধ সেখানে এমন ইফতার আয়োজন করা তার জন্য দিবাস্বপ্নই। যা পেয়ে তিনি আনন্দে আত্মহারা।

শুধু শাহিদা বেগম নয়, তার মতো প্রতিদিন টাঙ্গাইল শহরের তিন শতাধিক অসহায় ও দরিদ্রকে খুঁজে খুঁজে ইফতার সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছে ‘শিশুদের জন্য ফাউন্ডেশন’ নামের এই সংগঠনটি।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

শাহিদা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী আমাকে দেখাশোনা করে না। ছেলেও খোঁজ খবর নেয় না। নিজে অন্যের বাড়িতে কাজ করে চলি। এই মানের ইফতার কখনও তৈরি করতে পারি না। শিশুদের জন্য ফারুন্ডেশনের উদ্যোগে তারা আমাকে প্রতিদিন দেন অনেক দামি ও ভালো মানের ইফতার সামগ্রী। এতে আমি অনেক খুশি। খেয়ে খুব মজা পাই। আমার মতো তারা অন্য মানুষকেও যাতে সাহায্য করতে পারেন সেই দোয়া করি। তাদের খাবার খেয়েও তাদের জন্য দোয়া করি।’

শিশুদের জন্য ফাউন্ডেশনের  প্রতিষ্ঠাতা মঈদ হাসান তড়িৎ জানান, গত ৭ বছর ধরে টাঙ্গাইল ছাড়াও দেশের আরও ১১ জেলায় প্রায় ৫ শতাধিক স্বেচ্ছাসেবীর মাধ্যমে বিভিন্ন মানবিক কাজে অংশ নিয়ে আসছে এই সংগঠনটি। তারই ধারাবাহিকতায় নিজেরা রান্না করে টাঙ্গাইলের রাস্তায় ছিন্নমুল অসহায় ও দরিদ্র  খুঁজে খুঁজে ইফতার সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ১১ টি জেলায় প্রায় ৯ হাজার মানুষের মাঝে ইফতার সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।

ইফতার সামগ্রী পাওয়া বস্তির রত্না বেগম বলেন, ‘রোজার শুরু থেকে তারা ইফতার সামগ্রী দিচ্ছে। এমন ইফতার সামগ্রী বানানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আমাদের ছেলে মেয়ে নিয়ে তাদের ইফতার সামগ্রী দিয়ে আমরা ইফতার করে থাকি।’

বিজ্ঞাপন

হাসনা বেগম বলেন, ‘লকডাউনের মধ্যে আয় রোজগার বন্ধ। অনেকের ঘরে খাবার নেই, আবার অনেকেই খাবার পাই না। এই খাবার পেয়ে আমরা অনেক আনন্দিত। খাবার পেয়ে অনেকেই খুশিতে কান্না করে দেই।’

কদবানু বেগম বলেন, ‘আমি রাস্তায় ঘুরে ঘুরে টাকা তুলি। কিনে ইফতার খেতে হয়। আজ বানানো ইফতার পেয়ে খুব আনন্দিত। ইফতার দেখতে যে সুন্দর খাইতে আরো বেশি ভাল লাগবে।’

রিক্সা চালক হারুন মিয়া বলেন, ‘সারাদিন রিক্সা চালিয়ে শহরের শহীদ মিনারে এসে বসলে শিশুদের জন্য ফাউন্ডেশনের লোকেরা ইফতার দিয়ে যান। কোন দিন বিরিয়ানি আবার কোন দিন খিচুরি দিয়ে থাকেন। আবার কোন দিন সোলা, মুড়ি, খেঁজুর দিয়ে থাকেন।’

স্বেচ্ছাসেবক কাজী সিনথিয়া জেরিন বলেন, ‘শিশুদের জন্য ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে খুব ভাল লাগছে। মানুষের মাঝে ইফতার বিতরণ করাও মানবতা। ছিন্নমূল মানুষকে ইফতার করিয়ে নিজেদের ইফতার করার মধ্যে এক আত্মতৃপ্তি থাকে। যে আত্মতৃপ্তি পেয়ে নিজেরা খুবই গর্বিত।’

অপর স্বেচ্ছাসেবক তানজিলা ইসলাম সেমন্তি বলেন, ‘এই কাজটা করতে আমাদের অনেক ভাল লাগে। মানুষের পাশে দাঁড়ালে তারাও আমাদের ভালবাসে এবং আমাদের জন্য দোয়া করেন। তারা দোয়া পাওয়াই অনেক বড় ব্যাপার।’

স্বেচ্ছাসেবক তাহমিদ সাম্য বলেন, ‘মানুষের মাঝে আমরা যখন ইফতার বিতরণ করি। তারা অনেক খুশি হয়। মন থেকেই আমাদের জন্য তারা দোয়া করেন। মানুষের ভালবাসা পেয়ে আমরা অনুপ্রানিত হচ্ছি। নিজ বাসায় ইফতার করা বাদ দিয়ে ছিন্নমুল মানুষের সাথে ইফতার করি। তাদের সাথে ইফতার করতে আমাদেরও ভাল লাগে। সারাদিন রোজা রাখার পর আমাদের ইফতার পেয়ে তারা যে হাসি দেয়। মূলত সেই হাসি দেখার জন্য বাড়ি থেকে তাদের কাছে ছুটে আসি।’

মঈদ হাসান তড়িৎ বলেন, লকডাউন উঠে গেলে মার্কাস ও এতিমখানায় ইফতারের আয়োজন করা হবে। এ ছাড়াও ঈদের আগের দিন ছিন্নমূল মানুষের বাড়িতে বাড়িতে চাল, ডাল, সেমাই, মাংস, দুধ চিনিসহ ঈদ বাজার পৌছে দেওয়া হয়। এ বছরও দেওয়া হবে। ছিন্নমূল শিশুদের জন্য ঈদের নতুন পোশাক দেওয়া হয়। এ বছর প্রায় এক হাজার শিশুকে ঈদের নতুন পোশাক দেওয়া হবে। সকলের সহযোগিতায় আগামী বছরগুলোতেও এমন আয়োজন করা হবে। এমন কাজে সামর্থ অনুযায়ী সকলের অসহায়তায় এই মানুষগুলির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই।’

বিজ্ঞাপন