চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে চুরি যায় ওদের শৈশব

ভোর পাঁচটা থেকে রাত ১২টা। একদিন বাদে একদিন। কখনো প্রতিদিন। রাজধানীর অনেক শিশুর দিন চলে যায় লেগুনার ‘হেলপারি’ করতে করতে। তাদের ভেতর কেউ কেউ আবার চালকও! জীবনের চাকা ঘোরাতে ঘোরাতে তারা টেরই পাচ্ছে না, কখন চুরি হয়ে যাচ্ছে তাদের শৈশবের অমূল্য দিনগুলো।

অথচ শিশুশ্রম নিরসনে ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত একটি লক্ষ্যমাত্রা ছিল বাংলাদেশের। ওই সময়ে তার কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। এখন বলা হচ্ছে ২০২১ সালের মধ্যে দেশ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন হবে। আর ২০২৫ সালের মধ্যে নিরসন হবে সব ধরনের শিশুশ্রম। কিন্তু যাপিত জীবনে ঢাকা শহরে চোখ রাখলে বেশ বোঝা যায় ২০৩০ সালের মধ্যেও শিশুশ্রম কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন হবে না।

বিজ্ঞাপন

যারা নিয়মিত লেগুনায় চলাচল করেন তারা ভালো বলতে পারবেন যে লেগুনা কেন উল্টে যায়। মিরপুর থেকে যারা ৬০ ফুট দিয়ে চলাচল করেন তারা নিশ্চয়ই দেখেছেন যে ওই রাস্তায় চলাচলকারী সব লেগুনার হেলপারই ছোট্ট শিশু। যাদের বয়স খুব বেশি হলেও ৬ থেকে ৭। শুধু হেলপার নয় ড্রাইভারগুলোও বেশিরভাগ কিশোর। যেখানে অদক্ষ চালক এবং হেলপার সেখানে দুর্ঘটনা তো ঘটবেই। বেশিরভাগ লেগুনায় ঢাকার রাস্তায় চলে বেপরোয়াভাবে।লেগুনা-শিশুশ্রম

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জাতীয় শিশুশ্রম সমীক্ষা ২০১৩-এর তথ্য মতে, দেশে সাড়ে ৩৪ লাখ শিশু কর্মরত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৭ লাখ শিশু রয়েছে, যাদের কাজ শিশুশ্রমের আওতায় পড়েছে। শ্রম জরিপ বলছে সংখ্যাটি আরও বেশি। তাদের দাবি, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সের কর্মজীবী শিশুর সংখ্যা প্রায় ৭৫ লাখ। এদের মধ্যে ১৩ লাখ শিশু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে সম্পৃক্ত। ২০১৩ সালে সরকার এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ৩৮ ধরনের কাজকে শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। গাড়িতে শিশুদের এ ধরণের কাজকে সেখানে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছে। কিন্তু তাদের ওই পেশা থেকে সরিয়ে আনার উদ্যোগ নেই।

বিজ্ঞাপন

অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এ নির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, কারা শিশু। এখানে বলা আছে, ১৪ বছরের নিচে কোনো শিশুকে কাজে নেয়া যাবে না। ১৪ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত কাজে নেয়া যাবে, তবে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নেয়া যাবে না। এছাড়া শিশুশ্রম নীতি, ২০১০ আছে, এটা বাস্তবায়ন করার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।শিশু শ্রমিক-লেগুনা-শিশুশ্রম

লেগুনা বাদে বাংলাদেশের আারও অনেক সেক্টরে শিশুদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে নিয়মিত। যেসব কারখানা কমপ্লায়েন্স মেনে চলে, তাদের কোনো শিশুশ্রম নেই। কিন্তু অনেক ছোট কারখানা আছে, যারা কমপ্লায়েন্স মেনে চলে না, সেখানে শিশুশ্রম আছে। এসব শিশু তাদের ন্যায্য পাওনা পায় না। পোশাকশিল্পের ছোট কারখানা ছাড়াও অনেকে ট্যানারি, চামড়া, জুতা, যানবাহন, ভিক্ষাবৃত্তিসহ বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে। এদের কর্মক্ষেত্র ও কাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এসব কাজে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ প্রচণ্ডভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এসব শিশুদের কাজে না নিলে তাদের পরিবারের কী হবে? এমন প্রশ্ন অনেকেই করে থাকেন। বলা হয়, কাজ না পেয়ে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা অসৎ পথ বেছে নিতে পারে। এই শঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। এসব ক্ষেত্রে শুধু সরকার নয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের মতো, কিংবা ইউনিসেফের মতো সংগঠনগুলোর কার্যক্রমের সঙ্গে শিশুদের আরও সম্পৃক্ত করতে হবে। সারা দেশে ওয়ার্ল্ড ভিশন বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে ৫০ হাজার শিশু, যারা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত, তারা তাদের পুনর্বাসনের কাজ করেছে। ১ লাখ ৭১ হাজার দরিদ্র শিশুকে সহযোগিতা করেছে। আর ইউনিসেফ তো আছেই।

দুঃখের বিষয় এটাই যে, সরকারি উদ্যোগ থাকলেও সেগুলো থেকে শিশুরা কতটা উপকৃত হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এমন অনেক দরিদ্র পরিবারের আছে, যাদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি বিনামূল্যে শিক্ষার উদ্যোগ সম্পর্কেও তারা অবগত নয়। কোথায় গেলে, কীভাবে শিশুদের জন্য সাহায্য পাওয়া যায়, সেটাও তারা জানে না। এই জানানোর দায়িত্বটা আমাদের নিতে হবে। ২০২১ সালের মধ্যে শিশুশ্রম নিরসন করতে গেলে উদ্যোগী হতে হবে এখনই। যেভাবে চলছে, এভাবে চলতে থাকলে ২০১৬ লক্ষ্যমাত্রার মতো অবস্থা হবে!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View