চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

জয় বাংলা

বিকেলের দিকে বাবা অফিস থেকে ফিরলেন একটা পাখির খাঁচা নিয়ে। কী সুন্দর পাখি! দেখে আমার মন ভরে গেল। আমি দরোজা খুলে দেখি বাবা পাখির খাঁচা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। পাখিটা খাঁচার ভেতর চুপচাপ বসে আছে। লেজ নাড়ছে আর দম নিলে বুকের কাছে যে রকম ঢেউ ওঠে পাখিটার বুকেও সেরকম ঢেউ। মানে পাখিটা দম নিচ্ছে।

আমি পাখিটা দেখে আর আনন্দ সামলাতে পারলাম না। চিৎকার করে উঠলাম, আয়েশা আপা দেখে যাও বাবা কি এনেছে?

বাবার হাতে পাখির খাঁচা দুলছে। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বাবা বললেন, আমার ইচ্ছে ছিল না কিন্তু লোকটা এতো করে বললো পাখিটা নিয়ে যেতে। দামটা একেবারে কম তাই নিয়ে এলাম বলে বাবা ভেতরের ঘরে ঢুকে গেলেন।

আয়েশা আপা ভেতরের ঘর থেকে ছুটে এলো। পেছন পেছন মা। পাখি দেখে আয়েশা আপা লাফ দিয়ে উঠল, কী সুন্দর ময়না পাখিরে বাবা!

মা কিছু বললেন না। তবে মার চোখ-মুখ দেখে মনে হলো, বনের পাখি বনে থাকবে, ঘরে কেন? পাখিটা দেখে মা যে খুব খুশি হননি বোঝা গেল। আমি কিন্তু মনে মনে খুব খুশি। মা যদি পাখি পেয়ে আমার গদ-গদ ভাবটা দেখে রেগে যান সেই ভয়ে আমি মার সামনে খুশি-খুশি ভাবটা চেপে গেলাম।

আয়েশা আপা আমাকে বলল, দেখছিস কী? যা পাখিটার জন্য পানি নিয়ে আয় কেন?

দেখছিস না পানির জন্য বেচারা পাখিটা কেমন করছে? আয়েশা আপা এমন মায়া-মায়া গলা করে বলল যে মনে হলো, পাখির না ওর নিজেরই যেন পানির পিপাসা পেয়েছে।

আমি সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়ে টিনের একটা ছোট বাটিতে করে পাখির জন্য টলটলে পানি নিয়ে এলাম। খাঁচার দরোজা খুলে পানির বাটিটা আয়েশা আপা এগিয়ে ধরল। মা অবাক হয়ে আমার আর আয়েশা আপার কর্মকাণ্ড দেখছে। পাখিটা তখন আমাদের অবাক করে দিয়ে বলল, পানির জন্য ধন্যবাদ, ধন্যবাদ।

পাখিটার অমন করে কথা বলা দেখে আমি আয়েশা আপার দিকে আর আয়েশা আপা আমার দিকে তাকিয়ে রইল। মা আমাদের দুজনের দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকল।

বিজ্ঞাপন

বাবা ততক্ষণে ভেতরের ঘর থেকে দুটো চম্পা কলা নিয়ে এসে আমাকে বললেন, বাদল পাখিটার খাওয়ার দিকে খেয়াল রাখিস। খবরদার! পাখির যেন কোনো অযত্ম না হয়। বাবার কথা শুনে মা চোখ বড় বড় করে বললেন, তোমার বয়সও দেখছি বাদল আর আয়েশার মতো হয়ে গেল, ব্যাপার কী!

মার কথা শুনে বাবা শুধু হাসলেন। কিছু বললেন না। আমার বাবা সবসময় মার কথায় কিছু বলেন না। বাবা শুধু মার কথা শোনেন। এই যেমন এখন।

ময়না পাখিটা কয়েক মাসের মধ্যেই আমার আর আয়েশার ‘জান-পরান’ বন্ধু হয়ে গেল। পাখিটা সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে সুর করে গান গেয়ে আমাদের ওঠায়। লেজ নাড়িয়ে কথা বলে।

কিচির মিচির ডাক শুনলে মনে হয়, আমাদের বাড়িটা বোধহয় গহীন কোনো জঙ্গলে। বিশাল বিশাল সারিবদ্ধ গাছ। ঝরা পাতা। শুনশান নীরবতা। তার মধ্যে দূর বহুদূর থেকে পাখির একটানা ডেকে চলা।

ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিন পাখিটা ডেকে উঠল, সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার- পাখির এই ডাক শুনে আমরা তো ভীষণ অবাক। বলে কী! বাবাকে এই কথাটা বলতেই বাবা খুব অবাক হলেন। তারপর বাবা নিজের কানে পাখির কথা শুনে বললেন, কী আশ্চর্য! এই পাখি তো দেখছি আজব পাখি!

আমি তখন বললাম, বাবা লোকটা কম পয়সায় তোমাকে একটা জ্ঞানী-পাখি দিয়েছে। আয়েশা আপা আমার এক ডিগ্রি ওপরে। আয়েশা আপা তখন বাবাকে বলল, বাবা পাখি কিনে তোমার পয়সা উশুল।

বাবা হাসলেন। আমাদের বাবার এই এক মুদ্রা দোষ, বাবা কথায় কথায় খালি হাসেন।
ফেব্রুয়ারি মাস শেষ। পাখিটা পরদিন আরো একটা অবাক করা কা- ঘটাল। মার্চের প্রথম সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা শুনতে পেলাম বারান্দা থেকে পাখিটা সবদিনের মতো সুর গান গাইছে না। পাখিটা বলছে, জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, জয় শেখ মুজিব একবার না দুইবার না। বারবার। বহুবার।

বাবা, মা আমি আর আয়েশা আপা আমরা সবাই অবাক হয়ে গেলাম। আমাদের দেখে পাখিটা আগের মতো বলে যাচ্ছে, জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, জয় শেখ মুজিব। পাখিটা লেজ নাড়াচ্ছে। ডানা ঝাড়ছে। তাকাচ্ছে ইতি-উতি।

আমি বললাম, বাবা দেখেছ ফেব্রুয়ারি মাসে পাখিটা কিন্তু সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারদের নাম ধরে ডাকত। এখন মার্চ মাস এখন আবার পাখিটা ডাকছে আমার কথা শেষ হতে দিল না তার আগে আয়েশা আপা বলে উঠল, যাই বলিস পাখিটা কিন্তু অরিজিনাল বাঘের বাচ্চা!
বাবা অবাক হয়ে পাখিটাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তুমি দেখছি অদ্ভুত পাখি!

বাবার কথা পাখিটা বুঝল কী বুঝল না বোঝা গেল না। পাখিটা নির্বিকারভাবে আগের মতো ডেকেই চলল, জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, জয় শেখ মুজিব…।

বিজ্ঞাপন