চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

জয়শংকরের ঢাকা সফর: কিছু কী এগুলো?

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের আমন্ত্রণে তিন দিনের জন্য ঢাকা সফরে এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর।

গত ৩০ মে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পর এটাই জয়শঙ্করের প্রথম বাংলাদেশ সফর। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে আগামী অক্টোবরে ভারতে দ্বিপাক্ষিক সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। মূলত সেই সফরের পূর্ব প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই তিনি ঢাকা সফরে এসেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

ভারতের কোনো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী যখন বাংলাদেশ সফরে আসেন কিংবা বাংলাদেশের কোনো মন্ত্রী যখন ভারতে যান, তখন তা আলাদা গুরুত্ব বহন করে। কারণ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের রয়েছে অসংখ্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যু। সবাই উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন, বাংলাদেশ কতটুকু কী আদায় করতে পারল। বিরোধপূর্ণ ইস্যুগুলোর কতটুকু কী হলো। এবারও তার কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। যদিও জয়শংকরের ঢাকা সফরের তাৎক্ষণিক কোনো লাভালাভের হিসাব মেলানো যাচ্ছে না!

এখানে বলে রাখা ভালো যে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। প্রায় একই রকম সংস্কৃতি, একই শাসকের অধীনে শাসিত হবার ঐতিহ্যের কারণে ভারতের ব্যাপারে বাংলাদেশের মানুষের এক জটিল মনস্তত্ত্ব কাজ করে। এটা একইসঙ্গে ভালোবাসা ও বিরোধের। প্রেম ও বিদ্বেষের। ভারতীয় পোশাক, প্রসাধনী, সিনেমা, গান, টিভি অনুষ্ঠান বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষের এখনও প্রিয়। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের রাগ-ক্ষোভ-ঘৃণাও ভারতের প্রতিই বেশি।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভিত রচিত হয়েছিল ১৯৭১ সালে, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সরকার ও জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থনের মধ্য দিয়ে। একথা ঠিক যে ভারতের সাহায্য ও সমর্থন না পেলে বাংলাদেশের পক্ষে হয়তো নয় মাসে স্বাধীনতা লাভ করা সম্ভব হতো না। সে জন্য বাংলাদেশের মানুষের ভারতের প্রতি এক ধরনের কৃতজ্ঞতা রয়েছে। আবার বাংলাদেশের ‘ন্যায্য হিস্যা’ প্রদানে অনীহা আর ‘দাদাগিরি’র কারণে প্রতিবেশী এই রাষ্ট্রটির প্রতি আমাদের দেশের মানুষের বিদ্বেষও কম নেই। মাঝে মাঝে তা বেশ প্রকটভাবেই প্রকাশ পায়।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশি নাগরিকদের যেমন ভারতে যাওয়ার সংখ্যা অনেকটাই বেড়েছে, তেমনি ভারত থেকে বাংলাদেশে আসার সংখ্যাও বেড়েছে। ভারত সরকার বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা দেবার বিষয়টি আগের তুলনায় সহজ করেছে। 

উল্লেখ্য, গত এক দশকে নানা সন্দেহ, অবিশ্বাস, বঞ্চনার অনুভূতি সত্ত্বেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন এসেছে। এই সময়ে দুই দেশ যেসব বিষয়ে চুক্তি করেছে, সেটি একটি সময়ে অনেকে ভাবতেও পারেননি। এ সময়ে মধ্যে ভারতে সরকার বদল হলেও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে এখনো কোনো ভাটা পড়েনি। ছিটমহল বিনিময়, ভারতকে সড়ক পথে ট্রানজিট দেয়া, চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্র বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেয়া, ভারত-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা চুক্তি কিংবা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনে বাংলাদেশের সহায়তা-এসব কিছুতে অগ্রগতি হয়েছে।

কিন্তু বহুল প্রত্যাশিত তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি না হওয়া, সীমান্তে গুলি করে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা বন্ধ এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে ভারতের চাপ দেবার বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে নানা সমালোচনা রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের অনেক মানুষই মনে করেন, গত দশ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের স্বার্থকে যতটা প্রাধান্য দিয়েছে, বিনিময়ে ভারতে বাংলাদেশকে ততটা মূল্যায়ন করেনি।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরে নতুন কোনো চুক্তি নিয়ে আলোচনার কথা শোনা যায়নি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে মোমেনের সঙ্গে বৈঠকে তিস্তার পানি বণ্টন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদে মায়ানমারে ফেরত পাঠানো এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী অক্টোবরে ভারত সফর নিয়েই দুই মন্ত্রীর মধ্যে কথা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরে তিস্তার পানি বণ্টনের প্রসঙ্গটিই ঘুরেফিরে সামনে চলে এসেছে। ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি সম্পাদন হবে বলে ঠিক হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিতে শেষ পর্যন্ত তা বানচাল হয়।

এরপর ২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে এলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর এই বিষয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি দ্রুত সম্পাদনের আশ্বাস দেন তিনি। এর পর বিষয়টি আর এগোয়নি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের সময় বিষয়টি নিয়ে আবারও আলাপ-আলোচনা হবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

জয়শংকরের ঢাকা সফরের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। উপমহাদেশ এবং এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ঘিরে বাণিজ্যিক ও রাজনীতির নতুন পটভূমি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধ এ অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ক্রমশ জটিল করে তুলছে। ভারত এ অবস্থার ওপর গভীর দৃষ্টি রাখছে। এ কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টিও ভারতের কাছে এ মুহূর্তে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ভারত তার নিজের স্বার্থেই এখন প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বাড়াতে উদ্যোগী হয়েছে। যদিও পাকিস্তান ছাড়া অন্য সব প্রতিবেশী দেশের সঙ্গেই ভারতের সুসম্পর্ক রয়েছে। কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের নতুন করে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে টানাপড়েনে বিশ্বরাজনীতির বড় কুশীলবরা যেন কোনো ধরনের সুযোগ নিতে না পারে, সে বিষয়েও ভারত সতর্ক। সার্বিকভাবে উপমহাদেশ ও এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ঘিরে ক্রমশ-পরিবর্তিত বিশ্বরাজনীতির পটভূমিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।

এদিকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক গত এক দশকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছলেও তিস্তাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টন চুক্তি ছাড়াও আসামে জাতীয় নিবন্ধন ঘিরে জটিলতা দু’দেশের সম্পর্কে কিছুটা হলেও উত্তাপ ছড়াচ্ছে। এসব ইস্যু আগামী অক্টোবরে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশ-ভারত শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে গুরুত্বসহকারে আলোচিত হবে এবং এ বিষয়ে উদ্বেগ নিরসনের চেষ্টা করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তা ছাড়া বর্তমান মোদি সরকারের ব্যাপারে বাংলাদেশের আস্থা অর্জনেরও ব্যাপার আছে। দু’দেশই একে অপরের মনোভাব ও চাহিদা ভালোভাবে জানতে-বুঝতে চায়। কারণ উভয় দেশের রাজনৈতিক নেতারা জানেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রতিবন্ধকতা থাকবে। প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়াটা সমস্যা নয়, কিন্তু সমাধানের জন্য মনোবৃত্তি না থাকাটা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।

আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করতে হলে রাজনৈতিক বোঝাপড়া অত্যন্ত জরুরি। সুসম্পর্ক ও সহযোগিতার ভিত্তিতেই উভয় দেশ এগিয়ে যেতে পারে। এ সম্পর্কের বিকাশ দর–কষাকষির ভিত্তিতেই হতে হবে। তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়া বাংলাদেশের জনগণের আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত একটি অধিকার। এর সঙ্গে দেশের লাখ লাখ মানুষের স্বার্থ জড়িত। আছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে ভারতের ইতিবাচক ভূমিকা পালন, আসাম রাজ্যে জাতীয় নাগরিকপঞ্জিতে (এনআরসি)-বাদ পড়া ৪০ লাখ নাগরিক নিয়ে বাংলাদেশকে প্রভাবিত না করার প্রশ্ন।

আমাদের নেতারা জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে এগিয়ে নেবেন, দেশবাসী এটাই প্রত্যাশা করে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View