চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

জ্যোতির্বিদ্যা চর্চার প্রাণপুরুষের বিদায়

মহাকাশ বিজ্ঞান নিয়ে আমাদের দেশের সরকারের চেয়ে ব্যক্তিগতভাবে জ্যোতির্বিদ ফজলুর রহমান সরকার অনেকখানি এগিয়ে ছিলেন। মহাকাশ বিজ্ঞান বিষয়ক আন্তর্জাতিক ফোরামসমূহে ‘রাষ্ট্র’ বাংলাদেশ যখনই কোনো পদক্ষেপ নেবে- একজন ফজলুর রহমান সরকারের পদচিহ্ন ‘সে’ ঠিকই উপলব্ধি করবে। এটা অনেকটা চন্দ্রাভিযানের মত!

‘ওয়ার্ল্ড স্পেস উইক, ইউএন কুপাস, জাক্সাসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক মহাকাশ বিজ্ঞান সংগঠনের সাথে জ্যোতির্বিদ এফ আর (ফজলুর রহমান) সরকার নিজেকে যুক্ত করতে পেরেছিলেন। বাংলাদেশে তাকে জ্যোতির্বিদ্যা চর্চার প্রাণপুরুষ বলা হয়। পেশায় স্ক্রিন প্রিন্ট গার্মেন্ট ব্যবসায়ী হয়েও মহাকাশ বিজ্ঞানকেই তার জীবনের সার্বিক ধ্যান-জ্ঞান বা ব্রত করে নিয়েছিলেন। তিনি নির্ভুল ভাবে বলতে পারতেন- কবে কোথায় কোন গ্রহাণুতে কে কবে কোন স্পেস শিপ নামাবে বা কোন মহাকাশযানটি ঠিক এই মুহুর্তে কোন গ্রহের কোন বলয় অতিক্রম করছে। মহাকাশ বিজ্ঞানে নিমগ্নতার স্বাক্ষর হিসেবে তিনি এনায়েতপুরে তার নবনির্মিত বাড়ির নামকরণ করেছিলেন ‘মহাকাশ ভবন’। শীতের ভোরে কিংবা গ্রীষ্মের বাদলে এ মহাকাশ ভবনকে আমি দেখেছি খুব কাছ থেকে।

বিজ্ঞাপন

জাতিসংঘ অনুমোদিত সংগঠন ‘ওয়ার্ল্ড স্পেস উইক’ অ্যাসোসিয়েশনের সাথে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ছিলেন আমৃত্যু। শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ডেনিস স্টোন ‘ওয়ার্ল্ড স্পেস উইক’ এর নির্বাহী ছিলেন। ২০০৫ সাল থেকে এফ আর সরকার তার নিজের গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে মহাকাশ সপ্তাহ উদযাপনের রেওয়াজ শুরু করেন। প্রতি বছরই এটা করতেন তিনি মহাসমারোহে। ২০০৫ এ ওয়ার্ল্ড স্পেস উইক অ্যাসোসিয়েশনের ফ্রন্টপেজে বাংলাদেশের এনায়েতপুর গ্রামের সহস্র ছাত্রছাত্রীর হাতে ‘বিশ্ব মহাকাশ সপ্তাহ’ উদযাপনের ব্যানার, ফেস্টুন আর ক্যাপ শোভিত ছবি জায়গা করে নেয়। এনায়েতপুরের প্রায় ৭-৮ হাজার ছাত্রছাত্রী প্রতিবছর এই আয়োজনে অংশ নিতো। তিনি ঢাকা থেকে অধ্যাপক এ আর খান, অধ্যাপক আলী আসগর স্যারসহ বিজ্ঞানমনস্ক বিশিষ্টজনদের নিয়ে যেতেন সেখানে।

একবার ২০০৬ এ ঠাকুরগাঁওয়ের সালন্দর ইউনিয়নের একটি শস্য ক্ষেতে দিনের বেলায় একটা জ্বলন্ত উল্কাপিণ্ড এসে পড়ে। মাঠে কর্মরত কৃষকরা কেউ কেউ ভাবলো পাশের দেশ ইন্ডিয়া থেকে বিস্ফোরক জাতীয় কিছু ছুটে এসে পড়েছে। একেকজন এককটা ভাবতে শুরু করলো। সাংবাদিক-পুলিশ হয়ে পরের দিন পত্রিকায় এ খবর ঢাকায় এলো। খবর পড়ে তিনি আমাকে নিয়ে সে রাতেই রওনা হলেন দিনাজপুর। পরদিন সকালে আমরা স্থানীয় থানায় যেয়ে উল্কাটিকে দেখতে পেলাম। আমরা এর ছবি তুললাম। যেখানে এই উল্কাপিন্ডটি পড়েছিল সেখানে যেয়ে সে স্থানেরও ছবি তুললাম এবং স্থানীয়দের সাথে কথা বললাম। এরপর ঢাকায় ফিরে এসে উল্কা নিয়ে লেখালেখি শুরু হল। উল্কাপিণ্ডটির নামকরণ করা হয় ‘বাংলামেট’-যার একটি অংশ বর্তমানে আগারগাঁও বিজ্ঞান জাদুঘরে রক্ষিত আছে।

অনেকেই দূরে সরে যায় তবে এ শতকে একবার মঙ্গল গ্রহ পৃথিবীর কাছে এসেছিল। এটা সম্ভবত ২০০৩ সালের ঘটনা। সে সময় এ নিয়ে ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয় আমাদের মধ্যে। বাংলাদেশ এস্ট্রোনোমিকাল সোসাইটি’র সাধারণ সম্পাদক এফ আর সরকার, প্রথম আলো’র মুনীর হাসান, অনুসন্ধিৎসু চক্রের সদস্যগণসহ এ অঙ্গনের প্রায় সবাই যুক্ত হয়ে এ ইভেন্টকে স্মরণীয় করে তোলে। কেন্দ্রিয়ভাবে ঢাকা’র বুয়েট মাঠে টেলিস্কোপে এ বিরল দৃশ্য দেখাবার আয়োজন করা হয়। মনে পড়ে হাজার হাজার মানুষ বুয়েট মাঠে রক্ষিত টেলিস্কোপে চোখ রেখে মঙ্গল গ্রহকে খুঁজেছিলেন।

মহাকাশ বিজ্ঞান একটা অংক। যার কিছুটা মানুষ কষতে পারে। সে কারণেই কবে-কোথায়-কখন কতটুকু সময় ধরে সূর্যগ্রহণ হবে তা পূর্বেই বলা সম্ভব হয়। ২০০৯ সালে পঞ্চগড় থেকে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে এটা রাষ্ট্র হয়ে যায়। এই গ্রহণ দেখার জন্য বাংলাদেশে প্রস্তুতি কমিটি একবছর আগে থেকেই আয়োজন শুরু করে দেয়। প্রস্তুতি কমিটির হয়ে এফ আর সরকার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। প্রস্তুতির খবর আমি পরিচিত একজনকে ফোন করে পঞ্চগড়ে আগেই জানিয়ে রেখেছিলাম। তাকে বলেছিলাম-নির্দিষ্ট দিনে পঞ্চগড়ে দিনের বেলাতে ‘রাত’ নেমে আসবে। পশুপাখিরা বিভ্রান্ত হবে। মানুষ মুগ্ধ বা বিস্মিত হবে। এরপর যথারীতি নির্দিষ্ট সময়েই সেটা ঘটেছিলো পঞ্চগড়ে। গ্রহণের দিন পঞ্চগড় স্টেডিয়ামে ব্যাপক আয়োজন করে প্রজেক্টরের মাধ্যমে পঞ্চগড়বাসীসহ দেশী-বিদেশী বিজ্ঞান মনষ্ক মানুষেরা এটা প্রত্যক্ষ করে। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরপরই পঞ্চগড়ে আমার পরিচিত সেইজন আমাকে পীর-ফকির ভাবতে শুরু করে এবং আমার প্রতি তার ভক্তি ক্রমাগত বেড়ে যায়! মানুষের চন্দ্র পৃষ্ঠে পৌঁছানোর ঘটনা একটা প্রজন্মকে যে কতটা প্রভাবিত করতে পারে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন এফ আর সরকার।

চাঁদের ‘এ্যাপেলো-১১’ মিশন শেষ করে তিন নভোচারী পৃথিবীতে ফিরে আসার পরপরই তারা পুরো পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ শহরে শুভেচ্ছা ভ্রমণে বের হন। এক পর্যায়ে তারা আসেন ঢাকায়। সেটা একাত্তরের যুদ্ধের আগের ঘটনা। ঢাকা এয়ারপোর্টে তরুণ এফ আর সরকার ক্যামেরা নিয়ে কৌশলে নিরাপত্তা চৌকি ডিঙ্গিয়ে চন্দ্রাভিযানের নায়কদের কাছে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। এটা জেনে আমি আগারগাঁওস্থ জাতীয় গ্রন্থাগার ও আর্কাইভে রক্ষিত সে সময়ের দৈনিক পত্রিকা দেখে তার বর্ণিত ঘটনার সত্যতা খুঁজে পাই। মহাকাশ বিজয়ের মুগ্ধতা থেকে তিনি পরবর্তীতে তার মেয়ের নাম রাখেন ‘লুনা’ আর ছেলের নাম রাখেন ‘এ্যাপেলো’।

বিজ্ঞাপন

পুত্র না হলেও এফ আর সরকার আমাকে পুত্রসম জ্ঞান করতেন। তাঁর সাথে আমার যোগাযোগ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে। মহাকাশ বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়করণের ব্রত নিয়ে আমরা দুজন বহুদিন বহু জায়গায় একত্রে উপস্থিত হয়েছি। বিজ্ঞান জনপ্রিয় আন্দোলনের মুনীর হাসান ভাইয়ের সাথে তিনি নিয়মিত মহাকাশ বিষয়ে অনুষ্ঠান করতেন। এফ আর সরকারের সম্পাদনায় আমি ‘মহাকাশবার্তা’ নামে একটি অনলাইন পত্রিকা চালিয়েছিলাম বেশকিছুদিন। আমি এই পত্রিকার অনলাইন প্রকাশনার দিকটি দেখতাম। এছাড়া স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা দেয়ার জন্য আমরা মাল্টিমিডিয়ার প্রজেক্টর নিয়ে অডিও ভিউজুয়াল কনটেন্ট দেখাতাম সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। তখনও ইউটিউবের বিকাশ এভাবে ঘটেনি। ভিএইচ-ভিডিও আর সিডি-ভিডিভি ছিল একমাত্র শিক্ষা উপকরণ।

এফ আর সরকার জনকণ্ঠ পত্রিকায় প্রতি মাসে সচিত্র ‘রাতের আকাশ’ শিরোনামে লিখতেন। তিনি আমাকে রাতের আকাশের ম্যাপ তৈরি করা শিখিয়েছিলেন এবং এটা পত্রিকায় পাঠানোর দায়িত্ব ছিল আমার। তিনি ভালো স্কেচ করতে পারতেন। বিশেষত মানুষের মুখাবয়বের। জীবনের প্রথম দিকে আঁকিয়ে হিসেবেও কাজ করেছেন। তিনি নিয়মিত ডায়েরীও লিখতেন। মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই তিনি এটা করতেন। ১৯৭১ এর ব্যক্তিগত ডায়েরিটা আমাকে পড়তে দিবেন বলেছিলেন বেশ ক’বার। কিন্তু সেটা না দিয়েই তিনি চলে গেলেন।

১৫ ডিসেম্বর ২০২০ এ এসে এফ আর সরকারের দৈহিক অক্ষাবর্তন শেষ হয়। মারা যাবার আগের দিন ১৪ ডিসেম্বর দুপুরে তিনি আমাকে ফোন করেছিলেন-অনেকদিন পর। তার কণ্ঠস্বর ক্ষীণ লাগছিল। এ্যাজমার রোগী ছিলেন। অনলাইনে মহাকাশ বিষয়ক ক্লাস কিভাবে শুরু করা যায় সে জন্য পরিকল্পনা করতে বাসায় যেতে বললেন। ১৬ ডিসেম্বর সকালে পত্রিকা খুলে দেখি তাঁর মৃত্যু সংবাদ। আমার অসংখ্য স্মৃতি আছে এ মানুষটির সাথে। মাঝে মাঝে সিরাজগঞ্জের আঞ্চলিক টানে কথা বলতেন তিনি। একবার আমেরিকা গেলেন মাধ্যাকর্ষণ কাজ করে না এমন পরিবেশের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেবার জন্য। এ বিষয়ক মার্কিন সংস্থা তার বয়স বেশি বলে তাকে সোজা না বলে দেয়। তিনি দমবার পাত্র ছিলেন না । ২০০৮ এর ২৪ মে আমেরিকায় বসবাসরত মেয়ের জামাইকে দিয়ে ফোন করিয়ে এবং বন্ড সই দিয়ে তিনি ‘জিরো গ্রাভিটি’র স্বাদ নেন ৬৭ বছর বয়সে প্রথম একজন বাংলাদেশের বাঙ্গালী হিসেবে। জিরো গ্রাভিটি’র প্লেন থেকে নেমেই তিনি আমাকে মেইল করলেন তার শূন্যে ভাসমান ছবিটি দিয়ে। ভিডিওটাও পাঠালেন। আমি সে মুহুর্তে সেটা এটিএন বাংলা’য় ভানুরঞ্জন দাদাকে পাঠিয়ে দেই। এরপর তার জিরো গ্রাভিটি জার্নির খবরটা দেশে চাউর হয়।

একবার বাংলাদেশের পদার্থ বিজ্ঞানী ড. আলী আসগর স্যারকে নিয়ে এফ আর সরকার চাচা গেলেন রাতের আকাশ বস্তু দেখতে ঢাকার বাইরে। নিদিষ্ট স্থানে পৌঁছে তারা আরো ভালোভাবে দেখার আশায় উঁচু ও বন্ধুর পথ ধরে সামনে এগোতে শুরু করেন। রাতের অন্ধকারে ঠিকমতো দেখতে না পেয়ে এক পর্যায়ে আলী আসগর স্যার গর্তের মধ্যে পড়ে যান। ব্যাথার সাথে তার হাতে-পায়ে মাটি কাঁদা লেগে যায়। এগুলো ধোঁয়ার জন্যে পাশের এক বাড়িতে যান তারা। বাড়ির বয়ষ্ক মহিলা তখন তাদের আগমনের হেতু জেনে নাকি বলেছিলেন, আপনারা পায়ের সামনের গর্তই ঠিকমতো দেখেন না, তো এত দূরের গ্রহ-নক্ষত্র দেখবেন ক্যামনে?

এফ আর সরকার হাসতে জানতেন। হাসাতেও। তার প্রাণ খোলা হাসির কাছে খুব হিসেব করে হাসা লোকও বেহিসেবী হয়ে যেত। একাত্তরে সিরাজগঞ্জের তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক একে শামসুদ্দীন সাহেবের জীবন-কর্মের ওপর আমি প্রথম ১৯৯৫ সালে একটি ‘স্মৃতি তর্পণ’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করি ৫ সেগুনবাগিচাস্থ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। এটার সাথে এফ আর সরকার যুক্ত হয়েছিলেন প্রত্যক্ষভাবে। তিনি অতিথি হিসেবে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের প্রথম সংস্থাপন সচিব নূরুল কাদের সাহেবকে হাজির করেছিলেন সেই স্মৃতি তর্পণ অনুষ্ঠানে। এফ আর সরকার জীবনে অনেক মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। আর একটি গুণ লক্ষ্য করেছি- কেউ অসুস্থ হলে তাঁকে ডাক্তার দেখাতে এবং সঠিক পরামর্শ ও সহযোগিতা করতে। তার দৃষ্টি ছিল সুদূরে- কালের গণ্ডির বাইরে। হয়তো এ কারণে তাকে এবং তার মাঙ্গলিক চিন্তাকে কাছের মানুষ অনেকেই তা উপলব্ধি করতে পারতো না।

পত্রিকার খবর অনুযায়ী- ১৫ ডিসেম্বর ২০২০ মঙ্গলবার সকালে মিরপুরে নিজ বাসায় হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়ার পথে এফ আর সরকার মারা যান। তার আত্মার আকাঙ্ক্ষা পূর্ণতায় পৌঁছাক- এই আমাদের প্রত্যাশা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)