চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

জেনে না জেনে শিকার যে মানুষেরা

সম্প্রতি থাইল্যান্ডে মানবপাচারের বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে যার অনেকেই আবার বাংলাদেশী। কিছুদিন আগেই সমুদ্রপথে ইতালিতে যাবার সময় ছোট ট্রলার ডুবে গিয়ে অনেকের মৃত্যু হয়েছে এবং সেখানেও বাংলাদেশী ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটা বিশাল অংশ দেশের বাইরে কাজ করে। তারা যে আয় করে সেই রেমিটেন্স বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়াতে বাংলাদেশী শ্রমিকরা বেশি যায়।

বিজ্ঞাপন

যে দেশের অর্থনীতির একটা বিশাল অংশ নির্ভর করে বিদেশে থাকা মানুষদের রেমিটেন্সের ওপর সেই দেশে জনসংখ্যাকে সম্পদ হিসেবে দেখাই স্বাভাবিক। আর এই মানুষগুলোই যখন নিজের এবং দেশের অর্থনীতিকে সচল করতে জীবন বাজি রেখে অবৈধ পথে বিদেশে পাড়ি জমায় কিংবা না জেনে পাচার হয়ে যায় তখন সেটি হৃদয়বিদারক হওয়াই স্বাভাবিক।

মানুষগুলো তাহলে কেনো নিজের জীবন বাজি রেখে ভিনদেশে গিয়ে কাজ করতে চাইছে? পরিবার পরিজন ছেড়ে এমনিতেই তো কারো বিদেশে খুব বেশিদিন থাকতে ভালো লাগার কথা না। সেটি যদি হয় জীবন বাজি রেখে যাওয়া তাহলে প্রশ্ন জাগে নিজ দেশে নিশ্চয়ই পরিবার পরিজন নিয়ে ভালো ভাবে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য যেতে হচ্ছে কিংবা না জেনে পাচার হয়ে যাচ্ছে।

এই দুই বিষয়ের সাথেই অর্থনীতি জড়িত। দুইক্ষেত্রেই মানুষ ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য কিংবা অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য বিদেশে পাড়ি জমায়। তবে কেউ জেনে বিপদের ঝুঁকি নেয় আবার কেউ না জেনে বিপদে জড়িয়ে পরে। যারা না জেনে এই ঝুঁকির মাঝে পরে তাদের আসলে সংজ্ঞা অনুযায়ী হিউম্যান ট্রাফিকিং কিংবা মানবপাচারের সাথে সম্পৃক্ত করা যায়। অর্থাৎ এইক্ষেত্রে তাদের আসলে নিজেদের কোন দোষ নেই ওই অবৈধ কাজ করার জন্য। তাদের হয়তো বলা হয়েছিলো বৈধ উপায়ে ভালো কাজের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাই তারা গিয়েছে।

কিন্তু যারা জেনে বুঝে বিপদের ঝুঁকি আছে জেনেও ট্রলারে করে কিংবা স্থলে পথে পৃথিবীর নানা সীমান্ত অবৈধভাবে পাড়ি দেয় কিংবা দিতে গিয়ে ধরা পড়ে। তাদের ক্ষেত্রে আসলে মানবপাচার টার্মটি সম্পৃক্ত নয়। এইক্ষেত্রে এটি অপরাধ, কারণ তারা ইচ্ছে করে ওই অবৈধ পথে পা বাড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি বিশাল সংখ্যক বাংলাদেশীকে থাইল্যান্ডের জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। বলা হচ্ছে তারা অবৈধ পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য থাইল্যান্ডের জঙ্গলে আশ্রয় চেয়েছিলো। এদিকে থাই পুলিশ তাদের উদ্ধার করার পর সেখাকার কর্তৃপক্ষ এখন খতিয়ে দেখছে তারা কি আসলেই মানবপাচারের জন্য সেখানে আটকা পড়েছিলো নাকি তারা ইচ্ছে করেই জেনে বুঝে মালয়েশিয়া পাড়ি দেয়ার জন্য সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলো দালালদের সহায়তায়। যদি ইচ্ছে করে এই বিপদের ঝুঁকি জেনেও তারা এটি করে থাকে, তাহলে থাই সরকার হয়তো আইন অনুযায়ী তাদের শাস্তি দিতে পারে। অন্যথায় হয়তো তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে।

যারা সেখানে আটকা পড়েছে তাদের আদৌ এই বিষয়গুলো জানা আছে কিনা এটি হচ্ছে প্রশ্ন। সরকারের নীতিনির্ধারকদের এই বিষয় জানা থাকা উচিত এবং এই অনুযায়ী অতিদ্রুত বাংলাদেশীদের যাতে ফিরিয়ে আনা যায় সেই তৎপরতা চালানো উচিত। নইলে এই ভাগ্যবিরম্বিত মানুষগুলোর ভাগ্যে হয়তো আরো খারাপ আছে।

এই না জানার কারণ হচ্ছে মানুষের অসচেততা। মানবপাচার কিংবা অবৈধ পথে অভিবাসন আসলে একদম বন্ধ করা সম্ভব না। এটি অনেক আগে থেকেই হয়ে আসছে। গবেষণা সংস্থাগুলোর হিসাব মতে প্রতি বছর প্রায় ৮ লাখ মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন সীমান্তে পাচার হয়ে যাচ্ছ। যাদের প্রায় ৪৮ ভাগ শেষ পর্যন্ত সেক্স ইন্ডাস্ট্রিতে যুক্ত হচ্ছে।

এ পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায় পাচার হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর অর্ধেকই নারী যার মধ্যে আবার বিশাল একটা সংখ্যা শিশু। তবে এর মাত্রা কমানো যেতে পারে সবাইকে সচেতন করার মাধ্যমে। আর তা করার দায়িত্ব হচ্ছে সরকার এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার।

এছাড়াও যে প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখছে তারা বিদেশে কেমন আছে, তাদের সমস্যাগুলো কি, তাদের পারিবারিক বিষয়গুলো নিয়ে দেশে খুব একটা গবেষণা হয় বলেও মনে হয় না। কেবল কোয়ানটিটেটিভ বা সংখ্যাগত গবেষণা করলে আসলে সমস্যার গভীরের কোন কিছু জানা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন কোয়ালিটেটিভ বা বর্ণনামূলক গবেষণা। আর যে কোন গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফলগুলো বিশ্লেষণ করে যাচাই বাছাই করে সে থেকে সরকার নীতি নির্ধারকরা প্রবাসীদের জন্য কর্মপন্থা ঠিক করতে পারে এবং যারা বিদেশে যেতে চায় তাদের ব্যাপারেও নীতিনির্ধারণ করা যেতে পারে।

আমিনুল ইসলাম: শিক্ষক ও গবেষক। গবেষণার বিষয়বস্ত ‘অভিবাসী ও উদ্বাস্তু এবং তাদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া’। ইমেইল: [email protected]

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View