চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

জুলিও কুরি পদকে বিশ্ববন্ধুর স্বীকৃতি পান শেখ মুজিব

১৯৭৩ সালের ২৩ মে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের উত্তর প্লাজায় উন্মুক্ত চত্বরে সুসজ্জিত প্যান্ডেলে আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের বিশাল সমাবেশে বিশ্ব শান্তি পরিষদের তৎকালীন মহাসচিব রমেশ চন্দ বঙ্গবন্ধুকে জুলিও কুরি শান্তি পদক পরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন: ‘শেখ মুজিব শুধু বঙ্গবন্ধু নন, আজ থেকে তিনি বিশ্ববন্ধুও বটে।’

সেদিন থেকেই বাঙালি বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্বীকৃত বিশ্ববন্ধু শেখ মুজিব।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

বঙ্গবন্ধুর আগে ও পরে যারা ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পদক লাভ করেছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিডেল ক্যাস্ট্রো, ভিয়েতনামের জাতীয় নেতা হো চি মিন, প্যালেস্টাইন নেতা ইয়াসির আরাফাত, চিলির প্রেসিডেন্ট সালভেদর আলেন্দে, সাউথ আফ্রিকার নেতা ও প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলা, ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, মাদার তেরেসা, কবি ও রাজনীতিবিদ পাবলো নেরুদা, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু, মার্কিন বর্ণবাদবিরোধি নেতা মার্টিন লুথার কিং ও সোভিয়েট ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট লিওনিদ ব্রেজনেভ।

এর আগে বাংলাদেশ সরকারের জোট নিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ এবং শান্তি ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান গ্রহণের ফলে বাংলাদেশ বিশ্বসভায় মর্যাদা লাভ করে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭২ সালের অক্টোবর মাসে চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোতে বিশ্ব পরিষদের প্রেসিডেনসিয়াল কমিটির সভায় বাঙালি জাতির মুক্তি আন্দোলন এবং বিশ্বশান্তির সপক্ষে বঙ্গবন্ধুর অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ জুলিও কুরি শান্তি পদক প্রদানের প্রস্তাব উপস্থাপিত হয় এবং পৃথিবীর ১৪০টি দেশের শান্তি পরিষদের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুকে জুলিও কুরি শান্তি পদক প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা ও বাংলাদেশ শান্তি পরিষদের সভাপতি মোজাফফর হোসেন পল্টু চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: বিশ্বশান্তি ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের অগ্রদূত বঙ্গবন্ধুকে বিশ্বশান্তি পরিষদের জুলিও কুরি শান্তি পদক প্রদান এক বিরল ঘটনা। ঢাকায় দু’দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত বিশ্ব শান্তি পরিষদের সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন ছিল ২৩ মে।

বিশ্ব শান্তি পরিষদ মনে করে বিশ্বের শান্তি আন্দোলনের জন্য, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য বঙ্গবন্ধুর অবদান অনস্বীকার্য। যখন বঙ্গবন্ধুকে এ পুরস্কার দেয়া হয় তাদের প্রত্যাশা ছিল বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলাদেশের বন্ধু নন, তিনি আজ থেকে শুধু বাংলাদেশের বন্ধু নন, সারা বিশ্বের মানুষের বন্ধু।

মোজাফফর হোসেন পল্টু

নিজের অনুভূতির কথা ব্যক্ত করে মোজাফফর হোসেন পল্টু বলেন: তৎকালীন বিশ্ব শান্তি পরিষদের মহাসচিব রমেশ চন্দ্র যথার্থই বঙ্গবন্ধুকে বিশ্ববন্ধু উপাধি দিয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপন

বঙ্গবন্ধু যখন জাতিসংঘে ভাষণ দিলেন বলেছিলেন: ‘বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের দলে আছি। আমি শোষিতের পক্ষে আছি।’

মোজাফফর হোসেন পল্টু বলেন: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকদের দ্বারা যদি বঙ্গবন্ধু শাহাদাৎ বরণ না করতেন, যদি তিনি আরও দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতেন তাহলে সারা বিশ্বকে অনেক কিছু দিতে পারতেন। এটা থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি।

বিশ্ববন্ধুর উপাধির পর শান্তির সৈনিকদের শ্রদ্ধা নিবেদনে যা বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু
লাখো শহীদের রক্তে সিক্ত স্বাধীন বাংলার পবিত্র মাটিতে প্রথম এশীয় শান্তি সম্মেলনে যোগদানের জন্য আগত শান্তির সেনানীদের জানাই স্বাগতম। উপনিবেশবাদী শাসন আর শোষণের নগ্ন হামলাকে প্রতিরোধ করে ত্রিশ লক্ষ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে আমরা ছিনিয়ে এনেছি আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা, তাই বাংলাদেশের মানুষের কাছে শান্তি আর স্বাধীনতা একাকার হয়ে মিশে গেছে। আমরা মর্মে মর্মে অনুধাবন করি বিশ্বশান্তি তথা আঞ্চলিক শান্তিও অপরিহার্যতা।

এই পটভূমিতে আপনারা-বিশ্বশান্তি আন্দোলনের সহকর্মী প্রতিনিধিরা আমাকে ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পদকে ভূষিত করেছেন। এই সম্মান কোনো ব্যক্তিবিশেষের জন্য নয়। এ সম্মান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের আত্মদানকারী শহীদেদের, স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানীদের, ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পদক সমগ্র বাঙালি জাতির। এটা আমার দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের। বাংলাদেশের চরম দুঃসময়ে বিশ্বশান্তি পরিষদ যেমন আমাদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছিলেন, এদেশের মানুষও ঠিক একইভাবে বিশ্বশান্তি আন্দোলনের সহমর্মিতা জানিয়ে এসেছেন। আমি নিজে ১৯৫২ সালে পিকিং-এ অনুষ্ঠিত প্রথম এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলীয় শান্তি সম্মেলনের একজন প্রতিনিধি ছিলাম। বিশ্বশান্তি পরিষদের ১৯৫৬ সালের স্টকহোম সম্মেলনেও আমি যোগ দিয়েছিলাম। একই সাথে এটাও আমি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে চাই, বিশ্বশান্তি আমার জীবনদর্শনের মূলনীতি। নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত, শান্তি ও স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী মানুষ, যে কোন স্থানেই হোক না কেন, তাদের সাথে আমি রয়েছি। আমরা চাই বিশ্বের সর্বত্র শান্তি বজায় থাকুক, তাকে সুসংহত করা হোক।

বৃহৎ শক্তিবর্গ, বিশেষভাবে আগ্রাসী নীতির অনুসারী কতিপয় মহাশক্তির অস্ত্রসজ্জা তথা অস্ত্র প্রতিযোগিতার ফলে আজ এক সঙ্কটজনক অবস্থায় সৃষ্টি হয়েছে। আমরা চাই, অস্ত্র প্রতিযোগিতায় ব্যয়িত অর্থ দুনিয়ার দুঃখী মানুষের কল্যাণের জন্য নিয়োগ করা হোক। তাহলে পৃথিবী থেকে দারিদ্র্যের অভিশাপ মুছে ফেলার কাজ অনেক সহজসাধ্য হবে।

আমরা সর্বপ্রকার অস্ত্র প্রতিযোগিতার পরিবর্তে দুনিয়ার সকল শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের কল্যাণে বিশ্বাসী বলেই বিশ্বের সব দেশ ও জাতির বন্ধুত্ব কামনা করি। সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এই নীতিতে আমরা আস্থাশীল। তাই সামরিক জোটগুলোর বাইরে থেকে সক্রিয় নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি আমরা অনুসরণ করে চলেছি। শুধু সরকারের নীতিই নয়, আন্তর্জাতিক শান্তি ও সংহতি সুদৃঢ় করা আমাদের সংবিধানের অন্যতম অনুশাসন।

আপনারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, আমাদের সংবিধান জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এই চারটি স্তম্ভের উপরই রচিত। এই আদর্শের ভিত্তিইে আমরা একটি শোষণমুক্তি সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করতে চাই।

আমাদের মুক্তিসংগ্রামের আলোকেই জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মূল্য আমরা অনুধাবন করেছি। আমরা জানি, মুক্তিকামী মানুষের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রাম অস্ত্রের জোরে স্তব্ধ করা যায় না। সেজন্য ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস, এ্যাঙ্গোলা, মোজাম্বিক, গিনিবিসাউসহ দুনিয়ার সকল উপনিবেশ-বিরোধী সংগ্রামের প্রতি আমরা জানিয়েছি অকুণ্ঠ সমর্থন। আমরা ক্ষোভ প্রকাশ করি অন্যায়ভাবে আরব এলাকা ইসরাইল কর্তৃক জোরপূর্বক দখলে রাখার বিরুদ্ধে। আমরা দ্বিধাহীন চিত্তে নিন্দা করি দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিশ্বের সকল স্থানের বর্ণবাদী নীতির। আমরা সমর্থন জানাই বিশ্বশান্তি, নিরস্ত্র, নিরস্ত্রীকরণ ও মানব কল্যাণের যে কোন মহৎ প্রচেষ্টাকে।

বিশ্বশান্তি ও মানবকল্যাণ আমাদের অন্যতম মূলনীতি হওয়ার জন্যই শুরু থেকে আমরা এই উপমহাদেশের স্থায়ী শান্তির জন্য চেষ্টা করে আসছি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, পাকিস্তানের বৈরী মনোভাবের দরুণ আমাদের প্রচেষ্টা ফলবতী হয়নি। পাকিস্তান বার বার উপমহাদেশের নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিতে অস্বীকার করে এসেছে। স্থায়ী শান্তি ও মানব কল্যাণে আমাদের উদ্যোগের সর্বশেষ প্রমাণ ১৭ এপ্রিলে ভারত-বাংলাদেশ যুক্ত ঘোষণা। এই ঘোষণায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার সূত্র খুঁজে বের করার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে মানবিক সমস্যা সমাধানের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রস্তাবে অনুকূল সাড়া দেওয়ার পরিবর্তে পাকিস্তান প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে বেআইনীভাবে আটক নিরাপরাধ বাঙালিদের বন্দীনিবাসে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। এইভাবে পাকিস্তানের একগুয়ে নীতি উপমহাদেশে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শুধু তাই নয়, কেউ কেউ আবার নতুন করে পাকিস্তানকে সজ্জিত করে চলেছেন নতুন নতুন সমরাস্ত্রে। নিঃসন্দেহে এটা স্থায়ী শান্তির যে কোন শুভ উদ্যোগের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করতে পারে। আমি এর প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। জয় বাংলা। জয় বিশ্বশান্তি।

বিজ্ঞাপন