চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

জীবন থেকে জীবন কেড়ে নেয়া, এ কেমন খেলা প্রভু?

বার বার মনে পড়ছে এই গানটি,
‘‘খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে।
প্রলয় সৃষ্টি তব পুতুল খেলা নিরজনে প্রভু নিরজনে।।
শূন্যে মহা আকাশে
মগ্ন লীলা বিলাসে,
ভাঙিছ গড়িছ নিতি ক্ষণে ক্ষণে।।
তারকা রবি শশী খেলনা তব, হে উদাসী,
পড়িয়া আছে রাঙ্ পায়ের কাছে রাশি রাশি।
নিত্য তুমি, হে উদার
সুখে দুখে অবিকার,
হাসিছ খেলিছ তুমি আপন মনে।।’’

নিরজনে প্রভুর এমন প্রলয় খেলায় পৃথিবী এই শতাব্দীর ভয়ংকর ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। আপাতত আত্মসর্মপণ করছে অণুজীব-চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণ। মরণাস্ত্রে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র। জাতি-সমাজ-পরিবার। সবচেয়ে নির্মম-নির্দয়-নিষ্ঠুর-অসহায় আত্মসমর্পিত হচ্ছে মানবিক বন্ধন। জীবনের জীবনবোধ। জীবনের যে বন্ধন আমাদের ’মানুষ’ করেছে সেটি অবলীলায় কেড়ে নিচ্ছে এমন এক অদৃশ্য কণা, যার অস্তিত্বের স্বরূপ পাওয়া যায় কেবল স্ক্যানিং ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপ (এসইএম) এর সাহায্যে। জীবন থেকে জীবন কেড়ে নেয়া, মানবতা কেড়ে নেয়া, বন্ধন কেড়ে নেয়ার এমন প্রক্রিয়া হয়ত শুরু হয়েছিল অনেক আগে থেকেই। আমাদের দূরদৃষ্টির অগোচরেই তা বেড়ে উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

এই মানবিক সংকটে জাতি-রাষ্ট্র-সমাজে জীবনের বন্ধন ভেঙ্গে পড়ার গ্রাফে আমাদের অবস্থানের ভয়ঙ্কর চিত্র ফুটে উঠছে গণমাধ্যমগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে।

বিজ্ঞাপন

(১) একজন মুক্তিযোদ্ধা ১৬ ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্সে ৬ হাসপাতাল ঘুরেও বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেন। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ অথচ কোনো হাসপাতালের ডাক্তার তার চিকিৎসা দিলেন না। কেন? কোথায় সেই উন্নাসিক ডাক্তার যিনি গোলটেবিল বৈঠকে ডাক্তারদের সুরক্ষা সরঞ্জামের প্রশ্ন তুলে নেতৃত্বের ঝাঁজ দেখালেন? মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ চিকিৎসায় পিপিই জরুরী?

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাবি মতে, দেশে ডাক্তারদের জন্য পর্যাপ্ত পিপিই সরবরাহ করা হয়েছে এবং আরো মজুদ রয়েছে। তাহলে কেন চট্রগ্রামের ১১ বছরের মেয়েটি ৫ হাসপাতাল ঘুরেও চিকিৎসা পেল না? মৃত্যুর পর তার করোনা রির্পোট হলো নেগেটিভ। কি জবাব দিবেন সরকারী-বেসরকারী হাসপাতালের ডাক্তার মালিক-পরিচালকেরা?

একজন মুক্তিযোদ্ধার জীবন থেকে অবহেলায় অসময়ে জীবন কেড়ে নেয়া কিংবা ১১ বছরের শিশুর মৃত্যু কি অবহেলাজনিত হত্যা নয়? বর্তমানে এমন ভুক্তভোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে কোনো রোগে আপনি অসুস্থ মানেই বিনাচিকিৎসায় মৃত্যু। বিনাচিকিৎসায় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের সন্তানদের কাছে এই কষ্টের ওজন কত বড়- তা কি আমরা অনুধাবন করতে পারছি? মহৎ পেশার শপথ নিয়ে পাশবিক হয়ে ওঠা এমন বিশৃঙ্খল অবস্থাকে শৃঙ্খলায় ফেরাবে কে?

বিজ্ঞাপন

(২) এই সময়ে সাধারণ সর্দি-কাশিসহ যে কোনো অসুস্থতায় কারও মৃত্যু হলেই মৃত ব্যক্তির সৎকারের পরিবর্তে হৈ চৈ পড়ে যাচ্ছে। ধর্মীয় বিধান মতে গোসল, জানাযায়- এমনকি মৃত ব্যক্তির নিজ এলাকায় কবর দিতেও বাধা দেয়া হচ্ছে। অথচ মৃতদের রির্পোট বলছে, তারা করোনা আক্রান্ত ছিলেন না। তাহলে পূর্বসংস্কারের বশবর্তী হয়ে সৎকারের অধিকার কেড়ে নেয়ার মানসিকতা সমাজের কিসের লক্ষণ? জীবন থেকে জীবন হারিয়ে যাওয়ার?

(৩) দেশে এত যে ধর্মীয় নেতা-পীর-আল্লামা তাদের ভূমিকা দেখুন? এই সংকটে ইউটিউবে ঝড়তোলা তাহেরী-আজহারী-তেঁতুল-মাদানী-নগরী-চরমোনাই-শর্শিনা-মাইজভান্ডারি-আহলে হাদিস গ্রুপদের কোনো সামাজিক-ধর্মীয় দায়বদ্ধতা চোখে পরেছে? উনারা ইসলামের স্বঘোষিত হেফাজতকারী। কিন্তু কোনো মৃত মুসলিমের গোসল-জানাযা-কবর নিয়ে কোনো ফতোয়া দিয়েছেন? মুসলিমদের জন্য কোনো খেদমদকারী, আনসার গ্রুপ তৈরী করেছেন? এটি কি ধর্ম থেকেও মানবতা হারিয়ে যাওয়া?

(৪) এই সংবাদগুলো লক্ষ্য করুন: উত্তরায় কোয়ারেন্টাইন সেন্টার তৈরীতে এলাকাবাসির বিক্ষোভ-বাধা দান। কবরস্থানে লাশ দাফনে এলাকাবাসীর বাধা। করোনা চিকিৎসা দেয়ায় হাসপাতালের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর বিক্ষোভ। করোনা আক্রান্তদের জন্য হাসপাতাল নির্মাণে এলাকাবাসীর বাধা। জ্বর-সর্দি নিয়ে নৌকা যোগে চিকিৎসা কেন্দ্রে যাবার পথে এলাকাবাসীর নৌকায় ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা। হার্টের অসুখে মারা যাওয়া পিতাকে করোনায় আক্রান্ত সন্দেহে হাসপাতালে রেখে সন্তানের পালিয়ে যাবার সংবাদও ছাপা হয়েছে।

ভেবে দেখুন ওই সব মানসিক অসুস্থ এলাকাবাসী কিংবা ওই সন্তান দেশ সমাজের মানবিক বন্ধন ভেঙে ফেলার কি ভয়ঙ্কর উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন?

এ সমস্ত বৈশিষ্ট্য একটি মানবতাহীন সমাজ, জীবন ব্যবস্থার নগ্ন চিত্র মাত্র। যে সমাজ থেকে অজ্ঞতায় অথবা সুপরিকল্পিত ভাবে মানবতার-জীবনের বন্ধনের শেকড় উপরে ফেলা হয়েছে ধীরে ধীরে। তবে হতাশ হবেন না! লোমশ কালো অন্ধকারের মাঝে এক চিলতে আশার আলো হয়ে পদচারণায় আছেন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের মত প্রতিষ্ঠান এবং কিছু তরুণ।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)