চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

জীবনের স্মৃতি: আমি জীবনে কিছুই হতে চাইনি

আমি জীবনে কখনো নিজে থেকে কিছুই হতে চাইনি। আমি সুস্থ মস্তিস্কে, ঠাণ্ডা মাথায় জেনেশুনে সবসময় চেয়েছি, এই এক জীবনে যতটুকু সম্ভব জীবনটাকে নিজের মতো করে কাটিয়ে দিতে। যাপন করতে। সেই আরাধ্য জীবন কতটুকু পালন করতে পেরেছি-এই মধ্য বয়সে এসে নিজেকে দিয়ে হাড়ে হাড়ে টের পাই। ফেলে আসা দিনগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, এই এক জীবন তো আর আট দশজনের চেয়ে ভালোই পার করে এলাম।

এত যে অপ্রাপ্তি, এত যে অপূর্ণতা ভুবনভর তার মধ্যে আমি কত সৌভাগ্যবান! অপ্রাপ্তিকেও প্রাপ্তিযোগের হিসেবে রেখেছি আমি জীবনভর।

বিজ্ঞাপন

কোনোকিছুর প্রতি ক্ষেদ নেই আমার।
ক্ষোভও নেই এক রত্তি।

বিজ্ঞাপন

ছোটবেলায় কোন এক দৈব ঘটনায় আমি বুঝে গিয়েছিলাম আমার দ্বারা আর যা-ই হোক আর দশজনের মতো ‘কিছু একটা হতে হবে’ এই ফর্মুলার মধ্যে দিয়ে গেলে আমার হবে না। মানে একদম সোজা।

আমাকে দিয়ে সেই ‘কিছু একটা হতে চাওয়া’ হবে অরণ্যে রোদন, অসাধ্য সাধন, তাই ওসব আমাতে হবে না।

ছোটবেলায় বাসার মুরুব্বীরা যখন গর্ব করে আমাদের শুনিয়ে শুনিয়ে (এখন বুঝি সেটা আসলে শোনানোর জন্য নয়- আমাদের ধরে বেঁধে উৎসাহ দেয়ার জন্য যাতে আমরাও পঙ্গপালের মতো সেদিকে ধাবিত হই মানে জীবনে বড় কিছু একটা হও…) বলত,অমুক বাড়ির ছেলেটা, অমুক বাড়ির মেয়েটা বড় বড় পাশ দিয়ে ‘এই হয়েছে’, ‘সেই হয়েছে,’-

মুরুব্বীদের কথায় আমি উৎসাহিত হওয়ার পরিবর্তে গ্লানিবোধে ব্যাথিত হতাম এই ভেবে তারা কেন ভাবে না আমি আসলে এই জীবনে কী হতে চাই।

আমার চাওয়া পাওয়ার কি কোনোরকমের মূল্যই নেই তাদের কাছে!

সঙ্গতকারণে আমি আমার এই জীবনে অন্যদের ‘এই হতে পারা’ আর ‘সেই হতে পারা’টাকে কখনোই সাফল্য হিসেবে দেখিনি।

তখন থেকে আমার সামনে এরকম কাউকে দেখলেই আমার মনে হতো, আরে ‘এ তো এই হয়েছে’ আর ‘ও তো সেই হয়েছে’ গ্রুপের- তাতে আমার কি!
আমি তো এসব কোনোকিছুর মধ্যে নেই।
আমি আমার দল্ভুক্ত।

বিজ্ঞাপন

দুই
ছোটবেলা থেকে দেখে দেখে আর ঠেকে ঠেকে (আরও সহজ করে বললে বলা উচিত, লাত্থি উষ্ঠা খেতে খেতে…) শিখেছি, জীবনে সবাই সব কিছু হতে পারে না- হওয়া সম্ভবও না।

পৃথিবীর কোন পবিত্র গ্রন্থে লেখা আছে, এই দুনিয়াতে সবাইকে সব কিছু হতে হবে!

তিন
জীবনে কিছু একটা হতে চাওয়া- বিষয়টাই আমার কাছে সবসময় দুরূহ ব্যাপার বলে মনে হয়েছে। আর জীবনে কিছু একটা হতে পেরেছেন বা অনেক কিছু হতে পেরেছেন তাদের প্রতি কুর্নিশ আমার সদাই। তবে তাই বলে আশেপাশে সবার রাতারাতি/ দিনে দিনে ‘এটা-সেটা’ হয়ে উঠতে পারার মতো ব্যাপক সাফল্য আমাকে মোটেও তাড়িত করে না। আমি তখন থেকেই খুব সযতনে আর দশজনের মতো ‘ আমাকে কিছু একটা হতে হবে’- জাতীয় আদিখ্যেতা থেকে নিজেকে দূরে রেখেছি।
উজ্জীবিত করে না।
উত্তেজিত করে না।
প্রভাবিত করে না।

আমি খুব সাদামাটা ভাবে হিসেব করে জীবন অতিবাহিত করেছি, নিজের মতন করে কিছু একটা হতে না চাওয়ার বিপরীতে। আমি সবসময়, সব পরিস্থিতিতে কি দেশে, কি দূর প্রবাসে এই তরিকায় চলেছি, যেভাবে আমার মানুষ আমাকে তার সঙ্গে নিয়ে যাবে আমি তার সঙ্গী হবো। যেভাবে আমার দিন আমাকে নিয়ে যাবে আমি তার পেছন পেছন হাঁটব।
আমি তার অনুসারী হবো।
আমি তার প্রশ্নের জবাব হবো।

চার
জীবনের বেশিরভাগ সময় তো এভাবেই কাটিয়ে দিলাম।
আমি খুব সযতনে নিজের জীবনটাকে তার নিজের হাতে সঁপে দিয়েছি- জীবন নিয়ে অযথা জোর-জবস্তি করে তাকে জ্বালাতন করিনি।

এতগুলো বছর চলে গেল, এখন মনে হচ্ছে জীবনের প্রতি আমি যেমন অনাচার করিনি- জীবনও আমার প্রতি সহায় থেকেছে। সেও আমার সঙ্গে অনাচার করেনি।

এখন, খুব একান্তে যখন ফেলে আসা যাচ্ছেটাই ধরণের স্বাধীন আর অগোছালো জীবনযাপনের হিসেব মেলাতে যাই তখন জীবন আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসে। তাঁকে তখন বেশ পরিতৃপ্ত লাগে। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ’কি! জীবনের হিসেব মেলাবার চাও? সাদাসিধে জীবন তোমার- হিসাবের কিছু নাই তোমার…।’

আমি অবাক হই। হিসাবের কিছুই নাই?
বলে কি!

যারা জীবনে অনেক কিছু হতে চায় তাদের হিসেবের ফিরিস্তি অনেক। যোগ-বিয়োগ, পূরণ-ভাগ, ভুজুং ভাজুং, গড়মিল- এসব মিলিয়ে মিলিয়ে দেখতে হয়। তোমার তো এসবের কিছুই নেই-

পাঁচ
আমি একটা মহামূল্যবান জীবন পার করে দিলাম অতি দীনহীন ভাবে কিছু হতে না চেয়ে। কারণ অতি শৈশবেই বাবামা হারিয়ে আমাকে মুখোমুখি হতে হয়েছিল এক বিচিত্র বাল্যকালের- যেই বাল্যকাল আমাকে শিখিয়ে দিয়েছিল, পৃথিবীতে সবাইকে সবকিছু হতে হয় না। অন্য সবার মতো কিছু না হয়ে তুমি তোমার মতো হও-
আমি বাল্যকালের সেই শিক্ষাটা রপ্ত করতে পেরেছিলাম।