চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

জাতীয় পার্টি কি সফল হবে?

একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ ফের সরকার গঠন করেছে। জাতীয় সংসদের বিরোধীদল হিসেবে ভূমিকা পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় পার্টি। মহাজোটের অংশ হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে দলটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২২ আসন পেয়েছে। এই আসনগুলো তাদের বিরোধী দলের তকমা দিয়েছে। শুরুতে তারা আদৌ বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে আগ্রহী কিনা এনিয়ে একটা ধোঁয়াশা ছিল। দলটি সরকারের অংশ হয়ে থাকবে, নাকি সরকারের অংশ হওয়ার পাশাপাশি বিরোধী দলের ভূমিকাও পালন করবে, নাকি স্রেফ বিরোধী দল হিসেবে সংসদে ভূমিকা পালন করবে এমন দোদুল্যমান অবস্থা থেকে অবশেষে জাতীয় পার্টি কেবল বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের এই সিদ্ধান্তে জাতীয় সংসদে কেবল বিরোধীদলের অস্তিত্বের ব্যাপারটি ৫ বছর পর ফিরে এসেছে, যদিও গত সংসদে তারা ছিল বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকার পাশাপাশি ছিল আবার সরকারের অংশও।

নব্বইয়ের গণআন্দোলনে স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর ধারণা করা হচ্ছিল জনরোষে ক্ষমতা হারানো দলটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কিন্তু সেটা হয়নি। একানব্বইয়ের নির্বাচনে দলটির ভরাডুবি ঘটলেও ক্ষমতার প্রয়োজনে আওয়ামী লীগ-বিএনপি এরশাদের জাতীয় পার্টিকে টিকিয়ে রেখেছে। বারবার দল ভাঙলেও এরশাদের নামে মূল দল এখনও টিকে আছে; উলটো এরশাদকে বহিস্কার করে যারা পৃথক জাতীয় পার্টি গঠন করেছিল তারাই হারিয়ে গেছে।

জাতীয় পার্টির ওইসব ভগ্নাংশ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির আশ্রয়ে নামেমাত্র আছে ঠিক তবে তারা রাজনীতি ও ভোটের মাঠে রীতিমত প্রভাবহীন। বিএনপির জোটে জাতীয় পার্টির যেসব অংশ আছে তারা জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বহীন, তবে আওয়ামী লীগের আশ্রয়ে থাকা আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জাতীয় পার্টির একটা অংশ এক নেতার এক নামে এখনও আছে, এবং সেই নেতা এমপি আর সাবেক মন্ত্রীও। এটা যতটা না ওই নেতার কারণে তারচেয়ে বেশি আওয়ামী লীগের বদান্যতায় কিংবা প্রয়োজনে।

এরশাদের জাতীয় পার্টির অবস্থাও অন্যদের মত হয়ে পড়ত যদি না নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তাকে টানাটানি না করত। সেই নির্বাচনের আগে দু’দলই এরশাদকে নিজেদের জোটে ভেড়াতে টানাটানি করছিল। এরশাদও ছিলেন দোদুল্যমান অবস্থায়। শেষ পর্যন্ত তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অংশ হন এবং আওয়ামী লীগের কাঁধে সওয়ার হয়ে রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হন। এরপর দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিসহ বেশিরভাগ দল নির্বাচন বর্জন করলে অনেক নাটকের পর আওয়ামী লীগের মহাজোটের অংশ হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেয় জাতীয় পার্টি। হয়ে যায় জাতীয় সংসদের বিরোধী দল।

দশম সংসদে একদিকে সরকারের অংশ আবার অন্যদিকে বিরোধীদলের অদ্ভুত ভূমিকা পালন করে জাতীয় পার্টি। রওশন এরশাদ হন জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা, আবার একই দলের একাধিক সাংসদ মন্ত্রিসভার সদস্যও হন। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ হন মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। ওই সময়ে একাধিকবার জাতীয় পার্টির মন্ত্রিসভার সদস্যদের মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগের কথা জানানো হলেও তারা কেউ মন্ত্রিসভা ছাড়েন নি। উপরন্তু পুরো পাঁচ বছর মন্ত্রিত্ব করে গেছেন। এই সময়ে জাতীয় পার্টির সদস্যদের অনেকেই নিজেদের ‘গৃহপালিত বিরোধীদল’ হিসেবে আখ্যা দিলেও সেই গৃহপালিত অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার কোন উদ্যোগ নেননি। জাতীয় সংসদও বঞ্চিত হয় একটা কার্যকর বিরোধীদল থেকে।

দশম সংসদের পর একাদশ সংসদ নির্বাচন ইসিতে নিবন্ধিত সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে হলে নির্বাচনের ফলাফলে সেই জাতীয় পার্টি আসন প্রাপ্তির দিক থেকে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ দলের তকমা পায়। বিএনপির জনসমর্থন জাতীয় পার্টির চাইতে কয়েকশ’ গুণ বেশি থাকলেও নির্বাচনে তাদের ভরাডুবি হয়। এই নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি ও তাদের জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। তাদের নির্বাচিত ৮ প্রার্থীর শপথগ্রহণ অনিশ্চিত। তাছাড়া শপথ নিলেও তারা জাতীয় সংসদের বিরোধীদলের মর্যাদা পাওয়ার দাবি রাখে না, যখন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন প্রাপ্ত জাতীয় পার্টি এই ভূমিকা পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

Advertisement

নির্বাচনে জাতীয় পার্টির ২২ আসন প্রাপ্তি মূলত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অংশ হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কারণেই। ফলে কাগজেকলমে যাই হোক এই দলটি আদতে আওয়ামী লীগের বি-টিমই। ফলে সরকারের বি-টিম হয়ে তারা বিরোধীদলের ভূমিকা কতখানি পালন করতে পারবে কিংবা কতখানি যোগ্যতা রাখে এনিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

উপরন্তু এরশাদের এই দলটির মধ্যেও ছিল বিরোধীদল হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়ে মতভেদ। দলের চেয়ারম্যান এরশাদ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি বিরোধীদলীয় নেতা হবেন, তবে এরমধ্যে দলের অনেকেই এ নিয়ে খুশি নন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। দলটির বেশিরভাগ নেতারাই সরকারের অংশ হিসেবে থাকতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। এর প্রকাশ হয়ত মন্ত্রিপরিষদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়েও যাননি সাবেক বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ। অন্যদিকে, বিরোধীদলীয় নেতা হয়ে এরশাদ নিজের জন্যে উপ-প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা চেয়েছেন। এইসব ঘটনা জাতীয় পার্টির ভবিষ্যৎ ভূমিকার পাশে প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দেয়। তারা বিরোধীদল তবে এর বাইরে আরও কিছু চায় এসব ঘটনা এ থেকে পরিষ্কার।

এখন পর্যন্ত যে পরিস্থিতি তাতে মনে হচ্ছে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিত ৮ সদস্য (গাইবান্ধা-৩ আসনে নির্বাচনের বাকি রয়েছে) সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন না। আগামী ৩০ জানুয়ারি জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হবে। এর মধ্যে তারা শপথ না নিলে, এবং অধিবেশনের ৯০ দিনের মধ্যেও তারা শপথ না নিলে জাতীয় সংসদের ওইসব আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ফলে ফের মুখোমুখি হয়ে যাবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এমন অবস্থায় এখনকার বিরোধীদল জাতীয় পার্টি বিরোধীদল হিসেবে থেকেও সরকারের পক্ষে কাজ শুরু করতে পারে। ওই সময় জাতীয় সংসদে তারা কী ভূমিকা পালন করে সেটাই দেখার।

গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। এই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিপরীতে সরকার তুমুলমাত্রায় একনায়কতান্ত্রিক হয়ে যেতে পারে যে শঙ্কা তার বিপরীতে জাতীয় পার্টি দাঁড়াতে পারবে বলেও মনে হচ্ছে। অবশ্য এরশাদ নিজেই কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। সামরিক বাহিনীর সদস্য ছিলেন, এবং এরপর বন্দুকের নলের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। ক্ষমতায় এসে দল গঠন করেছিলেন। দলের গঠন থেকে শুরু করে কোনো পর্যায়েই গণতন্ত্রের চর্চা ছিল না তার মধ্যে, এখনও নেই। অগণতান্ত্রিক জন্মপ্রক্রিয়া শেষে অগণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ও চর্চায় অভ্যস্ত এরশাদের জাতীয় পার্টি নিয়ে তাই গণতান্ত্রিক কিছু সম্ভব বলেও মনে হয়না। ফলে সরকার যা চাইবে সেখানেই তাদের সায় থাকবে, এবং সেটা গণতান্ত্রিক-অগণতান্ত্রিক সকল কিছুই নির্বিশেষে।

এমন অবস্থায় এরশাদের জাতীয় পার্টিকে নিয়ে তাই আশা দেখছি না, আশা দেখতে পারছি না। অবয়বে ছোট্ট হলেও যথাসম্ভব কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারত জাতীয় পার্টি কিন্তু দলটির ক্ষমতালিপ্সা, টিকে থাকার মানসিকতা এবং দলের জন্মইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে ওঠার ইতিহাসে গণতান্ত্রিক চর্চার কোন চিহ্ন না থাকার কারণে তাদের নিয়ে আশাবাদী হওয়া যায় না। সবচেয়ে বড় কথা জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে টিকে থাকাটা যখন আওয়ামী লীগের ওপরই নির্ভর করছে তখন তারা চাইলেও কতখানি পারবে কার্যকর বিরোধী দল হতে?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)