চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

জাতিকে রক্ষার দায়িত্ব এই বীরদের কাঁধেই

গত কয়েক মাস ধরে সারা বিশ্বে ভয়ংকর করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে, সামনে থেকে লড়াই করে যাচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। যাদের নেতৃত্বে আছেন চিকিৎসকরা। বাংলাদেশে, প্রতিবেশী ভারতে, সুদূর ইতালিতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কিংবা চীনের উহানে। সবখানে চিত্রটা একই। প্রাণের মায়া ত্যাগ করে, পরিবার-পরিজন ছেড়ে, দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রমে মরণাপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সর্বত্রই বীরত্ব দেখাচ্ছেন এসব স্বাস্থ্যকর্মী। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, গণমাধ্যমকর্মী, বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এই লড়াইয়ের মাঠে আছেন।

আজ থেকে প্রায় দুই মাস আগে ৮ মার্চ যেদিন আইইডিসিআর বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত তিন ব্যক্তির কথা জানায়, সেদিন দেশের মানুষ চমকে উঠেছিলেন। আর ঠিক ১০ দিন পর ১৮ মার্চ এই ভাইরাসে প্রথম ব্যক্তির মৃত্যুর খবরে অনেকেই আতঙ্কিত আর ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। তারপর থেকে ক্রমশই করোনাভাইরাসে যেমন আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে মৃতের সংখ্যাও।

বিজ্ঞাপন

ফাইল ছবি
করোনাভাইরাসে আক্রান্তের চিকিৎসা চলছে

শুরুতে সংশয়, শঙ্কা আর আতঙ্কে থাকলেও তা কাটিয়ে পৃথিবীর অন্যসব দেশের মত এদেশের মানুষকেও সাহস দিচ্ছেন সেই চিকিৎসক আর স্বাস্থ্যকর্মীরাই। তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত জ্বলজ্বল করছে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একটি বিলবোর্ডে। কয়েকদিন আগে সেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা হয়েছে, ‘HEROES WORK HERE’ আর তার ঠিক উপরে লেখা ‘করোনা ভাইরাস নিয়ে আতঙ্কিত হবে না’।

হ্যাঁ, সাধারণ মানুষ এই সাহসটুকুই চান চিকিৎসকদের কাছ থেকে। যদিও শুরুর দিকে এমন সাহস নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে বেশকিছু চিকিৎসক নিজদের দায়িত্ব ভুলে গিয়েছিলেন। যে কারণে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নন, এমন অনেক সাধারণ রোগীকেও করোনা সন্দেহে চিকিৎসা না দিয়ে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। যাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেয়েই মারা গেছেন। যার বড় উদাহরণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সুমন চাকমা।

চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাওয়া ঢাবি শিক্ষার্থী সুমন চাকমা

দীর্ঘদিন ফুসফুসের সমস্যায় ভুগতে থাকা সুমন চাকমা চিকিৎসা পেতে বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরে কোথাও চিকিৎসা পাননি। বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু নিশ্চিত জেনে তিনি ফিরে গেছেন খাগড়াছড়ির প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিজ বাড়িতে। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে ফেসবুকে নির্মম আর আবেগঘন এক  স্ট্যাটাসে তিনি লিখে গেছেন, ‘‘আমার করোনা হয়নি অথচ পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে করোনার জন্যই আমাকে মারা যেতে হবে।’’

বিজ্ঞাপন

এমন চিকিৎসা না দেওয়ার ঘটনা যেমন সাধারণ হাসপাতোলগুলোতে ঘটেছে, তেমনি ঘটেছে করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় নির্ধারিত বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী সরকারি হাসপাতালেও। সেখানে গিয়ে অনেকেই চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এমনকি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিকেও ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও সেখানে একাধিকবার ঘটেছে। আর এ কারণে শেষ পর্যন্ত সরকারকে কঠোর হতে হয়েছে। সেই হাসপাতালের ৬ চিকিৎসককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। যাদের কেউ কেউ দীর্ঘদিন কর্মস্থলে আসেননি। আবার কেউ কেউ কর্মস্থলে থেকেও রোগীকে চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

পিপিই’র অভাবে রেইনকোট পরে চিকিৎসা দিচ্ছেন ভারতের একজন চিকিৎসক

আর এসব ঘটনা নিয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাতে বাধ্য হন। কয়েকদিন আগে একটি অনুষ্ঠানে করোনাভাইরাসের মধ্যে যেসব চিকিৎসক, নার্সসহ অন্য স্বাস্থ্যকর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন; তাদেরকে পুরস্কৃত করার করার কথা জানান তিনি। পাশাপাশি যারা চিকিৎসা না দিয়ে নিজেদের সুরক্ষার জন্য পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তাদের উদ্দেশে বলেন, রোগী এলে চিকিৎসা দেবেন না- এ মানসিকতা কেন? রোগী এলে চিকিৎসা দিতে হবে। রোগী যেখানে যেখানে গিয়ে চিকিৎসককে পায়নি, তাদের চিকিৎসা করার যোগ্যতা নেই- তাদের চাকরি থেকে বের করে দেয়া উচিত।

এটা ঠিক শুরুর দিকে অনেক হাসপাতালে চিকিৎসকদের সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাব ছিল। কিন্তু দেখা গেছে, যেসব হাসপাতালে সেসব ছিল, সেখান থেকেও রোগী ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। কানাডা ফেরত এক শিক্ষার্থীকে দীর্ঘ সময় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পড়ে ছিল। যখন সব ধরনের সুরক্ষা নিশ্চিত করে চিকিৎসকরা সেখানে এসেছেন, তখন সবশেষ। তাকে আর বাঁচানো যায়নি। আর এখন দেশের প্রায় সব হাসপাতালেই সুরক্ষা সরঞ্জাম আছে, তারপরও রোগী ফিরিয়ে দেওয়া বন্ধ হয়নি।

অথচ আমরা দেখেছি, ভারতে পিপিই-মাস্ক না থাকার পরও সেদেশের চিকিৎসকরা রেইনকোট, হেলমেট পরে রোগীকে চিকিৎসা দিচ্ছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনী দেশেও চিকিৎসকরা মাথায় ময়লা ফেলার প্লাস্টিক পরে রোগীর পাশে দাঁড়িয়েছেন। এটাই প্রকৃত চিকিৎসকদের স্পিরিট। নৈতিক অবস্থান। আবার ইতালিতে চিকিৎসক সংকট তৈরি হওয়ার পর অবসর ভেঙে বহু চিকিৎসক ছুটে এসে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসা দিচ্ছেন।

তাদের এমন পেশাদার মনোভাবে ওইসব দেশে তারা বীরের মর্যাদা পেয়েছেন। মানুষ ঘরবন্দি থেকেও তাদের জন্য মোম-মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে, হাততালি দিয়ে, এমনকি থালা-বাটি বাজিয়েও সেইসব চিকিৎসদের অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। আরও শক্তি নিয়ে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছেন। এদেশের মানুষও সাহসী, বীর চিকিৎসক আর স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশে একদিন সেভাবেই দাঁড়াবে; আজ যারা জীবন হাতের মুঠোয় নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আর চিরদিন ঘৃণা করে যাবে সেইসব পালিয়ে যাওয়া ভীরুদেরকে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)