চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘জাগো বাহে, কোনঠে সবায়’

একদিন করোনার ঢেউ হয়তো থাকবে না, জীবনের ঢেউও মিলিয়ে যাবে। থেকে যাবে শুধু অমর কীর্তি আর মানুষের ভালোবাসা। করোনায় আক্রান্ত হয়ে কিছু প্রিয় গুণী মানুষের মৃত্যু যেন সে কথাই মনে করিয়ে দেয়। সেইসাথে কিছু ভালো কথা, কিছু ভালো গুণ, কিছু পরামর্শ স্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবে ফিরে আর আসবে না। নতুন প্রজন্ম অভাবে পড়বে প্রকৃত সংস্কৃতি চর্চার। অশুভ অপশক্তির পদচারণায় হারিয়ে যাবে সোনালী অতীত।

অর্ধশত বছরের সাংস্কৃতিক জগতের ব্যক্তিত্ব বীর মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠসৈনিক আলী যাকের পৃথিবীর মঞ্চ ছেড়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। আর দেখা যাবে না তার পদচারণা, শোনা যাবে না সেই দ্বরাজ গলায় “জাগো বাহে, কোনঠে সবায়”। করোনায় নিষ্ঠাবান সংস্কৃতি ও প্রগতিশীল প্রিয় মানুষগুলো যেন একে একে হারিয়ে যাচ্ছেন। মঞ্চ সংস্কৃতির কর্ণধার মানুষগুলো ছেড়ে যাচ্ছেন এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে। সম্প্রতি না ফেরার দেশে চলে গেছেন আরও একজন, “সংবাদ” পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী নির্ভীক সাংবাদিক খন্দকার মনিরুজ্জামান। এমনই গুণী মানুষগুলো একে একে হারিয়ে যাচ্ছেন আমাদের মাঝ থেকে। শুধু এই দুজনের কথাই শেষ নয়, আমরা হারিয়ে ফেলেছি এমনই অনেক গুণীজনকে। যারা লাল-সবুজের বাংলাদেশে নাট্য আন্দোলন থেকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন আর স্বাধীনতা যুদ্ধের সম্মুখ সারির যোদ্ধা ছিলেন। করোনা একদিন চলে যাবে কিন্তু ফিরবে না করোনাকালীন সময়ে মৃত এই মানুষগুলো, থেকে যাবে তাদের অমরকীর্তি।

বিজ্ঞাপন

স্মৃতিরপাতা থেকে জেগে ওঠে- গ্রাম বাংলার কৃষাণ-কৃষাণী আজও ঘরে সন্ধ্যাবাতি দেয়। তুলসীতলায় স্রষ্টার কাছে মঙ্গলকামনা করে শাখা বাজায় ।ভোর রাতে গ্রামের মসজিদে ভেসে আসে আযানের ধ্বনি “আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম” । আশ্বিন-কার্তিক মাসে তিন প্রহরের ভোররাতে সুদূর থেকে ভেসে আসা শিয়ালের ডাক । সকাল হলে গ্রামের বৃদ্ধ লোকগুলো শীতের চাদরে মিষ্টি রোদের আভায় হাতছানি দেয়।

বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ কালবৈশাখীর ঝড়ে ঝরে পড়া আম কুড়ানোর আনন্দ, আষাঢ়-শ্রাবণে ঘরে ঝিরঝির বৃষ্টির শব্দে রাতের মূষলধারা বৃষ্টির সাথে ঘুমিয়ে পড়া, গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য নৌকা বাইচ আর কচুরি দিয়ে চেপে রাখা পাটের সেই সোঁদা গন্ধযুক্ত পরিবেশে বৃষ্টিতে ভিজে মাছ ধরা, বন্ধুদের সাথে দৌঁড়ে গিয়ে বৃষ্টির মধ্যে ফুটবল খেলা আর সারা সন্ধ্যায় সর্দি-কাশিতে মায়ের স্নেহ মাখা বকুনি খাওয়া।

স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখা, বাড়ি ফিরে হারিকেনের আলোয় পড়তে বসা, পরীক্ষা শেষে বন্ধুদের সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলা, মঞ্চনাটক আর যাত্রাপালায় ভিড় জমানো, বিকেলের নীলিমায় ঘুড়ি ওড়ানো, কেটে যাওয়া ঘূর্ণি ফিরে পাওয়ার সেই ভালোলাগার অনুভূতি– দূর প্রবাসে বসে বাংঙালী সংস্কৃতির ভাবনাগুলো আজ সবই যেন ম্লান।

ভয় আর শঙ্কায় শুধুই ভাবি, আমাদের নতুন প্রজন্ম –প্রকৃতির ও সংস্কৃতির এসব থেকে বিচ্ছিন্ন। একান্নবর্তী পরিবার আর হৈ-হুল্লোড় যেন দালান কোঠার আড়ালে হারিয়ে গেছে, হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের প্রকৃত সংস্কৃতি, হারিয়ে যাচ্ছে নিষ্ঠাবান সংস্কৃতি ও প্রগতিশীল মানুষগুলো।

শঙ্কা -নতুন প্রজন্মকে নিয়ে, তারা যেন অশুভ আর অপসংস্কৃতির পদচারণায় হারিয়ে না যায়। মঞ্চ ও সংস্কৃতি ছেড়ে যাওয়া মানুষগুলির দরাজ কণ্ঠের সেই উদাত্ত আহ্বান “জাগো বাহে, কোনঠে সবায়”– আমাদের নতুন প্রজন্ম এ ডাকে সাড়া দেবে তো?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)