চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

জবর-আজব গুজবের দিন

Nagod
Bkash July

গুজবকেও আজকাল ল্যাবরেটারিতে পরীক্ষা করা যায়। বড় আজব ব্যাপার বটে! বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোথায়, কে, কবে, দেখেছে এমন কারবার! নগরপালের বক্তব্য সাক্ষী! ডেঙ্গু ‘একটা গুজব’ ছিল।

Reneta June

কিন্তু ‘গুজব’ মহামারি হয়ে গেলো। ঘরে-ঘরে হানা দিল। গুজবে আক্রান্ত মানুষের ভিড়ে উপচে উঠলো শহরের হাসপাতালগুলো। নিরাময়হীন গুজবের জ্বরে ভুগে মরে যাওয়া মানুষের স্বজনদের হাহাকারে সয়লাব হয়ে গেলো ফেসবুক। অবশেষে নিরুপায় কর্তৃপক্ষ গুজব-জ্বর পরীক্ষার খরচ বেঁধে দিল।

গুজবের শেষ নেই। এই তো ফেসবুকের ওয়ালে-ওয়ালে দেখছি, ভিআইপির আগমনের অপেক্ষায় থাকা ফেরিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আহত এক শিশু রবীন্দ্রনাথের ফটিকের মতই সকল অপেক্ষার ইতি ঘটিয়ে চিরতরে নিয়েছে ছুটি। বালাই ষাট! এমন হতেই পারে না। মানুষ জানে, ভিআইপির সময় অতিমূল্যবান। কিন্তু তা কিছুতেই নয় একজন আহতের জীবনের চেয়ে দামি। অতএব, তিতাসের মৃত্যু আলবৎ গুজব বৈ অন্য কিছু নয়।

নগরপালের বক্তব্য সত্য। মিডিয়াই গুজব রটায়। কে না জানে যে, শুধু পাক-সাফ কাপড়ে হজ হয় না। কে না জানে যে, হৃদয়ের শুদ্ধতা ছাড়া মেলে না পরম প্রভুর সান্নিধ্য। কিন্তু মিডিয়া কিনা সেই আলোকের অভিযাত্রীদের নিয়েও ছড়িয়েছে গুজব। মিডিয়া বলেছে, ডাক্তারের তালিকায় কারসাজি করে মালি-পিয়ন-আরদালি গোত্রের লোককে নাকি পাঠানো হয়েছে পবিত্র মক্কায়। আমি বিশ্বাস করি, অপবিত্র পন্থায় পবিত্র যাত্রা হতেই পারে না। আল্লাহ মাফ করুন, নিশ্চয়ই এ গুজব।

আরো একটা গুজবের খবর খুব ঘুরছে মানুষের মুখে-মুখে। প্রতিযোগীদের ছাড়াই তাদের সফরসঙ্গীরা নাকি চলে গেছে ট্রাম্পল্যান্ডে। এই নিয়ে একটি দৈনিক আবার রসিকতা করে লিখেছে বর ছাড়াই বরযাত্রার খবর। এও কি বিশ্বাসযোগ্য! এই সংবাদ মোটেও আমলে নিইনি। কারণ আমি বিশ্বাস করি, এটা গুজব। গুজবই। এমনটা বাস্তবে আমাদের মতন সহৃদয় নেতা-নেত্রী এবং সুনীতির দেশে হতেই পারে না।

কিন্তু ফেসবুকে গুজব রটিয়ে যারা রামুতে হামলা করে, যারা নাসিরনগরে বিগ্রহ ভেঙে করে খান-খান তারা কারা? তারাও কি গুজব? কোনটা সত্যিই গুজব? ফেসবুকে ‘ধর্ম অবমাননার গুজব’ গুজব? নাকি রামুতে পুড়ে অঙ্গার হওয়া সৌম্য বুদ্ধ মূর্তি আর নাসিরনগরে ভেঙে খান-খান হওয়া বিগ্রহের ঘটনা গুজব?

এই গুজবের দিনগুলোতে আমার আজকাল ক্র্যাক প্লাটুনের কথা মনে পড়ে। এদেশের মানচিত্র জয়ের লড়াইয়ে ক্র্যাক প্লাটুনের অসম সাহসী যোদ্ধা ছিলেন রুমি। রুমির মায়ের ডায়রিতে এবং আরো বই-পত্রে পড়েছি, শাসকেরা ‘বিচ্ছু’দেরকে ‘ভারতের চর’ বলে ডাকতো। তারা প্রচার করতো, সব ‘স্বাভাবিক’ চলছে। তারা প্রচার করতো, ‘বিচ্ছুরা’ ‘দুষ্কৃতিকারী’।

শাসকের মনোজগতে গণমানুষের ‘স্বাধীনতার স্বপ্ন’ ছিল একটা গুজব। ‘মুক্তি’দের ‘যুদ্ধ’টা ছিল একটা গুজব। একটা সময়ে গুজবের সংখ্যা এতোই বেশি হয়ে গেলো যে, ঘরে-ঘরে গুজব ঢুকে গেলো। ঘরে-ঘরে দুর্গ গড়ে উঠলো। হাঁটু ছাড়ানো কিশোরও বুকে বোমা বেঁধে সদর্পে হেঁটে গেলো শত্রুসেনার দিকে।

তখন গুজব আর সত্য একাকার হয়ে গেলো। লোকে গুজবের আড়ালে সত্য আর সত্যের আড়ালে গুজবকে প্রকাশ করতে থাকলো।

ডেঙ্গু জ্বর-মশাগুজব তো গুজবই। ছেলেধরা একটা গুজব। ডেঙ্গু একটা গুজব। কিন্তু গুজবের খবরে কেন রেণু মারা যায়? গুজবের জ্বরে আক্রান্ত মানুষের জন্য কেন ল্যাব-টেস্টের মূল্য নির্ধারণ করে দেয় কর্তৃপক্ষ? সত্য ও গুজব কি তবে ভর করেছে একে অন্যের কাঁধে? নাকি একের চেহারায় অন্যটি এসে জনপদে নিচ্ছে আশ্রয়?

যদি তাই হয়, তবে এ কঠিন সময়। এমন জবর-আজব গুজবের দিনে কামান দাগার ভান করে শেষ রক্ষা হয় না। ডিনাইয়াল বা অস্বীকার তত্ত্ব দিয়ে শেষ রক্ষা হয় না। গুজব মহামারি হয়ে যায়। হাসপাতাল উপচে ওঠে। হাহাকার ও হতাশায় ভরে উঠে ভয়ার্ত জনপদ। তাই, নেতাকে জনতার কাতারে দাঁড়াতে হয়। টের পেতে হয় জনতার বুকের ধুকপুকানি। মানুষের নাভিশ্বাস ও কান্না টের না পেলে সে কার নেতা? কেমন নেতা?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

BSH
Bellow Post-Green View