চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

জনযুদ্ধের সেই চেহারা এই বইয়ে প্রতিফলিত হয়েছে

আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন সাধারণ মুক্তিযোদ্ধার অসাধারণ স্মৃতিকথা এ-বইটি। যুদ্ধ শুরুর লগ্নে তিনি ছিলেন তৎকালীন ইপিআর-এর একজন বেতারকর্মী, তাঁর কর্মস্থল ছিল রাজশাহী। সেই অবস্থান থেকে, বলা যায় কোনো ঘোষণা বা নির্দেশের অপেক্ষা না করেই, স্রেফ দেশপ্রেমের প্রেরণায় ও অত্যাচার-নির্যাতন বিরোধী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। সিগন্যাল কোরের একজন সদস্য হয়েও তিনি অস্ত্র হাতে লড়াই করেন, অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনে অংশ নেন, তাতে যথার্থ বীরত্বের পরিচয় দেন। যদিও যুদ্ধের শেষ দিকে তিনি আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। বিজয়ের কয়েক দিন পর ভারত থেকে দেশে ফিরে আসেন তিনি।

আজকের অবস্থান থেকে যে যাই বলুন না কেন, ১৯৭১’এর মার্চে সেদিন একটি যুদ্ধে জড়িত হওয়ার সামরিক বা মানসিক প্রস্তুতি কোনোটাই আমাদের ছিল না। শোষণ-বৈষম্য বা অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ আর স্বাধীনতার জন্য লড়াই ঠিক এক ব্যাপার নয়। সেদিক থেকে বলা যেতেই পারে, যুদ্ধটা এক রকম আমাদের গায়ে এসে পড়েছিল। পাকবাহিনীর ব্যাপক গণহত্যা, ধর্ষণ-নৃশংসতা এবং পোড়ামাটি ধ্বংসনীতির মুখে অস্ত্র হাতে রুখে দাঁড়ানো ছাড়া বাঙালির কোনো উপায় ছিল না। কিংবা একমাত্র উপায় হয়তো ছিল শত্রুর কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ, এবং তার মাধ্যমেও শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকেই বরণ করে নেওয়া। অল্পকিছু লোকের কথা বাদ দিলে সেদিন দেশের সমস্ত মানুষই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। এভাবে যুদ্ধটা অচিরেই একটা সর্বাত্মক জনযুদ্ধের রূপ নেয়। জনযুদ্ধের সেই চেহারাটাই এই বইয়ে প্রতিফলিত হয়েছে। অন্যদিকে দেশপ্রেম, সাহসিকতা ও মহত্ত্বের ইতিহাসে পৃথিবীর কয়েকটি বড়যুদ্ধ বা বিপ্লবের সঙ্গেই কেবল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের তুলনা চলতে পারে। সেই সাহস ও মহত্তে¡রও কিছুটা পরিচয় পাঠক এ-স্মৃতি কথায় পাবেন।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক বা প্রকৃত ইতিহাস লেখার কথা আমরা প্রায়শ বলে থাকি। যদিও সে ইতিহাসের জন্য আমাদেরকে হয়তো আরও কিছুকাল অপেক্ষা করতে হবে। এ-মুহূর্তে যা করণীয় তা হলো যুদ্ধ সম্পৃক্ত সমস্ত তথ্য-দলিল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ। ১৯৭১ নিয়ে এ দেশের কয়েক কোটি মানুষের (সেদিন যারা অন্তত সাবালক ছিলেন) প্রত্যেকের রয়েছে প্রায় অভিন্ন কিন্তু আলাদা আলাদা স্মৃতি। সে স্মৃতিকথাগুলো লিপিবদ্ধ হলে কিংবা তার মৌখিক বিবরণ ধারণ করে যথাযথ সংরক্ষণ করা গেলে তাই হতে পারে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার পক্ষে সবচেয়ে মূল্যবান উপাদান। এক্ষেত্রে কিছুকাজ এরমধ্যে হয়েছে, আরও অনেক করবার বাকি। বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আমীরুজ্জামান বীরবিক্রমের এ-বইটি সে দায়িত্ববোধেরই প্রেরণায় লেখা বলে মনে হয়। রচনা হিসেবে এটি হয়তো খুব গোছানো বা সুলিখিত নয়। তবে সততা ও আন্তরিকতার স্পর্শ বইটির প্রতি পঙক্তিকে উজ্জ্বলতা দিয়েছে বললে আশা করি অতিশয়োক্তি হবে না। একজন সাধারণ দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে একাত্তরের মার্চ-পূর্ব ও পরবর্তী দিনগুলোকে তিনি যেভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন, একজন যোদ্ধা হিসেবে যে-অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে তাঁকে যেতে হয়েছে, প্রায় সেভাবেই তা তুলে ধরেছেন। পরিবর্তিত সময়ের ঔচিত্য-ভাবনা কিংবা রাজনৈতিক-তাত্ত্বিক বিবেচনা-বিশ্লেষণের আলোকে তাকে ঢেলে সাজাতে চাননি। এই বৈশিষ্ট্য আমার মতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা মহা-মহা সব গ্রন্থের সারিতে এই স্মৃতিকথাটিকে স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত করেছে। নিশ্চয় এটি একমাত্র নয়, তবে অন্যতম উদাহরণ।

সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত না হলেও, লেখকের শৈশব থেকে যৌবনের, ছাত্র ও কর্মজীবনের স্মৃতিচারণ বইটিকে এক আলাদামাত্রা ও অতিরিক্ত তাৎপর্য দিয়েছে। একার্থে বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের আত্মবিকাশের কাহিনী বলা যেতে পারে এ-অংশটিকে। শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্য থেকে মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে যারা একদিন মনে প্রাণে পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন করেছিল, আবার সে-স্বপ্ন বা মোহ ভাঙতেও যাদের সময় লাগেনি। সমস্যার সমাধান হিসেবে দেশভাগকে স্বাগত জানিয়ে বা তার বাস্তবতা মেনে নিয়েও, আশৈশব পরিচিত প্রতিবেশী, ছোটবেলার খেলার সাথী, সহপাঠী ও শিক্ষকদের দেশত্যাগ যাদেরকে বেদনার্ত করে। কিংবা গভীরভাবে ধর্মবিশ্বাসী হয়েও ও কঠোরভাবে ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান পালন করার পরও যাদের অসাম্প্রদায়িক হতে বাধে না। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত প্রেক্ষিত ও তার সবলতা-দুর্বলতার দিকগুলো বুঝতে এবং পরবর্তী গতিধারা অনুসরণ করতেও বইয়ের এ-অংশটি পাঠককে সহায়তা করবে।

Advertisement

যুদ্ধের বিভিন্নপর্বে যাঁরা ছিলেন তাঁর সহযোদ্ধা, দেশে-বিদেশে যেসব ব্যক্তি এমনকি সাধারণ বেসামরিক নাগরিক নানাভাবে তাঁদের সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের কথাই লেখক মনে রাখতে চেষ্টা করেছেন। সময়ের ব্যবধানে যাঁদের নাম-পরিচয় হয়তো স্মরণে আনতে পারেন নি, ঘটনার উল্লেখ করে তাঁদের প্রতিও তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। এমনকি যুদ্ধ শুরুর আগে যে-পাঞ্জাবি ক্যাপ্টেন সম্ভাব্য পাকিস্তানি আক্রমণ সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে তাঁদের নিরাপদ আশ্রয় নিতে বলেছিলেন, যে-অবাঙালি ড্রাইভার ও দুজন সৈনিক যুদ্ধ প্রচেষ্টায় তাঁদের সহায়তা করেছেন, তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি দিতেও তিনি কুণ্ঠিত হন নি। যে-কোনো যুদ্ধই মানুষের মধ্যে এক ধরনের অমানবিক বিভাজন ঘটায়। মানুষ আর তখন মানুষ থাকে না, হয় সে শত্রু নয় মিত্র। অন্য সব বিবেচনাকেও যা আচ্ছন্ন করে ফেলে। যুদ্ধোত্তর কালে ইতিহাস লিখতে বসে ঐতিহাসিক-পণ্ডিতরাও অনেক সময় যার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে, নির্মোহ দৃষ্টি নিয়ে ঘটনার বর্ণনা বা বিচার করতে পারেন না। অথচ, সবিস্ময়ে লক্ষ করি, একজন সক্রিয় যোদ্ধা হয়েও, এই গ্রন্থের লেখক তাঁর স্মৃতিচারণায় যথার্থ মুক্তদৃষ্টি ও সত্যনিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন। যুদ্ধের দিনগুলোতে একশ্রেণীর অবাঙালি বা বিহারিরা বাঙালিদের ওপর যে-গণহত্যা ও নির্যাতন চালিয়েছে তার কথা আমরা সবাই জানি, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা আমাদের বইপত্রে যার বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের সূচনায় ও পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধারাও যে কোথাও কোথাও বেসামরিক অবাঙালি নাগরিক — নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের নির্বিচারে হত্যা করেছে এই সত্যের উল্লেখ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বিশাল বিশাল গ্রন্থে ক্বচিৎ পাওয়া যায়। আমীরুজ্জামান তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে এ-ধরনের ঘটনারও উল্লেখ করে সে-সম্পর্কে তাঁর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

পরিশিষ্টে লেখকের কয়েকজনসহ যোদ্ধার সাক্ষাৎকার, পশ্চিমবঙ্গের একটি পত্রিকার সংবাদ প্রতিবেদন, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ও শহীদ রাইফেল্স বিশেষ করে সিগন্যাল কোরের সদস্যদের নামের তালিকা ইত্যাদি যুক্ত হয়ে নিঃসন্দেহে বইটির মূল্য বৃদ্ধি করেছে। মুক্তিযুদ্ধের ভবিষ্যৎ ইতিহাস রচয়িতাদের যা হয়তো কাজে লাগবে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একজন সৈনিকের স্মৃতিকথা
সৈয়দ আমীরুজ্জামান, বীরবিক্রম
প্রকাশক: পড়ুয়া, আজিজ সুপার মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা
প্রচ্ছদ: কামাল পাশা চৌধুরী
মূল্য: ৩০০ টাকা

সৌজন্যে: বইনিউজ