চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

জঙ্গি বিরোধী অভিযান ও সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্কট

ঝিনাইদহের মহেশপুরে আবারও জঙ্গি আস্তানার সন্ধান মিলেছে। আবারও পুলিশি অভিযান পরিচালিত হয়েছে এবং দুই জঙ্গি নিহত হয়েছে। মাত্র কয়েকদিন আগে ঝিনাইদহ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে দুটি জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পাওয়া যায়। পুলিশ কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঝিনাইদহের আস্তানাটি বিস্ফোরক তৈরির ল্যাবরেটরি হিসেবে ব্যবহার করত জঙ্গিরা। ওখানে প্রচুর বিস্ফোরক পাওয়া গেলেও কোনো জঙ্গি পাওয়া যায়নি। আর চাঁপাইনবাবগঞ্জের অভিযানে চার জঙ্গি নিহত হয়েছে।চাঁপাইনবাবগঞ্জের আস্তানাটিতে তারা বিস্ফোরক মজুদ করে চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করত। অর্থাৎ, ওই আস্তানাটিকে তারা ব্যবহার করত স্টোরহাউজ হিসেবে।

সরকার একের পর এক জঙ্গিবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে, জঙ্গিদের লাশ ফেলছে, গত কয়েক মাসে বড় কোনো জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেনি-এত সব কিছুর পরও সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে। তারপরও কেন জানি জঙ্গি-তৎপরতা ও পুলিশের অভিযান নিয়ে সন্দেহ, সংশয়, প্রশ্ন। অনেকে তো জঙ্গি-ইস্যুকে ‘নাটক’ বলে অভিহিত করে চলেছেন। এদিকে জঙ্গিরা কিন্তু গোপনে তাদের তৎপরতা ঠিকই চালিয়ে যাচ্ছে।

আমাদের দেশে জঙ্গি তৎপরতার বিবর্তনটা সবার চোখের সামনেই ঘটেছে। এক সময় যারা ছুরি-চাপাতি হাতে বিভিন্ন লেখক-মুক্তমনাদের কুপিয়েছে, বাঙালি সংস্কৃতি চর্চাকারী, সিনেমা হল, যাত্রা প্যান্ডেল, মাজার, ভিন্ন মতাদর্শ, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের টার্গেট করেছে, প্রগতিশীলদের সমাবেশে বোমা মেরেছে, কালের বিবর্তনে তারাই অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে গুলশান হলি আর্টিজানে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছে। সিলেটে তো তারা আরও ভয়ঙ্কর রূপে আবির্ভূত হয়েছে। বিপুল অস্ত্রশস্ত্র ও বিস্ফোরকে সমৃদ্ধ হয়ে জঙ্গিরা রাষ্ট্রের সবচেয়ে দক্ষ ও চৌকস বাহিনীর সঙ্গে প্রায় চারদিন লড়াই করেছে।

জঙ্গি প্রশ্নে এই যে বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট, এ জন্য সরকারের ভূমিকাও কম দায়ী নয়। জঙ্গি গ্রেপ্তার নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রায়ই নানা রকম ‘গল্প’ রচনা করে। দুই মাস আগে গ্রেপ্তার করে হঠাৎ একদিন ‘আটক’ দেখায়। আবার কাউকে কাউকে ঘুম পাড়ানি মাসিপিসির গল্পের মত ক্রসফায়ারের চিরন্তন গল্প শুনিয়ে মেরে ফেলা হয়। তাতে করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব কথা সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয় না। এটা সার্বিকভাবে  র‌্যাব-পুলিশের ভাবমূর্তির সমস্যা। কিছু কিছু খারাপ কাজ করে তারা এমনই নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে যে এখন ভালো কাজ করলেও মানুষের কাছে তা অসত্য বা গল্প মনে হয়। এতে সরকারের ভাবমূর্তিও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। আর এই সুযোগটা নিচ্ছে বিরোধী দল ও জঙ্গিসমর্থকরা।

তারা পুলিশের দুঃসাহসী জঙ্গিবিরোধী অভিযানগুলো নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। অনেকে এতে বিভ্রান্তও হচ্ছে। মৌলবাদ ও জঙ্গি প্রশ্নে সরকারের ভূমিকারও পুনর্মূল্যায়ন জরুরি। সরকার জঙ্গিদমনে কঠোর ভূমিকা পালন করছে। সব রকম প্রশ্ন-সমালোচনা-আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে কাউকে ‘জঙ্গি’ সন্দেহ হলেই তাকে গুলি করে মারতে দ্বিধা বোধ করছে না। কিন্তু জঙ্গিবাদী রাজনীতির অন্যতম সমর্থক হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে গভীর সখ্য বজায় রেখে চলছে। হেফাজতিদের কথায় সবার অগোচরে পাঠ্যপুস্তক পর্যন্ত পরিবর্তন করা হয়েছে। হেফাজতিরা যেন না চটে-এজন্য সম্ভাব্য সব কিছুই করা হচ্ছে। সরকারের এই ‘হেফাজত-তোষণ নীতি’র কারণে মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদ বিরোধী পরিচালিত অভিযান নিয়ে সরকারের সততা ও আন্তরিকতা নিয়ে তাই সন্দেহের অবকাশ থেকেই যাচ্ছে।

জঙ্গিবিরোধী সরকারি উদ্যোগের বিশ্বাসযোগ্যতা না থাকার পেছনে সরকারের কর্তা ব্যক্তিদের অবদানও কোনো অংশে কম নয়। তারা এমন সব কথা বলেন, এমন সব বিবৃতি দেন তাতে মানুষের সন্দেহ-সংশয় আরও বাড়ে। এ প্রসঙ্গে সিলেটের বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাটি উল্লেখ করা যেতে পারে। সিলেটে যে বোমা বিস্ফোরণে পুলিশের দুজন কর্মকর্তাসহ ছয়জন নিহত হয়েছেন, ‘সেটি আগে থেকে পেতে রাখা ছিল’ বলে বিবিসিকে জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষায়, ‘যখন শিববাড়ির ওই সন্দেহভাজন জঙ্গি আস্তানাটি নিরাপত্তা বাহিনী ঘেরাও করে ফেলে, তখনই বোধহয় কোনো একসময় এখানে আশেপাশে তারা বোমাটি রেখে গিয়েছিল বা আগেই রেখে গিয়েছিল। পুলিশরা যখন দেখেছে, তখনই এটা বিস্ফোরিত হয়েছে, ধাক্কা-ধোক্কা খেয়ে’।

‘পুলিশরা যখন দেখেছে, তখনই এটা বিস্ফোরিত হয়েছে, ধাক্কা-ধোক্কা খেয়ে’ এই যদি হয় একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি, তাহলে সাধারণ মানুষ সেই বিবৃতিকে বিশ্বাস করবে কোন যুক্তিতে? পুলিশ দেখার পরও ‘ধাক্কা-ধোক্কা খেয়ে’ বোমা ফাটে কীভাবে? ‘ধাক্কা-ধোক্কা খেয়ে’ বোমা ফেটে দুই জন পুলিশ, র‌্যাবের একজন সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা নিহত হন? তাহলে তাদের সতর্কতা কোথায় ছিল?

জঙ্গিবাদ যে বর্তমান সরকারের আমলে সৃষ্টি হয়নি, এটা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া একটা ভয়ঙ্কর আপদ-একথা আমরা জানি। জঙ্গিবাদের যে নমুনা আমরা এখন দেখছি, তার শুরুটা বেশ কয়েক বছর আগে। উদীচী, সিপিবি, ছায়ানটের সমাবেশে বোমাবাজি, সিনেমা হলে, গির্জায়, জুমার নামাজে, আদালতে হামলা অনেক বছর আগেই হয়েছে। ৬৩ জেলায় যখন একসঙ্গে বোমা ফাটানো হয়, তখন এটা রীতিমতো চাঞ্চল্যকর বিষয় ছিল। এটা কি কেবলই কতিপয় ধর্মীয় উন্মাদনায় আচ্ছন্ন মানুষের কাজ ছিল? পরে আমরা জেনেছি, এর পেছনে রাষ্ট্রের প্রশ্রয় ছিল।

বিজ্ঞাপন

বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট হিসেবে আমাদের দেশের বেসামরিক ও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিভিন্ন সময়ে দেশে বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকান্ডে যুক্ত ছিল বলে অভিযোগ আছে। সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সর্বোচ্চ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা এখন জেলে আটক আছেন। ১০ ট্রাক অস্ত্রসহ নানা মামলায় তারা অভিযুক্ত। ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগে’র সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনাটিও ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে অনেকের অনুমান।

যাহোক, আমাদের দেশে পুলিশকে স্বার্থ সিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই তারা অসত্য বলে, বিপথে চলে। কাউকে ফাঁসাতে, নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে পুলিশ অনেক ক্ষেত্রেই ভূমিকা পালন করে। সমস্যা হল, আমাদের সব সময় ‘পুলিশের মুখেই ঝাল’ খেতে হয়। ত ছাড়া, যে খবরে যত মুচমুচে ‘গল্প’ থাকে, তার দর তত বেশি। সেগুলোর জন্য ‘অফিশিয়াল ব্রিফিং’ বা অফিসারদের একাংশের ‘আনঅফিশিয়াল গল্পগাছা’-র বাইরে সাংবাদিকের নিজের তদন্ত করার সুযোগ ও সময় কতটুকু?

জঙ্গির খবর পুলিশ ইচ্ছাকৃত ভাবে ‘খাওয়াচ্ছে’ না অনিচ্ছাকৃত ভাবে ভুল করছে, তা যতক্ষণ না যাচাই করতে পারছি, ততক্ষণ খবর ফাইল করব না— এই অবস্থান সাংবাদিকের পক্ষে নেওয়া সম্ভব? উপরওয়ালার ভর্ৎসনা পর্যন্ত যাওয়ার দরকার নেই, অন্য চ্যানেল বা কাগজ বড় করে ছাপলে বা দেখালেই তো আত্মগ্লানিতে ভুগতে হয়, ইস, এ সব গল্প তো আমার কাছেও ছিল, পেয়েও ছেড়ে দিলাম!

আমাদের দেশে ইনভেস্টিগেটিভ জারনালিজম ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। সাংবাদিকরা কোনো গোপন রহস্যই ভেদ করতে পারে না, অজানা-অচেনা কোনো কিছুই বের করতে পারে না। ফলে পুলিশ যদি বলে, এ জঙ্গি, তবে তাই সই। আর যদি যদি বলে এর সঙ্গে জঙ্গিসংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি তবে তাই ঠিক।

পুলিশ অনেক ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য দিতে পারে না। সঠিক তথ্য দিতে পারাটা সহজও নয়। কিন্তু তারা যেটা করে নিজেদের কৃতিত্ব জাহির করতে অনেক সময়, সত্যাসত্য যাচাই না করেই একটা তথ্য দিয়ে দেয়। মিডিয়া সঙ্গে সঙ্গে তা লুফে নেয়। যেমন ঘটেছে আশকোনায় নিহত আত্মঘাতীর ক্ষেত্রে। পুলিশ বলেছে, নিহত ব্যক্তি জুয়েল রানা হতে পারে। ব্যস মিডিয়ায় তা ফলাও করে প্রকাশ করা হলো। পরদিন একজন জুয়েল রানা মিডিয়ায় হাজির হয়ে বলল, আমিই জুয়েল রানা। আমি মরি নাই! তাহলে আত্মঘাতীটা কে? তার পরিচয় কিন্তু এখনও পাওয়া যায়নি। হুট করে একটা নাম বলে না দিয়ে পুলিশ আরকটু সময় নিতে পারত।

জঙ্গিবাদের মত স্পর্শকাতর ও ভয়ঙ্কর ইস্যুতে সরকারের উচিত আরও সতর্ক ও ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা। জঙ্গিবাদ দমনে ধারাবাহিক উদ্যোগের পাশাপাশি এ মুহূর্তে সরকার ও পুলিশের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট কাটিয়ে উঠাও কিন্তু কম জরুরি নয়।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

শেয়ার করুন: