চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

জঙ্গি দমনে সরকারের ভূমিকা ও সমালোচনা

জঙ্গিবাদের বিপদ কিছুতেই কাটছে না। দেশের নানা প্রান্তে তাদের অস্তিত্ব টের পাওয়া যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জঙ্গিদের অস্তিত্ব যেখানেই পাচ্ছে, সেখানেই অভিযান পরিচালনা করছে, তাদের নির্মমভাবে গুলি করে মারছে। তারপরও জঙ্গিদের তৎপরতা থেমে নেই। নানা জায়গায় তারা বিস্ফোরকসহ ধরা পড়ছে। মারাও পড়ছে। সর্বশেষ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ১৯ ঘণ্টার অভিযানে ৪ জঙ্গিসহ পাঁচ নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

গেল বছর গুলশান হলি আর্টিজান বেকারীর হামলা ও শোলাকিয়ায় ঈদগাহে হামলার পরে সরকার ও পুলিশ নড়েচড়ে বসে। সারাদেশে জঙ্গিবিরোধী অভিযান জোরদার করা হয়। উন্মোচন হয় একের পর এক জঙ্গি আস্তানা। নিহত হয় তালিকাভুক্ত শীর্ষ জঙ্গিরা। রাজধানীর কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান পরিচালনার মধ্যদিয়ে আইন-শঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জঙ্গি নির্মূলকরণের যে যাত্রা শুরু হয়, তা অব্যাহত আছে। নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায়, মিরপুরের রুপনগরে, পুরান ঢাকার আজিমপুরে, গাজীপুরের পাতারটেক ও টাঙ্গাইল, রাজধানীর দক্ষিণখান থানার পূর্ব আশকোনা, সর্বশেষ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জঙ্গিবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়েছে। প্রতিটি অভিযানেই অস্ত্র-গোলাবারুদের ব্যবহার ও জঙ্গি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। জনমনে জঙ্গি ভীতি ও আক্রান্ত হওয়ার ভয় তারপরও কাটছে না।

বিজ্ঞাপন

সরকার একের পর এক জঙ্গিবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে, জঙ্গিদের লাশ ফেলছে, গত কয়েক মাসে বড় কোনো জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেনি-এত সব কিছুর পরও সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে। সরকারের প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তি বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে: সরকার জঙ্গি নিয়ে নাটক করছে। যাদের ধরা হচ্ছে তারা প্রকৃত জঙ্গি নয়। দেশের মৌলবাদী গোষ্ঠীর একটা বড় অংশ এই মত বিশ্বাস করে। এতে জঙ্গিরা আরও বেশি আস্কারা পাচ্ছে।

সোয়াট অভিযানের আগে সীতাকুণ্ডের একটি জঙ্গি আস্তানা ঘিরে রেখেছে পুলিশ

এ জন্য সরকারের ভূমিকাও কম দায়ী নয়। জঙ্গি গ্রেপ্তার নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রায়ই নানা রকম গল্প রচনা করে। দুই মাস আগে গ্রেপ্তার করে হঠাৎ একদিন ‘আটক’দেখায়। আবার কাউকে কাউকে ঘুম পাড়ানি মাসিপিসির গল্পের মত ক্রসফায়ারের চিরন্তন গল্প শুনিয়ে মেরে ফেলা হয়। তাতে করে আইনশৃঙ্খল রক্ষাকারী বাহিনীর সব কথা সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয় না। এটা সার্বিকভাবে র‌্যাব-পুলিশের ভাবমূর্তির সমস্যা। কিছু কিছু খারাপ কাজ করে তারা এমনই নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে যে এখন ভালো কাজ করলেও মানুষের কাছে তা অসত্য বা গল্প মনে হয়। এতে সরকারের ভাবমূর্তিও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। আর এই সুযোগটা নিচ্ছে বিরোধী দল ও জঙ্গিসমর্থকরা।

তারা পুলিশের দুঃসাহসী জঙ্গিবিরোধী অভিযানগুলো নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। অনেকে এতে বিভ্রান্তও হচ্ছে। মৌলবাদ ও জঙ্গি প্রশ্নে সরকারের ভূমিকারও পুনর্মূল্যায়ন জরুরি। সরকার জঙ্গিদমনে কঠোর ভূমিকা পালন করছে। সব রকম প্রশ্ন-সমালোচনা-আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে কাউকে ‘জঙ্গি’ সন্দেহ হলেই তাকে গুলি করে মারতে দ্বিধা বোধ করছে না। কিন্তু জঙ্গিবাদী রাজনীতির প্রধান সমর্থক হেফাজতে ইসলামের কথায় সবার অগোচরে পাঠ্যপুস্তক ঠিকই পরিবর্তন করেছে। হেফাজতিরা যেন না চটে-এজন্য সম্ভাব্য সব কিছুই করা হচ্ছে। সরকারের এই ‘হেফাজত-তোষণ নীতি’র কারণে মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদ বিরোধী পরিচালিত অভিযান নিয়ে সরকারের সততা ও আন্তরিকতা নিয়ে তাই সন্দেহের অবকাশ থেকেই যাচ্ছে।

জঙ্গিবাদ দমনের প্রশ্নে সরকারের ভূমিকা আরও স্বচ্ছ হওয়া দরকার। জঙ্গিবাদ দমনের নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন আইনবহির্ভূতভাবে কিছু না করে, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। যাদেরকে জঙ্গি হিসেবে ধরা হচ্ছে, কিংবা মেরে ফেলা হচ্ছে, তাদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ হাজির করা দরকার। জঙ্গিবাদকে সমূলে নির্মূল করতে হলে আরও অনেক বেশি সতর্ক ও সচেতন হতে হবে। কাউকে জঙ্গি হিসেবে অভিহিত করে তাকে গুলি করে মারলেই হবে না। প্রতিটি জঙ্গির ব্যাপারে সঠিক তদন্ত করে তথ্য জানা চাই। সরকারের উচিত এ বিষয়ে গ্রহণযোগ্য যুক্তি উপস্থাপন করা। তা না হলে জঙ্গিদের প্রতি উল্টো সহানুভূতি সৃষ্টি হতে পারে।

জঙ্গিবাদ বর্তমান বিশ্বের এক রাজনৈতিক বাস্তবতা। সমাজের বিভিন্ন স্তরে উগ্র মৌলবাদ বাসা বেধেছে। জগতের অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি জঙ্গিবাদ নিয়ে ব্যাপক বিশ্লেষণ গুরুত্ব পাচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে জঙ্গিবাদের এই বিপুল উত্থান কিসের কারণে? সে কি দারিদ্র্যের কষাঘাত, ধর্মীয় উন্মাদনার যুক্তিহীন উন্মেষ, রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের কুটিল অভিপ্রায়, নাকি সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবরুদ্ধ বিদ্রোহে?

অনেকে আধুনিক জঙ্গিবাদের মূল কারণকে রিলিজিয়াস ফ্যানাটিজম বা ধর্মীয় উন্মাদনার বিস্তার বলে বিশ্বাস করেন। ধর্মীয় উগ্রতা জঙ্গিবাদের পরিবেশ সৃষ্টিতে অনুকূল ভূমিকা তৈরি করতে অবশ্যই সহায়ক হয়। কিন্তু সেটাই কি মূল কারণ? পৃথিবীর নানা ধর্মমতে এমন অজস্র অনুসারী রয়েছেন, যাঁরা নিজেরা ধর্মান্ধ হয়েও কোনো ধরনের সহিংস নীতির প্রতি মোটেই বিশ্বস্ত নন। জঙ্গিবাদকে নিজেদের বিশ্বাস প্রচারের অস্ত্র হিসেবে তাঁরা ব্যবহার করতে পছন্দ করেন না। তাহলে জঙ্গিবাদ সৃষ্টির পেছনে কোন অন্তর্নিহিত কারণগুলো বিরাজমান?

বিজ্ঞাপন

গুলশান হামলায় অংশ নেয়া জঙ্গিদের চার জনের অস্ত্রহাতে হাস্যজ্জ্বল ছবি, কমান্ডো অভিযানে এরা নিহত হয়

এর নিগূঢ় উত্তর হলো, জঙ্গি মানসিকতা নিশ্চিতভাবেই সমাজের কিছুসংখ্যক মানুষের এমন এক সাইকোলজিক্যাল বৈশিষ্ট্য বা মনস্তস্ত্ব, যখন সেই মনস্তত্ত্ব দেশীয় শক্তি অথবা আন্তর্জাতিক মহলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক কিংবা ধর্মীয় আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়।

জঙ্গিবাদ মানবসমাজকে ঠেলে দিতে চাইছে এমন একটি অন্ধকার সময় ও স্থানের দিকে, যেখানে গণতান্ত্রিক সমাজের ধারণাগুলো বিলুপ্ত। যেখানে বিশ্বজনীন আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। সেটা তারা করতে চাইছে সমাজ কাঠামোতে ভাঙন ধরিয়ে চতুর কৌশলে মানবসমাজে বিভাজন সৃষ্টির মাধ্যমে। সভ্য মানুষের বিশ্বাস, সংস্কার কিংবা আচার আচরণের মূলে কুঠারাঘাত দিয়ে ভয়াল বিপর্যয় ঘটিয়ে নিত্য নতুন নির্মম সন্ত্রাস, অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ড ও অরাজক পরিস্থিতিতে অসহনীয় পারিপার্শ্বিকতা তৈরি করে। যাতে নাগরিক মানুষের মনে সন্দেহ, সংশয়, আতঙ্ক ও ত্রাস সৃষ্টি হয় এবং সুশীল সমাজে স্বাধীনতা ও সাধারণ মানুষের বাঞ্ছিত জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হতে হতে সামাজিক পরিবেশ জুড়ে নেমে আসে মৃত্যুশীতল বিপর্যয়। কেননা সমাজবদ্ধ মানুষের সুস্থ চেতনাই মানব সভ্যতাকে এগিয়ে দেয় সুস্থতর ভবিষ্যৎ নির্মাণের দিকে। মানুষকে করে তোলে মানবিক গুণাবলির আদর্শের ধারক। মানুষকে করে তোলে অমলিন মনুষ্যত্ব বিকাশের অনির্বাণ বাহক।

সীতাকুণ্ডের জঙ্গি আস্তানায় সোয়াট বাহিনীর অভিযানের প্রস্তুতি

জঙ্গি প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তি অর্জন, তাদের পরিপুষ্টি লাভের পেছনে সর্বদাই যে বিদেশী শক্তির সমর্থন থাকে, তা নয়। এখন স্রেফ অন্ধ ধর্মবিশ্বাস আর জিহাদের ভুল তত্ত্বে আকৃষ্ট হয়ে অনেকে জঙ্গি তৎপরতায় শামিল হচ্ছে। জঙ্গিরা কতটা হিংস্র হতে পারে তার প্রমাণ আমরা দেখেছি-হলি আর্টিজান হামলার ঘটনায়। নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা বিধান, যা কিনা রাষ্ট্রীয় সরকারের মূল কর্তব্য, তা এই সন্ত্রাসীদের কারণেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বারবার। কারণ জঙ্গিবাদ উদ্দেশ্য সাধনের এমনই এক হীন কৌশল, যা হিংসা বা জিঘাংসা ছাড়া অন্য পথের অনুসন্ধান জানে না।

প্রযুক্তিবিজ্ঞানের অসামান্য অবিষ্কার ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য আশীর্বাদ বয়ে আনছে সত্যি, কিন্তু তার সঙ্গে ছায়াসঙ্গী হয়ে একই গতিতে এগিয়ে চলেছে অভিশপ্ত অন্ধকারও। কারণ, জগতের সর্বত্রই সন্ত্রাসী দলগুলো যেমন দ্রুতবেগে শিখে নিচ্ছে কীভাবে ওয়েব ও সোশ্যাল মিডিয়াকে ম্যানিউপুলেট করে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করে নিতে হয়। তেমনি জঙ্গিরা এর মাধ্যমে তরুণ সমাজের সঙ্গে সংযোগ সাধন করে উচ্চশিক্ষিত আধুনিক প্রজন্মকেও প্রতিদিন টেনে আনছে সন্ত্রাসবাদীদের ঘরানায়। উচ্চশিক্ষিত তরুণ সমাজ, যারা নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে অনায়াসে পরিচিত এবং সিদ্ধহস্ত তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন ব্যবহারে, তারাও সন্ত্রাসবাদের নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে তারা জর্জরিত নয়, তাদের কখনো সামাজিক বৈষম্যেরও শিকার হতে হয়নি।

আইএসের পক্ষ থেকে এক ভিডিও বার্তায় বাংলাদেশে আরও হামলা চালানোর হুমকি দেওয়া হয়। ওই ভিডিওতে অংশ নেয়া তিনজনই ছিলেন বাংলাদেশি নাগরিক যারা সিরিয়ায় পালিয়ে গিয়েছেন।

বর্তমান জগতের জঙ্গিবাদ এমনই কিছু মানবসৃষ্ট মানসিক মহামারি, যা ক্রমশই চাতুর্যের সঙ্গে পৃথিবীর প্রত্যেক প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে ভয়াবহ দাবাগ্নির মতো। পৃথিবীর পরিবর্তিত জলবায়ু যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিপুল ভয়াবহতাকে ঘনিয়ে তুলছে ভবিষ্যৎ জগতের জন্য। ড্রাগের নেশার মতো জঙ্গিবাদের হিংস্র উদ্দীপনাও অজস্র তরুণের মনে নিষ্ঠুর মাদকতার পরশ লাগাচ্ছে। ফলে জঙ্গি সংগঠনের আদর্শের প্রতি তারা আশ্বস্ত হচ্ছে। হিংস্রতার নির্মম আনন্দের প্রতি আসক্ত হচ্ছে ভয়ালভাবে।

উদ্বেগের কারণটা এখানেই আরও বেশি। কারণ, মানব সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে হলে মনের সুকুমারবৃত্তির পরিচর্যা দরকার। হিংসা দিয়ে যে জীবন তৈরি হয়, তাতে আর যা-ই হোক কাঙ্ক্ষিত মানবসভ্যতাকে লালন করা সম্ভব নয়। এখন তাই প্রয়োজন যেকোনো জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সচেতন প্রয়াস। প্রয়োজন, এর ভয়ংকর পরিণাম সম্পর্কে সর্বস্তরের সামাজিক জাগরণ। সেখানে সরকারের ভূমিকা সব রকম বিতর্ক ও সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

Bellow Post-Green View