চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

জঙ্গি আস্তানায় নিহত নারী: ‘বাবা আমাকে মাফ করে দিও, আর কোন দিন দেখা হবে না’

শাহ আলম শাহী: মৌলভীবাজারের নাসিরপুরে জঙ্গি আস্তানায় আত্মঘাতি বোমা বিস্ফোরণে নিহত ৭ জন দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের একই পরিবারের সদস্য।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি দেখে তাদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে পরিবার। এরা হলেন, কলাবাড়ী গ্রামের আবু বকর সিদ্দিক’র জামাতা লোকমান আলী , মেয়ে মোছা. শিরিনা আক্তার, নাতনি আমেনা খাতুন (১৬), সুমাইয়া (১২), মরিয়ম (১০), ফাতেমা (৭) ও খাতিজা (৭ মাস)।

লোকমানের শ্বশুরের পরিবার তার মেয়ে ও ৫ নাতনির লাশ নিতে চাইলেও জামাতা লোকমানের লাশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এ নিয়ে এলাকায় বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

মৌলভীবাজারের নাসিরপুরে একটি জঙ্গি আস্তানায় আত্মঘাতি বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয় চার শিশুসহ ৭ জন। নিহতদের ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর ঘোড়াঘাট উপজেলার কলাবাড়ী গ্রামের আবু বকর সিদ্দিক নিশ্চিত করেন নিহতরা তার জামাতা, মেয়ে ও ৫ নাতনি।

আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, প্রায় ৩ বছর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর গত ২৯ মার্চ রাত ১টা দিকে তার মেয়ে শিরিনা আকতার ফোন করে বলে, ‘বাবা আমাকে মাফ করে দিও, আর কোন দিন দেখা হবে না।’ এ সময় তারা কোথায় আছে, মেয়ের কাছে জানতে চাইলে মেয়ে কাঁপা গলায় জানায় এখানে কারো আসার উপায় নেই।

সে সময় পাশেই জামাতা লোকমান আছে বুঝতে পেরে তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে লোকমান কথা বলেনি বলে জানান আবু বক্কর সিদ্দিক।

সরেজমিনে রোববার দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, মেয়ে ও ৫ নাতনি হারানোর শোকে বিহ্বল পরিবার। বিলাপ করছে শিরিনা আক্তারের বাবার বাড়ির লোকজন। তারা ভয়াবহ পরিণতির জন্য লোকমানের উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডকেই দায়ী করেছেন। তাদের অভিযোগ, তার মেয়ে ও নাতনিদের জোর করে আটকে রেখেছিল লোকমান।

শিরিনা আক্তারের মা জোবেদা বেগম বলেন, ‘আমার মেয়ে ও ৫ নাতনির লাশ ফেরত দাও। দেশেদ্রোহী জামাতা লোকমান আলীর লাশ আমরা চাই না।’

পরিবার ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজারের নাসিরপুরে জঙ্গি আস্তানায় আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে নিহত লোকমান আলী জামায়াত শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে একসময় সম্পৃক্ত ছিলেন। বেশ কয়েক বছর আগে সে জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। কয়েকবার পুলিশ তার খোঁজে বাড়িতে আসলে সে উধাও হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরেই সে এলাকা থেকে নিখোঁজ ছিল।

Advertisement

জঙ্গি লোকমান আলী ঘোড়াঘাট উপজেলার ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে। লোকমানের বাড়ি যেয়ে সাংবাদিকরা জঙ্গি আস্তানায় নিহতদের ছবি দেখালে লোকমানের বোন নুর বানু ও প্রতিবেশীরা নিশ্চিত করেন নিহতরা লোকমান ও তার স্ত্রী-সন্তান।

লোকমানের ছোট বোন নুর বানু জানান, ৩ ভাইয়ের মধ্যে লোকমান সবার ছোট। সে স্থানীয় কৃষ্ণরায়পুর মাদ্রসায় দাখিল পর্যন্ত পড়ালেখা শেষ করে কৃষি কাজ করত। ২০০২ সালে বিয়ের পর ৭/৮ বছর ভালোই ছিল। এরপর প্রায় ৮ বছর থেকে তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই।

প্রতিবেশী আফজাল বলেন, লোকমান ছাত্র শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। কয়েকবার পুলিশ তার খোঁজে বাড়িতে আসলে সে উধাও হয়ে যায়।

স্থানীয় গ্রাম্য পুলিশ তারা মিয়া জানান, জঙ্গি সম্পৃক্ততার সঙ্গে জড়িত থাকায় বেশ কয়েকবার লোকমানকে গ্রেফতারের জন্য অভিযানও চালানো হয়।

এদিকে ঘোড়াঘাট থানার ওসি ইসরাইল হোসেন বলেন, লোকমানের নামে ঘোড়াঘাট থানায় কোন মামলা নেই। তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থানায় তার বিরুদ্ধে একটি সন্ত্রাস বিরোধী মামলা হয় ২০০৮ সালের ২৫ অক্টোবর।

নাসিরনগরে এক প্রবাসীর বাড়িতে নব্য জেএমবির সদস্যরা আস্তানা গেঁড়েছে খবর পেয়ে পুলিশ গত ২৯ মার্চ ভোরে এলাকাটি ঘিরে ফেলে।

পরদিন সোয়াট ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিট সেখানে অভিযান চালায়। অভিযান শেষে পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, পালানোর পথ না পেয়ে আত্মঘাতি হন ওই বাড়ির বাসিন্দারা।

নিহত ৭ জনের লাশ বর্তমানে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে রয়েছে। লাশের পরিচয় নিশ্চিত হতে ডিএনএ নমুনা রেখেছেন চিকিৎসকরা।