চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ছয় দফার আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ড্রেস রিহার্সাল

শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন, লক্ষ্য পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম। ১৯৩৭ সালে পরাধীন ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ কে ফজলুল হক ছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। নিখিল ভারত মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে তাকে দিয়েই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তান প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। শেরে বাংলা খেতাবটি ওই সম্মেলনেই তাকে দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, ওই সময়ে ভারতের অন্য কোনো রাজ্যে মুসলিম মুখ্যমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না।

লাহোর প্রস্তাবে বাংলা ও আসামকে নিয়ে একটি ব্লক এবং সিন্ধু, বেলুচিস্তান, পাঞ্জাব ও সীমান্ত প্রদেশ নিয়ে আরেকটি ব্লক ধরা হয়। ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর দুটি অংশ হবে সার্বভৌম এবং একের থেকে অপরটি স্বাধীন। এ দুটি অঞ্চলের মধ্যে বাংলা ও আসামে মুসলিম জনসংখ্যা পাঞ্জাব-সিন্ধু অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি। লাহোর প্রস্তাব উপস্থাপনের ২০ বছর পর ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে সেই লাহোর নগরীতেই তৎকালীন পূর্ব বাংলার আরেক নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির রাষ্ট্রীয় অধিকারের যে ছয় দফা প্রস্তাব উপস্থপন করেন, সেটাকে আমরা গঠনমূলক ফেডারেশন বলতে পারি।

বিজ্ঞাপন

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সুচতুর, ধুরন্ধর রাজনৈতিক নেতা সন্দেহ নেই। উপমহাদেশের মুসলিমদের জন্য পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন যখন নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন তিনি সুচতুর চাল দেন। ১৯৪৬ সালের এপ্রিল মাসে দিল্লিতে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের আইন সভায় মুসলিম লীগ থেকে যে সব সদস্য নির্বাচিত হন, তাদের সম্মেলন ডাকেন। সে সময়ে গোটা ভারতবর্ষে চারটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশের মধ্যে একমাত্র বাংলায় মুসলিম লীগ দলের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি। মুসলিম লীগ প্রধান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এই সোহরাওয়ার্দি সাহবকে দিয়েই ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের সংশোধনী উপস্থাপন করতে চাইলেন। কারণ লাহোর প্রস্তাবে দুটি সার্বভৌম মুসলিম অঞ্চল গঠনের পরিকল্পনা ছিল। সেটা বাদ দিয়ে যদি করাচি-লাহোরকে কেন্দ্র করে একটি সার্বভৌম মুসলিম রাষ্ট্র গঠিত হয়, তাহলে প্রধান বঞ্চনা নেমে আসবে বাংলায়। অতএব, বাংলার কোনো লোককে দিয়ে যদি লাহোর প্রস্তাব সংশোধনের দাবি উপস্থাপন করা যায়, সেটা হবে উত্তম।

খ্যাতিমান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. জিল্লুর রহমান খান তার ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মোহনী নেতৃত্ব ও স্বাধীনতা সংগ্রাম’ গ্রন্থে লিখেছেন, মোহাম্মদ আলী ‘জিন্নাহ নিজেও সোহরাওয়ার্দিকে যথেষ্ট গুরুত্ব প্রদান করেন এবং তাঁকে দিল্লি রেলওয়ে স্টেশনে নিজে উপস্থিত থেকে অভ্যর্থনা জানান, দিল্লি কনভেনশনের মূল প্রস্তাব উপস্থাপনের সম্মান প্রদান করেন। [পৃষ্ঠা ৪৪-৪৫]

বঙ্গবন্ধু ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে লিখেছেন, ৭-৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত দিল্লি কনভেনশনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির নেতৃত্বে বাংলার প্রতিনিধিদল ‘দিল্লি যখন পৌঁছলাম… আট ঘণ্টা দেরি হয়েছে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কনভেনশন বন্ধ করে রেখেছেন আমাদের জন্য। সকাল ন’টায় শুরু হবার কথা ছিল, আমাদের ট্রেন থেকে সোজা সভাস্থলে নিয়ে যাওয়া হল। … আমরা বাংলায় স্লোগান দিতে দিতে সভায় উপস্থিত হলাম। [পৃষ্ঠা ৫১]

দিল্লি সম্মেলনে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের সংশোধন করলেন। সোহরাওয়ার্দি সাহেবকে দিয়ে বলিয়ে নিলেন লাহোর প্রস্তাবে ‘স্টেটস’ লেখা ছিল টাইপং মিসটেকে, আসলে হবে ‘স্টেট’।

বাংলার দুই রাজনৈতিক নেতার জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বাঙালির যে সর্বনাশ করেছিলেন, সেটাই সংশোধন করেন আরেক বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি লাহোর প্রস্তাব পাসের ২৬ বছর এবং তা অন্যায়ভাবে ছল-চাতুরি করে সংশোধনের ২০ বছর পর ১৯৬৬ সালে সেই লাহোর নগরীকেই বেছে নিলেন ছয় দফা উত্থাপনের জন্য। কেউ কেউ বলেন, এক বাঙালি ১৯৪০ সালে লাহোরে পাকিস্তান গড়ার প্রস্তাব উত্থাপন করেন, আরেক বাঙালি সেই লাহোরেই পাকিস্তান ভাঙার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ছয় দফা উত্থাপনের পরপরই তিনি ঢাকায় ফিরে তরুণ সহকর্মীদের বলেছিলেন, ছয় দফা মানা না হলে এক দফা। স্বাধীনতার সাঁকো দিলাম, পার হয়ে যেতে হবে।

বাঙালি মাত্র পাঁচ বছর পরেই সেই সাঁকো পার হয়ে যায়। ১৯৭১ সালে ত্রিশ লাখ নারী-পুরুষ-শিশুর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা।

১৯৬৫ সালে পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ বাঁধিয়েছিল কাশ্মীর দখলের স্লোগান নিয়ে। সে যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান ছিল অরক্ষিত। পশ্চিম পাকিস্তানের অনেক নেতা বলতেন, পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তার ভার পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে। পাকিস্তানি পাঠান-পাঞ্জাবিরা সামরিক কৌশলে এতই দক্ষ যে ভারত তাদের সাথে যুদ্ধে কখনও পারবে না। আর এই ভয়ে ভারত পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণ করবে না। পাকিস্তানি সামরিক নেতাদের কেমন ধারণা ছিল এ বিষয়ে সেটা আমাকে একবার মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সচিব ড. আকবর আলী খান বলেছিলেন। তাঁর সিএসপি ট্রেনিং ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। সেখানে তিনি কয়েকটি সামরিক বিমান ঘাঁটি দেখেন। তাঁর প্রশ্ন জাগে পশ্চিম পাকিস্তানে এত বিমান ঘাঁটি, পূর্ব পাকিস্তানে কেন নেই? তাকে বলা হয়, ভারত যদি পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণ করে তাহলে পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন বিমান ঘাঁটি থেকে ঝঁঅকে ঝাঁকে যুদ্ধ বিমান উড়ে ভারতের বিভিন্ন শহরে বোমা ফেলতে ফেলতে কলিকাতা-গৌহাটি পর্যন্ত যাবে এবং বোমা ফেলতে ফেলতে করাচি-লাহোর ফিরে আসবে নিরাপদে। এই ভয়েই ভারত কখনও পূর্ব পাকিস্তানে হামলার কথা ভাববে না।

কী মুর্খের ভাবনা!

আমাদের এ ভূখণ্ডের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ধারণা বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই সামনে আনেন। বয়স যখন মাত্র ২৯ বছর। আওয়ামী মুসলিম লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক ১৯৪৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আরমানিটোলা ময়দানে ছাত্রলীগ আয়োজিত জনসভায় বলেছিলেন, ‘পাঞ্জাবি সৈন্যরা পূর্ব বাংলার ভৌগলিক অবস্থার সঙ্গে পরিচিত নয়। আমাদের দেশের নিরাপত্তা আমাদেরই নিশ্চিত করতে হবে।’ [সূত্র : সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টালিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দি ন্যাশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রথম খণ্ড পৃষ্ঠা ২৭৫]

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি যে সংগঠনের জন্ম দেন, সেই ছাত্রলীগ থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নেওয়া উপলক্ষে আয়োজন হয়েছিল সম্মেলনের। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্মেলন ও জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান প্রাপ্ত বয়স্ক সকল ব্যক্তিকে সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদান এং প্রয়োজন পড়লে দেশ রক্ষার জন্য তাদের অস্ত্র সরবরাহের দাবি জানান। [পৃষ্ঠা ২৭০]

মাত্র ২৯ বছর বয়সে কী দূরদৃষ্টিই না ছিল বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের।

১৯৬৬ সালে লাহোরে ছয় দফা উত্থাপন করেছিলেন। সেটা ছিল শত্র“র ডেরা। কে এটা করেছিলেন? সেখানে তাকে গ্রেফতার করা হতে পারত? কিন্তু একটি যুগান্তকারী কর্মসূচি ঘোষণার জন্য উপযুক্ত স্থান ও সময় নির্বাচনে ভুল করেননি। ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে আইয়ুব খান কাশ্মীর জয় করতে পারেননি। পাকিস্তানের লোকেরা জেনে যায়, যুদ্ধে পাকিস্তানের বিস্তর ক্ষতি হয়েছে। সামরিক শক্তি ভেঙে গেছে। অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে। এ কারণে ভারতের সঙ্গে তাসখন্দ চুক্তি করতে হয়। কিন্তু এ চুক্তিতেও তো কাশ্মীর পাওয়া গেল না। সঙ্গত কারণে পাকিস্তানিদের মধ্যে বিস্তর ক্ষোভ। সরকার বিরোধী কয়েকটি দল এ সুযোগে ফিল্ড মার্শাল আইযুব খানকে হটাতে ১৯৬৬ সালের ফেব্র“য়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে লাহোরে বিরোধী দলগুলোর নেতা-কর্মীদের কনভেনশন আহ্বান করে। অন্তত ৬০০ লোকের সমাবেশ। পূর্ব পাকিস্তান থেকে মুসলিম লীগের দুটি গোষ্ঠী, নেজামে ইসলামী, সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানসহ ২০-৩০ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

আওয়ামী লীগও আমন্ত্রিত হয়। সম্মেলনের কয়েকদিন আগে ২৮ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানকে দুটি পৃথক মামলায় এক বছর করে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। কিন্তু ওই দিনই তিনি জামিন পেয়ে যান। তিনি সিদ্ধান্ত নেন ৬ ফেব্রুয়ারির লাহোর সর্বদলীয় সম্মেলনে যাবেন। তাজউদ্দীন আহমদসহ কয়েকজন নেতাকে নিয়ে তিনি ৪ ফেব্রুয়ারি লাহোর পৌঁছান। পরদিন সাবজেক্ট কমিটির বৈঠকে আলোচ্যসূচিতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেন। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় সব নেতা এবং পূর্ব পাকিস্তান থেকে যোগদানদারী কয়েকজন নেতা লাহোরে পাস্তিানের দক্ষিণপন্থী ও সাম্প্রদায়িক নেতাদের কনভেনশন ডেকেছিলেন কেবল দুটি দাবি সামনে রেখে। সার্বজনীন ভোটাধিকার ও পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান বললেন, পূর্ব পাকিস্তান প্রায় দুই দশক ধরে বঞ্চিত হচ্ছে। শোষিত হচ্ছে। সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হচ্ছে। শিল্প-বাণিজ্য-শিক্ষা, সব কিছুতে বাঙালিরা পিছিয়ে পড়েছে। এর অবসান ঘটানোর সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি চাই। কনভেনশনে সেটা নিয়ে আলোচনা করতে হবে।

কিন্তু আয়োজক বেশিরভাগ নেতা এ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় রাজী নয়। শেখ মুজিবুর রহমান কনভেনশন বর্জন করেন। পরের কয়েকটি দিন পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যস্ত সময় কাটান। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যে সব বাঙালি রয়েছে, তাদের সঙ্গে কথা বলেন। পাকিস্তানের ক্ষমতাসীনরা বুঝে যায়, এক নতুন যুগের সূচনা হয়ে গেছে।

শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় ফিরে ১৩ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করেন। ২১ ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে ছাত্রলীগ ১৪ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষা প্রচলন সপ্তাহ পালন করে। ১৩ মার্চ আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটি ও ১৮-১৯ মার্চ দলের কাউন্সিল অধিবেশনে ছয়-দফা অনুমোদন পায়। কিন্তু দলের সভাপতি মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশসহ একদল প্রবীণ নেতা ছয় দফার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। ১৬ মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান রাজশাহীতে এক জনসভায় বলেন, ছয় দফা হিন্দু আধিপত্যাধীন যুক্ত বাংলা গঠনের ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত ছাড়া কিছু নয়। ছয় দফা বাস্তবায়িত হলে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানরা বর্ণ হিন্দুদের গোলামে পরিণত হবে।

বিজ্ঞাপন

আওয়ামী লীগ সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান দলের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। তৃণমূল থেকে সংগ্রাম-সংগঠন করে একটি দলের প্রধান নেতা হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠান পেয়েছিলেন। এমন নজির আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে খুব একটা নেই। সম্ভবত এ কারণেই ছয় দফা বিরুদ্ধে শাসকদের এবং একইসঙ্গে নিজ দলের ভেতর থেকে যে প্রতিরোধ আসে, সেটা সহজেই অতিক্রম করতে পারেন। প্রাদেশিক কাউন্সিলে ভবিষ্যৎ আন্দোলনের বিষয়টি সামনে রেখে নতুন কমিটি গঠিত হয়। সভাপতি শেখ মুজুবর রহমান, সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ।

নতুন দায়িত্ব নিয়ে তিনি জেলা ও মহকুমায় একের পর এক জনসভা ও কর্মী সভায় অংশ নিতে থাকেন। একেকটি জনসভায় বক্তব্য রাখেন, আর তার বিরুদ্ধে দায়ের হতে থাকে মামলা। কোথাও কোথাও তাকে গ্রেফতার করে জেলে নেওয়া হয়। তিনি জামিনের আবেদন করেন এবং আদালতে তা মঞ্জুর হয়। কিন্তু ৮ মে নারায়ণগঞ্জে জনসভায় ভাষণ প্রদানের পর ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে ফিরে এসে যে গ্রেপ্তার হলেন, মুক্তি পান ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি প্রবল গণবিক্ষোভে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বাতিল হওয়ার পর।

ছয় দফা প্রদানের পরপরই বঙ্গবন্ধু নিজের নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। ‘আমাদের বাঁচার দাবি ছয় দফা’ শিরোনামে। শহর-বন্দর-গ্রামে এ পুস্তিকা বিলি করা হয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার গৌরবের ইতিহাসের সঙ্গে এ পুস্তিকাটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যারা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে উৎসাহী, যারা ১৯৭১ সালের পটভূমি জানতে চান, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে যাদের সামান্যতম উৎসাহ। তাদের জন্য ৫৪ বছর পরও এ পুস্তিকার আবেদন বিন্দুমাত্র কমেনি।

ছয় দফার প্রতিটি দফার বিস্তারিত ব্যাখ্যা বঙ্গবন্ধু উদাহরণ দিয়ে দিয়ে তুলে ধরেন। ভাষা একেবারে সহজ, সরল। সামান্য লেখাপড়া জানলেও বুঝতে পারবে।

আর কী বিনয়ী ছিলেন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান নেতা হয়ে ওঠার প্রস্তুতিপর্বে। পুস্তিকায় তিনি লিখেছেন, ‘সাড়ে পাঁচ কোটি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ভালোবাসাকে সম্বল করিয়া আমি যে কোনো ত্যাগের জন্য প্রস্তুত আছি। আমার দেশবাসীর কল্যাণের কাছে আমার মতো নগণ্য ব্যক্তির জীবনের মূল্যই বা কতটুকু। … আমার দেশের প্রিয় ভাইবোনেরা, আল্লাহর দরবারে শুধু এই দোয়া করিবেন, বাকি জীবনটুকু আমি যেন তাহাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি সাধনায় নিয়োজিত করিতে পারি। আপনাদে স্নেহধন্য খাদেম শেখ মুজিবুর রহমান।’

ছয় দফার কারণে শেখ মুজিবুর রহমানকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত করা হয়। তার প্রাণদণ্ড হবে, ফাঁসির আদেশ নিশ্চিত। এটাই ধরে নেওয়া হয়েছিল। জনগণ তাকে মুক্ত করে আনে। ছয় দফা না মানলে এক দফা। এ পথেই বাঙালি অগ্রসর হয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্য রাতে ফের তিনি গ্রেফতার হন। আবারও জনগণ তাকে মুক্ত করে আনে। ত্রিশ লাখ নারী-পুরুষ-শিশু স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মদান করে। বঙ্গবন্ধু ফিরে আসেন তাঁর জীবনের স্বাধ পূর্ণ হওয়া স্বাধীন বাংলাদেশে।

আমাদের দুর্ভাগ্য, এই স্বাধীন দেশেই অর্থনৈতিক মুক্তি ও মানুষের কল্যাণ সাধন করতে গিয়ে তাকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জীবন দিতে হয়।

ছয় দফা জনগণের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি তিনি আরেকটি অপরিহার্য কাজ করেছিলেন, জনগণকে সচেতন ও সংগঠিত করা। একইসঙ্গে নজর দিয়েছিলেন সংগঠনের প্রতি। পাকিস্তানের শুরুতে যে ছাত্রলীগ তিনি গঠন করেছিলেন, সে সংগঠন ষাটের দশকের মাঝামাঝি প্রবল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। আওয়ামী লীগের একটি অংশ যখন ছয় দফার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, শাসকরা যখন আওয়ামী লীগকে নির্মূল করার হুঙ্কার ছাড়তে থাকে, তখন ছাত্রলীগ বাধার প্রাচীর হয়ে ওঠে।

আরেকটি বিষয়ও আমরা লক্ষ্য না করে পারি না। পঞ্চাশের দশকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক থাকার সময় বাংলার পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়ান বঙ্গবন্ধু। এ সময়ে বিভিন্ন জেলা ও মহকুমার নেতৃত্বের জন্য ৩০-৩৫ বছর বয়সী যে সব যুবক-তরুণকে বাছাই করেন তারাই ছয় দফা, ১১ দফা ও সর্বোপরি স্বাধীনতা আন্দোলনে কেবল আওয়ামী লীগের নয়, জনগণের নেতৃত্ব প্রদান করেন।

ছয় দফা প্রদানের পর আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের শত শত নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়নের অনেক নেতাও ছয় দফা সমর্থনের কারণে গ্রেফতার হয়ে যান। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সম্পাদকদের একে একে গ্রেফতার করার পর অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দিতে হয় মহিলা সম্পাদক আমেনা বেগমকে। এমন তীব্র দমননীতির মধ্যেও ১৯৬৬ সালের ৭ জুন আওয়ামী লীগ হরতাল আহ্বান করে। কীভাবে এ হরতাল পালিত হয়েছিল, তার বিবরণ বঙ্গবন্ধু নিজেই দিয়েছেন : ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে এই ঐতিহাসিক তারিখে (৭ জুন, ১৯৬৬সাল, মঙ্গলবার) শেখ মুজিবুর রহমান দিনলিপি বা ডায়েরি শুরু করেছেন এভাবে ‘সকালে ঘুম থেকে উঠলাম। কী হয় আজ? আবদুল মোনায়েম খান যেভাবে কথা বলছেন তাতে মনে হয় কিছু একটা ঘটবে আজ। কারাগারের দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভেদ করে খবর আসলো দোকান-পাট, গাড়ি, বাস, রিকশা সব বন্ধ। শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল চলেছে। এই সংগ্রাম একলা আওয়ামী লীগই চালাইতেছে। আবার সংবাদ পাইলাম পুলিশ আনসার দিয়া ঢাকা শহর ভরে দিয়েছে। …আবার খবর এল টিয়ার গ্যাস ছেড়েছে। লাঠি চার্জ হতেছে সমস্ত ঢাকায়। আমি তো কিছুই বুঝতে পারি না। কয়েদিরা কয়েদিদের বলে। সিপাইরা সিপাইদের বলে। এই বলাবলির ভিতর থেকে কিছু খবর বের করে নিতে কষ্ট হয় না। … জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করেছে। তারা ছয় দফা সমর্থন করে আর মুক্তি চায়, বাঁচতে চায়, খেতে চায়, ব্যক্তি স্বাধীনতা চায়। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি, কৃষকের বাঁচবার দাবি তারা চায় এর প্রমাণ এই হরতালের মধ্যেই হয়ে গেল।’

[সূত্র : কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা ৬৯]

এ গ্রন্থের ৭০ পৃষ্ঠায় তিনি আরও লিখেছেন, ‘এমন হরতাল নাকি কোনোদিন হয় নাই, এমনকি ২৯ সেপ্টেম্বরেও হয় নাই।’

১৯৬৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সমগ্র পাকিস্তানে বিরোধী দলগুলো হরতাল পালন করেছিল। সে হরতালের বিবরণ পরদিন দিয়েছে দৈনিক সংবাদ এভাবে : নির্যাতন প্রতিরোধ দিবসের এ হরতালে এই প্রথম পূর্ব বাংলায় রেলের চাকা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। হরতালের সময় অসংখ্য শোভাযাত্রা ও জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। বিকেলে পল্টন ময়দানে ২ লাখ লোকের জনসভায় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানি সভাপতিত্বে করেন। রাজধানীতে কাঁচা সবজির দোকানও খোলেনি। কোথাও পিকেটিংয়ের প্রয়োজন পড়েনি। [সূত্র: অজয় দাশগুপ্ত প্রণীত ‘সাত দশকের হরতাল ও বাংলাদেশের রাজনীতি’, পৃষ্ঠা ৩৭]।

৭ জুনের হরতালের খবর প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন গভর্নর মোনায়েম খান। বলা হয়, কেবল সরকারি প্রেসনোট ছাপতে হবে। কিন্তু সচিবালয়ের বাঙালি কয়েকজন কর্মকর্তা বুদ্ধি আঁটেন, এমনভাবে প্রেসনোট লিখতে হবে যাতে জনগণ ধারণা পায় অনেক বড় ঘটনা ঘটে গেছে। এ কারণে শুরুতেই লেখা হয়, প্রত্যুষ থেকেই ব্যাপক বাধার মাধ্যমে হরতাল সংঘটিত করা হয়। সংঘর্ষে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়। রেল চলাচলে বাধা দেওয়া হয়।

আহমদুল কবির সম্পাদিত ‘দৈনিক সংবাদ’ কেবল প্রেসনোট প্রকাশ করে পত্রিকা প্রকাশে রাজী হয়নি। সরকারি নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে ৮ জুন সংবাদ প্রকাশিত হয়নি। ৯ জুন আহমদুল কবির জানান, সরকারি দমননীতির এটাই তাদের প্রতিবাদ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষাপট এভাবেই তৈরি হয়েছিল, এভাবেই হয়েছিল ১৯৭১ সালের ড্রেস রিহার্সাল।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)