চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘ছোট থেকে চাইতাম বড় হয়ে ম্যাজিস্ট্রেট হবো’

ছোট থেকেই  চাইতেন বড় হয়ে ম্যাজিস্ট্রেট হবেন। এর পেছনের কারণটাও ছিলো বেশ মজার। এসএসসি পরীক্ষার সময় যখন নারী ম্যাজিস্ট্রেটরা পরীক্ষার হলে আসতেন গার্ড দিতে, তাদের দেখে অনুপ্রাণিত হতেন। ভাবতেন বড় হয়ে ম্যাজিস্ট্রেট হবেন। তিনি বাংলাদেশ পুলিশের এআইজি আবিদা সুলতানা। 

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর যোগ দেন বিএনসিসিতে। সেখানে কিছুদিন কাজ করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অনুপ্রেরণা দেন বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে যোগ দেবার। আর তখন থেকেই স্বপ্ন দেখতে থাকেন ইউনিফর্মের। বিএনসিসির শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন হাতছানি দিতে থাকে তাকে। আর তখন থেকেই স্বপ্ন দেখা শুরু ইউনিফর্মের।

বিজ্ঞাপন

ইচ্ছে ছিলো প্যারেড কমান্ডার হবার। এ বছর পুলিশ সপ্তাহের প্যারেড কমান্ডারের ১০টি কন্টিনজেন্টের অধিনায়ক হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন আবিদা সুলতানা। বর্তমানে কর্মরত আছেন পুলিশ সদর দপ্তরে।

চ্যানেল আই অনলাইন-কে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে শুনিয়েছেন জীবনের সফলতার গল্প।

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম ঠেঙ্গারবান্দে তার জন্ম। ১৯৮৯ সালে এসএসসি ও ১৯৯১ সালে এইচএসসি পাশের পর ভর্তি হন দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগে।

বাবা ব্যবসায়ী মোহাম্মদ নাজমুল আলম। আর মা কাওসার আক্তার গৃহিনী। চার বোনের মধ্যে আবিদা ছিলেন দ্বিতীয়। পরিবারের অন্য সদস্যরা বেশ রক্ষণশীল হলেও বাবা ছিলেন উদারনৈতিক। আর তাই পুলিশে যোগ দেবার পর অন্যরা বেশ ভয়ের চোখে তাকালেও বাবা-মা ছিলেন সবসময়ই মেয়ের পক্ষে।

ছোট থেকেই লেখাপড়ায় ছিলেন মেধাবী। বিএনসিসির ক্যাডেট থাকাকালে সেখানে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করায় শিক্ষকরাও বুঝে গিয়েছিলেন এই মেয়ের পক্ষেই চ্যালেঞ্জ নেয়া সম্ভব।

শিক্ষকদের অনুপ্রেরণায় বিসিএসে প্রথম পছন্দ দেন পুলিশ ক্যাডার। বিসিএসের সার্বিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হতে আবিদা এনজিও ও ব্যাংকে চাকরি করে ফেলেন। এর মাঝেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেন বেসরকারি কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আবু সাদাত মুহম্মদ শাহীন এর সাথে। এ দম্পতির ঘরে এখন দুই মেয়ে এক ছেলে। 

জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাবা-মা, স্বামী, শ্বশুরবাড়ির সবার সহযোগিতা পেয়েছেন এ পুলিশ কর্মকর্তা। এমনকি বিসিএস পরীক্ষার সময় স্বামী নিজ হাতে আবিদাকে নোট করে দিয়ে সহায়তা করেছেন।

তার এ চ্যালেঞ্জিং পেশায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি কেউ।

বিজ্ঞাপন

২২তম বিসিএসের মাধ্যমে যোগ দেন বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে। সেবছর ৪৪ জন পুলিশ কর্মকর্তা যোগ দিয়েছিলেন একসাথে। তাদের মধ্যে আবিদাসহ নারী ছিলেন ৫ জন।

বিসিএসের ফলাফলের পর মৌলিক প্রশিক্ষণে অংশ নিতে যান সারদা পুলিশ একাডেমিতে। সেসময় তার প্রথম সন্তান ১৬ মাসের ছোট্ট মেয়েটিকে নিজের বাবা-মা ও বোনদের কাছে রেখে যান আবিদা।

তবে ১৬ মাসের ছোট্ট শিশুটিকে রেখে প্রশিক্ষণ করতে গিয়ে বেশ মনোকষ্টে ভুগতে হয়েছে তাকে। প্রথম দেড়মাস পর যখন নিজের মেয়েকে কাছে পান আবিদা সেসময় মেয়ে মাকে চিনলেও চারমাস পর যখন আবার মেয়ের সাথে দেখা হয় তখন মেয়ে আর চিনতে পারে না মাকে।

হাসতে হাসতে এ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন: আমার সেসময় কান্নাকাটি অবস্থা। আমি বাদে বাড়ির সবাই তার মা। সবাইকে মা ডাকে আমাকে ছাড়া। আমার কাছেও আসে না।

এরপর মেয়ের মনোযোগ আর ভালোবাসা পেতে বেশ বেগ পোহাতে হয়েছে এ কর্মকর্তাকে।

শারীরিক ও মানসিক কষ্টের এ প্রশিক্ষণে ব্যাচমেটদের পেয়েছেন বন্ধুর মত। ৩৯ জন পুরুষ আর ৫ জন মেয়ে হলেও নিজেদের কখনো আলাদা মনে হয়নি।

২০১২ সালে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব উইমেন পুলিশের পক্ষ থেকে পেয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল রিকগনিশন স্কলারশিপ অ্যাওয়ার্ড। ২০১৩ সালে পেয়েছেন পিপিএম পদক। বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠায় এবং পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় বাংলাদেশ পুলিশের সর্বোচ্চ পদক বিপিএম পেয়েছেন ২০১৮ সালে।

কর্মক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত হতে হয়েছে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। কাদের মোল্লার ফাঁসি, বিডিআর বিদ্রোহসহ দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকাকালে রাতের পর রাত থাকতে হয়েছে বাড়ির বাইরে।

বিনয়ী ও সৎ এ কর্মকর্তা অর্পিত দায়িত্ব পালনে বদ্ধপরিকর। কাজের ক্ষেত্রে পেয়েছেন সম্মান। পেয়েছেন সাধারণ মানুষের ভালোবাসা। কাজ করতে চান দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য।

নারী দিবস উপলক্ষ্যে চ্যানেল আই অনলাইনের মাধ্যমে নারীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে আবিদা সুলতানা বলেন: সমাজে নারীদের ক্ষমতায়নের জায়গায় আসতে হবে। সমাজে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরী করতে হবে। নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও ডেডিকেশন থাকলেই সমাজে মেয়েরা আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে।