চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ছুটি অথবা লকডাউনের সুবিধা আমরা কতটুকু নিতে পারলাম?

সপ্তম দফায় বাড়ানো হলো সাধারণ ছুটি। যদিও এটা ‘লকডাউন’ নয়। করোনার প্রকোপ ঠেকাতে বা নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত ২৬ মার্চ থেকে ছয় দফায় (২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল, ৪ এপ্রিল থেকে ৯ এপ্রিল, ৯ এপ্রিল থেকে ১৪ এপ্রিল, ১৪ এপ্রিল থেকে ২৫ এপ্রিল, ২৫ এপ্রিল থেকে ৫ মে, ৫ মে থেকে ১৬ মে) সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার।

তবে মঙ্গলবারই (১২ মে) জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ছুটির মেয়াদ বাড়ছে। কেননা ১৭ মে থেকে ঈদের আগে কর্মদিবস রয়েছে মাত্র চারটি। বাকি দিনগুলোয় শবেকদর ও সাপ্তাহিক ছুটি। এরপরেই ঈদের ছুটি। সুতরাং মাঝখানের মাত্র চারদিনের জন্য ছুটি সমাপ্ত ঘোষণা করে কাজকর্ম শুরু করলে তাতে হীতে বিপরীত হওয়ার শঙ্কাই বেশি। কেননা করোনা পরিস্থিতির উন্নতি তো হচ্ছেই না, বরং প্রতিদিনই শনাক্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। ফলে সরকারের সামনেও ‘ছুটি’ বাড়ানোর ঘোষণা না দেয়ার কোনো বিকল্প ছিল না।
সপ্তম দফায় মেয়াদ বাড়ানোয় এখন ৩০ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি।

বিজ্ঞাপন

সুতরাং ৩১ মে থেকেই হয়তো সব অফিস, কারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে খোলার প্রক্রিয়া শুরু হবে। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কতদিন বা কত মাস সময় লাগবে, তা এখনও অনিশ্চিত। কারণ করোনা যে ঠেকানো যাবে না, সে বিষয়ে মোটামুটি সবাই একমত হলেও এই অদৃশ্য আততায়ীকে যে মাত্রায় নিয়ন্ত্রণে রাখা যেতো বলে সবার বিশ্বাস, সেখানে বাংলাদেশ খুব একটা সফল হয়নি। এর প্রধান কারণ মানুষের ‘ড্যামকেয়ার’ বা উদাসীন ভাব; শুরুর দিকে করোনা নিয়ে সরকার ও সরকারি দলের নেতাদের অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাস এবং ‘লকডাউন’ না বলে ‘সাধারণ ছুটি’ শব্দটি ব্যবহার।সচেতন নাগরিকরা শুরু থেকেই বলে আসছিলেন যে, সাধারণ ছুটি শব্দটি ব্যবহার করে মানুষকে ঘরে রাখা যাবে না। কারণ লকডাউন বললে সেখানে যেরকম একটা ভয়ের ব্যাপার থাকে, ছুটির সঙ্গে ঠিক সেরকম ভীতি জড়িত নেই। আর মানুষের মনে এই ভয়টা তীব্রভাবে ঢুকানো যায়নি বলেই কার্যত লকডাউন থেকে যে পরিমাণ সুবিধা নেয়া যেতো, সেটি ব্যর্থ হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গণমাধ্যম ও পোশাক খাত বাদ দিলে প্রায় দুই মাস ধরে সরকারি ছুটিতে রয়েছে দেশ। এই দীর্ঘ ছুটিতে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক। সেই ক্ষতির পরিমাণ হয়তো নিরূপণের চেষ্টা চলছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে ক্ষতি এড়ানোর জন্য এই ছুটি দেয়া হলো, সেই সুবিধাটা আমরা কটতটুকু নিতে পেরেছি বা আদৌ পেরেছি কি না?

অনেকেই যে কথা বলবেন বা স্বাস্থ্যমন্ত্রীও যে কথা বলেছেন যে, ইউরোপ আমেরিকার তুলনায় আমাদের দেশে করোনা পরিস্থিতি ভালো। এ কথার সত্যতা আছে নিশ্চয়ই। কিন্তু পরিস্থিতি তো দিনকে দিন খারাপ হচ্ছে। এটা অব্যাহত থাকলে এবং নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আমাদের অবস্থা যে ইতালি বা নিউইয়র্কের মতো হবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা আছে? হয়তো আমাদের দেশের মানুষের জীবনযাত্রা, আবহাওয়া, প্রবীণ লোকের সংখ্যা কম থাকাসহ নানা বিষয় আমাদের আশীর্বাদ হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু তারপরও আমাদের আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা তো ক্রমবর্ধমান। যে সামাজিক সংক্রমণ আমরা সহজেই এড়াতে পারতাম, সেই সুযোগটি তো আমরা একেবারেই নিজেদের অবহেলায় হারিয়েছি।

বিজ্ঞাপন

মার্চ মাসেও যখন এখানে পরিস্থিতি ততটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেনি, তখনও যদি ইউরোপ আমেরিকার ‍দৃশ্য দেখে আমাদের নীতিনির্ধারকরা এটা আন্দাজ করতে পারতেন যে, আমরাও এরকম ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পড়তে পারি, তাহলে সামাজিক সংক্রমণ রোধে খুব কঠোর পদক্ষেপ নেয়া গেলে এবার দেশের মানুষের ঈদটা মাটি হত না।

বর্তমান প্রজন্ম এই প্রথম এমন একটি নিরানন্দ ঈদের দিন দেখতে পাবে, যেদিন হয়তো তারা ঈদের নামাজও পড়তে যেতে পারবে না। সারাদিন গৃহবন্দি থাকবে। আত্মীয়-স্বজন-বন্ধু-বান্ধবের বাসায় যেতে পারবে না। অনেকের বাসায় ভালো খাবার-দাবার রান্না হবে এবং তারা সেটা নিজেরাই খাবে। আবার অসংখ্য মানুষের ঘরে এবার সেই ভালো খাবারটুকুও রান্না হবে না। কেউ হয়তো তার বাসায় খাবার পৌঁছেও দেবে না। অথচ এই পরিস্থিতিটা আমরা সহজেই এড়াতে পারতাম।

আমরা ছুটির পরে ছুটির মেয়াদ বাড়াচ্ছি। কিন্তু তার সুফল পাচ্ছি না। হয়তো সরকারের তরফে বলা হবে, এই ছুটি না দিলে বা এতটুকু কার্যকর না হলে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতো। সেটিও হয়তো ঠিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সপ্তমবারের মতো যে ছুটির মেয়াদ বাড়ানো হলো, এটাই কি শেষ হবে নাকি ঈদের পরে আবারও ছুটি বাড়বে? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বারবারই কেন সাধারণ ছুটি শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে? লকডাউন বলতে অসুবিধাটা কোথায়—এর কোনো ব্যাখ্যা আমরা জানি না।ধরা যাক, এরপরে আর ছুটির মেয়াদ বাড়বে না এবং ৩১ মে থেকে অফিস-আদালত-কারখানা-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করবে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়াটিও ভুলূণ্ঠিত হবে যদি এই সপ্তম মেয়াদের ছুটির দিনগুলোর সুবিধা আমরা নিতে ব্যর্থ হই। কেননা, গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও ঈদের আগ মুহূর্তে দেখা যাবে মানুষ যে যেভাবে পারছে বাড়ির পথে রওনা হবে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেকে যাবে। সেই পরিস্থিতি যদি কঠোরভাবে ঠেকানো না যায়, তাহলে নিরানন্দ ঈদটা অনেকের জন্যই বিভীষিকায় পরিণত হবে।

একইভাবে ঈদের পরে মানুষ যখন দলে দলে ঢাকায় এবং বড় বড় শহরে তাদের কর্মক্ষেত্রে রওনা হবে, তখনও যদি করোনা পরিস্থিতির কোনো উন্নতি না হয় এবং মানুষ যদি সেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার মধ্যে দলে দলে রওনা হয়, তখন নতুন করে অসংখ্য মানুষের আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হব। সেই পরিস্থিতি মোকাবেলার কি কোনো কৌশল আছে?

আমরা ছুটির পরে ছুটি বাড়াচ্ছি ঠিকই, অর্থনীতির ক্ষতি করছি ঠিকই, মানুষের মৃত্যু হচ্ছে ঠিকই—কিন্তু আখেরে তার সুফল কতটুকু পাচ্ছি? এর উত্তর নিশ্চয়ই ‍খুব আশাব্যঞ্জক নয়। সুতরাং সপ্তম দফায় যে ছুটি বাড়ানো হলো, এই দুই সপ্তাহ খুব কঠোরভাবে যদি আমরা নিয়ম-কানুন মেনে ঘরেই থাকি এবং জনসমাগমে নাই; বাজার করার মতো নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া বেহুদা বের না হই এবং বের হলেও সবাই মাস্ক পরিধানসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারি, তাহলে ভয়াবহ পরিস্থিতি ঠেকানো না গেলেও, অন্তত নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। এই দুই সপ্তাহ সময়টাকে আমরা কি আমাদের জীবনের জন্য একটা বড় পরীক্ষা হিসেবে নিতে পারি না?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)