চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘ছাত্রজীবনে শখের ক্যামেরাতেই ২১শে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক ছবি উঠে আসে’

গবেষণামূলক ও সাক্ষাতকারভিত্তিক গ্রন্থ ‘ভাষা সংগ্রামীর বাংলাদেশ’ থেকে সংক্ষেপিত

১৯৫২’র ভাষা আন্দোলনের যে সব আলোকচিত্র আছে তার বেশিরভাগ তুলেছেন ভাষা সংগ্রামী রফিকুল ইসলাম। সাক্ষাতকার গ্রহণের সময় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস এর উপচার্যের দায়িত্বে। সাক্ষাতকার গ্রহণের জন্য ধানমন্ডিতে তার কার্যালয়ে যাই দুপুর ২টার দিকে।

ভাষা সংগ্রামী অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের সাক্ষাৎকারের বাকি অংশ পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো:

বিজ্ঞাপন

তা. ই. মাসুম: স্যার, আপনি তো ভাষা আন্দোলনের বেশীরভাগ ছবি তুলেছেন। কিভাবে তা তুলেছিলেন। এবং সেই সময়ের অবস্থা জানতে চাই।

রফিকুল ইসলাম: আমি ছেলে বেলা থেকেই ছবি তুলতাম। কিন্তু ভাল ক্যামেরা ছিল না। কোডাক বক্স ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলতাম। ১৯৫১ সালের দিকে আমার ছবি তোলার হাত দেখে আমাকে প্রখ্যাত রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী কলিম শরাফী, তিনি আমাকে একটি ক্যামেরা গিফট হিসেবে দেন। ফোল্ডিং ক্যামেরা সেকালের, কিন্তু ছবি উঠত মাত্র ৮টা, একবারে। ৫১ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম প্রথম বর্ষে। তখন দেখতে দেখতে ৫২ সালে এসে গেল।ক্যামেরায় একটা রোল ভরা থাকত, আর একটা রোল আমি পকেটে রাখতাম।

২১শে ফেব্রুয়ারিতে যখন ১৯৫২ সালের, ঐ যে, রাষ্ট্রভাষা দিবস হিসেবে ঘোষিত হয়েছিল কিন্তু ৪ঠা জানুয়ারি। এবং এটা হয়েছিল যে, খাজা নাজিমউদ্দিন সাহেব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম লীগ সভাপতি, তিনি ঐ ’৫১ সালের জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে পল্টনে এক জনসভায় আবার ঘোষণা দিলেন, যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।

মূলত: ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়কে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়টা শুরুর হল। ৪ তারিখে প্রথম আমরা নামি, পথে নামি, মানে আমতলায়, পুরনো কলা ভবনের আমতলায় মিটিং হয়। মিটিং এর শেষে সারা শহর আমরা প্রদক্ষিণ করি। ১০ তারিখে আমরা পতাকা দিবস পালন করি। সেদিন আরো বড় শোভাযাত্রা হয়। সেদিন স্কুল-কলেজের ঢাকা শহরের সবাই এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। ৪ তারিখেই ঘোষণা করে দেয়া হয়েছিল যে, ২১শে ফেব্রুয়ারি আমরা রাষ্ট্রভাষা দিবস হিসেবে পালন করব। এর আগে কিন্তু ১১ই মার্চ পালন করা হত।

কেন ২১শে ফেব্রুয়ারি?
কারণ সেইদিন পূর্ব বাংলার আইনসভায় বাজেট অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা। তখন আইনসভা বসত জগন্নাথ হলের অ্যাসেম্বিলি হলে। যেটা ভেঙ্গে পড়েছিল। সেই জন্য ২১ তারিখ। এই প্রশ্নটা কিন্তু কেউ করে না। যে ২১ তারিখ কেন আপনারা সিলেক্ট করলেন?

২১ তারিখ বাজেট অধিবেশন বসবে, আমরা সেখানে গিয়ে স্মারকলিপি পেশ করব যে, আপনারা পাকিস্তান সরকারের কাছে এবং পাকিস্তান গণ-পরিষদের কাছে এই প্রস্তাব পাশ করেন, যেন বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা হয়, সেই জন্য।

তখন নূরুল আমীন সরকার ক্ষমতায়। নূরুল আমীন সরকার ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ২০ তারিখ ১৪৪ ধারা জারি করল। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তখনই স্বতঃস্ফূর্তভাবে সিদ্ধান্ত নিলাম। আগামীকাল আমরা ১৪৪ ভঙ্গ করব। ১৪৪ ধারা মানে ৫ জনের বেশি লোক একত্র হতে পারবে না। সভা শোভাযাত্রা সবকিছু নিষিদ্ধ। তো পলিটিক্যাল পার্টিগুলো, যে অল-পার্টি রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ ছিল তাদের মিটিং হল। তারা ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা না ভাঙ্গা নিয়ে কোন ডিসিশন নিতে পারলেন না।

যাক, ২১ তারিখ সকাল বেলা আমতলায় যখন সভা শুরু হল, তখন আমার হাতে একটা ক্যামেরা ছিল। ঐ ক্যামেরাটাই তাতে ১টা রোল ছিল ৮টা ছবি আর ১টা রোল আমার পকেটে ছিল। মোট ১৬ টা ছবি আমি নিতে পারি। তো সভা যখন শুরু হল গাজীউল হক সাহেবের সভাপতিত্বে।

সেখানে ঐ কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদ থেকে শামসুল হক সাহেব আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তিনি বললেন, আমরা যেন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করে আমরা শান্তিপূর্ণ ভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাই।যদি কোন রকম বিশৃঙ্খলা হয় তাহলে পূর্ব বাংলায় আইন সভার যে নির্বাচন আসছে মার্চে না এপ্রিল মাসে, সেটা নূরুল আমীন সরকার বাতিল করে দেবে। এটা উনি যুক্তি দিলেন। কিন্তু সেটা আমরা মানলাম না। ওখানে সভায় সিদ্ধান্ত হল যে আমরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করব।
আমার সমনে তখন ২টা পথ খোলা ছিল, এক হচ্ছে ঐ যে ১০ জন ১০ জন করে যে তাদের সঙ্গে গিয়ে গ্রেপ্তার হওয়া।

কিন্তু তখন, তাহলে ক্যামেরাটা আমার যায়, ছবিও তোলা হয় না।
তখন আমি ঠিক করলাম যে আমি ছবি তুলব। কিন্তু ছবি তুলব কোথা থেকে? তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন কলা ভবনের ছাদে উঠে গেলাম। ছাদে উঠতে গিয়ে বিপদ হল যে, ছাদে উঠার কোন সিঁড়ি ছিল না। ছাদে একটা ফোকর ছিল শুধু। আমার বন্ধুরা আমাকে ঠেলে ছাদে তুলে দিল। আমি ছাদের ওপর থেকে পুরনো কলা ভবনের এখন যেটা মেডিকেল কলেজের আউটডোর ঐখানে। এখন তো অনেক বিল্ডিং উঠে গেছে। তখন তো ঐসব ছিল না। একটা আমগাছ ছিল শুধু।

সেখান থেকে আমি মোটামুটি সভার, শোভাযাত্রার, ঐ যে ১০ জন ১০ জন করে লাইন করে দাঁড়ানো আমি কিছু তুলতে পারলাম। কিন্তু আমার ফিল্ম এত কম! যে আমাকে খুব সতর্কভাবে ছবি তুলতে হচ্ছিল।আমার কপাল ভাল ছিল যে, একটা ফিল্মও নষ্ট হয় নাই। যে কয়টা ছবি আমি তুলেছি।

তারপর যখন গুলি চলল! মেডিকেল কলেজের মোড়ে, তখন আমি ছিলাম মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের ওখানে।আমি দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে মেডিকেল কলেজের এখন যে গেটটা আছে, মেইন বিল্ডিং এর যে প্রবেশ পথ ওখানে গেলাম। ওখানে আসতে দেখলাম যে এ্যাম্বুলেন্সে করে একটা লাশ নিয়ে আসা হল। এবং সে লাশের মাথার খুলি উড়ে গেছে বুলেটে এবং ঘিলু গড়িয়ে পড়ছে আর ধুয়ো বেরোচ্ছে।

আমার সঙ্গে আরেকজন ভদ্রলোক ছিলেন তার নাম আমানুল হক। তার হাতেও একটা ক্যামেরা ছিল। আমরা দুইজন একসঙ্গে ছিলাম। আমি বললাম আপনার কাছে ফিল্ম আছে? -বললেন, ২-৩টা আছে। বলে আমিওতো তুলে ফেলেছি।

এমন সময় কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিস একজন সাংবাদিক, তিনি সরকারের তথ্য দপ্তরে কাজ করতেন। তিনি এসে আমাদের বললেন, আপনারা কি ছবি তুলতে চান এই লাশের? যে লাশটা এখন গেল! বলল আসেন, কারণ লাশটা ওরা গুম করার জন্য, এই লাশটা ছিল রফিক উদ্দিন আহমেদের। ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ। তার বাড়ি মানিকগঞ্জে। ওরা এই লাশটাকে ইমার্জেন্সিতে না নিয়ে পাশে একটা গুদাম ঘরের মত ছিল, সেখানে নিয়ে লাশটা লুকিয়ে রেখেছে। ওখান থেকে তারা লাশটা সরিয়ে ফেলবে।

তো আমানুল হক সাহেবকে আমি বললাম যে, ওনার ডাক নাম মতি ভাই। বললাম যে, মতি ভাই আমার তো ফিল্ম শেষ, আপনি যান, তুলেন। উনি গিয়ে ঐ রফিক উদ্দিনের মাথার খুলির একটা ছবি তুলতে পারলেন, অন্ধকারের মধ্যে কোন রকম।ঐ রফিকউদ্দিন আহমেদ অর্থাৎ ভাষা আন্দোলনের প্রথম যে শহীদ সেই ছবিটা সৌভাগ্যক্রমে আমানুল হক সাহেব তুলতে পারলেন। কিন্তু আমি তুলতে পারলাম না।

এখন বিপদ হয়েছে যে, ছবি তো তুললাম! এখন আমি জানি যে, রাতে আমার বাসায় রেইড হবে। তো তখন, ঐ যেখানে এখন সচিবালয়, তার পেছনে যে রেস্টুরেন্টগুলো আছে না?

ওখানে ‘যায়দিজ’, যায়দিজ বলে একটা স্টুডিও ছিল। অবাঙালী স্টুডিও যায়দিজ উনি ইউপি থেকে রিফিউজি।রোল দুটো ওখানে দিয়ে আসলাম যে, আপনি ডেভেলপ করে রাখেন। আমি কিছু বললাম না যে কিসের ছবি, যেহেতু অবাঙালী। আমি বাসায় আসতে না আসতেই আইবি থেকে দুটো লোক এসে হাজির!
-বলে, আপনি ছবি তুলেছেন?
আমি বললাম, না। আমি ছবি তুলব কোত্থেকে আমার তো ফিল্মই ছিল না।
-বলে, আপনার ক্যামেরা ছিল সঙ্গে।

বিজ্ঞাপন

আমি বললাম, ক্যামেরা ছিল, ফিল্ম ছাড়া ক্যামেরায় কি ছবি ওঠে? আমি ক্যামেরা দিয়ে দিলাম যে দেখেন! তো ওরা ক্যামেরা খুলে দেখল ভেতরে কোন ফিল্ম নেই।

আর যায়দিজ থেকে আমি আরো ২/১ টা রোল ফিল্ম কিনে নিয়ে আসছিলাম। পরের দিন ছবি তোলার জন্য। এবং সেগুলো দিয়ে আমি ২২শে ফেব্রুয়ারি যে প্রসেশন হল, সকালে মেডিকেল কলেজে যে নামাজে যানাজা হল, তার পর যে প্রসেশনটা বের হল। যে প্রসেশনের ওপর পুরনো হাইকোর্ট আর কার্জন হলের মাঝামাঝি জায়গায় গুলি চলে প্রসেশনটা দুইভাগ হয়ে যায়। ঐ প্রসেশনেরও আমি ছবি তুলতে পেরেছি।

৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির ছবি আমানুল হক সাহেব যে প্রথম শহীদের ছবি তুলেছিলেন সেগুলো আছে।
আর আন্দোলনের ছবি আমি কিছু তুলেছিলাম সে আছে। এছাড়া আর কোন ছবি নাই! এটি হচ্ছে মোদ্দা ঘটনা।
এর মধ্যে কিন্তু আমার বাহাদুরির কিছু নেই। আমি ওখানে ছিলাম, আমার কাঁধে একটা ক্যামেরা ছিল, তাতে ফিল্ম ভরা ছিল এবং আমি কলা ভবনের কিছু ছবি নীচে তুলেছি, কিছু ছবি উপর থেকে তুলেছি। পরে দিনও আমি ২২/২৩ তারিখে কিছু কিছু ছবি তুলতে পেরেছিলাম।

২৪ তারিখে, যখন ২৩ তারিখে রাতারাতি যখন প্রথম শহীদ মিনার তৈরি করল মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা। সেইটা ভেঙ্গে দেয়ার আগে, তখন তো সমানে স্ট্রাইক চলছে। সমস্ত কিছু তখন বন্ধ। ফিল্ম পাচ্ছিলাম না। ঐটার একটা ছবি জামিল চৌধুরী যিনি পরে টেলিভিশনের মহাপরিচালক ছিলেন। তিনি একটা ছবি তুলেছিলেন। সেইটারও একটা ছবি আছে।
কাজেই ৫২‘র ভাষা আন্দোলনের ছবি তোলার কৃতিত্ব শুধু আমার নয়। আমার কিছুটা, আমানুল হক সাহেবের এবং শহীদ মিনারের ছবিটা তুলেছিলেন জামিল চৌধুরী। পরবর্তীকালে আমি আমানুল হক সাহেবের কাছ থেকে ঐ শহীদ রফিকউদ্দিন আহমেদের ছবি আর জামিল চৌধুরীর কাছ থেকে প্রথম শহীদ মিনারের ছবি আমি সংগ্রহ করে আমার আমার এ্যালবামে ছাপাই। আমার ছবির সঙ্গে। এই হচ্ছে সংক্ষেপে।

তার পরে ৫৩ সালে শহীদ দিবসের ছবি তুলেছি অনেক। শহীদের কবরে, আজিমপুরে কবরে ছবি তুলেছি, সেখানে মাওলানা ভাষানী ফুল দিচ্ছেন সেই ছবি আমার তোলা আছে। আবুল বরকতের ছবি তুলেছি। তখনো বাঁধাই হয়নি। তার পর শফিউর রহমান তিনি ২২শে ফেব্রুয়ারি শহীদ হয়েছিলেন, তার ছবি তুলেছি।
তার পরে আমরা প্রথম ৫৩ সালে প্রথম কালো পতাকা ওড়াচ্ছি, কলা ভবনের ওপরে শোক দিবস, প্রথম শহীদ দিবসের ছবি তুলেছি।

তার পর ৫৪, ৫৫ সালে আই এই ২১শে ফেব্রুয়ারিতে আমি ছবি তুলেছি।
৫৩ সালে ঢাকা কলেজের ছাত্ররা আর ইডেন কলেজের সাইন্সের ছাত্রীরা মিলে শহীদ মিনার বানাচ্ছিল, সেই শহীদ মিনার ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপ্যাল শামসুজ্জামান চৌধুরী বোধ হয় আর ইডেন কলেজের প্রিন্সিপ্যাল মিসেস ফজিলাতুন্নেছা জোহা, ওরা পুলিশ নিয়ে এসে ওরা ঐটা ভেঙ্গে দেয়। সেই ছবি আমার তোলা আছে। ৫৩ সালে ঢাকা কলেজে যে শহীদ মিনারটা ওরা তৈরি করেছিল। এছাড়া আরো নানা জায়গায় বিভিন্ন সময়ে ৫৩, ৫৪, ৫৫ সালে নানা জায়গায় নানা রকম শহীদ মিনার তৈরি করেছে ছাত্র ছাত্রীরা। সেগুলো আমার মোটামুটি তোলা ছিল।

এই সব ছবি দিয়ে বাংলা একাডেমি ভাষা আন্দোলনের যে একটা ছোট যাদুঘর করেছে সেখানে গেলে ছবিগুলো দেখতে পাবে। মোটামুটি এই আরকি, আমার ছাত্রজীবনে, একটা শৌখিন ক্যামেরাম্যান হিসেবে ক্যামেরা হাতে নিয়েছিলাম কিন্তু সেটা, কিছু ঐতিহাসিক ছবি তাতে উঠে এসেছে।

তা. ই. মাসুম: স্যার, ভাষা আন্দোলনে যারা জড়িত, তাদের ভাষা সৈনিক বলা হয় কেন?
রফিকুল ইসলাম: এই কথাটা যদি বলতে হয়, কয়জন লোককে ভাষা সৈনিক বলাটা ঠিক না। ঠিক না এই জন্য যে, ২১ তারিখে গুলি চলার পর সমস্ত ঢাকার মানুষ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এবং ২২শে ফেব্রুয়ারি ২৩ শে ফেব্রুয়ারি ২৪ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারাদেশে আন্দোলন চলেছে। সবাইতো ভাষা সৈনিক! শুধু কয়েকজন লোককে ভাষা সৈনিক কেন বলব? আমি এটার বিরোধী।

তা. ই. মাসুম: ঠিক আছে স্যার, আমরা সৈনিক শব্দটা কেন ব্যবহার করছি?
রফিকুল ইসলাম: আমি জানি না। আপনি বলতে পারেন, ভাষা কর্মী বা ভাষা সংগ্রামী এই পর্যন্ত বলতে পারেন। ভাষা সৈনিক শব্দটা এটা ব্যবহার করা উচিৎ নয়। উচিৎ নয় এই জন্য যে, আর যদি করতে হয় তাহলে সমস্ত, তখনকার দিনে আমাদের জনসংখ্যা ছিল ৪-৫কোটি সবাইতো! ছেলে বুড়ো সবাই! কেউতো বাদ ছিল না! ২১শে ফেব্রুয়ারি গুলি চলার পর সমস্ত দেশের আবেগ এমনভাবে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিল যে, ২২শে ফেব্রুয়ারি থেকে সবাই তো রাজপথে ছিল। কেউ ১৪৪ ধারা মানে নাই! কেউ কারফিউ মানে নাই। তো সবাই তো আপনার ভাষার জন্য যুদ্ধ করেছে। আমরা কয়েকজন যেহেতু ওখানে উপস্থিত ছিলাম, আমরা ভাষা সৈনিক হয়ে গেলাম?

তাহলে ওনারা কি? এটা হাস্যকর নয় কি? কারণ ভাষা আন্দোলন একটা স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। এবং ২১ তারিখ গুলি চলার পর স্বাভাবিক ভাবেই সমস্ত নেতারা আত্মগোপন করেন।তখন মুসলিম হল থেকে আর মেডিকেল কলেজ হোস্টেল থেকে আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছিল। মেডিকেল কলেজ ছাত্র ইউনিয়ন/সংসদ নেতা ছিলেন, যারা ছিলেন তারা ছিলেন।
আর সলিমুল্লাহ হলের যে অ্যাথলেটিক ক্লাব ছিল। আসাদুল হক-আসাদ আমীন তিনি ছিলেন ফিজিক্সের নামকরা ছাত্র। এবং ইউনিভার্সিটি টেনিস ব্লু। তার নেতৃত্বে অ্যাথলেটিক ক্লাব আন্দোলন চালিয়েছে। ২২, ২৩, ২৪, ২৫, ২৬ তারিখে রেইড হয়ে হল বন্ধ করে দেয়ার আগ পর্যন্ত। তারা তো সব খেলোয়াড় ছিলেন। তারা কিন্তু কেউ রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না। তারা কেউ রাজনীতি করতেন না। কিন্তু আন্দোলন চালিয়েছেন। এবং শেষ পর্যন্ত এই যে, আসাদ-আসাদ আমীন তিনি তো আন্ডার গ্রাউন্ডে থাকতে গিয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। তাকে বর্ডারের ওপারে পার করে দেয়া হয়। তার পর কোলকাতায় চিকিৎসা করে অনেক দিন পর তিনি দেশে ফিরে আসতে পেরেছিলেন। অথচ আপনি তার নাম কোথাও ভাষা সৈনিক হিসেবে দেখবেন না।

যে রিক্সাওয়ালা মারা গেল, আউয়াল। তার নাম কি শোনা যায়? কত লাশ গুম করে ফেলেছে। আপনি দেখেন! প্রথম যে শহীদ রফিক উদ্দিন তার কোন কবর নাই। শুধু বরকতের একটা কবর আছে, আর শফিউর রহমানের কবর আছে আর কারো কোন কবর নাই। কাজেই, এসব বিশেষণ ব্যবহার করা অযৌক্তিক!!

তা. ই. মাসুম: এটা তো ব্যবহার হয়ে আসছে?

রফিকুল ইসলাম: আসছে না! এটা কিছু লোক ব্যবহার করছে। এগুলি বাহাদুরি খেলানোর জন্য। বাহাদুরী নেয়ার জন্য। এটা বুঝতে পারছেন না? তো যদি এতই ভাষা সৈনিক থাকবে, ৪৮ সালে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছে তাই তো? ৬০ বছর পার হয়ে গেছে না? ৫২ সালে যে রক্ত দিল সেটাও তো ৬০ বছর পূর্ণ হতে চলল। বাংলা ভাষা কেন এখনো চালু হল না? জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে? সৈনিকেরা কোথায় গলে সব!? তারা কি পালায়ন করেছে?
কাজেই এটা যারা করেন, তারা এটা একটা উদ্দেশ্যমূলক। যেমন ; অলী আহাদ ভাষা আন্দোলনের একজন কর্মী, তিনি বলেন, ‘ওরা যদি ভাষা সৈনিক হয় আমিতো সিপাহসালার’। (হাসতে হাসতে বললেন হা… হা… হা) আমি তো ভাষা আন্দোলনের নেতা। সৈনিক কেন? উনি এটা বলেন কৌতুক করে, কিন্তু কথাটা সত্যি।

তা. ই. মাসুম: মুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা বলি, ভাষা আন্দোলন যারা করেছেন তাদের কি বলব? সৈনিক শব্দটা কেন ব্যবহার হচ্ছে? ভাষা যোদ্ধা বা ভাষা সংগ্রামী কি বলা যায়?
রফিকুল ইসলাম : মুক্তিযোদ্ধা হল তারা, যারা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছে। আর যারা দাবীদার, আরো আশেপাশের লোকজন আমি তাদের কোন মূল্য দেই না। যারা আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ, তাদের সন্তানরা যেত। যে কোন দিন গ্রামের সীমানা পার হয় নাই, সে কোথায় সীমান্ত পেরিয়ে কোথায় কোথায় চলে গেছে ট্রেনিং নিয়ে ফিরে এসে যুদ্ধ করেছে। ওরা হচ্ছে সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা।

সে দিন যারা গুলির সামনে শোভাযাত্রা করেছে। যারা গুলি মানেনি, লাঠি মানেনি, টিয়ার গ্যাস মানেনি, তারা হচ্ছে সত্যিকারের যোদ্ধা। আমি ছবি তুলেছি কয়েকটা আমার কি বাহাদুরী? আমার কি অবদান আছে বলেন?
আর যারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার বিপক্ষে ছিল তা এখন সব ভাষা সৈনিক! এটা হচ্ছে সব’চে হাস্যকর।
আর নেতারা, তদানীন্তন ছাত্র নেতারাওতো ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার বিপক্ষে ছিল। এটাতো ছাত্র-ছাত্রীদের স্বতঃস্ফূর্ত সিদ্ধান্ত, যে না, আমরা ১৪৪ ভারা ভঙ্গ করব। করেছে, লাঠি চলেছে, টিয়ার গ্যাস চলেছে, টিয়ার গ্যাস ধরে ধরে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে।

তখন তো শেল অন্যরকম ছিল। ওরাও হাতে ছুড়ত আমরাও ধরে আবার ওদের ওপরে ফেলতাম। তখন তো গান থেকে ফায়ার করা হত না। ওরা হাতে নিয়ে ফেলত। ব্যাগের মধ্যে থাকত! হাত বোমার মত ছিল ফেলত, তো, এগুলো আমরা ক্যাচ ধরতাম। ধরে ওদের দিকে ফেলতাম। কেননা ওটা মাটিতে না পড়লে ফাটত না।

তা. ই. মাসুম: আমার প্রশ্ন স্যার, জানতে চাচ্ছি সৈনিক শব্দটা কেন আসল? এটা কি তখন একটা সৈনিক পত্রিকা ছিল সেই থেকে এসেছে? না-কি, কেন এসেছে? আমার জিজ্ঞাসা ভাষা সংগ্রামীদের কেন ভাষা সৈনিক বলছি।

রফিকুল ইসলাম : না! এটা কিছু লোক উদ্দেশ্যমূলক ভাবে এই শব্দটা চালু করেছে। কিছু বাহাদুরী নিতে চেয়েছে। যারা, যাদের সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের কোন সম্পর্ক ছিল না। অর্থাৎ তারা মাঠে নামেনি। যারা সভায় আসেনি, শোভাযাত্রায় আসেনি, লাঠি খায়নি, টিয়ার খায়নি, গুলি খায়নি, সেই ধরনের কিছু লোক, যারা গা বাঁচিয়ে নিজেরা দুরে দুরে ছিল তারা পরবর্তীকালে যখন ভাষা আন্দোলন স্বীকৃতি পেল, রাষ্ট্রভাষা বাংলা হল তখন, তারা নাম কেনার জন্য স্বাধীনতার পর তারা নিজেদের নামের পাশে ভাষা সৈনিক কথাটি জুড়ে দিল।

এগুলো সব মতলববাজ! ফেরেববাজ এগুলো! এদের সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের কোন সম্পর্ক নেই। আন্দোলনকারী তারাই, যারা সেদিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেছিল। যে নেতারা পুলিশের সঙ্গে হাতাহাতি যুদ্ধ করেছে।