চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ছবি তোলাটা আমার কাছে ছবি আঁকার মতোই মনে হয়: মইনুল আলম

ছোটবেলায় তাঁর মা হাফপ্যান্ট আর শার্ট কাচতে গিয়ে প্রতিবারই খুব বকা দিতেন। পকেট থেকে নানা আকৃতির কুড়িয়ে-পাওয়া পাথর, কাঠ, বোতলের ছিপি আর ভাঙা পোরসিলিনের প্লেট-কাপের নকশার টুকরোগুলো খুঁজে বের করতেন আর বলতেন, এতে পকেটটা তো তাড়াতাড়ি ছিঁড়ে যায়। অথচ এগুলোই ছিল তাঁর কাছে অমূল্য সম্পদ।

সে-সময় থেকেই ফর্ম, আলোছায়া, ছবি, প্রকৃতি তাঁকে ভীষণ অবাক করত। প্রথম ক্যামেরা বাবার হাতেই দেখেন। একদিন বাবার ক্যামেরাটি নিজের হলো, কিছুদিন পর তা বেহাতও হলো। তারপর নানা ঘটনা-অভিজ্ঞতার পরম্পরায় ক্যামেরার সঙ্গেই জীবনের সন্ধি হলো। বলছি আলোকচিত্রী মইনুল আলমের কথা। তাঁর সাম্প্রতিক কাজ ‘ঠিকানা’। এ নিয়েই চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে থাকলো প্রাসঙ্গিক আলাপচারিতা:

পড়াশোনা চারুকলা নিয়ে, আলোকচিত্রে কীভাবে প্রবেশ?
ছবি তোলাটা আমার কাছে ছবি আঁকার মতোই মনে হয়। চারুকলায় পড়ার সময়টা অনেক কিছুই শিখিয়েছে। রং, ফর্ম, আলোছায়া, বিশেষত কম্পোজিশন থেকে জীবনের মূল্যবোধ পর্যন্ত গড়ে দিয়েছে সেই সময়টা।

বিজ্ঞাপন

আলোকচিত্রের সঙ্গে কত বছরের সম্পর্ক?
দেশের অগ্রজ ও বরেণ্য আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেনের কাছ থেকে একটা পুরোনো এবং প্রায় নষ্ট ক্যামেরা কিনে প্রথম পথ চলা, ১৯৯৫-৯৬ সালের দিকে। অবশ্য তারও বছর পাঁচেক আগ থেকে টুকটাক ছবি তোলা হতো সময়ে-সুযোগে, অন্যের ক্যামেরা বা লেন্স ধার করে।

বিজ্ঞাপন

আলোকচিত্রের সঙ্গে চিত্রকলার মূল পার্থক্য কী, যে-পার্থক্য খুব আকর্ষণীয় মনে হয়?
চিত্রকলার সঙ্গে আলোকচিত্রের তেমন কোনও পার্থক্য দেখি না। শিল্পের প্রতিটি ক্ষেত্রই এক, অভিন্ন, একসূত্রে গাঁথা। শুধু প্রকাশটা ভিন্ন-ভিন্ন। ভিন্নতার কারণ এটুকু বুঝি যে আলোকচিত্র হচ্ছে মুহূর্তের দ্রুততম প্রকাশ।

আলোকচিত্রে আপনার কম্পোজিশন আলাদাভাবে চোখে পড়ে। তা কি চারুকলার জ্ঞান থাকার কারণে, না অন্য কোনওভাবে প্রাণিত?
সবক্ষেত্রে চারুকলাই সমৃদ্ধ করেছে। আমার যা-কিছু গ্রাফিক্সের কাজ, তার যৎসামান্য জ্ঞানই চারুকলার মাধ্যমে পাওয়া।

প্রিন্ট মিডিয়াতেও আপনার দক্ষতার কথা জানি। সে-অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলুন…?
এখানেও চারুকলার অবদান। গ্রাফিক্সের কাজ করতে করতেই প্রিন্টিং-বিষয়ক যতটুকু যা জানি তা আয়ত্তে এসেছে। প্রিন্ট মিডিয়ায় নান্দনিকতাকে উপেক্ষা করার কোনও সুযোগ নেই, ফলে সেখানে শিল্প-চিত্রকলার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তাই সেটিও ধীরে-ধীরে আমার কাজের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

ছবি তোলার ক্ষেত্রে পরিবেশের ভূমিকা কতখানি? ঘটনাবহুল একটি পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ, না কি যে-কোনও পরিবেশেই ক্যামেরার পিছনে দুটি চোখের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ?
ছবি তোলার ক্ষেত্রে পরিবেশ সবসময় প্রধান নয়, যে-কোনও পরিবেশে যে-কোনও মুহূর্তে ছবি তৈরি করতে পারাটাই প্রধান। ক্যামেরার পিছনের মানুষ, তার দুটি চোখ এবং তারও আগে প্রধান হচ্ছে তার অনুভব, অনুভূতিকে শাটার বাটন পর্যন্ত নিতে পারা।

ক্লোজ আপ শটের প্রতি কি কোনও বিশেষ দুর্বলতা আছে? কিংবা ক্লোজ আপ শট নির্বাচনের পিছনে আপনার কোনও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আছে কি? এক্ষেত্রে কম্পোজিশনের ব্যাপারে কোন্ বিষয়টি মাথায় রেখেছেন বিশেষভাবে?
আলাদা করে ক্লোজ আপ শটের প্রতি কোনও দুর্বলতা নেই, তবে কম্পোজ করার সময় নান্দনিক ব্যাপারটা মাথায় রাখার চেষ্টা করি সবার আগে। মনের মতো না হলে বিমর্ষ হয়ে পড়ি।

একটি সার্থক ছবির বৈশিষ্ট্য কী বলে মনে করেন?
ছবি তখনই সার্থক রূপ পায়, যখন তার ব্যঞ্জনা অনুভূতিকে নানাভাবে নাড়া দেয়।

একদিকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আপনার ছবির বিষয় হয়েছে, অপরদিকে প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গকে মূল বিষয়ে পরিণত করে ছবি তুলেছেন। উদাহরণ হিশেবে সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে নির্মিত আপনার ছবি ‘মৌনের পথরেখা’র কথা বলা যায়। ভবিষ্যতে কী ধরনের কাজের কথা ভাবছেন?
কাজ করার সময় মানুষের খুব অল্প আসলে। সবাই যদি সময়গুলোকে ঠিকঠাক কাজে লাগাতে পারত তবে হয়তো পৃথিবী অনেক সমৃদ্ধ হতো। ভবিষ্যতে ভিন্ন-ভিন্ন আঙ্গিকে নানা ধরনের কাজ করার আগ্রহ আছে। হঠাৎ মনের মধ্যে কী ধরনের কাজের ভাবনা ঘুরপাক খাবে তা আগে থেকে বোঝা যায় না, কিছু-না-কিছু তো তৈরি হবেই।

উট নিয়ে আপনার ভিজ্যুয়াল আর্ট ফিল্ম ‘ঠিকানা’র ভাবনা কী করে এল?
দীর্ঘদিন থেকে ইচ্ছে ছিল রাজস্থানের পুষ্করে উটমেলা দেখতে এবং ছবি তুলতে যাব। গত বছরের শেষের দিকে সুযোগও হয়ে গেল। প্রথম দেখাতেই অনুভূতি হলো, এত বর্ণাঢ্য একটা মেলা, অথচ তার বিপরীতে যে-প্রাণীগুলোকে উপজীব্য করে এই মেলা সেই প্রাণীগুলোর কেমন যেন এক করুণ বিবর্ণ দশা! ঠিক ওই সময়টাতেই আবার অস্ট্রেলিয়ায় হাজার-হাজার উট নিধন করার সরকারি ঘোষণা এল। এসব মিলিয়ে মনে যে-তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলো ‘ঠিকানা’য় তা ধরে রাখার চেষ্টা করেছি।

আবহসংগীত নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোন্ ব্যাপারটি মাথায় রেখেছেন?
রাজস্থানের ঐতিহ্যবাহী যন্ত্রসংগীতের ধ্বনি সরাসরি ক্যামেরায় ধারণ করা যার অংশবিশেষ ছবিতে ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া বাঁশি ও বহুল ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র রাবাব বাজিয়ে করুণ মূর্ছনা ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি। বাঁশি ও রাবাব বাজিয়েছেন চট্টগ্রামের দুজন শিল্পী: বাদল দাশ ও সুনীলকুমার দাশ।

করোনার এই সময়ে নিরাপদেই আছেন প্রত্যাশা করি। এই সময়টাকে আপনার ক্যামেরা কীভাবে দেখছে?
মরণঘাতী করোনা ভাইরাসের কারণে যদি একটি মানুষেরও মৃত্যু না হতো, তাহলে আমি খুশি থাকতাম। কারণ আমি প্রকৃতি-প্রেমী এবং শ্বাস টানতেই বুঝতে পারছি প্রকৃতি কতোটা নির্মল হয়ে উঠেছে গত কিছুদিনে। প্রকৃতি এবং এ-র প্রাণীরা এই অপার সুখ ভাগ করে নিচ্ছে। আর এই রূদ্ধ সময়ে আমি এই নির্মল প্রকৃতি এবং তার প্রাণীদের ছবিই তুলে রাখছি আমার ক্যামেরায়। এই করোনাকালে ছবি তুলতে গিয়ে আমি যেটা অবিষ্কার করলাম, তা অভূতপূর্ব! শহুরে পরিবেশে, কাকের কর্কশ কণ্ঠ শোনা কান, ছেলেবেলার শোনা সে-ই সব পাখির ডাক আবারও শুনতে পাচ্ছি, গাছেদের সে-ই সবুজ সজীবতায় চোখ জুড়িয়ে আসছে। কাজেই আমি মনে করি, আশা করি মানুষ সচেষ্ট থাকবে এই পরিবেশটা ধরে রাখতে।