চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

চৌর্যবৃত্তির অপ্রকাশিত রূপ

চৌর্যবৃত্তি শব্দটি মার্জিত, এর আমজনতার অর্থ চুরি। ব্যাপারটি নিছক মন্দ নয়, যদি তা হয় মন চুরি! প্রসঙ্গটি মূলত আসছে আমাদের জ্ঞানরাজ্যে ও শিক্ষায় যে ভয়াবহ প্লাজিয়ারিজম বা জাল হচ্ছে, তা নিয়ে। সম্প্রতি গণমাধ্যমে এ নিয়ে বিস্তর কথা হচ্ছে। আমি দু-একটি বহুল আলোচিত চৌর্যবৃত্তির ঘটনা নিয়ে সঙ্গতিপূর্ণ কিছু বিষয় উত্থাপন করেছি এখানে।

কিছুদিন পূর্বে ঢাবির ফার্মেসী বিভাগের এক শিক্ষক যখন তার পিএইচডি থিসিসের আটানব্বই শতাংশই অন্য আরেকজন থেকে মেরে দিলেন এবং সুপারভাইজার তা অনুমোদন করলেন, তখন থেকেই জ্ঞান ও শিক্ষায় চুরি কথাটি অন্য মাত্রায় আলোচিত হচ্ছে। এসব ঘটনা অত্যন্ত লজ্জার এবং আমাদের জ্ঞানভিত্তিক জাতিগঠনের বিরুদ্ধে। ব্যাপারটি ঢালাওভাবে না হলেও এখানে যে অনেকাংশে ঘটছে তা দু-একটি উদাহরণের মাধ্যমে দেশবাসীর প্রত্যক্ষগোচর হলো।

বিজ্ঞাপন

কবে থেকে শুরু হলো এই জাল চর্চা? এটি এখন অনেকের অনুসন্ধিৎসুর বিষয়! মোদ্দাকথা যদি বলা হয়, তা এক কথায় বর্তমান ভোগবাদী সমাজে দ্রুত বৈষয়িক উন্নতিই লক্ষ্য। শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চাও এর সাথে পিছিয়ে থাকবে কেন?

এক নজরে বিশ্বসভায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়
QS এর সর্বশেষ র‌্যাংকিং অনুযায়ী (দ্য ঢাকা ট্রিবিউন, ০৬/০৬/২০২০) বিশ্বের শীর্ষ এক হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের দুটি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), শেষ দু’শোর মধ্যে (৮০০-১০০০) স্থান করেছে এবং বাংলাদেশের একটিমাত্র বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় দুটি সাবজেক্ট ক্যাটেগরিতে (নর্থসাউথ, সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার,২৪/০৯/২০২০) ৪০০-৬০০ এর মধ্যে র‌্যাংক করেছে।

যেখানে একাডেমিক রেপুটেশন এর মধ্যে রিসার্চ এবং রিসার্চ সাইটেশন (যেমন খ্যাতনামা: Elsevier’s Scopus ও Mendeley ডাটাবেস) প্রধান বিবেচ্য বিষয়।

অতএব, বোঝাই যাচ্ছে যে, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলিতে মৌলিক গবেষণা কী পরিমানে হয়!

প্লাজিয়ারিজম ধরার সফটওয়্যার এবং এর সীমাবদ্ধতা
উল্লেখ্য যে, প্লাজিয়ারিজম নিয়ে সচেতনতা আমাদের দেশে কিছুদিন পূর্বে শুরু হয়েছে কেবল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তিন বৎসর পূর্বে অন্যের লেখা জাল বা প্লাজিয়ারিজম ধরার সফটওয়্যার এর প্রচলন শুরু করে, তাও অভিযোগের ভিত্তিতে।

এখানে কথা হচ্ছে, সরাসরি বা পরোক্ষ অথবা অনিচ্ছাকৃতভাবে হোক, অন্যের লেখা উদ্ধৃতি নিয়ে লেখা একটি সাধারণ স্বীকৃত বিষয়।

সফটওয়্যার ইন্টারনেটে পূর্বে প্রকাশিত ডাটা বা তথ্যের সাথে মিল করে চেককৃত ডকুমেন্টস এর বাক্য ও শব্দের প্লাজিয়ারিজম এর একটি হার দেখায় (এ রকম একটি ফ্রি সফটওয়্যার হলো- www.edubirde.com)

কিন্তু নব্য তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থায় কোন লেখার শব্দগুলিকে সমার্থক শব্দ ও প্রয়োজনীয় গ্রামার পরিবর্তন করে নতুন আঙ্গিকে তৈরি করার সিস্টেম ও বের হয়েছে (যেমন: www.free-article-spinner.com)। এতে করে পরিবর্তিত লেখাটির প্লাজিয়ারিজম ধরার কোন সুযোগই নেই।

তাহলে কী প্লাজিয়ারিজম ধরার কোনো উপায়ই থাকছে না? 
কথা ঠিক সেরকম শুনালেও বর্তমান প্রযুক্তি ব্যবস্থায় এর সমাধানের পথ বিশ্বের কিছু প্রতিষ্ঠান করেছে বটে। আমাজনের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠান স্পিনকৃত কন্টেট ধরার জন্য নিজস্ব ব্যবস্থায় উন্নতমানের সফটওয়্যার প্রবর্তন করেছে।

ইন্টারনেটে এ ধরণের কিছু টুলস পাওয়া যায়(যেমন: www.jetchecker.com), তবে এগুলো ঠিক কার্যকর না।

বিজ্ঞাপন

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে- আমাদেরও কি সেরকম ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে? সেটি আমাদের শিক্ষাপ্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা ভেবে দেখবেন!

চৌর্যবৃত্তি ধরার নতুন চ্যালেঞ্জ এবং নৈতিকতা
ভবিষ্যতের দিনগুলিতে জ্ঞানের রাজ্যে চৌর্যবৃত্তি এবং তা ধরার জন্য কী নিয়মিতই আমাদের সিস্টেম এর উপর নির্ভর করে যেতে হবে?

সময় এর সঠিক জবাব দিবে।

‘থিংকিং ওভার থিংকিং’ একটি আলোচিত শব্দ বিশ্বের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে। যেখানে বিদ্যমান কোনো গবেষণা নিয়ে নব্য গবেষকরা নতুন আইডিয়া প্রবর্তন করেন।

উল্লেখ্য যে, আমাদের গবেষকরা অন্যের লেখার রেফারেন্স দেওয়ার সাধারণ সৌজন্যবোধটুকু দেখাতে অনীহা প্রকাশ করেন।

গণমাধ্যমে খবর এসেছে ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলো বর্তমানে পিএইচডিকে আরামদায়ক করেছে! মাত্র এক থেকে দেড় বছরে ঘরসংসার করে কেউ কেউ পিএইচডি সম্পন্ন করে ফেলছেন!(শিক্ষা ছুটি না নিয়েই!) আর যেনতেনোভাবে অনেকে পাবলিকেশন করেন প্রমোশন পাওয়ার উদ্দেশ্যে।’

আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম এর উপর একজন গবেষক (ড. তাহা ইয়াসিন)তার পিএইচডি থিসিস আট বছরে সম্পন্ন করেছেন, এরকম উদাহরণও অনেক আছে নিশ্চয়ই!

জ্ঞান ও গবেষণায় এরকম চৌর্যবৃত্তি ও নৈরাজ্য ভবিষ্যত গবেষকদের মারাত্মকভাবে নিরূসাহিত করবেই শুধু নয়, তা বর্হিবিশ্বে বদনামও কুড়োবে।

কিছু প্রস্তাবনা
* সমস্ত প্রকাশনা অনলাইনে প্রকাশের বাধ্যবাধকতা করতে হবে।
* প্লাজিয়ারিজম ধরার গতানুগতিক টুলস এর বিকল্প ও প্রয়োজনে নতুন সফটওয়্যার উদ্ভাবনের কথা ভাবতে হবে।
* প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাটাবেস ও কেন্দ্রীয়ভাবে দেশীয় গবেষকদের গবেষণার ডাটা সেন্টার তৈরি করা যেতে পারে।
* বিশ্ববিদ্যালয়ে ও কলেজ পর্যায়ে অনার্স ও মাস্টার্স পর্বে থিসিস বিষয়টি এর আওতাভূক্ত করতে হবে। যাতে করে প্রাথমিক পর্যায়েই নতুন মিনি রিসার্চচাররা শিক্ষা লাভ করতে পারে। বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলিতে সবার জন্য থিসিস/টার্ম পেপার এর যে বিধানটি রয়েছে, তা পরিবর্তন করে নির্দিষ্ট কিছু শিক্ষার্থীদের জন্য রাখার ব্যবস্থা সুপারিশ করছি।

সর্বোপরি, যে উদ্দেশ্যে লেখা, সেই মূল গবেষকরা উন্নত দেশগুলির ‘রিসার্চ এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ এর ধারণায় চালিত হয়ে চৌর্যবৃত্তি পরিহার করে আসল বাস্তবমুখী জ্ঞান বিশ্বের সামনে তুলে ধরবেন এই প্রত্যাশা দেশবাসীর।

বর্তমানে অগ্রসরমান অর্থনেতিক উন্নয়নের সাথে তাল রেখে জ্ঞানরাজ্যে প্রভাব বিস্তারও একান্ত জরুরি। আর এর মাধ্যমেই প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছাতে শিক্ষা ক্যাটেগরিতে শিক্ষাপ্রশাসন ও শিক্ষাঙ্গন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)