চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

চেপ্টি বেটি যা পারে, আমরা তা পারিনা কেন?

হ্যাদলা আর গ্যাদলা দুই ভাই । অভিনব নাম হলেও এরা কিন্ত গল্পের কোন চরিত্র নয়, বাস্তবেই আছে । দেশের বাড়ি নীলফামারি জেলার খাটুরিয়ায় গিয়ে দেখা হল হ্যাদলাদার সাথে । ওর প্রকৃত নাম যে কী আমরা তা জানিনা । বাপ চাচারা ডাকতো হ্যাদলা ব্যাটা বলে, আর আমরা ডাকি হ্যাদলাদা । ওর ভাই গ্যাদলা, আমরা ডাকতাম গ্যাদলা দা ।

হ্যাদলা দা এসে মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসলো । চেহারাতে বেশ দু:খ দু:খ ভাব। জিজ্ঞাসা করলাম কী বাহে তোর মনটা খারাপ ক্যানে ? বলল, “ আর কইন্যা, মোর পরিবার চেপটি মোক আর মাইনবার চাছেনা।”

আমি জানতে চাইলাম চেপটি কী ? বলল, “মোর পরিবার । মোর বউয়ের নাম চেপটি।” কারো নাম যে চেপটি হতে পারে, ভাবাই যায়না !!

হ্যাদলাদা চেপটি সম্পর্কে তার অভিযোগ বলেই চলল, “ওমরালা মোক আর সোয়ামি হিসাবে গ্রাহ্যি কারে না, মান্যি গন্যিও কারেনা। সারাক্ষণ বিড়ি ফুকেছে। নামাজ, ওজা নাই। মায়াছইল বেটাছইল মাইনসির নাকান কাম কাইজ করে। বেটা ছেলের নাকান চলাফিরাও করে।” জানতে চাইলাম ও ব্যাটাছেলের মতো কী কাজ করে? বলল, “ এনজিও কারে। ঐ এনজিও’র হয়া আস্তাত গাছ লাগায়, ক্ষেতের কাজ কারে। ট্যাকা কামাই কারে বলে ওমরালার কাছোত বড় ছোট কোন দিগজ্ঞান নাই। মাইয়া ছাওয়াল হইছে কিন্তুক কোন পর্দা পুসিদা নাই।”

অনেকক্ষণ কথা বলে বুঝলাম স্ত্রীর এই বাইরে কাজ করাটা এবং আয় করে নিজের পায়ে দাড়াঁনোটা হ্যাদলাদার পছন্দ হয়নি । স্বামীর কথা অনুযাযী ধর্ম কর্ম না করা এবং হ্যাদলাদাকে গুরুত্ব না দেয়াই চেপ্টি বেটির অপরাধ । অবশ্য হ্যাদলাদাকেইবা দায়ী করি কিভাবে ? বহু শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত তথাকথিত প্রগতিশীল পুরুষও হ্যাদলাদার মত এমনটাই ভাবে ।

Advertisement

চেপ্টির কাছে যখন জানতে চাইলাম সে কেন হ্যাদলাদার কথা শোনেনা ? চেপ্টি পরিস্কার জানিয়ে দিল, “মোর কাছোত কাম আগত । খায়া দায়া, ছেলে ছোট নিয়া নিজে বাচিঁম, নাকি ওমারলার কথা শুনি ঘরত সেন্দে থাকিম? মুই একটা মাইনসি, মুই ক্যানে কাম কারিমনা ? কাম কাইজ করি মুই সংসার চালাই, ছাওয়া পাওয়াক পড়ােশুনা করাই ।

অথচ অনেক বছর আগে আমি দেখেছি আমার ডাক্তার বোন কীভাবে ডাক্তারি বিদ্যা ভুলে পুরোপুরি স্বামীর উপর নির্ভরশীল হয়ে গেল ? দেখেছি আজ থেকে ২৫ বছর আগে বেক্সিমকো গ্রুপের একটি উচুঁ পদে চাকরিরত আমার আরেক বোনকে ‘স্বামী চায়না’ বলে চাকরি ছেড়ে দিয়ে গৃহবন্দী হতে এবং পরে স্বামীর হাতেই দিনের পর দিন নিপীড়িত হতে । চলমান ব্যবসা বন্ধ করে দিল আমার ভাবী। কারণটা সেই একই, আমার ভাই চায়না যে ভাবী কাজ করুক । অফিস থেকে ঢাকার বাইরে মাঝেমাঝে যেতে হয় বলে আমার বন্ধুকে এনজিও’র ভাল চাকরি ছেড়ে দিতে হয়েছে । বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েও হাতছাড়া করতে হল আমার এক ভাগ্নীকে, কারণ শ্বশুরবাড়ি রাজী নয়।

এরকম বহু বহু উদাহরণ আছে আমাদের সামনে। শহরের শিক্ষিত নারীকেই যদি এই বাধার মুখে পড়তে হয়, তাহলে গ্রামের পড়াশোনা না জানা, হতদরিদ্র চেপ্টি বেটির অবস্থা কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।

কিন্ত সবচেয়ে সুখের কথা হল, চেপ্টি বেটি পরাজিত হয়নি। স্বামীর অযাচিত মাতবরি সে মেনে নেয়নি। মাথা নত করে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারেনি। বরং শেষপর্যন্ত আমাদের হ্যাদলা দাকে বোঝাতে পেরেছিল নারীকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিলে আখেরে লাভ বই ক্ষতি হয়না।

আজ আমরা অনেকে শিক্ষিত হয়েও যা করতে পারছিনা, পরাজয় মেনে নিচ্ছি। চেপ্টি বেটি তা করতে পেরেছে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)