চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

চেনা আমু, অচেনা আরেফ

এ বছর একুশের বইমেলায় প্রকাশিত হয় শামসুদ্দিন পেয়ারা লিখিত ‘আমি সিরাজুল আলম খান: একটি রাজনৈতিক জীবনালেখ্য’ শিরোনামে আলোচিত একটি বই। বইটি রাজনীতির প্রবাদপুরুষ এবং রহস্যময় চরিত্র হিসেবে খ্যাত এবং স্বাধীনতার পরপরই জাসদ নামে নতুন রাজনৈতিক দলের নির্মাতা সিরাজুল আলম খানের বয়ানে লেখা। বাংলাদেশের স্বাধীকার আন্দোলন ও সংগ্রামের এক দীর্ঘ অজানা ইতিহাসই মূলত বইটির মূল উপজীব্য। বইটিতে রাজনীতির নেপথ্যচারী  সিরাজুল আলম খানের স্ব-বয়ানে ৬০ দশকে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে ‘নিউক্লিয়াস’-এর কর্মকাণ্ড, ৬ দফা আন্দোলন, ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদান, ‘জয়বাংলা’ শ্লোগান তৈরি, স্বাধীন দেশের পতাকা ও স্বাধীনতার ইতিহাস তৈরি, ৭ মার্চের ভাষণ-এসব বিষয়ে নেপথ্যের অনেক অজানা বা ইতিহাসের নিচে লুকিয়ে থাকা ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।

কয়েকদিন আগে এই বইটি নিয়ে দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে কয়েক কিস্তি সাক্ষাৎকার দেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দুই বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ এবং আমীর হোসেন আমু। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন জনপ্রিয় সিনিয়র সাংবাদিক পীর হাবিবুর রহমান। আওয়ামী লীগের দুই বর্ষীয়ান নেতাই সিরাজুল আলম খানের জীবনালেখ্য বইটির বিভিন্ন ঘটনা, তথ্যের তীব্র বিরোধীতা করেন। দু’জনই সিরাজুল আলম খানের নিজস্ব বয়ানকে চরম মিথ্যাচার বলেও অভিহিত করেন। তবে  সিরাজুল আলম খান বরাবরের মতেই রহস্যময়তা ধরে রেখেছেন। তোফায়েল আহমেদ এবং আমীর হোসেন আমুর বক্তব্যের কোনো আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক কোনো প্রতিবাদ করেননি। জাসদের কোনো অংশ বা জাসদের জীবিত নেতাদের কেউও প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ এবং আমীর হোসেন আমুর দেওয়া বক্তব্য সেই অর্থে চ্যালেঞ্জ করেনি। 

বিজ্ঞাপন

তবে ২২ জুন ২০১৯, শনিবার প্রকাশিত বাংলাদেশ প্রতিদিনের ১ম পৃষ্ঠার ৮ নম্বর কলামে পীর হাবিবুর রহমানের ইতিহাসের মুখোমুখি আমির হোসেন আমুর জবানীতে “রাজ্জাক তো সিরাজের বিরোধীতা করেছিলেন, অচেনা আরেফকে নিয়ে নিউক্লিয়াস হয় কী করে?” শীর্ষক প্রতিবেদনটি রাজনৈতিক মহলে সবার দৃষ্টিগোচর হয়। জাসদ দলীয়ভাবে  আমির হোসেন আমুর এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করে। জাসদ আমির হোসেন আমুর বক্তব্যের প্রতিবাদে বলে-২২ জুন বাংলাদেশ প্রতিদিনে আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর সাক্ষাৎকারে জাতীয় বীর বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম-স্বাধিকার সংগ্রাম-স্বাধীনতা সংগ্রাম-মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক কাজী আরেফকে অচেনা কাজী আরেফ বলে কটাক্ষ করার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা করছি।

আমরা মনে করি, যাদের ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বল অবস্থান নেই তাদের কাছেই কাজী আরেফ অচেনা। আমীর হোসেন আমুর কাছে কাজী আরেফ আহমেদ অচেনা হলেও আজকের প্রধানমন্ত্রী ৬০ দশকে ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের অন্যতম নেত্রী ও ৬৬-৬৭ শিক্ষাবর্ষে ইডেন কলেজ ছাত্রী সংসদের নির্বাচিত ভিপি শেখ হাসিনা খুব ভাল করেই কাজী আরেফকে চিনতেন, তার ভূমিকা সম্পর্কে জানতেন। তাই ১৯৯৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি কাজী আরেফ আহমেদকে হত্যার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কাজী আরেফ আহমেদের কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা কবরস্থানে সমাধিস্থ করার নির্দেশ দেন এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাজী আরেফ আহমেদের মৃত্যুবার্ষিকীতে বাণী দিয়ে আসছেন।

কাজী আরেফ আহমেদ ১৯৬০ সালে জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। সে বছরই তিনি পূর্বপাকিস্তান ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৩ সালে ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা ঘোষণা করলে এ সময় ছাত্রলীগ ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি কাজী আরেফ আহমেদ সর্বপ্রথম ৬ দফার সমর্থনে ঢাকায় মিছিল বের করেন। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের সদস্য ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

বিএলএফ/মুজিব বাহিনীর দক্ষিণ অঞ্চলীয় কমান্ডের ব্যারাকপুরস্থ হেড কোয়ার্টার থেকে অধিনায়ক তোফায়েল আহমেদ, উপ অধিনায়ক নুর আলম জিকুর সাথে মিলে বিএলএফ/মুজিব বাহিনীর গোয়েন্দা প্রধান কাজী আরেফ আহমেদ হাজার হাজার গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাকে পরিচালনা করার পাশাপাশি বিএলএফ/মুজিব বাহিনীর চারটি অঞ্চলের অধিনায়ক ও উপ অধিনায়কদের সাথে সমন্বয় করেছেন। স্বাধিকার-স্বাধীনতা সংগ্রাম-মুক্তিযুদ্ধে প্রকাশ্যে সামনের কাতারে দাঁড়িয়ে কাজী আরেফ আহমেদ যে বীরত্বপূর্ণ দুঃসাহসিক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন। ৬০ দশকের ছাত্রলীগের হাতে গোনা গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতার মধ্যে অন্যতম কাজী আরেফ আহমেদকে অচেনা বলা বা না চেনার ভান করা সেই সময়ে কোনো ছাত্রলীগ নেতা বা কর্মীর জ্ঞানপাপ ও মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। আর সত্যি সত্যি না চিনে থাকলে বলতে হয়, তিনি আর যাইহোক মন দিয়ে ঐ সময় ছাত্রলীগ করেননি বা ছাত্রলীগে থাকলেও মনে মনে পাকিস্তানপন্থী ছিলেন যার কাছে শুধু কাজী আরেফ আহমেদই নয় পুরো ছাত্রলীগই অচেনা ছিল।

কাজী আরেফ আহমেদ বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে চির উজ্জ্বল ধ্রুবতারা। বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম-স্বাধিকার সংগ্রাম-স্বাধীনতা সংগ্রাম-মুক্তিযুদ্ধে তার কিংবদন্তীতুল্য অবদান অস্বীকার করা মানেই জাতির সবচাইতে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকেই অস্বীকার করা। স্বাধীন বাংলাদেশেও জাসদ গঠন করে সমাজবিপ্লবের লক্ষ্যে বিপ্লবী সংগ্রাম পরিচালনা করা, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ শক্তির দ্বন্দ্বকে রাজনীতির প্রধান দ্বন্দ্ব হিসাবে নির্ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য ও সামরিক শাসন-সাম্প্রদায়িকতা-ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-অসাম্প্রদায়িকতা-ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনা ধারণ করে ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক সংগ্রামের মৌলিক রাজনৈতিক তত্ত্ব ও রাজনৈতিক লাইন বিনির্মাণ করেন। তার এই রাজনৈতিক তত্ত্ব ও লাইনের ভিত্তিতেই ১৯৮০ সালে জিয়ার বিরুদ্ধে ১০ দলীয় ঐক্য জোট, ১৯৮৩ সালে এরশাদের বিরুদ্ধে ১৫ দলীয় ঐক্য জোট, ১৯৯২ সালে ঐতিহাসিক গণ আদালত এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও জামাত নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলন গড়ে উঠে। এসব কিছু জানার পরও তার সমসাময়িককালের একজন রাজনীতিক কর্তৃক তার প্রতি কটাক্ষ অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ধরনের নিম্নরুচি ও ইতিহাসকে অস্বীকার করার অপচেষ্টা স্বাধীনতা বিরোধীদের খুশি করবে মাত্র।

আসলেইতো বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন কাজী আরেফ আহমেদ যেমন অচেনা, তেমনি খুবই চেনা রাজনীতিবিদ আমির হোসেন আমু। আওয়ামী লীগের এই বর্ষীয়ান নেতা আমির হোসেন আমু মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সাবেক মন্ত্রী। এ কথা সত্য, ক্ষমতার জন্য তথাকথিত রাজনীতিবিদদের যে আচরণ ও বেশভূষা আয়ত্ত করতে হয়, কাজী আরেফ আহমেদ-এর জীবনাচারণে তা ছিল না। তিনি বরাবরই ছিলেন মিতভাষী, মিতব্যয়ী, সুনিয়ন্ত্রিত, নির্লোভ এবং আত্মত্যাগী। সাদাসিধে জীবনে অভ্যস্ত এই রাজনীতিবিদ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ নির্মাণের কথাই ভাবতেন এবং সেভাবেই কাজ করতেন। ৯১ সালে খালেদা জিয়ার আমলে ঐতিহাসিক গণ আদালত গঠনে কাজী আরেফ আহমেদ-এর ভূমিকা কী ছিল তা ইতিহাসই বলবে। এরকম আরও অনেক অনেক উদাহরণ আছে।

শ্রদ্ধাভাজন নেতা আমির হোসেন আমু জীবনের শেষবেলায় এসে জাতীয় বীর কাজী আরেফ আহমেদ-এর বিরুদ্ধচারণ করতে গিয়ে যা বলেছেন সেটা যে ইতিহাসে কোনোদিন গ্রহণযোগ্য হবে না তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। তবে ইতিহাসে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আমির হোসেন আমু কী কারণে এখনও বড় বেশি চেনা হয়ে আছেন তা কিন্তু কারো অজানা নেই। সেই কলঙ্কের দায় তিনি এবং আওয়ামী লীগ কোনোদিন মুছে ফেলতে পারবেন না। বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ সরকার শুধু তার জীবদ্দশায় লবণ কেলেঙ্কারির ক্ষতের কারণে রাজনীতির মনস্তত্ত্বতে কতোটা পিছিয়ে পড়েছিল, এখনও সেই কেলেঙ্কারি কতোটা যন্ত্রণার উদ্রেক করে তা জননেত্রী শেখ হাসিনাই ভাল বুঝেন। রাজনীতির ইতিহাসে একজন কাজী আরেফ আহমেদ অচেনা হয়েই থাকুক, আপত্তি নেই। ইতিহাসই একসময় বলবে কে চেনা আর কে অচেনা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)