চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে যত কথা

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আমন্ত্রণে ১ জুলাই চীন যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চীন ও বাংলাদেশের জনগণ প্রাচীনকাল থেকেই পরস্পরের ভালো প্রতিবেশী ও বন্ধু। চীনের ফাহিয়েন ও হিউয়েন সাং বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের সন্ধানে এ অঞ্চলে এসেছিলেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশের অতীশ দীপঙ্কর চীনে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করেছেন। চীনের মিং রাজবংশ আমলের সমুদ্রচারী চাং হো-ও দুবার বাংলা সফর করেন।

গত শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তৎকালীন চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই দু’বার ঢাকা সফর করেন। বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও সে সময় দুইবার চীন সফর করেন। তাই, দুই দেশের বন্ধুত্ব সুদীর্ঘকালের।

বিজ্ঞাপন

চীন-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার অনেক আগেই দুই দেশের প্রবীণ নেতারা মৈত্রী বৃক্ষের চারাটি রোপণ করেছিলেন। যার শিকড় আজ অনেক গভীরে প্রথিত হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের একটা ধারণা চীনের সঙ্গে বিএনপির ঘনিষ্ঠতা বেশি। কূটনীতি ও দেশের সঙ্গে দেশের সম্পর্ক একটি পরিবর্তনশীল বিষয়। এটা কখনো এক জায়গায় আটকে থাকে না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালে চীন সফর করেন এবং একই বছর তৎকালীন চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ সফর করেন। পরবর্তীতে, ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ সফর করেন এবং এই সফরের মাধ্যমেই বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। এরই ধারাবাহিকতায়, ২০১৭ সালকে ঘোষণা করা হয়েছে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রীবর্ষ।rz

আগামী এক থেকে দেড় দশকে চীন বাংলাদেশের জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ খাতে ৫ হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ করবে বলে সম্প্রতি আশা প্রকাশ করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। চীন মনে করে সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন চীন বাংলাদেশের এক নম্বর বিনিয়োগকারী দেশে পরিণত হবে। বর্তমান সরকারের সময়ে বাংলাদেশ-চীনের সম্পর্ক যে অন্য মাত্রায় পৌঁছেছে তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। বর্তমানে বাংলাদেশের বড় বড় স্থাপনার নির্মাণের কাজ করছে চীন। এছাড়াও সামরিক ক্ষেত্রে চীন-বাংলাদেশের সম্পর্ক পৌঁছেছে অন্য মাত্রায়।

বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের এই বাণিজ্যিক সম্পর্কের ব্যাপারে ভারতের আপত্তি না থাকলে সামরিক সহায়তা ও সাবমেরিন ক্রয়কে সন্দেহের চোখে দেখছে ভারত। বর্তমান সরকারের অন্যতম কূটনৈতিক সাফল্য হলো একইসাথে প্রতিবেশী দুই শক্তিশালী রাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা, যা অনেকটাই দুঃসাধ্য কাজ। অবশ্য এ সম্পর্কের মূল্য দিতে গিয়ে নানা সময় বাংলাদেশকে নানা ভোগান্তিতেও পড়তে হয়েছে। এসব কিছুর পরও বাংলাদেশ চায় দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে। তাই, বাংলাদেশের নানা ইস্যুতে চীনের উচিত বাংলাদেশের পাশে থেকে এই সম্পর্ককে আরো এগিয়ে নেওয়া।

বাংলাদেশ-চীনের নতুন মাত্রার এই সম্পর্ক শুধু বাংলাদেশের জন্যই গড়ে উঠেনি বরং নানা কারণে চীনেরও স্বার্থ রয়েছে বাংলাদেশের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা। বাংলাদেশ সফরকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে চীন এবং এটিই বাংলাদেশকে ঘিরে চীনের আগ্রহের মূল কারণ।

চীনা অর্থনীতি অনেকাংশে ভারত মহাসাগর দিয়ে আনা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল তাই, এই অঞ্চলে প্রভাব বাড়ানোর পাশাপাশি এর ওপর অতি নির্ভরশীলতা কমাতে চীন ভারত মহাসাগরের তীরবর্তী দেশগুলোকে বিনিয়োগ প্রস্তাব দিচ্ছে। এছাড়াও, চীনের বর্তমান চাহিদা অতিরিক্ত উৎপাদন লাঘবের জন্যও নতুন বাজার প্রয়োজন। যেহেতু ক্রয়ক্ষমতার সার্মথ্যের ভিত্তিতে এই অঞ্চল বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমারের সমন্বয়ে গঠিত উপ-আঞ্চলিক করিডর দক্ষিণ এশিয়ায় চীনা পণ্য ঢোকার জন্য সহায়ক, তাই বাংলাদেশকে আস্থায় নেওয়া চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

ব্যাপারটা হচ্ছে কৌশলগতভাবে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান, ভারতের সঙ্গে তার ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক নৈকট্য, সস্তা শ্রমের প্রাপ্যতা এবং বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি অবস্থান এসব কিছুই চীনের আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি ও ভূ-অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রী তার এই সফরে বাংলাদেশের নানা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে চীনের সাথে আলোচনা, চুক্তি সাক্ষর ও চীনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা কামনা করতে পারে, যা দুই দেশের জন্যই লাভজনক। যেমন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কারণে বাংলাদেশ এখন একটি কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যেহেতু চীন বাংলাদেশের এক নম্বর বিনিয়োগকারী দেশে পরিণত হতে চায়, তাই এই দেশের শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি চীনের জন্যও প্রয়োজ্য। কিন্তু, বাংলাদেশে প্রতি চীনের এত আগ্রহ ও বিনিয়োগ থাকার পরও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে চীন কোনো শক্ত অবস্থান নেয়নি।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অন্যতম সদস্য ও দক্ষিণ-এশিয়ার শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে চীনের নৈতিক দায়িত্ব ছিল মিয়ানমারের উপর চাপ প্রয়োগ করে রোহিঙ্গা ইস্যুর সঠিক সমাধান নিশ্চিত করা। যেহেতু এতদিনেও এ বিষয়ে চীন তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেনি তাই, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক ও বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগের বিষয়টি মাথায় রেখে, সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে, এই সফরে দু’দেশের মধ্যে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য কার্যকরী আলোচনা হওয়া দরকার।

বিশ্বব্যংকের এক হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে ৭৪-১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। চীন-ভারতের প্রতিযোগিতার এই সুযোগকে ব্যবহার করে বাংলাদেশ যেমন সুবিধাজনক মূল্যে তার প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারে তেমনি অবকাঠামো, মজুরি ও বিশাল জনশক্তি বিবেচনায় চীনের স্থানান্তারিত হালাকা শিল্পের জন্য বাংলাদেশ আদর্শ জায়গা হতে পারে। চীন “মেইড ইন চায়না ২০২৫” উদ্যোগের মাধ্যমে তার বর্তমান হালকা শিল্পকে ভারী শিল্পে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। স্বাভাবিকভাবে চীনের বিশাল হালকা শিল্প পাশের দেশগুলোতে স্থানান্তরিত হবে। তাই, বাংলাদেশে চীনের হালাকা শিল্পকে স্থানন্তর কারার বিষয়েও আলোচনা হতে পারে এই সফরে যা আমাদের শিল্পের বিকাশের সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। যেহেতু বাংলাদেশে এখন বিপুলসংখ্যক সস্তা শ্রমিক পাওয়া সম্ভব তাই, চীনের শ্রমঘন শিল্পের মালিকেরা যারা উৎপাদন চালিয়ে যেতে চান, তাদের জন্যও বাংলাদেশ শিল্প স্থানান্তরের ভালো জায়গা হতে পারে।

প্রতিনিয়তই বাংলাদেশে যেমন চীনের বিনিয়োগ বাড়ছে তেমনি চীনের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতিও বাড়ছে। এই বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে, চীনের বাজারে আরো বেশি বাংলাদেশী পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশের পাশাপাশি চীনে তৈরি পোশাক, আম, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, পাটজাত পণ্য এবং বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক খাবার রপ্তানির বিষয়ে চীনের সাথে আলোচনা করা যেতে পারে।

বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষা ও সহজে কর পরিশোধের দিক থেকে বিভিন্ন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম। আর ব্যবসা শুরু করা এবং নিকটতম প্রতিবেশীর দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। দেশে জ্বালানি খরচ প্রতিবেশী যেকোনো দেশের তুলনায় কম। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এখন বেশ জোরেশোরে বাণিজ্যযুদ্ধ চলছে। তাই বাড়তি খরচের হাত থেকে বাঁচতে মার্কিন ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান পোশাকের ক্রয়াদেশ দিতে বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকছে। চীনা পোশাকের ব্যবসা আসতে শুরু করায় ক্রয়াদেশ বাড়ছে দেশীয় কারখানায়। বাংলাদেশে চীনের পোশোকের ক্রয়াদেশ আরো কীভাবে বাড়ানো যায় সে বিষয়ে দু’দেশের ব্যবসায়ীদের মাধ্যে আলোচনা হতে পারে এবং সেক্ষেত্রে এই সফর সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।চীনের অন্যতম বড় শক্তি তাদের প্রযুক্তি। যেটির সাহায্য নিচ্ছে পুরো বিশ্ব। আমরাও প্রযুক্তিগত দিক হতে অনেকটাই এগিয়েছি এবং আরো সামনে অগ্রসর হতে চাই। যেটার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে চীন। প্রযুক্তিগত, কারিগরি ও চিকিৎসা শিক্ষায় চীন অনেক উন্নত। প্রতি বছর প্রায় তিন হাজার বাংলাদেশী শিক্ষার্থী চীনে যাচ্ছে নানা বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে। যেহেতু বর্তমান সরকার ক্রমাগত এই বিষয়ক শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব বাড়াচ্ছে তাই এই সফরের মাধ্যমে চীনে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য আরো বেশি শিক্ষাবৃত্তি নিশ্চিত করা গেলে তা আমাদের জন্য দীর্ঘকালীন সুফল বয়ে আনবে।

দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের বিশাল কর্মযজ্ঞ ও ভারতের সঙ্গে চীনের প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য অসাধারণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তাই, আমারা আমাদের এই ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগাতে পারি। বাংলাদেশকে এখন সূক্ষ্ম ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে চীনের চেকবুক কূটনীতি থেকে লাভবান হতে হবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View