চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ

আমার জানালার বাইরেও যেটুকু আকাশ, যা আমাদের দৃষ্টির সীমানার বাইরেই রয়ে গেল সে আকাশ রবীন্দ্রনাথ।

তাঁর গান, কবিতা, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য নিয়ে যতোই আলোচনা হোক, সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখনও রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ, তা কেবল ছবিকে ঘিরেই।

বিজ্ঞাপন

‘পূরবী’ কাব্যের পাণ্ডুলিপিতে নানা ধরনের বিচিত্র কাটাকুটি হঠাৎ করেই তিনি শুরু করেন। আর্জেন্টিনা আসার আগেই ১৯২৩ সালে রক্তকরবীর পাণ্ডুলিপির খসড়ার পাতায় তাঁর কাটাকুটি থেকে ছবি তৈরি করার নেশা চাপে। এমনকি তারও আগে রবীন্দ্রনাথ ছবি এঁকেছেন। তবে সে আঁকাতে কোনো ধারাবাহিকতা বজায় ছিল না। ১৮৭৮-৮২ এই সময়কালে রবীন্দ্রনাথ ‘মালতী’ নামে একটি পুঁথির পাতায় ছবি আঁকতে শুরু করেন। ১৮৮৯ সালের দিকে তিনি একটি পকেটবুক রাখতেন, তাতে যখন যা মনে হত, তাই আঁকতেন। এই তাঁর মর্জি।  আসলে রবীন্দ্রনাথ পুরোদস্তুর ছবি আঁকা শুরু করেন ১৯২৮ সালে । আমরা এখন ‘রবীন্দ্র চিত্রকলা’ বলতে যা বুঝি তা হল সেই সময় থেকে পরবর্তী দশ বারো বছরে আঁকা তাঁর আড়াই হাজারের ওপর ছবিকে।

বিজ্ঞাপন

জীবনের রবীন্দ্রনাথ নিবিড় উপলব্ধির স্মৃতি চৈতন্যের সৃষ্টি মগ্নতার এক আত্মপ্রকাশ। তিনি মরমির সাধনা খেলায় মহাজগৎ বইতে গান বেঁধেছেন প্রেমের। তিনি সহজের সহজতায় প্রেম ও বৈচিত্রকে নানা স্তরের শিল্পীত মনন, দৃষ্টির পর্যায়ক্রমিক অনুভূতি, সরল জীব ও জড় জ্ঞানের ভিতর দাঁড়িয়ে আঁকতে চেষ্টা করেছেন।

চেতন ও অবচেতনের মায়ালোকে দাঁড়িয়ে। রবীন্দ্রনাথ সৃজনী প্রবাহের অনন্য চেতনতাকে প্রকাশ্যে এনেছেন তুলির নানা রঙের মধ্য দিয়ে।

রবীন্দ্রনাথের উপর ওকাম্পোর একটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ বয়সে ‘চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ’ হয়ে ওঠাটা। রবীন্দ্রনাথ নিজেই তাঁর ছবি আঁকার শখকে উল্লেখ করেছেন ‘শেষ বয়সের প্রিয়া’বলে। জানার বিষয় হল ১৮৭৮ সালে কবি রবীন্দ্রনাথ যখন প্রথমবার ইউরোপে যান তখনই কবির ভিতর জেগেছিল ছবির ছবি!

সে বার উঠেছিল ওকাম্পোর বাড়িতেই, সেই ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থ তৈরির সময়। পাতায় পাতায় ছবি!

ওকাম্পো কবির উপর লিখেছেন – ‘ওঁর একটি ছোট খাতা টেবিলে পড়ে থাকতো, ওরই মধ্যে কবিতা লিখতেন বাংলায়। বাংলা বলেই যখন-তখন খাতাটা খুলে দেখা আমার পক্ষে তেমন দোষের কিছু ছিল না। এই খাতা আমায় বিস্মিত করল, মুগ্ধ করল। লেখার নানা কাটাকুটিকে একত্রে জুড়ে দিয়ে তার ওপর কলমের আঁচড় কাটতে যেন মজা পেতেন কবি। এই আঁকিবুঁকি থেকে বেরিয়ে আসতো নানা রকমের মুখ, প্রাগৈতিহাসিক দানব, সরীসৃপ অথবা নানা আবোলতাবোল। সমস্ত ভুল, সমস্ত বাতিল করা লাইন, কবিতা থেকে বহিষ্কৃত সব শব্দ এমনি করে পুনর্জীবিত হতো এক ভিন্ন রূপের জগতে, আমাদের দিকে তাকিয়ে যেন স্নিগ্ধ কৌতুকে হাসত তারা … এই ছোট খাতাটাই হলো শিল্পী রবীন্দ্রনাথের সূচনাপর্ব।’

কবির ছবিতে  যেমন প্রেম ও প্রকৃতি, নির্জনতার নিবিড় আশ্রয়, নারী ও মায়া, জড়ের অন্তর ভেদকেও তুলে ধরেছেন রঙের ছোঁয়াতে।

মেধা ও মগজ দিয়ে গড়েছেন যেমন, ছবির শরীরকে আধুনিক করতে ভেঙেছেনও তেমনি, জোড়ালো ভাবেই নিজেকে।

প্রতিদিনের চেনা অভ্যাসের মধ্যে দাঁড়িয়েও শিল্পী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সময়ের অক্ষর পটে ভাসিয়েছেন ভেলা। সৃজন শক্তিই তাঁকে প্রেরণা জুগিয়েছে। কখনো কবিতা, কখনো গদ্যের শরীরে, কখনো ক্যানভাসের ছবির ভিতরের নির্জনতাকে ধরার চেষ্টা।

এই চেষ্টার নেশা, পাগলপনা হলেই তিনি বুঝতে পারবেন প্রেম ও প্রেমের ভিতরে থাকা শরীরি প্রকৃতিকে। খোলামেলা এই ছবির জগতে, রবীন্দ্রনাথের বিচরণ নতুন আবিস্কারের মতো। বিস্ময়কর হলেও অপ্রত্যাশিত নয়। তাঁর রং এর রেখা আর জোরালো শিল্পীত মনের বিকাশ ঘটলো উদ্ভাবনীয় প্রতিভার স্বতঃস্ফূর্ত বিচ্ছুরণ।

শিল্প শিক্ষার ক্ষেত্রে একজন শিক্ষক না হলেও চলে, যদি তাঁর প্রকৃতি জ্ঞান থাকে। সেই সহজ সরল সত্যিটাকে উপলব্ধি করেই বিধিবদ্ধ অনুশীলনের পথে কোনো দিনই পা রাখেননি রবীন্দ্রনাথ।

রবীন্দ্রনাথের ছবির ভাষা তাই হয়ে উঠেছিল সহজ সত্যের সমাধান। তাঁর বিচিত্র প্রতিভার নানান গুণের বর্ণনা বহু দিন ধরেই বিভিন্ন গবেষক তুলে ধরার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। জীবনে অনেক পরে হলেও দর্শনের ছবি আঁকতে শুরু করেন রবীন্দ্রনাথ! ছবির শরীরেও জড়িয়ে আছে আছে কবিতার ভাষা, প্রেম ও প্রকৃতি। তাঁর আড়াই হাজারেরও বেশি আঁকা ছবিতে দর্শনের ভাবটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সাহিত্য স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথের কাছে, চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ যে ঋণী সে বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই। শেষ জীবনের সাহিত্যে যে দর্শন ফুটে উঠেছিল, রবীন্দ্রনাথের ছবির ভাষাতেও সেই দর্শন স্পষ্ট!

ভারাক্রান্ত ছবির জগতে, জৈব বিবর্তনের মতো নব্যশিল্পের আধুনিকতার যে অন্দরমহলে ছবিকে নিয়ে গিয়ে প্রবেশ করান রবীন্দ্রনাথ,  তা বড়ো আশ্চর্যের! শিল্পশিক্ষা, ভারতীয় শিল্পকলা, পশ্চিমী শিল্প, জাপানি শিল্প, পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের শিল্প, শিল্পের নানা সমস্যা, দেশবিদেশের বিভিন্ন শিল্পী সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের মনোজ্ঞ আলোচনা থেকেও পাওয়া যায় তাঁর ধারাবাহিক শিল্পের প্রতি প্রেমই চিত্রী রবীন্দ্রনাথের শিল্পের শিক্ষা।

সতেরো শতক থেকে শিল্পীদের চোখে ধরা পড়লো যৌবনা নারী তনুদেহের গরিমা। আস্তে আস্তে নানান রহস্যময় রূপ নিয়ে চর্চা করতে করতেই গ্রীক শিল্পীদের দেখার আশ্রয় সরে এলো পুরুষ দেহ থেকে নারী দেহের দিকে। বিষয় বৈচিত্র্যেও হৃদয় মাধুরি যুক্ত হতে লাগলো আস্তে আস্তে। টিশিয়ান, রুবেনস্, রেনোর, রাফায়েলের ছবিতে ছিল আবেগি তাপ। নারীদেহের মধ্যেই ধরা পড়ে নগ্নতার অপূর্ব সৌন্দর্য। তবে মানব মানবীর যে কোনো দেহকে ফুটিয়ে তোলায় হল শিল্পীর শিল্পের সখ্যতা! প্রত্যেকটি শিল্পের ভিতরে একটা বাউল থাকে, তাঁকে আবিস্কৃত তুলে ধরায় শিল্পীর আত্মসাধনা! জীবনের বিজ্ঞানে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ সেই শিল্পের চর্চায়, একজন দক্ষ শিল্পী। বিশ্বের বিখ্যাত শিল্প সমালোচকদের দৃষ্টি এখন রবীন্দ্র জীবনের শেষ জীবনের ছবি নিয়ে!