চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ
Channeliadds-30.01.24Nagod

চাকরির বদলে ভাই-বোনের ব্যবসায় আশার আলো

মৌসুমী মোশাররফ মৌ এবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা দিয়েছেন। তার ছোট ভাই মারুফ বিন মোশাররফ ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বিবিএর ছাত্র। দু’জনের পড়াশোনা প্রায় শেষের দিকে। চাকরি খোঁজার বয়স হয়ে গেছে। কিন্তু খুঁজলেই কি পছন্দসই চাকরি পাওয়া যায়? তাই দুই ভাই-বোন সিদ্ধান্ত নিলেন, নিজের মেধা ও পরিশ্রম অন্যের জন্য নয় বরং নিজেদের জন্য খরচ করবেন। যেন মেধা ও পরিশ্রমের সুফল নিজেরাই ভোগ করতে পারেন।

যেই ভাবা সেই কাজ। বাবা-মাকে জানালেন ব্যবসা করবেন। বাবা-মায়ের সবুজ সংকেত পেয়ে ভাবনায় ডুব দিলেন। কী করা যায়? মিরপুরে চাপ, কাবাব, বিরিয়ানির দোকানে সবসময় উপচে পড়া ভিড় থাকে। কোন বার্গার চেইন নেই। অথচ তরুণদের পছন্দের খাবারের শুরুর দিকেই বার্গার। চিন্তা-ভাবনা করে নেমে পড়লেন বার্গার চেইন দেওয়ার প্রচেষ্টায়।

ছয়মাস ধরে খুঁজলেন পছন্দসই জায়গা। এর মধ্যে ঢাকা শহরের নামকরা সব বার্গার চেইন শপে ঘুরে ঘুরে স্বাদ নেওয়া চলছে। দোকান পাওয়া গেল। মিরপুর এক নম্বর, সনি হলের পেছনে রাইনখোলা মোড়ের মসজিদ মার্কেটে।

মৌ ও মারুফের খুব পছন্দ হলিউড সিনেমা পাইরেটস অফ দ্যা ক্যারিবিয়ান সিরিজ। ইচ্ছা  ছিল তাদের বার্গারশপটি হবে পাইরেটি আবহে। একটা নামও ঠিক করলেন মারুফ। টরটুগা। টরটুগা হলো ক্যারিবিও দ্বীপপুঞ্জের একটি  এলাকা যেখানে সবাই যেত খাবার ও বিনোদনের জন্য। মারুফ মনে করেন, খাবার একটি স্বস্তি ও আনন্দের বিষয়। সেই থিম থেকে নাম প্রস্তাব করেন টরটুগা। বড় বোনেরও খুব পছন্দ হলো নামটা।

Reneta April 2023

নামধাম তো হলো। এবার কী করতে চাইছেন সেটা পরিবারকে বোঝাতে হবে। ফুড শপ দেবেন শুনে বাবা-মা নাক কুঁচকলেন। খাবার হোটেল? দীর্ঘ সময় লাগলো বাবা-মাকে বোঝাতে। তারা বলতে চাইছিলেন,  হোটেলই যখন দিবা, ভাত-বিরিয়ানি বিক্রি করো। এ কেমন নাম? একটা সুন্দর নাম দাও, ইত্যাদি ইত্যাদি।

বাবা-মাকে বোঝালেন দুই ভাই-বোন। এখন কী চলছে, কোনটা ট্রেন্ড। আর বললেন সন্তানদের উপর আস্থা রাখতে। বাবা-মা আস্থা রাখলেন বটে; তবে এটাই প্রথম ও শেষ সুযোগ, এমনটাও বলে দিতে দ্বিধা করলেন না।

শুরু হলো মনের মাধুরী মিশিয়ে শপটি সাজানোর কাজ। পছন্দ মতো লাইট খুঁজতেই সারা ঢাকা চষে বেড়ালেন। একপাশের দেওয়ালে আঁকা হলো ক্যারিবিও দস্যুদের ভয়ংকর সব ছবি। অন্যপাশে দৃষ্টিনন্দন, রুচিশীল পেইন্টিং। আরও কিছু  পরীক্ষণ-নিরীক্ষণের পর চালু হলো টরটুগা। ভাই-বোনের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান। নিজেরা তো চাকরি খুঁজলেনই না বরং খুঁজতে শুরু করলেন চাকরি প্রার্থী। ওয়েটার, শেফ, ম্যানেজারসহ বিভিন্ন পদে সাতজন লোক নিয়োগ দিলেন।

লোক নিয়োগ দেওয়ার অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে মৌসুমী মোশাররফ মৌ বলেন, চাকরি পাওয়া যেমন কঠিন। চাকরি দেওয়াও তেমন কঠিন। মানে সঠিক লোক খুঁজে পাওয়া যায় না। আমি হাজার খুঁজেও পছন্দসই শেফ পাই না। বাধ্য হয়ে বিডি জবস এ সার্কুলার দিতে হলো। এছাড়া মারুফ তো সারাক্ষণ কিচেনে পড়ে থাকে। রান্না দেখে দেখে এখন ও নিজেই শেফদের চেয়ে ভালো বার্গার বানায়। কাস্টমারের ভিড় থাকলে দোকানের মালিক মারুফ ট্রে হাতে হয়ে যান ওয়েটার। মারুফ বলেন, নিজের প্রতিষ্ঠানে খাটবো তার আবার লজ্জা কিসের?

মেধাবী ভাই-বোন মাত্র এক মাসের মাথায়  বুঝে ফেললেন কাস্টমার কী চায়। নির্ধারণ করলেন টার্গেটেড কাস্টমার। সেভাবেই মডিফাই করলেন খাবারের মেন্যু। খাবারের কোয়ালিটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিলেন। সেই সাথে চলল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অল্প-স্বল্প করে বিজ্ঞাপন দেওয়া।

যত দিন যায় বাড়ে কাস্টমারের ভিড়। একজন খেয়ে যায়। বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আসে। ছুটির দিনগুলোতে পরিবার-পরিজন নিয়ে আসেন অনেকে। অনলাইন সেবাদাতা দুই প্রতিষ্ঠান ‘হাংরিনাকি ডটকম’ থেকে আসতে শুরু করে হোম ডেলিভারি অর্ডার। এক কাস্টমার তো সাত কিলো দূর থেকে সাইকেল চালিয়ে চলে আসে স্পেশাল মেন্যুর লোভে। অনেকে খেয়ে দেয়ে জিজ্ঞেস করে, আপনাদের আর কোনো শাখা আছে?

এসব জানিয়ে মারুফ বলেন, প্রতিষ্ঠার মাত্র তিন মাসেই টরটুগা খরচের টাকা তুলে কাঙ্ক্ষিত লাভের মুখ দেখতে শুরু করে।

শুরুতে কপাল কুঁচকানো বাবা-মাও এখন আসেন টরটুগায়। বাবা কলিগদের নিয়ে আসেন সন্তানের ‘হোটেলে’ খেতে। মৌ-মারুফের মনে আশার আলো জ্বলতে শুরু করেছে। তারা দেখছেন বড় বড় স্বপ্ন।

মারুফ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘এখন স্বপ্ন দেখি দেশের সর্ববৃহৎ বার্গার চেইন হবে আমাদের টরটুগা। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে আমাদের বার্গারের সুনাম। বিশ্ব জানবে দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশে এত সুস্বাদু বার্গার হয়।’

‘টরটুগা বার্গারের বিখ্যাত ব্রান্ড হবে। অতি শীঘ্রই ব্যাংক লোন নিয়ে আমরা ধানমণ্ডিতে নতুন শাখা খুলবো,’ বলছিলেন মারুফ।

মৌ জানালেন, তাদের এখানে যারাই আসছে বেশিরভাগ সন্তুষ্টচিত্তে ফিরতে পারছেন। তারা একটা ধারণা নিয়ে ফিরছেন যে, টরটুগা কাস্টমারদের ঠকায় না। এছাড়া এখানকার বিশেষত্ব হলো ৭০ ভাগ রেসিপি নিজেদের আবিষ্কৃত। মারুফ নানান পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে, উপাদান বাড়িয়ে কমিয়ে এসব রেসিপি বানায়।

দুই ভাই-বোন জানালেন এই ব্যবসায় যেমন আশার আলো আছে তেমনি অন্ধকার দিকও আছে। যদি প্রজেক্টটা কোন কারণে ফেল করতো তাহলে আর উঠে দাঁড়ানো সম্ভব ছিল না তাদের জন্য। এছাড়া কাস্টমারের সন্তুষ্টি অর্জন অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। স্টাফরা চলে যায়। কেননা দেশে ভালো শেফের অনেক চাহিদা। ঘন ঘন স্টাফ চলে যাওয়াও বড় একটা সমস্যা।

নতুন যারা এধরণের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তায় আসতে চান তাদের উদ্দেশ্যে মৌ-মারুফের পরামর্শ, আগে পার্সোনাল সার্ভের মাধ্যমে বাজার ও স্থানীয়দের রুচি বুঝতে হবে। তারপর পরিকল্পনা মাফিক সময় বুঝে দিতে হবে মোক্ষম ঝাঁপ। মোটামুটি সাত লাখ টাকা হলে এমন একটি বার্গার চেইন দেওয়া সম্ভব বলে জানান মৌসুমী মোশাররফ মৌ ও মারুফ বিন মোশাররফ।