চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

চলে গেলেন রবীন্দ্রনাথের এক ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশি

সেই পুরনো ভিডিওচিত্র ও আলোকচিত্র আমাদের কাছে আছে। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে যাবো। আমি চোখে দৃশ্যটি দেখতে পাচ্ছি। শাহজাদপুর রবীন্দ্র কাচারি বাড়ির জানালার দিকে আঙুল তুলে নাছিমউদ্দিন মালিথা কবিতা পাঠ করছেন। ‘সোনার তরী’ থেকে। বলছেন, কবি এই জানালায় বসে দেখেছিলেন আকাশের চাঁদ। ‘আকাশের চাঁদ’, ‘ভরা ভাদরে’ ‘পুরস্কার’, ‘দুই পাখি’ এসব কবিতা তার এখানেই বসে লেখা।

আমরা রবীন্দ্রনাথের এক ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশিকে পেয়ে গেলাম যেন। রবীন্দ্রনাথকে তিনি সবসময়ই দেখতে পান। বললেন, কবির শ্রেষ্ঠ সব সৃষ্টি এই শাহজাদপুরেই। তারপর তিনি আমাদের নিয়ে গেলেন ছিন্নপত্র’র পাতায় পাতায়। নিয়ে গেলেন ‘পোস্টমাস্টার’, ‘ছুটি’ ‘অতিথি’ ‘সমাপ্তি’ গল্পের প্রেক্ষাপটে। নিয়ে গেলেন পল্লীপ্রকৃতির ফসল আর মাটির গন্ধের কাছে। যেন একজন ‘ওপেনটি বায়োস্কোপ’এর রবীন্দ্রনাথের সারাজীবনের চৌম্বক অংশ দেখিয়ে দিচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

রবীন্দ্র সৃষ্টির গভীরে বহুবার ঢুকেছেন নাছিমউদ্দিন মালিথা। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে জীবন কাটাবেন বলে শাহজাদপুরকেই আঁকড়ে ধরেন জীবনের রস প্রবাহের কেন্দ্র হিসেবে। চলনবিলের মৌসুমি বৈভব আর করতোয়ার প্রবাহে যে সোনার খনি পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, তার সবটাই ঢুড়ে উল্টে পাল্টে পলে পলে ছত্রে ছত্রে রসাস্বাদন করেন বাংলা সাহিত্যের অসাধারণ এক কর্মী অধ্যাপক মালিথা।

বিজ্ঞাপন

এক যুগ আগের কথা। রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকীতে হৃদয়ে মাটি ও মানুষের বিশেষ প্রামাণ্য প্রতিবেদন হবে। জনাব শাইখ সিরাজের নেতৃত্বে আমরা বেরিয়েছি রবীন্দ্রনাথের কৃষি ও সমবায় ভাবনা বিষয়ক তথ্যচিত্র ধারণে। কুষ্টিয়ার শিলাইদহ সেরে তারপর সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর। সেখানে আমাদের সামনে রবীন্দ্রনাথকে অন্য উচ্চতায়, অনন্য ব্যাখ্যা ব্যঞ্জনা ও অধ্যায়নের গভীর রসে মেলে ধরলেন অধ্যাপক নাছিমউদ্দিন মালিথা। শাহজাদপুর কাচারিবাড়ির পাশেই তার বসতবাড়ি। রুচিশীল বাংলার অধ্যাপক বলে কথা। ভাঁজ ভাঙা খাদি পাঞ্জাবি, কালো মোটা ফ্রেমের চশমায় বলিষ্ঠ অবয়বের এক মানুষ। আমাদের চাপটা কমিয়ে দিলেন। তার সঙ্গে কাচারিবাড়ি ঘুরতে ঘুরতে আমরা একপশলা রবীন্দ্র অধ্যায়নে স্নাত হলাম। ভেতরে খুব বেশি নেয়ার মতো মাথা আমার নয়। অভিভূত কিংবা বিস্মিত হয়েই ধন্য হলাম।

সেদিন চিত্রধারণ করতে করতে অপ্রীতিকর ঘটনার মতো কিছু একটা ঘটলো। আমাদের কর্মাধ্যক্ষ শাইখ সিরাজ অসুস্থ বোধ করছিলেন। মুহূর্তে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন অধ্যাপক মালিথা।

বিজ্ঞাপন

কাচারি বাড়ির অভ্যর্থনা কক্ষ খুলিয়ে দিলেন তার বিশ্রামের জন্য। তিনি বাড়ি গিয়ে এক ভেষজ দাওয়াই নিয়ে এলেন। জৈন বা যাওন। বললেন সামান্য এক চিমটি মুখে দিয়ে এক গ্লাস পানি খেলেই গ্যাসঘটিত যে কোনো সমস্যা চলে যাবে। তাৎক্ষণিক আমরা জৈনের গুণ পেয়ে গেলাম। জনাব শাইখ সিরাজ সুস্থবোধ করলেন। অধ্যাপক মালিথা আমাদের সঙ্গে জৈন এর কৌটাটি দিয়ে দিলেন। বললেন, এটি নিয়মিত খেলে হজম ভালে হয়। বুকের জ্বালাপোড়া উপশম হয়।

তারপর থেকে সেই ঘরোয়া দাওয়াই এর উপকারিতা গ্রহণ করে চলেছি। সে সঙ্গে রবীন্দ্র বিশারদ হিসেবে সবসময়ই মনে করি নাছিম উদ্দিন মালিথাকে। তার একমাত্র ছেলে আমাদের প্রিয় সহকর্মী। সেই সুবাদে তার খোঁজখবর নিয়মিত আমি পাই। তিনি নতুন বই প্রকাশ হলে আমাকে পাঠান। মাঝে সাঝে ফোনে কথাও হয়।

গত এক দেড় বছর তার শরীরটা ভালো নয়। চকোর প্রাণপ্রিয় বাবার জন্য অস্থির থাকেন। ভারত যান। ভারতের এক প্রকাশনী থেকে বাবার বই প্রকাশের উদ্যোগ নেন। বাবাকে খুশী করতে চকোরের উদ্যোগ আর প্রয়াসগুলো দেখে আমরা প্রাণিত হই।

করোনাকালে শুরু থেকেই চ্যানেল আই এ প্রতিদিনের আক্রান্ত, মৃত্যূ ইত্যাদির হাল নাগাদ তথ্যের রিপোর্ট করেন চকোর মালিথা। টানা কয়েক মাস করোনার বহু প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করেই তিনি কাজটি করেছেন। কিন্তু গত বেশ কিছুদিন হয় হার মানতে হলো তাকেও। কারণ বাবা অসুস্থ। পরিবারের সবাই কমবেশি আক্রান্ত হয়েছেন করোনায়। সবাই সুস্থ হয়ে উঠলেন। বহুদিন আশা নিরাশার প্রদীপ জ্বলা নেভার ভেতর শেষ পর্যন্ত আর উঠলেন না অধ্যাপক নাছিমউদ্দিন মালিথা। এই করোনায় জাতির বাতিঘর ও বটবৃক্ষসম অনেকের মতো তিনিও চলে গেলেন।

নাছিমউদ্দিন মালিথার কবিতার বই হাতে বসে আছি। বইটি তিনি পাঠিয়েছিলেন আমার জন্য। ‘বুকেরভেতর পোষা পাখি’। একটি কবিতা পড়ে তার আত্মবিশ্বাসী অবয়বটি সামনে দেখতে পাচ্ছি। “অসংখ্য মৃত্যূ আমাকে আলিঙ্গন করলো/ অথচ আমি বেঁচে রইলাম”।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)