চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

চলে গেলেন আমাদের ইকরাম চৌধুরী

তিনি নেই; তাহলে বিকল্প কে? কিছুক্ষণ চিন্তা করেই পেয়ে গেলাম। পেয়ে গেলাম নাম ও নাম্বার। শরিফ চৌধুরী। ইকরাম চৌধুরীর ছোট ভাই। তিনি আপাতত সামলাবেন। নিউজ-ফুটেজ কিংবা জরুরি তথ্য তিনি ব্যবস্থা করে পাঠাবেন। সহজ মৃত্যুর দিন। কাজের জায়গাতে বিকল্প লাগে। এখানে চিন্তাটি এমন যে, পৃথিবীতে কোনো জায়গাই শূন্য থাকে না। কারো জন্য কোনো কিছু পড়ে থাকে না। তাহলে একজন মানুষ চলে গেলে ক্ষতটা হয় কোথায়? ক্ষতিটাই বা কী হয়? আমরা কি কথার কথা বলি, তার মৃত্যুতে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল? মানুষের চলে যাওয়ার মতো সত্যটি আমরা মানতে চাই না। হয়তো মানুষ বলেই এমন হয়।

আমার সতের বছরের সহকর্মী ইকরাম চৌধুরী চলে গেলেন। চ্যানেল আই ন্যাশনাল ডেস্ক এর আটষট্টি সদস্যের পরিবারের এক সদসস্যের বিদায়। কিন্তু চাঁদপুরের সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক অঙ্গন দেখছে একজন প্রথিতযশা সাংবাদিক, সম্পাদক ও সংগঠক এর প্রস্থান হিসেবে। ইকরাম চৌধুরী চাঁদপুরের প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র চাঁদপুর দর্পনের সম্পাদক। জেলা পর্যায়ে একটি সংবাদপত্র যে কী প্রাণসঞ্চারি উদ্যোগ তা যারা মফস্বলে সাংবাদিকতা করেন, তারা উপলব্ধি করে থাকবেন। আমি স্থানীয় পর্যায়ের সাংবাদিকতাকে মাটির সঙ্গে লেপ্টে থাকা কলম সৈনিকের জীবন সংগ্রাম মনে করি। একজন সম্পাদককে অনেক কিছু সৃষ্টি করতে হয়। অনেক কিছুর গভীরে যেতে হয়। তার নিজস্ব একটি সম্পাদকীয় নীতিমালা নিয়ে চলতে হয়। যে নীতি তার ব্যক্তি জীবনের ওপর বিরাট প্রভাব রাখে। রাজধানী থেকে প্রকাশিত বড় কোনো দৈনিকের সম্পাদকের সঙ্গে জেলা থেকে প্রকাশিত চারপাতার পত্রিকার সম্পাদকের মৌলিক পার্থক্য থাকে।

বিজ্ঞাপন

মফস্বলে পত্রিকা প্রকাশ করতে হয় হৃদয় দিয়ে। সেখানে যুদ্ধটা করতে হয়, তৃণমূলের খেটে খাওয়া মানুষের বিরুদ্ধ স্রোতের একটি শক্তির সঙ্গে। কখনো সেই যুদ্ধ আত্মমর্যাদার, কখনো সেই যুদ্ধ জীবন মরণের। একটি ঘটনা ছাপার অক্ষরে প্রকাশ পাবার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সম্পাদকের ঘুম থাকে না। কখনো পরিস্থিতির কারণে কঠিন চাপ, উত্তেজনা নিয়ে থাকতে হয়। একজন সম্পাদক পত্রিকা প্রকাশের আগেও জানেন, তিনি এক কঠিন পথ বেছে নিতে যাচ্ছেন, এই পথের কোনো শেষ মাথা নেই, এই পথের কোনো ফিরতি পথও নেই। এই পথ জীবনকে শুধু শূন্যতার দিকেই টানতে থাকে, তারপরও তিনি পত্রিকা প্রকাশ করেন। একজন দায়িত্বশীল সম্পাদক কিংবা সাংবাদিকের ক্ষেত্রেই এমনটিই ঘটে। এর অন্যথা যে নেই তা বলা যাবে না। অনেকের দৃষ্টিতেই এর ব্যতিক্রমই হয়তো বেশি। আমি সে দিকটি দেখতে চাই না।

মফস্বলের আর পাঁচজন সাংবাদিকের চেতনার জয়গাটি যেখান থেকে শাণিত হয়ে ওঠে, ইকরাম চৌধুরীর ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। তিনি ছাত্রজীবনেই যুক্ত হয়েছিলেন লেখালেখির সঙ্গে। নিয়মিত লিখতেন রূপসী চাঁদপুর পত্রিকায়। কিন্তু ডিপ্লোমা প্রকৌশলীর ডিগ্রি নিয়ে চাকরি পেলেন বিসিক-এ। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে এক দশকেরও বেশি বিসিকে চাকরি করার পর আবার ফিরে এলেন নিজের জায়গাতে। বুঝলেন, ‘প্রকৌশল’ তার জায়গা নয়। সাংবাদিকতাতেই টিকে থাকতে হবে। আর তার জন্য নিজেই পত্রিকা প্রকাশ করতে হবে। ১৯৯৯ সালে তিনি চাঁদপুর থেকে প্রথম দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করলেন। চারপাতার ট্যাবলয়েড পত্রিকাটি তার নিজের সাংবাদিকতার প্রত্যয়কে যেমন মজবুত করে তুললো, জেলার শিক্ষিত সজ্জনদের মধ্যেও তৈরি হলো নতুন জাগরণ।

আমার সঙ্গে পেশাগত বন্ধুত্ব ছিল ইকরাম চৌধুরীর। বয়সে আমার চেয়ে বেশ বড় হলেও কর্মক্ষেত্রের প্রচলিত কিছু কৃত্রিমতার কারণে তিনি আমাকে আদিত্য দা বলে ডাকতেন, সম্মান দেখাতেন বড় ভাইয়ের মতো। মাঝে মাঝে ভাইজানও বলতেন। আমি তাকে বন্ধু হিসেবে সহজ ও সারল্যপূর্ণ সম্পর্ক রেখে চলতাম। তার সঙ্গে যখন ফোনে কথা হতো, তখন আমি কাজের কথার পাশাপাশি তার পেশাগত জীবন, পত্রিকা ইত্যাদির খোঁজ নিতাম। যারা পত্রিকা প্রকাশ করেন আমি তাদের জীবনের উচ্চতাকে দেখতে পাই। কারণ, আমি স্থানীয় পত্রিকায় দীর্ঘদিন কাজ করেছি। আমি কোনো দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের সক্ষমতা অর্জন করিনি। অবশ্য, সে চিন্তাও কখনো করিনি।

বিজ্ঞাপন

বছর তিনেক হলো ইকরাম চৌধুরী আকস্মিক চুপসে যান। জানলাম, শরীরে নানা রোগ। সংবাদপত্র প্রকাশনাকে বেশি ভালোবাসলে শরীর থাকে না। মনও হয়ে পড়ে বিপর্যস্ত। প্রতিদিন গভীর রাতে পেস্টিং শেষ করে বাসায় ফিরে ঠাণ্ডা ভাত খেয়ে ঘুমোতে যাওয়ার মধ্যে এক অন্যরকম নেশা আছে বটে, কিন্তু সেই নেশা সবসময় জীবনের পক্ষে থাকে না। কিন্তু এই রুটিন চালাতে গিয়েই হতোদ্যম হতেই হয়। এই তো ক’দিন আগে রোজার মধ্যে তার অসুখ বিসুখ নিয়ে কথা হলো। বললেন, দুটি কিডনীই নষ্ট হয়ে গেছে। তাতে কোনো অসুবিধা নেই। টাকা পয়সা জোগােড়ে নানারকম তৎপরতা চলছে, দিল্লির এক হাসপাতালে কথাবার্তাও ফাইনাল হয়েছে। কিডনী প্রতিস্থাপন করলেই ঠিক হয়ে যাবে। দেখলাম, দারুণ দৃঢ়তা তার কণ্ঠে। কথার ভেতর বিন্দুমাত্র অসুস্থতার লেশ নেই।

বললেন, প্রধানমন্ত্রীও আমাকে সাহায্য করবেন, আশা করি। তারপর কথা হলো দিন পনের আগে। বললেন, ছুটির একটি চিঠি লাগবে ভিসার জন্য। আমি চিঠি তৈরি করে মেইল করে দিলাম। তিনি পেয়ে ধন্যবাদ দিলেন। মনে মনে শুভকামনা করলাম। তিনি বলেছিলেন, দুয়েকদিনের মধ্যে ভারত যাচ্ছেন।

আজ সকালে চ্যানেল আই নিউজের মেসেঞ্জার গ্রুপে ভেসে উঠলো কোনো একটি মৃত্যুসংবাদের অংশ। এখন প্রতিদিনই মৃত্যু সংবাদ আসে। আগে ব্যাকুল হয়ে দেখতাম। এখন সহজভাবে দেখি। দেখলাম, ইকরাম চৌধুরী আর নেই। তিনি ভারত যেতেই পারেননি। কারণ ভিসা হয়নি। করোনার কারণে ভারতের ভিসাকেন্দ্র বন্ধ। টাকাপয়সা প্রস্তুত। সবকিছু ঠিকঠাক। দিল্লিতে তার কিডনী প্রতিস্থাপনের প্রাথমিক প্রস্তুতিও হয়ে আছে। কিন্তু কিছুই করা গেল না।

করোনা আসার পর মানুষের শ্বাসযন্ত্র সবচেয়ে দামী হয়ে উঠেছে। আগেও দাম ছিল। কিন্তু শ্বাসকষ্ট শুনলেই বুকের ভেতর ধক করে ওঠে। সম্ভবত চোখ কান খোলা প্রতিটি মানুষই নিজের শ্বাসযন্ত্র নিয়ে চিন্তিত থাকেন। ইকরাম চৌধুরীর কিডনী বিকল, গত মঙ্গলবার রাতে চাঁদপুরের বাড়িতেই শুরু হলো শ্বাসকষ্ট। সঙ্গে সঙ্গে অক্সিজের সিলিন্ডার এনে কৃত্রিম শ্বাসের ব্যবস্থা করা হলো। ডাক্তারের পরামর্শে পাঠানো হলো হাসপাতালে। কোনো কাজ না হওয়ায় এ্যাম্বুলেন্সে আনা হলো ঢাকায়। ভর্তি করা হলো ধানমণ্ডি জেনারেল এন্ড কিডনী হসপিটালে। সেখানে পরদিন থেকে ডায়ালেসিসও শুরু হলো। কিন্তু তার সময়টি শেষমেষ ফুরিয়েই গেল।

ইকরাম চৌধুরীর বাবা প্রয়াত দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী ছিলেন মহকুমা শিক্ষা অফিসার। ছয়ভাই পাঁচবোনের পরিবারে ভাইদের মধ্যে পঞ্চম ছিলেন তিনি। সাংবাদিকতার কারণেই জেলার বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ইকরাম চৌধুরী। প্রেসক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন টানা কয়েকবার। সাংবাদিকদের মাঝেও তিনি ছিলেন গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় একজন। স্ত্রী এক ছেলে এক মেয়ের বেশ গোছানো পরিবার ছিল তার । ছেলে মেয়েও অনেকটা গুছিয়ে এনেছে তাদের জীবন। ছেলে আবরার চৌধুরী সফটঅয়্যার প্রকৌশলী, মেয়ে ইশরাত জাহান ইয়ানও ঢুকেছে চাকরি ও সংসার জীবনে। সাংবাদিকতার মতো অনিশ্চয়তা ও উত্থান পতনের পেশায় থেকেও ভেতরে ভেতরে গুছিয়ে ওঠেন ইকরাম চৌধুরী। হয়তো এ কারণেই শেষ সময়েও ছিলেন সমান আত্মবিশ্বাসী। পেশাগত কিংবা চেতনাগত অর্জন থেকেই আসতে পারে এই আত্মবিশ্বাস। এখান থেকেই হয়তো বলে গেলেন, ‘চলে তো যেতেই হবে, তাই বলে তো বিশ্বাস তো হারানো যাবে না।’

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)