চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

অনুপ্রবেশ: বহুদূর যেতে হবে

তুমি যদি মনে করো ফিল্ম না বানাতে পারলে তুমি মরে যাবে, কেবল তাহলেই ফিল্ম বানানোর চেষ্টা করো। কথাটি বলেছেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক রিয়্যান কনোলি। প্রকৃত ফিল্ম মানে আলু-পটলের ব্যবসা করার মতো কোনো মুনাফার আড়তখানা নয়। বিশ্বখ্যাত ওয়াল্ট ডিজনির একটি কথা এক্ষেত্রে স্মরণীয়-উই ডোন্ট মেক মুভিজ টু মেক মানি, উই মেক মানি টু মেক মোর মুভিজ (অর্থ উপার্জনের জন্য আমরা সিনেমা বানাই না, বরং আমরা অর্থ উপার্জন করি আরো সিনেমা বানানোর জন্য)। ডিজনির কাছে ফিল্ম-এর অর্থ তিনটি। আর তা হলো-আর্ট, আর্ট এবং আর্ট। আর কে না জানে আর্টের কোনো ফর্মুলা হয় না। কোনো একটি ‘আর্ট’ তৈরি হওয়ার পর অবশ্য তার ফর্মুলা বের করা যায়, কিন্তু কেবল ফর্মুলার মাধ্যমে সৃষ্টি করা যায় না নতুন আর্ট। এজন্যই আর্ট হলো মুক্ত, অবারিত, অসীম।

আমি কোনো নতুন আর্ট সৃষ্টির চেষ্টা করিনি, সেই ধৃষ্টতা আমার নেই। অনুপ্রবেশ-এর চিত্রনাট্য লেখার সময় আমি কেবল পুরো সিনেমাটা নিজের মানসচোখে দেখতে চেষ্টা করেছি বারবার। এই দেখে নেওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আমি আসলে কী করতে চাই-সেই ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয় এই বারবার দেখার ভেতর দিয়েই। অনুপ্রবেশ নির্মাণের সময় আমার কেবল সেই আত্মবিশ্বাসটুকু ছিল। গভীরভাবেই ছিল। কিন্তু আত্মবিশ্বাসই শেষ কথা নয়। আমি যখন আমার প্রথম উপন্যাস অনুপ্রবেশ-কে চলচ্চিত্ররূপ দিতে চেয়েছি, সেটা বাহ্যিকভাবে মনে হয়েছে-সামান্য ডিঙা দিয়ে সাগর পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা। ফিল্ম বানানোর সবচেয়ে কঠিন বাধা হলো টাকা। ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখার চেয়েও বড় অপরাধ হলো শূন্য প্রস্তুতিতে কেবল কমনসেন্স দিয়ে ফিল্ম বানানোর দুঃসাহস দেখানো। আমি সেই অপরাধে চরমভাবে অপরাধী। আর আমাকে এই অপরাধ করতে সহযোগিতা করেছেন যারা, তারা সম্ভবত ভেবেছেন- ছেলেটা একটা ফিল্ম বানাতে চাইছে, বানাক না। এ আর এমন কী কঠিন কাজ! ছেলেটা নিশ্চয়ই পাগল নয়, যখন ভেবেছে ফিল্ম বানাতে পারবে, তখন নিশ্চয়ই পারবে।

বিজ্ঞাপন

পাগল যদিও বুঝতে পারে না, সে পাগল। আমিও বুঝতে পারিনি- আমি পাগল। পরিবারের বাইরে থেকে যিনি সহযোগিতা করেছেন, তার অবদানের কথা উচ্চারণ করাটা হবে ‘সকল প্রশংসা মহান সৃষ্টিকর্তা’র মতো। সুতরাং সেই প্রশংসা উহ্যই থাক। কিন্তু যার প্রশ্রয় না পেলে সিনেমাটা শুরুই করতে পারতাম না, তিনি আমার স্ত্রী শর্মিষ্ঠা। কেন সে মনে করল আমি সত্যিই ফিল্ম বানাতে পারব? একমাত্র সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়া আমার ফিল্মের সবারই প্রথম ছবি এটি। আমি নিজেই সবচেয়ে বড় অনভিজ্ঞ। অথচ আমি এই ছবির পরিচালক। কেবল তাই নয়, এর কাহিনিকার, চিত্রনাট্যকারও আমি। ক্যামেরাম্যান অর্থাৎ সিনেমাটোগ্রাফারও আমি। এমনকি আমার কোনো অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্যামেরাম্যান নেই। যে ক্যামেরা দিয়ে শুটিং শুরু করেছি, সেই ক্যামেরা ছুঁয়ে দেখিনি কস্মিনকালেও। ইংল্যান্ড থেকে বন্ধু বুলবুলের মাধ্যমে যখন ঢাকায় ক্যামেরা হাতে পেলাম, তখন পনেরো দিন ধরে আমি কেবল ৫০০ পাতার ঢাউস ম্যানুয়াল পড়েছি গভীর উত্তেজনায়।

কথায় আছে- জুতা সেলাই থেকে চণ্ডিপাঠ। দাদাঠাকুর সিনেমায় ছবি বিশ্বাস একটি পত্রিকা বের করতেন। সেখানে তিনি ছিলেন পত্রিকাটির মালিক, সম্পাদক, মুদ্রাকর, রিপোর্টার এবং হকার। ফিল্ম বানাতে গিয়ে আমার ভূমিকাও অনেকটা ওরকম। কোনো এক কালে কলকাতায় সিনেমার ওপর কয়েক বছর পড়াশোনা করেছিলাম, ক্যামেরার ওপর প্রফেশনাল ট্রেনিং নিয়েছিলাম, কিন্তু নিজে কখনো কোনো সিনেমার মেকিং দেখিনি। কেবল আছে সামান্য গ্রন্থগত বিদ্যা আর কমন সেন্স। কিন্তু কে না জানে সেই বিখ্যাত দুই পংক্তি- ‘গ্রন্থগত বিদ্যা আর পরহস্তে ধন/নহে বিদ্যা নহে ধন, হলে প্রয়োজন।’ সুতরাং এই অবস্থায় সিনেমা বানানোর চেষ্টাটা হলো পিপীলিকার পাখা গজাবার মতো।

সুতরাং আমার অবস্থা যে খুব সঙ্গিন হয়ে পড়ল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সেটা প্রথম বুঝতে পেরেছিলেন আমার শিক্ষক আলতাফ হোসেন। তিনি আমার ছবির অনুপ্রেরণাদাতা অভিনেতাও বটে। কিন্তু আলতাফ স্যার যেন দিব্যচোখে দেখতে পাচ্ছিলেন- অনুপ্রবেশ বানাতে গিয়ে আমি ভয়াবহ লেজে-গোবরে অবস্থার মধ্যে পড়তে যাচ্ছি। এলোপাথারি শুটিংয়ের ফুটেজ মেলাতে গিয়ে আমি এমন প্যাঁচে পড়ব, এমন সব পাজল-এ নাজেহাল হব যে, শেষ পর্যন্ত পুরো সিনেমাটি খাপছাড়া অর্থহীন ফুটেজ ছাড়া আর কিছুই হবে না। এজন্য শুটিংয়ের সময় আলতাফ স্যার বারবার আমাকে সতর্ক করেছেন- ‘তুমি এসব কী করছ? তুমি কি সত্যিই জানো- তুমি কী করছ?’

আলতাফ স্যারের কথা উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। তিনি হুমায়ূন আহমেদের দীর্ঘদিনের বন্ধু। ছোটখাট অভিনয়ও করেছেন হুমায়ূন আহমেদের নাটিকায়। শুটিং দেখার ফার্স্ট হ্যান্ড অভিজ্ঞতা আছে তার।
কিন্তু যিনি মনে করতেন আমি ভুল করতে পারি না কিছুতেই, তিনি হলেন আমার প্রধান সহকারী পরিচালক মৃধা রেজাউল। ভালো মানুষের সংজ্ঞা তৈরি করতে গেলে রেজাউল ভাই একাই যথেষ্ট। মানুষ হিসেবে তার বৈশিষ্ট্য মেপে শর্ত সাজালেই ভালো মানুষের সংজ্ঞা তৈরি হয়ে যাবে। তিনি তো ভালো মানুষ, কিন্তু ফিল্মমেকিং কী জিনিস- খায় নাকি মাথায় মাখে, সেই ব্যাপারে বকলম। তার একমাত্র যোগ্যতা হলো তিনি ফিল্মকে ভালোবাসেন সন্তানের মতো। কেবল এই কারণেই তিনি নির্দ্বিধায় অংশ নেন আমার পাগলামিতে। সুবোধ বলে আমার এক দুর্বোধ্য বন্ধু আছে। সে হলো সর্বঘটে কাঁঠালিকলা। কিংবা সে হলো ‘আলু’র মতো, সব তরকারিতেই দেওয়া যায়। এজন্য সে খুবই দরকারি। সুবোধ এসে আমার সঙ্গে যোগ দেয় গভীর উত্তেজনায়। একটি কিন্ডারগার্টেনের ছা-পোষা শিক্ষক সে। আমার সঙ্গে টানা শুটিং করতে গিয়ে বেচারার সাড়ে তিন হাজার টাকা বেতনের অমূল্য চাকরিটাই যায় চলে। কিন্তু ওর উত্তেজনা তাতে কমে না একবিন্দু। ওর দৃঢ় বিশ্বাস- আমাদের সিনেমা বাংলাদেশ কাঁপাবে।

আমার ছবিতে একজন মাত্র ইউনিট বয় ছিলেন। হাসান নামের সেই তাগড়াই ছেলেটি একাই কাজ করতেন পাঁচজনের সমান। হাসানকে ডাকলেই আলাদিনের দৈত্যের মতো ‘জো হুজুর’ বলে হাজির হতেন, আর যা বলতাম সেই কাজটি তিনি করে দিতেন চোখের পলকে।

ফিল্মকে বলা হয় হান্ড্রেড মেম্বারস টিম। আর আমার টিমের মেম্বার সংখ্যা মেরেকেটে দশজন। শুটিং করেছি পাঁচ দফায় ৫০ দিনের মতো। এর মধ্যে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় কাজ করেছেন মাত্র চারদিন। বাকি ৪৭ দিন কাজ করেছি সম্পূর্ণ নতুন এবং আনাড়ি একটি টিম নিয়ে। আগেই বলেছি, সেই টিমের কেউই কোনোদিন শুটিং দেখেননি। কীভাবে সিনেমা তৈরি হয়, সেটা জানা তো অনেক দূরের ব্যাপার। এজন্য কেউ কেউ খুব তুচ্ছ চোখে দেখত আমাদের মেকিংকে। একদিন একটা ঝড়ের শুটিং হবে, বড় বড় ফ্যান সেট করা হয়েছে। কিন্তু ট্রলির লাইন তখনো পাতা হয়নি। এদিকে আলো পড়ে যাচ্ছে খুব দ্রুত। আমি নিজেই বড় বড় লাইন কাঁধে নিয়ে হাত লাগালাম সবার সঙ্গে। এরকমটি প্রায় সময়ই করতাম। ইউনিট বয় একজন হলেও আসলে আমরা সবাই-ই ছিলাম ইউনিট বয়। সুতরাং কাজ শুরু হওয়ার পর আমাদের ছবির লিড অভিনেত্রী বুঝতে পারে-আমার টিমের সবাই ‘গাঁইয়া’। আমি অবশ্য এতে বিস্মিত হতাম না। সত্যিই তো আমরা অনভিজ্ঞ, গেঁয়ো। আমাদের কোনো প্রোডাকশন ম্যানেজারও ছিল না। কারণ এত লোকবল নেওয়ার টাকা ছিল না আমাদের। কেবল মেকআপ আর্টিস্ট এফডিসি-র প্রফেশনাল একজন। তাই রক্ষে। ২০১৫ সালের মে মাসে শুটিং শুরু হয়, অতঃপর শেষ হয় ওই বছর ডিসেম্বরে। আমার সঞ্চিত যা যা ছিল, আমার স্ত্রীর যা যা সঞ্চয় ছিল, সব শেষ হলো একে একে।

সমস্যাটা হলো, আমার সিনেমাটার কাহিনীর ভেতরে জাদুবাস্তবতা আছে, কল্পবিজ্ঞান আছে, নিগূঢ় দর্শন আছে। স্পেশাল এফেক্ট আছে, গ্রিন স্ক্রিনে ক্রোমা শুটিং আছে। বিশেষ সেট তৈরির ব্যাপার আছে। স্পেশাল ফুটেজ কেনার ব্যাপার আছে (জাপান থেকে সেই ফুটেজ কিনতে সহযোগিতা করে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ডা. আমিনুল হক শাহীন)। হিসেব মতো ঠিকঠাক টিম নিয়ে কাজ করতে হলে এই ছবির জন্য বাজেট দরকার কমপক্ষে এক কোটি টাকা।

কথা হলো, শুটিং ইউনিট ১০০ জনের হোক আর একজনেরই হোক, সিনেমা দেখে দর্শক যেন মনে না করে এ বড় অনভিজ্ঞ কাজ। চ্যালেঞ্জ সেখানেই। সেজন্য যতোটা সম্ভব নিখুঁতভাবে কাজ করতে গিয়ে কেবল শুটিং করতেই চলে যায় ৫০ দিনের বেশি সময়। প্রচুর রিটেক, প্রচুর ডিটেইলস নিয়ে শুটিং করা হয়। এই কাজটি অনেক সহজ হয়েছিল প্রধান অভিনেতা আনোয়ার সায়েম সোহেলের জন্য। টুকরো টুকরো বিচিত্র সব দৃশ্যের শুটিং করতে আমরা দুজন যখন তখন ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম। তবে শেষ পর্যন্ত এত ফুটেজ আর এত গার্বেজ জমল যে, সেখান থেকে নির্যাস বের করতে গিয়ে আমি চোখে সর্ষের ফুল দেখতে লাগলাম।

পোস্ট প্রোডাকশনের টাকা জোগাড় করে সম্পাদনার কাজ শুরু করলাম ২০১৬ সালের মার্চ মাসে। পোস্ট প্রোডাকশনে গিয়ে সম্পাদনার সময় আমার দুর্দশা দেখে প্রায়শই শর্মি হেসে যা বলত, তার সারমর্ম হলো- ‘হও’ বললে, আর হয়ে গেল ‘সিনেমা’, এত সোজা? তিন মাস ধরে কাটাকুটি চলল। রাতদিন পরিশ্রম, অনিদ্রা, দুশ্চিন্তা। সকালবেলা এডিট-স্টুডিয়োতে ঢুকতাম, বাড়ি ফিরতাম রাত ১০টার পর। আমার ছোট্ট সোনামণি মুক্তমন জেগে বসে থাকত-কখন আমি ফিরব, ওর সঙ্গে খেলব। এডিটিং শেষে ডাবিং, ফলি, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, কালার কারেকশন, ফাইভ পয়েন্ট ওয়ান সাউন্ড ডিজাইন, স্পেশাল এফেক্টের কাজ শেষ করতে অক্টোবর পার হয়ে গেল।

বিজ্ঞাপন

আমার অবশ্য ভয় হচ্ছিল- শিব বানাতে গিয়ে আমি বাঁদর না বানিয়ে ফেলি! অতঃপর অনুপ্রবেশ এক দিন আদল পেল পুরো ফিল্মের। সাউন্ড স্টুডিয়োর ঠান্ডা রুমে সার-রাউন্ডিং সাউন্ডের মাঝে বসে প্রথম যেদিন পূর্ণাঙ্গ ফিল্মটা দেখলাম, সেদিন যেন লম্বা লম্বা নিশ্বাস নিয়ে ভাবছিলাম- এটা আমার সৃষ্টি! এটা আমি বানিয়েছি? অবশেষে বানাতে পারলাম? কী অক্লান্ত পরিশ্রম, কত সূক্ষ্ম ভাবনার বিন্যাস, কত অবচেতন চিন্তার ভার। ছবিটাকে সুন্দর রূপ দিতে নতুন নতুন বিকল্প মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম সারাক্ষণ। আমাকে তখন এত বেশি অন্য মনস্ক থাকতে হতো যে, শর্মি খুব বিরক্ত হতো। ভয় পেত। নানারকম অভিযোগ করত। ভাবত- এক সিনেমা আমার মাথা খেয়ে ফেলেছে। যেদিন কালার কারেকশন স্টুডিয়োতে শর্মিকে নিয়ে পুরো ছবিটা দেখলাম সেদিন ওর ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় মনে হলো অ্যাসিড টেস্টে আমি সম্ভবত উতরে গেছি। শর্মি আমার সৃজনকাজের সবচেয়ে কঠিন এবং নিষ্ঠুর সমালোচক। ওর মন জয় করতে পারলে বুঝতে পারি, পরিশ্রম বিফলে যায়নি।

ছবিটি মোটামুটি দাঁড় করানোর পর বিশিষ্ট কিছু মানুষকে ডেকে ঘরোয়া প্রদর্শনী করে দেখানো হলো। মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেলাম। কিন্তু সবচেয়ে বেশি অবাক হলো এই ছবির প্রধান অভিনেতা, অভিনেত্রী এবং মেকিং-এর সহযোদ্ধারা। আলতাফ স্যার অকপটে প্রকাশ করলেন তাঁর গভীর বিস্ময়। কে বলবে এই সিনেমা বানাতে কোটি টাকা খরচ হয়নি? কুটির শিল্পের মতো করে অনভিজ্ঞ সবাই মিলেই কী অসাধ্য সাধন করেছি!

অনুপ্রবেশ-এর নামলিপি এঁকে দেন প্রিয় শিল্পী ধ্রুব এষ। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর অনুপ্রবেশ যখন উপন্যাস আকারে সময় প্রকাশন থেকে প্রকাশের তোড়জোড় চলছিল, তখন ফরিদ ভাইকে বলেছিলাম এর প্রচ্ছদ করাতে হবে ধ্রুব এষকে দিয়ে। ধ্রুবদা আমাকে চেনেন না। তিনি বছরে কত শত বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকেন, নিজেও হয়তো জানেন না। সুতরাং পুরো বই পড়ে প্রচ্ছদ আঁকার সময় কোথায় তার? কিমাশ্চর্যম! অচেনা লেখক হওয়া সত্ত্বেও আমার বইটা পড়লেন, প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার পর পুরো উপন্যাসটা নাকি পড়তে বাধ্য হলেন তিনি! প্রকাশক ফরিদ আহমেদের কাছে খোঁজ নিলেন-কে এই লেখক? সহকর্মী ওয়াসিফ-এ-খোদার কাছ থেকে আমার মোবাইল নম্বর নিলেন। ফোন করে ধ্রুবদা অনুপ্রবেশ নিয়ে যা যা বললেন, তা আমি শুনতে শুনতে ভাবছিলাম-আমি কি পারি না এই কাহিনি নিয়ে একটা সিনেমা করতে?

যাই হোক, সিনেমা তো শেষ হলো, কিন্তু সেন্সর তো করাতে হবে। বিদেশে গিয়ে শুটিং করেছি, বিদেশি শিল্পী নিয়েছি (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়), বিদেশি কণ্ঠশিল্পী গান গেয়েছে, সংগীত পরিচালনা করেছে বিদেশি সুরকার। এসবের জন্য আগে থেকেই অনুমতি নিতে হয় তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে। সেই অনুমতির নেওয়ার নিয়ম-কানুন জানতে হয়। আমি তা জানতাম না। ভাবলাম, আগে সৃজন শেষ হোক। পরে দেখা যাবে। জানতে পারলাম, ছবি শেষ হওয়ার পর ঘটনোত্তর অনুমোদন নেওয়া যায় বটে, যদি তাদের দয়া হয়। আমি আবেদন করার সুযোগ পেলাম অনেক মণ ঘি পুড়িয়ে। অনেক চেষ্টার পর ডেট পেলাম রিভিউ কমিটির ইন্টারভিউয়ের। এসব নিয়ে অবশ্য বেশি কথা লেখা যাবে না, সমস্যা আছে। যাই হোক, অনেক দৌড়ঝাঁপ করে অবশেষে ঘটনোত্তর অনুমতি পেলাম। বিএফডিসি থেকে এনওসি নিতে হবে। কত কিসিমের যে কাগজপত্র লাগবে। সব জোগাড় করা হলো। ২০১৭ সালে মার্চে অনুপ্রবেশ জমা দিতে পারলাম সেন্সর বোর্ডে। নিয়ম অনুযায়ী সেন্সরও হয়ে গেল বিনাকর্তনে। ঘাম দিয়ে যেন জ্বর ছাড়ল।

ধ্রুবদাকে বললাম, পোস্টার করে দিতে হবে। ধ্রুবদা বললেন, আগে সিনেমাটা দেখাও। তাকে সিনেমাটা দেখানোর বিশেষ ব্যবস্থা করলাম। গভীর রাতে ধ্রুবদার ছোট্ট মেসেজ পেলাম- ‘খুব ভালো, খুব ভালো, খুব ভালো।’ এর কিছুদিনের মধ্যে ধ্রুবদা ছয়টা পোস্টার তৈরি করলেন অনুপ্রবেশের জন্য। ছবিতে দুটি গান গেয়েছেন শুভমিতা এবং রূপঙ্কর। শুটিং শুরুর আগে গান দুটির রেকর্ডিং হয় কলকাতায় উষা উত্থুপের স্টুডিয়োতে। সেদিন শুভমিতা এবং রূপঙ্করের জাদুকরি কণ্ঠ শুনতে শুনতে আমার প্রথম মনে হলো- আমি নতুন করতে যাচ্ছি। আমার নবজন্ম হতে যাচ্ছে।

লন্ডনে গত ১৬ এপ্রিল রেইনবো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের সমাপনী দিনে অনুপ্রবেশ প্রথমবারের মতো অচেনা দর্শকদের মাঝে প্রদর্শিত হয়। আয়োজকদের কাছ থেকে যে প্রতিক্রিয়া আমার লন্ডন প্রবাসী-বন্ধু বুলবুল হাসান জেনেছে- তা হলো, দর্শকরা দারুণভাবে আপ্লুত হয়ে এ ছবি দেখে। অবাক হয়েছে এই ভেবে যে, বাংলাদেশেও এই ধরনের ভাবনা নিয়ে ছবি তৈরি হয়! আয়োজকরা জানিয়েছেন, তারা অনুপ্রবেশের আরো একটি কমার্শিয়াল প্রদর্শনী করতে চান।

এভাবেই শুরু নতুন পথের। প্রতিক্রিয়ার জন্য এখন অপেক্ষা করছে অনেকগুলি ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল। সেটা অনেক বড় চাপ। আর সবচেয়ে বড় চাপ বাংলাদেশে বাণিজ্যিক মুক্তি। সেটা দেওয়া হবে আসছে অক্টোবরে।

একে একে বৈতরণীর কঠিন সব ঢেউ পার হবার পর মনের কোণে আনন্দ ঝিলিক দিয়ে ওঠে- অবশেষে তরি ভিড়তে যাচ্ছে তীরে। কিন্তু সত্যিই কি নোঙর করতে পারবে তরি?

আর্ট কখনোই আর্টিস্টকে তৃপ্ত করতে পারে না। এখন যদি নতুন করে এই ছবির শুটিং করি, তাহলে অনেক কিছুই অন্যভাবে করতাম। সুতরাং একটি ছবি একজন পরিচালকের কাছে আসলে এক ধরনের নিরীক্ষা মাত্র।

আসলে-বহুদূর যেতে হবে, এখনো পথের অনেক রয়েছে বাকি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View