চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

চকবাজারের অগ্নিকাণ্ড ও মির্জা ফখরুলের উক্তি

রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সরকারের দায়িত্বহীনতা ও অব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন জায়গায় বহু মানুষ অকারণে জীবন হারাচ্ছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে ভাষা শহীদদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মির্জা ফখরুল বলেন, সরকার সবক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। (সমকাল অনলাইন, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)।

মির্জা ফখরুল ইসলাম ছাত্রজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিকিংপন্থী ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে চীন আমাদের প্রতিপক্ষ পাকিস্তানকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেছে। এছাড়া বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার অল্প দিনের মাথায় রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে আসীন জিয়াউর রহমান স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে বিএনপি গঠন করলেও সেখানে মশিউর রহমান যাদু মিয়াসহ পিকিং বা চীনপন্থী নেতাদের প্রাধান্যই বেশি ছিল। অর্থাৎ এককালে সমাজতন্ত্রের লালঝাণ্ডা ওড়ানো ও অসাম্প্রদায়িকতার বুলি আওড়ানো অনেক চীনপন্থী নেতা রাতারাতি ভোল পাল্টে মিশে যান স্বাধীনতাবিরোধী মুসলিম লীগসহ অন্যান্য সাম্প্রদায়িক দলের নেতাদের সঙ্গে। উগ্র পন্থায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী দল (দলটির তখনকার বিশ্বাস মতে) জাসদের অনেক নেতাও ছিলেন এই তালিকায়। আমরা পরবর্তী সময়ে এসব চীনপন্থী ও জাসদ নেতার আসল চেহারা খুব ভালো করেই দেখেছি।

তবে এ কথা ঠিক যে, চীনপন্থী অনেক রাজনৈতিক নেতাকর্মী সরাসরি মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাদের অনেকে যেমন আদর্শচ্যুত হয়েছেন, তেমনি আদর্শের ঝাণ্ডা ধরেও রেখেছেন অনেকে। বহুধাবিভক্ত হয়ে শত প্রতিকূলতার মাঝেও নিজ নিজ অবস্থান থেকে তারা শোষণ-বৈষম্যহীন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্য রাজনীতি করে যাচ্ছেন। তবে বঙ্গবন্ধুর খুনী চক্র, স্বাধীনতার বিরোধীতাকারী ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তিসমূহের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষক বিএনপিতে যোগ দিলে তাদের পক্ষে তা সম্ভব হতো না। এই অর্থে চীনপন্থী রাজনীতিকরা সবাই বিতর্কিত নন।

এ ক্ষেত্রে বিএনপির সাবেক মহাসচিব প্রয়াত আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। ভোগবাদী রাজনীতিতে জাতীয় পর্যায়ের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা হয়েও তিনি সততার পরিচয় দিয়েছেন। আমৃত্যু অসাম্প্রদায়িকতার ধারক-বাহক মান্নান ভূঁইয়া একজন মার্জিত রুচিসম্পন্ন সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন। হয়তো এ কারণেই শেষপর্যন্ত নিগৃহীত হয়ে বিএনপি ছাড়তে হয়েছে তাকে।

শ্রদ্ধেয় মান্নান ভূঁইয়ার উত্তরসূরি, বিএনপির বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুলকেও অনেকটা ব্যতিক্রম মনে হয়। পিকিংপন্থী ছাত্র সংগঠনের সাবেক নেতা হয়ে উগ্র ডানপন্থী দলে ভেড়া ফখরুলও একজন সৎ, ভদ্র ও মার্জিত রুচিসম্পন্ন মানুষ বলে আমার উপলব্ধি। বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে হাতেগোণা যে ক’জনকে এই কাতারে গণ্য করা হয়, তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। এ কারণে ব্যক্তিগতভাবে আমিও তাকে পছন্দ ও শ্রদ্ধা করি। যদিও অগণতান্ত্রিক দল বিএনপিতে পদ-পদবি ও নিজের অবস্থান ধরে রাখতে গিয়ে যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতের সঙ্গে আপোস ও অনেক সময় অগ্রহণযোগ্য মন্তব্যও করতে হয় তাকে।

বিজ্ঞাপন

তবে চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনায় মির্জা ফখরুল যে মন্তব্য করেছেন তা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ চকবাজারসহ পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ ও ঘিঞ্জি অলিগলিতে ভরা এলাকায় দাহ্য রাসায়নিকের গুদাম, বিভিন্ন ধরনের কারখানা ও অন্যান্য অপরিকল্পিত স্থাপনা রাতারাতি গড়ে ওঠেনি। ২০১০ সালের ৩ জুন সন্ধ্যায় নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জনের প্রাণহানির পর বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনায় আসলেও মূলত ৯০ দশক থেকেই এ জাতীয় ব্যবসার প্রসার ঘটতে শুরু করে। আর সেখানে ঘনবসতি দীর্ঘদিনের। ১৯৯১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে মির্জা ফখরুলের দল বিএনপি দু’দফায় ১০ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল; আওয়ামী লীগ ছিল ১৯৯৬-২০০১ পাঁচ বছর। এই তিন দফায়ই সেখানে বিএনপি দলীয় সাংসদ ছিলেন। এছাড়া এই সময়ে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনে যে তিনজন মেয়র দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের দু’জন ছিলেন বিএনপির। কিন্তু বিএনপি সরকার কিংবা বিএনপি দলীয় জনপ্রতিনিধিরা এই সমস্যার সমাধান করেননি।

যদিও পুরান ঢাকার দুটি ট্রাজেডির দায় বর্তমান সরকারেরও এড়ানোর সুযোগ নেই। সাড়ে ৮ বছর আগে সংঘটিত নিমতলী ট্রাজেডির পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ আজো বাস্তবায়ন করা হয়নি। কমিটির সুপারিশের আলোকে ৮০০ রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা চিহ্নিত করা হয়েছিল। বিপজ্জনক এসব গুদাম ও কারখানা কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ারও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। কিন্তু নেওয়া হয়নি। এ ক্ষেত্রে গ্রিণ ক্লাব অব বাংলাদেশ (জিসিবি) ও সিটিজেনস রাইটস মুভমেন্টসহ পরিবেশবাদী সামাজিক সংগঠনগুলোর অব্যাহত দাবিও উপেক্ষা করেছে সরকার। এসব সংগঠনের দাবি মেনে রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানাগুলো এতদিনে সরানো হলে চকবাজার ট্রাজেডি এড়ানো যেতো।

বাংলাদেশে অন্যতম একটি জাতীয় সমস্যা হলো সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি; এটাও ৯০ এর দশক থেকে বেশি মাত্রায় শুরু হয়েছে এবং বর্তমানে তা অসহনীয় মাত্রায় পৌঁছেছে। সে সময় থেকে এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি- এ দুই দলই ঘুরে ফিরে দেশ শাসন করছে। গণপরিবহন সেক্টরে লাগামহীন চাঁদাবাজি ও রাজধানীর বাস-ট্রাক টার্মিনালগুলো দখলের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে, তাদেরই এক শীর্ষস্থানীয় নেতার মাধ্যমে; যা এখন সারা দেশে সব ধরনের যানবাহনের ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়েছে। এই সময়ের মধ্যে বিএনপি দু’দফায় ১০ বছর দেশ চালালেও সমস্যা সমাধানের কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

দেশের নদ-নদী দূষণ, ভরাট ও দখলের প্রতিযোগিতা আশির দশক থেকে শুরু হলেও তা নব্বইয়ে দশকে পরিপূর্ণতা পেয়েছে এবং বর্তমানে জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। বিএনপি সরকার এই সংকট নিরসনের কোনো পদক্ষেপ নেয়নি; বরং বাজেটে নদী ড্রেজিং খাতে ব্যয় কমিয়ে দিয়েছিল। তাদের দুই দফা শাসনকালে নদী খনন ও পলি অপসরণের জন্য একটি ড্রেজার কিংবা একটি এস্কেভেটরও আমদানি করা হয়নি। ফলে খনন ও নিয়মিত পলি অপসারণের অভাবে বহু নদী শুকিয়ে গেছে, শত শত কিলোমিটার নৌপথ পরিত্যক্ত হয়েছে। 

১৯৯১ থেকে এ পর্যন্ত দুই মেয়াদে ১০ বছর ছাড়া বাকি সময় বিএনপি বিরোধী দলে থাকলেও সড়ক দুর্ঘটনা, নদী দূষণ ও দখল এবং পুরান ঢাকার রাসায়নিকের গুদামগুলোর ভয়াবহতার কথা তাদের দলীয় কর্মসূচিতে স্থান পায়নি। আমরা গণমাধ্যমকর্মীরা কিংবা জনস্বার্থমূলক বিভিন্ন বিষয়ে সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িতরা আশা করেছিলাম, রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচিতে এসব বিষয় যুক্ত হোক। সেক্ষেত্রে বিএনপির মতো বড় দলে বিষয়গুলো প্রাধান্য পেলে সহজেই সমাধান আসতে পারে। কিন্তু নিরাশ হয়ে উপলব্ধি করেছি, মির্জা ফখরুলরা ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি ছাড়া অন্য কিছু বোঝেন না। তারা বোঝেন দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত কারাবন্দী দলীয় চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া এবং দুর্নীতি ও ২১ আগস্টের হত্যাযজ্ঞের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামী তারেক রহমানকে মুক্ত করার রাজনীতি। তাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একজন সৎ, ভদ্র ও নিরাহংকারী রাজনীতিবিদ হলেও তার মুখে এসব কথা বড্ডই বেমানান ও হাস্যকর।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

শেয়ার করুন: