চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

গৌতম: বিপ্লবীর বর্ণময় জীবনের লড়াইয়ে বেজেছিল গিটারের সুর

‘মহীনের ঘোড়াগুলি কেবল একটি গানের দল ছিল না, ছিল একটি রক্তাক্ত হওয়ার বিপ্লব’

যে হাতে বেজেছে গিটার, সেই হাতেই রাইফেল! গান ভোলা এক মরমী সাধক মানুষ, গৌতম চট্টোপাধ্যায়। তিনি ছিলেন একদিকে বাঙালি সংগীতজ্ঞ, গায়ক, গীতিকার, থিয়েটার ব্যক্তিত্ব, চলচ্চিত্র নির্মাতা, নৃতাত্তিক, আবার ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ ফোক-রক ব্যন্ডের প্রতিষ্ঠাতা এবং সর্বপরি একজন বিল্পবী। সৃষ্টির আঁধারে তাঁর হাত ধরেই লেগেছে রক্তের দাগ!

নকশাল আন্দোলনের সময় অন্তবাসে থাকা অবস্থায় মিনতি চট্টোপাধ্যায় (বিয়ে হয় ১৯৭০) নামের এক উজ্জ্বল নারীকে গানপাগল গৌতম বিয়ে করেন। এ-ও যেন এক বিপ্লব!

বিজ্ঞাপন

নিজের ভাই প্রদীপ চট্টোপাধ্যায় একদিকে বিপ্লবী আন্দোলনে যেমন ছিলেন সঙ্গী, তেমনই সংগীত জীবনের সঙ্গেও তিনি হেঁটেছেন দীর্ঘ পথ! পারিবারিক সঙ্গীরাই তাঁর প্রতিষ্ঠিত বাংলা ফোক গানের চর্চাকে করেছিল পুষ্ট! তেমনই ছিলেন রঞ্জন ঘোষাল, গৌতমের মামাতো ভাই যিনি ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’কে মাতিয়ে রেখেছিলেন! বর্ণময় জীবনের গৌতম ছিলেন সৃষ্টিশীল! বাংলা সিনেমার জগতে তাঁর অবদান ভোলার নয়!

বিজ্ঞাপন

‘কিছু সংলাপ কিছু প্রলাপ’ চলচ্চিত্রে গৌতম চট্টোপাধ্যায়কে দেখা যায়, এক অন্য গৌতমের ভূমিকায়।

গৌতম ১৯৬০-এর দশকে প্রেসিডেন্সি কলেজে মনোবিজ্ঞান বিষয়ে অধ্যয়নকালীন সময়ে তাঁর অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বন্ধুদের নিয়ে ‘দ্য আর্জ’ নামে একটি ব্যন্ড গঠন করে ছিলেন।১৯৬৯-৭০ সালের দিকে নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে গৌতম মনেপ্রাণে জড়িত হয়ে পড়েন। অস্ত্র, অজ্ঞাত বাস, গোপন ডেরায় বক্তৃতা দিয়ে শুরু করেন নেতৃত্ব দিতে। গাইতেন গানও। ফলে তিনি গ্রেপ্তার ও বহুবার নির্যাতনের স্বীকার হন। এরপর তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় পুলিশ লক-আপে পাওয়া যায়। যদিও এতো নির্যাতনের পরও তিনি কোন প্রকার নকশালি তথ্য প্রকাশ করেননি, এমনই গোপনীয়তায় করেছেন দল।

বাংলা জীবনমুখী গানের ধারার আদিস্রষ্টা গৌতম। রক্তে সংগীত নিয়েই বড় হয়েছেন গৌতম। তাঁর বাবা পেশায় বিজ্ঞানী হলেও বরাবরই ছিলেন সংগীত রসিক, অল্পবিস্তর করতেন চর্চাও। সেই সুবাদে বেহালার বাড়িতে চিরকালই গানবাজনার চর্চা ছিল। নানা ধরনের শিল্পী এসে গাইতেন গান। যার বেশির ভাগটাই ছিল শাস্ত্রীয় সংগীত। বাড়িতে ছিল নানাবিধ যন্ত্র। সেতার, অর্গান, এস্রাজ, হারমোনিয়াম, ব্যাঞ্জো, ভায়োলিন, তবলা। গৌতমরা ছিলেন পাঁচ ভাই। ছোটবেলা থেকে তাঁরাও বিভিন্ন যন্ত্রের তালিম নিতেন নিয়মিত। গৌতম বাজাতেন তবলা। তবে তাঁর ভাই এবং মহীনের ঘোড়ার অন্যতম ঘোড়া প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতি কথায় মেলে, ‘মণিদা (গৌতম) সবই বাজাতে পারত। যে কোনও ইনস্ট্রুমেন্টই খুব সহজে বাজিয়ে ফেলত। তালিম ছাড়াই। নিজে নিজেই শিখে ফেলত বাজানোর আদব-কায়দা।’ তবে তবলায় বিশেষ ভাবে হাত পাকিয়ে ছিলেন গৌতম। পাড়ার অনুষ্ঠান মানেই তবলায় তখন সঙ্গত করবে গৌতম। আজন্ম স্বভাববিদ্রোহী গৌতম। একদিন ভাইয়ের কাছে বেশ ক্ষুব্ধ হয়েই বলেছিলেন, ‘সঙ্গত’ শব্দটায় তাঁর বিশেষ আপত্তি আছে। কেমন যেন ‘সেকেন্ড ক্লাস সিটিজ়েন’এর মতো শোনায় কথাটা। সংগীত জগতে প্রত্যেকের গুরুত্ব সমান না হলে, তাঁকে রপ্ত করা যায় না। ওই যে গায়ক যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক ততটাই গুরুত্বের সুরের যন্ত্রীরা।

গৌতম তখন ঘুরে বেড়াচ্ছেন রাস্তায় রাস্তায়। দেখছেন, সাপ ও বেদের খেলা। তুলে নিচ্ছেন তাঁদের খেলা দেখানোর গান, নিজস্বী সুরের কণ্ঠে। বৃহন্নলাদের পাড়ায় গিয়ে শুনছেন তাঁদের শরীরি গান। সুরে তুলে নিচ্ছেন গলায়। ট্রেনের হকারদের, ভিখারিদের গাওয়া গান ও তাদের গায়কী তখন আকর্ষণ করছে তাঁকে। ডেরায় গিয়ে শুনছেন, বাউল-ফকিরদের গান। এর বহু বছর পর ওই বাউলসঙ্গ অবশ্য জীবনের অনেকখানি জুড়ে বসবে গৌতমের, তা ভাবেননি হয়তো।

প্রতিদিন নিজের চেতন বিছানায় শুয়ে স্বপ্নেও বিপ্লবের রং মাখতেন গৌতম চট্টোপাধ্যায়। বাংলা গানের ধারা বদলে দিয়ে তিনি, শুরু করেছিলেন গানবিপ্লব। প্রেমের আহ্বানে গাইতেন বিপ্লবের গান। সে দিন তাঁরা সকলে মিলে এই উত্তাল রক্তাক্ত ভূমিতে হেঁটে ছিলেন গানের চর্চা নিয়েই। মহীনের ঘোড়াগুলি কেবল একটি গানের দল ছিল না, ছিল একটি রক্তাক্ত হওয়ার বিপ্লব। কঠিন পরিস্থিতির জীবনে, শক্ত কাজের ধারায়, এমনকি ঘুম ভেঙে মধ্য রাতের স্বপ্নেও গৌতম চট্টোপাধ্যায় দেখতেন বিপ্লবেরই রং। গানই বিপ্লব, বিপ্লবের গান।

সত্তর দশকের শুরুর দিক। গিটার, ড্রামসের সঙ্গে তখনও তেমন ভাবে বিশেষ কেউ পরিচিত হননি কলকাতায়। সে সময় গান, সবাই গান মানে শোনতো হেমন্ত-মান্নার। অপর দিকে সংস্কৃতির আকাশে দখলদারি ছিল রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যার আলো। এমনই এক সাংস্কৃতিক উন্মাদ আবহে প্রতি রাতে ড্রামস-গিটারের দাপাদাপি শুরু হয়েছিল গোপনে নাকতলা অঞ্চলের এক পুরনো বাড়িতে। বিরক্ত হতো সবাই। ভদ্দরলোকের সময় নয় মধ্যরাত। এক দিন নয়, দিনের পর দিন চলতো এই পাগলামি। সংগীতচর্চার আদর্শ সময় নাকি মধ্যরাত। ফলে ‘বাধ্য’ হয়েই প্রতিবেশীরা সেই বাড়ির পাঁচিলে গোপনে লিখে রেখে গিয়েছিলেন ‘আস্তাবল’। অন্তত এটুকু দেখে যাতে স‌ংবিৎ ফেরে উঠতি রকস্টারদের। যদি বন্ধ হয় মধ্যরাতের দাপাদাপি। তবে এই নরম প্রতিবাদে বন্ধ তো হলই না, বরং বাড়ল চর্চা। গলা উঠলো আরও জোরে! মণিদা ওই ‘আস্তাবল’ লেখাটা কোনও দিন মুছতে দেননি। ব্যাপারটাকে ‘কমপ্লিমেন্ট’ হিসেবেই নিয়েছিলেন ভিতর থেকে। দলের বাকি সদস্যদেরও নাকি বলেছিলেন, বিষয়টিকে সদর্থক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে।

তিনি বলেছিলেন, এর কিছু দিন পরে ওই আস্তাবল থেকেই জন্ম হবে একটা মস্ত বিপ্লবের। বাংলা আধুনিক গানের গতিপ্রকৃতি বদলে দেওয়ার স্বপ্নের বীজ রোপণ হবে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র হাত ধরে। আর গৌতম চট্টোপাধ্যায় হয়ে উঠবেন আস্ত একটা প্রজন্মের ‘মণিদা’। নতুন বাংলা গানের জীবন্ত ‘আইকন’।

মধ্যবিত্ত ভদ্র পরিবারের ছেলে হোটেলে গান করে! সময় নিতে পারে না! ষাট-সত্তরের দশকে কলকাতায় ব্যাপরটা মোটেই ভাল চোখে দেখা হত না। পছন্দের ছিল না অচেনা রক গান! গৌতমের চেহারাপত্তরেও তখন রীতিমতো ছাপ ফেলেছে রক আদপ। লম্বা লম্বা চুল, রংচঙে পোশাক, পিঠে গিটার, চোখে নেশা— বাড়িতে একটু সমস্যাই শুরু হল অন্য জীবনে ঢোকা। গৌতমও আর্জ ছাড়লেন। বাড়ির চাপে নয়, মনের খেয়ালে। নকশাল রাজনীতি তত দিনে বদলে দিয়েছে গৌতমের সংগীত দর্শন। রাজনীতির পাঠ গৌতমকে বুঝিয়ে দিয়েছে, রেস্তরাঁর এলিট গ্রাহকদের সামনে ইংরিজি গান গেয়ে বিপ্লব তৈরি হবে না। তার জন্য বাংলায় গান বাঁধতে হবে, বাংলার নিজস্ব সুরে। গানের ভিতরে জাগবে মানুষ। সেই মানুষের কথা বলতে হবে গানের ভেতর। রক্ত-মাংস-ঘামের কথা উঠে আসবে গানের রক্ত মাংস মর্জার শরীরে।

অবশেষে প্রেসিডেন্সি কলেজে ফিজ়িওলজি নিয়ে ভর্তি হয়েছেন সে দিনের তরুণ তুর্কি গৌতম। সেই সঙ্গে করতে শুরু করেছেন সমাজ বদলের দেওয়াল লিখন। পাড়া ছেড়ে পাড়ায় দৌড়। স্লোগান, মিটিং, মিছিল! প্রেসিডেন্সিতে পড়তে পড়তেই প্রথম স্প্যানিশ গিটার হাতে বাজারে এলেন মণিদা। সেই গিটারের পিছনেও অবশ্য গল্প রয়েছে ভরপুর, দীর্ঘ দুপুর ও রাতের। পরিশ্রমী গল্প! তাঁদের বাড়িতে ছিল একটি পুরনো হাওয়াইয়ান ক্লাসিক্যাল গিটার। স্থানীয় দোকানে নিয়ে গিয়ে সেই গিটারটিকেই স্প্যানিশ গিটারে রূপান্তরিত করা হয় বিভিন্ন পদ্ধতিতে, গৌতমের নির্দেশে। কলেজে পড়তে পড়তে এক দিকে গিটারে হাত পাকাচ্ছেন গৌতম, অন্য দিকে নকশাল রাজনীতিতে হাত সেঁকছেন। বক্তব্যে ঝরছে গান। আরও একটা কাজ করছেন একইসঙ্গে। শুনছেন সমকালীন বিশ্বসংগীত। রকসংগীতের কান তৈরি হচ্ছে। প্রাক ইন্টারনেট যুগের সেই কলকাতায় তখন মধ্যবিত্ত বাড়ির কোনও ছাত্রের পক্ষে ‘বিটলস’ শোনা মোটেই সহজ কথা ছিল না। সমকালীন বিশ্বের বিভিন্ন ব্যান্ডের অ্যালবাম জোগাড় করাটা রীতিমতো একটা যুদ্ধ ছিল। গৌতম কেবল সে সব গান শুনছেন না, আত্মস্থও করছেন রীতিমতো। ভিতর ও বাইরে যুদ্ধটা চলছেই। সময়ে অসময়ে সেই যুদ্ধের কথা শোনাচ্ছেন ভাই এবং বন্ধুদের।

বিএসসি শেষ করে গৌতম ঠিক করেছিলেন পুণে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে গিয়ে ছবি তৈরির কলাকৌশল শিখবেন, নিজের মতো করে। সময়টা ষাটের দশকের শেষ পর্যায়ে কলকাতার তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশ তখন মা-ও সে তুং এর ‘গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার’ স্বপ্ন দেখছেন। শহর ছেড়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিপ্লবের নিশান তৈরি করতে চাইছেন তাঁরা। গৌতমও ব্যতিক্রম নন। নেমে পড়লেন সরাসরি রাজনীতিতে। সারাক্ষণ সঙ্গে নিয়ে ঘুরছেন রেডবুক। ক্রমশ বাড়ি ফেরা কমতে শুরু করল। ঘুরে বেড়াচ্ছেন গ্রামে গ্রামে। এই পর্যায়েই হাইকম্যান্ডের নির্দেশে যোগ দিচ্ছেন নকশাল কৃষক ফ্রন্টে। অনেক কমরেডের মতোই চলে যাচ্ছেন আন্ডারগ্রাউন্ডে। সে সময় বাড়ি ফেরা একেবারে বন্ধ হল মণির। অনেক পড়ে ভাইদের কাছে গৌতম গল্প করেছিলেন কৃষক ফ্রন্টে কাজ করার অভিজ্ঞতা। গ্রামে গ্রামে ঘুরে শিখেছিলেন ধান বোনা, মড়াই করা, চাষবাসের নানাবিধ কাজ। সে সময়েই পেয়েছিলেন তিনি শ্রমের গন্ধ। যে কাজে ছিল প্রাণ, সেই কাজেই নিজের জীবনকে জড়িয়ে নিয়ে হাঁটেন! আর তারই সঙ্গে শিখে নিয়েছিলেন কৃষকের গান। নবান্নের গান। এর বহু দিন পর মহীনের গানে ঢুকে পড়বে সেই সব মাটির গানের অভিজ্ঞতা। গানের প্রিলিউড-ইন্টারলিউডে শোনা যাবে গরুকে ঘরে ফেরানোর বিশেষ আওয়াজ। যে আওয়াজ মিশে যাবে অ্যাফ্রো-আমেরিকান ব্লুজ়ের আবহে।

এক সময় আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা সময়ে বহু বার বেহালার বাড়িতে পুলিশ এসেছে। গৌতমের খোঁজ করে গেছে । বাড়ির লোকজনদের চাপ দেওয়া হয়েছে, গৌতমের খোঁজ জানতে। করা হয়েছে অত্যাচারও! তবুও আদর্শের কাছে নতজানু গৌতম, এগিয়ে গেছেন এক অন্ধকার বনছায়ার জগতে। অবশেষে একদিন গৌতম ফিরলেন মায়ের সঙ্গে দেখা করতে, অতি গোপনে। ফেরার পথেই গৌতম এবং তাঁর আরও দুই ‘কমরেড’কে গ্রেপ্তার করল পুলিশ। জানা যায়, এক বন্ধুকে তাঁর চোখের সামনেই ভুয়ো এনকাউন্টারে মেরে ফেলে ছিল পুলিশ। দীর্ঘদিন জীবনের থ্রেট ছিল গৌতমের উপরও।

দীর্ঘ দেড় বছর জেলে থাকার পর গৌতম অবশেষে মুক্তি পেয়েছিলেন একটাই শর্তে, পশ্চিমবঙ্গের বাইরে থাকতে হবে তাঁকে। আশ্চর্যের বিষয় হল, জেলজীবনে অসংখ্য গান লিখলেও, একটিও রাজনৈতিক গান লেখেননি গৌতম। সবই কেমন রোমান্টিক গান। তেমনই একটি গান ‘নীল সাগরের অতল গভীরে’। অ্যালবামে নেই গানটি। তবে বেশ কয়েকবার অনুষ্ঠানে গাওয়া হয়েছে, এ গান।

জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর গৌতমের মূলস্রোতের রাজনীতির থেকে খানিকটা নিরাপদ দূরত্ব তৈরি হয়। প্রকাশ্যে তেমনই দেখেছে মানুষ। শেষে কাঁধে স্প্যানিশ ঝুলিয়ে চলে গেলেন ভোপাল। সেখানে গিয়ে পেয়ে গেলেন মেডিকেল রিপ্রেজ়েন্টেটিভের কাজ। জব্বলপুর গেলেন পরে। চাকরি তখনও গৌণ। গৌতমের কাছে আড্ডাই যেন মুখ্য। সে সময় গৌতম, চুটিয়ে গান লিখছেন। গাইছেনও সুর করে বহু গান। মহীনের প্রস্তুতি পর্ব তখনই শুরু হয়ে গিয়েছিল প্রবাসে বসেই। তখন বাড়ির সঙ্গে ছিল না তেমন যোগাযোগ।

যোগাযোগ ছিল না ভাই প্রদীপের সঙ্গেও। প্রদীপও সে সময় সক্রিয় নকশাল রাজনীতিতে। গৌতম গ্রেপ্তার হওয়ার কিছু কাল আগে প্রদীপও গ্রেপ্তার হয়েছিল বিই কলেজ মাঠে। শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে বামপন্থীদের সঙ্গে অন্য দলের মারপিট সে সময় নিত্যদিনের ঘটনা। দেড় মাস জেলে কাটিয়ে প্রদীপ ছাড়া পেলেও, বেহালা থানায় দিনে দুবার হাজিরা দিতে যেতে হত তাঁকে। পুলিশের জুলুমেই দাদা-ভাইয়ের যোগাযোগ ছিল না সে সময়। অবশেষে ভোপাল থেকে কলকাতায় ফিরে এলেও, গৌতমের পিছুটান ছিল। সেই পিছুটানের মোহেই ১৯৮১ সালে তাঁকে ফের ফিরতে হয় মিনতির কাছে। বিয়ে করে কলকাতায় নিয়ে আসবে বলে। ভোপাল-পর্বেই মিনতি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল তাঁর।

সে সময় বরযাত্রী পৌঁছল স্টেশনে। ভোপালের ট্রেন আসতে তখনও খানিক বাকি। হঠাৎই আবিষ্কার হল, টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না। সকলে যখন তা নিয়ে হইচই জুড়ে দিয়েছেন, বেপাত্তা হলেন গৌতম। বেশ খানিক পর কেউ এক জন দেখলেন, স্টেশন মাস্টারের ঘরে গিয়ে গল্প জুড়েছেন মণি। মিনিট কয়েকের সেই গল্পে স্টেশন মাস্টার কাত। ব্যবস্থা করে ফিরেছিলেন টিকিট। এই তাঁর দেখাতেই আটকে দেওয়া প্রেম! চির বাউন্ডুলে গৌতম বিয়ের এক বছর পর বাবা হলেন। ছেলের নাম রাখলেন গাবু। বাংলা ব্যান্ডের বর্তমান চিত্রে সে গাবু একটা পরিচিত নাম। গাবুর জন্মের প্রায় সাত বছর পরে জন্ম হয় গৌতমের মেয়ে চিকিতার। গাবুর ভাল নাম যেমন প্রায় কেউ জানেন না। চিকিতাও তেমন বাবার দেওয়া ডাকনামেই পরিচিত হয়েছে গোটা বাঙালির কাছে ।

মহীনের ঘোড়াগুলি ১৯৭৬ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম বাংলা স্বাধীন রক ব্যান্ড। এটি ভারতের প্রথম রক ব্যান্ড যা ১৯৭০-এর দশকের মাঝ পর্বে কলকাতায় যাত্রা শুরু করে। ১৯৭৭ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত সংবিগ্ন পাখিকূল ও কলকাতা বিষয়ক (১৯৭৭), অজানা উড়ন্ত বস্তু বা অ-উ-ব (১৯৭৮) এবং দৃশ্যমান মহীনের ঘোড়াগুলি (১৯৭৯); এই তিনটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। তবে সে সময়ে তারা প্রায় অপরিচিত ছিল বলা যায়। নব্বইয়ের দশকে তারা দ্য ভেলভেট আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ডের মতোন পুনরায় সমালোচনামূলক মূল্যায়ন পেয়েছে। ১৯৯৫ সালে সমসাময়িক বিভিন্ন শিল্পীদের সমন্নয়ে গৌতম চট্টোপাধ্যায় ‘আবার বছর কুড়ি পরে’ শিরোনামে মহীনের ঘোড়াগুলির একটি কভার সংকলন প্রকাশ করে। জীবনমুখী গান এবং নৈতিক সংগীতদর্শনের কারণে বর্তমানে তাদেরকে বাংলা গানের পথিকৃৎ বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

শহরের বিভিন্ন গলিতে, ক্লাবে, উৎসব মঞ্চে, বিভিন্ন অঞ্চলে তখন চুটিয়ে অনুষ্ঠান করছে সাত তরুণ। অনুষ্ঠান করলে তো নাম দিতে হয় নিজেদের! সাত জনের দলের নাম হয়ে গেল ‘সপ্তর্ষি’। যদিও স্টেজে উঠে অনেক সময়েই গৌতম ভুলভাল সব নাম বলতেন। তেমনই একটি নাম ‘গৌতম চ্যাটার্জি বিএসসি অ্যান্ড সম্প্রদায়’।

আড্ডা, মজলিস ঠাট্টা-ইয়ার্কি মেরে এ ভাবেই দিব্যি চলছিল গানবাজনা দীর্ঘদিন। রঞ্জন ঘোষাল সিরিয়াস করে দিলেন আবহ তৈরি করে। জমাটি এক আড্ডার বিকেলে হঠাৎ প্রস্তাব করলেন দলের নতুন নাম— ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’। এরপর আর কখনও নাম বদলায়নি দলের। শো খুব বেশি আসত না। তবে সেই আমলেও ঘোড়ার দল সাড়া ফেলে দিয়েছিল রবীন্দ্রসদনে মস্ত একটা শো করে। সেই ইতিহাস!

আশির দশকের প্রারম্ভে ব্যান্ডটি ভেঙে যাবার পর সদস্যরা বিভিন্ন কর্মজীবনে চলে গেলে, ভেঙ্গে পড়ে গৌতম। মনস্থির করতে গৌতম চট্টোপাধ্যায়ও কলকাতায় চলচ্চিত্র নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। অপরদিকে বিশ্বনাথ চট্টোপাধ্যায় পাড়ি জমান সান ফ্রান্সিসকোতে, প্রদীপ চট্টোপাধ্যায় তার প্রকৌশলী জীবনে মনোযোগ দেন, রঞ্জন ঘোষাল বেঙ্গালুরুতে বিঞ্জাপন আর থিয়েটারে যুক্ত হয়ে পড়েন, এব্রাহাম মজুমদার জার্মানিতে মিউজিক স্কুল চালু করেন, তাপস দাস কলকাতায় চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে কাজ শুরু করেন। আর তপেশ বন্দ্যোপাধ্যায় যোগ দেন তার নিজের কর্মজীবনে।

১৯৯৯ সালে একদিন হঠাৎই বজ্রপাত! থেমে গেল ঝড়! চিন্তনলোক ছেড়ে, জরলোকে পাড়ি দিলেন গানের বিপ্লবী গৌতম।