চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

গৃহকর্মী: আধুনিক দাস ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি

১৯৮২ সালে মৃণাল সেনের ‘খারিজ’ নামের একটি বিখ্যাত চলচ্চিত্র প্রকাশিত হয়েছিল, খারিজের অর্থ পরিসমাপ্তি। বিষয় ছিল একটি নাবালক গৃহপরিচালকের মৃত্যু, তার নিজের পরিবারের অবস্থান এবং গৃহমালিকের সর্বক্ষণের উৎকন্ঠা কিভাবে পুলিশের ঝামেলা থেকে বাঁচা যায়। ছেলেটির বাবা জানায়, তার শ্বাসকষ্ট সম্পর্কে সচেতন করা সত্ত্বেও কেন তাকে কয়লার চুলার রান্নাঘরে শুতে দেওয়া হলো? হ্যাঁ, বিষয় সেটিই। গৃহকর্তা যখন জানায় যে ছেলেটি পরিবারের একজন ছিল, তখন প্রশ্ন ওঠে তার নিজের সন্তান কি রান্নাঘরে ঘুমাতো?

গৃহপরিচারিকা/চাকর, কাজের মেয়ে/ছেলে, চাকর/চাকরানি, দাস/দাসী, ভৃত্য, বুয়া/চাচা, মাসি/কাকু, এসব যা কিছু বলা বা ডাকা হোক না কেন তাদের অবস্থান দাসত্বের। মূলতঃ এটা তাদের কর্মসংস্থান বা চাকরি। কিন্তু অভাবগ্রস্ত এইসব মানুষগুলো মালিক শ্রেণীর ইচ্ছার বা শখের দাসে পরিণত হয়। এমনকি এই বিষয়ে কারোর কোন আপত্তিও নেই।

ছোটকাল থেকে শিশুকে গড়ে তোলা হয় তাদের উপরে খবরদারি করতে, বাবা-মায়ের বয়সী একজনকে অবলীলায় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করাটা অস্বাভাবিক না আমাদের সমাজে, এমনকি দৃষ্টিকটুও না। সাধারণত গৃহপরিচালনায় নারী শ্রমিকের আধিক্য দেখা যায় গৃহকর্ত্রীর সুবিধার্থে। যৌন আগ্রাসনের শিকার হয় অনেকেই; কেউ কেউ মেনেও নেয়, ভয়ে, অপারগতায় বা নিজস্ব ক্ষুধা মেটাতে।

যে কোন শ্রেণীর নারী তূলনামূকভাবে নিজেই অবদমিত, নিজের সেই নিরুপায় অবদমনের উল্টো প্রকাশের রূপদানে নিজের অধিনস্তের উপর নির্যাতন করে। সন্তান বাৎসল্যের কারণে সন্তানরা নিস্তার পেলেও কিন্তু গৃহকর্মীরা পায় না। প্রচলিত সামাজিকতায় কিছু কথা প্রচলিত আছে; মনিব ঈশ্বর, অন্নদাতা। বড় অংশে আছে বিশেষশ্রেণীর সুবিধায় তৈরি ধর্মের ছায়া। ব্রাহ্মণের সঙ্গে সহবাসে স্বর্গলাভ, এই সুযোগে অনেক মনিব নিজেই ব্রাহ্মণত্বলাভ করেন। ইসলামেও দাসীর সঙ্গে যৌনমিলন বৈধ। ঘোমটাধারী স্ত্রীকে এইটুকু বিদ্যা দিলেই সব হাতের মুঠোয়।

গৃহকর্মী প্রথা যেসব সমাজে প্রচলিত, সেখানেই বহুবিধ অত্যাচারের নমুনার কথা শোনা যায়। বাংলাদেশি, ফিলিপিনো, শ্রীলঙ্কান, ইন্দোনেশিয়ান গৃহপরিচারিকারা মধ্যাপ্রাচ্যে কি অবস্থানে জীবনযাপন করছেন আমরা সংবাদ পাই, কিন্তু নিরুপায়ের মতো সহ্য করি, কেননা তারা নারী শ্রমিক। তাদের অনেকেই দিনে গৃহপরিচারিকা, রাতে যৌনকর্মী।

দেশে কিন্তু এরা আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নাগরিক। একটা গল্প পড়েছিলাম ছোটকালে, সম্ভবত গার্সিয়া মার্কেজের লেখা, গল্পের নাম মনে নেই, বিষয়বস্তু মনে আছে। ম্যাক্সিকোর এক ধনীর ঘরে কুকুরের খাবার চেখে খাওয়ার অপরাধে পরিচারিকাকে খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছিল গল্পটি।

 

লিঙ্গবাদে নারী অবদমিত, শ্রেণীবৈষম্যে দরিদ্র অবদমিত, বয়সবৈষম্যে শিশু অবদমিত, আর এই তিনটির যখন সমন্বয় ঘটে তখন সে রাস্তার পাথরকুচির সমতুল্য ব্যবহার্য।
সামন্তবাদ প্রথায় অগণিত দাসদাসীর ব্যবস্থা থাকতো অবস্থাপন্ন ঘরে। এদের নিজস্ব একটি এলাকা থাকতো বসবাসের। একে অপরের সাহায্যে থাকতো আবার প্রয়োজনে ক্ষতিও করতো। অনেকের গর্ভস্থ সন্তানের বীর্যদাতা হতো মালিকশ্রেণীর পুরুষ, যদিও স্বীকার করে নিতো না। যে কারণে বংশপরম্পরায় তারা সেইসব পরিবারের দাসে পরিণত হতো। রক্তের দাবীতে চিরস্থায়ী দাস। এই সমস্ত কারণে অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটতো, গুম করা হতো তাদের মৃতদেহ। যে কারণে এইসব প্রসঙ্গ তুলে ধরলাম, আমরা সেই সামন্তপ্রথা থেকে খুব একটা বের হতে পেরেছি? আমি, আপনি, সে, তারা, কেউ?

মধ্যবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তের সন্তানরা নিজেদের কাজ নিজে হাতে করতে শেখে না। সামর্থ্য অনুযায়ী একজন পরিচারক নিয়োজিত থাকলে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে আঠারো উনিশ ঘন্টা তাদেরকে সেবাদান করতে হয়। কোন যন্ত্রও তো একটানা এতটা সচল থাকে না। সবার আগে ঘুম থেকে ওঠা এবং সবার পরে ঘুমাতে যাওয়া শতভাগ অবস্থায় দেখা যায়। কখনো তাদেরকে আটঘন্টা ঘুমাতে দেওয়া হয় না।

শিশুর উপযোগী না এমন কাজ করানো হয় শিশুদেরকে দিয়ে, কিন্তু বাবা মায়ের কাছ থেকে তাদেরকে নিয়ে আসার সময় বলা হয় শুধু সঙ্গ দেবে তাদের সন্তানদের, কিন্তু মশলা বাটা, কাপড় কাচা, সব্জি-মাছ-মুরগী কাটতেও দেখা যায়। বলাবাহুল্য, অনেক পিশাচ রাতের অন্ধকারে এদের সাথে যৌনমিলন করে ভয় দেখিয়ে। জানাজানি হলে খুন হয় পরিচারিকা গৃহিনীর হাতে অসাবধানে শারীরিক অত্যাচারে।

 

বিজ্ঞাপন

পুরান ঢাকার একটি ঘটনা শুনেছিলাম, স্ত্রী দাঁড়িয়ে থেকে স্বামীকে দিয়ে পরিচারিকাকে ধর্ষণ করিয়েছিল। স্বামীটিও কী বাধ্য! আজকের দিনে কিছুটা হলেও উন্নতি ঘটেছে আইনের সুবিধার্থে। অন্তত বিচারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, অন্যদিকে বিচার ফাঁকি দেওয়াও হচ্ছে। যখন কোন অত্যাচারের ঘটনা আমরা দেখি, তখন সংবাদপত্র হাতে, আজকাল স্যোসাল মিডিয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়ি। কিন্তু সমাজের এই শ্রেণীবৈষম্য দূর করতে আমাদের কারোর কোন অবস্থান আছে ঘরে কিংবা বাইরে? শিক্ষাব্যবস্থায় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের বিষয় হতে পারতো, হয়েছে?

তিন-চার বছর বয়স থেকে ছেলেমেয়েরা ঘরের গাড়িচালক, পরিচারকদেরকে যেভাবে আদেশ করা শেখে, তা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিৎ নয় সমাজে। সামাজিক ভারসাম্যতা বিকল হয় এভাবেই। তাছাড়া ছোটকালে নিজের কাজ করানো শেখায় না কোন পরিবার। অনেক পরিবারে স্কুলের ব্যাগ দেখা যায় শিশুপরিচারক হাতে করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ভৃত্য শিশুটির নিরাপত্তা দেবে কে? দারিদ্র্যের কারণে তারা যেন জন্ম থেকেই বয়স্ক। তাদের না থাকে কোন শৈশব, না কৈশোর। থাকে শুধু অভাবমাখা সংগ্রাম আর অত্যাচার সহ্য করে চলার নামাবলি।

দেশের এই মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত শ্রেণীর সদস্যরা নিজের কাজ নিজে করা শিখতে হবে। আমরা সেই একই সমাজ থেকে বের হয়ে যখন প্রবাসী জীবনযাপন করি, তখন অনেক কষ্ট করেই শিখি একহাতে সব কাজ করা। আজকাল মনে মনে হাসি যখন দেশের কোন বন্ধু বা পরিবারের সদস্য সামান্য কোন কাজেও ‘বুয়া আসেনি’ মাতম করেন। নিজেদেরকে কাজ করতে বললেই সহজ একটা কথা বলে বসে, ‘তোমরা বিদেশে থাকো, কত সহজ ওখানে কাজ করা’? হাস্যকর, উত্তর না দিয়ে হাসি আজকাল। না, কাজের তালিকা দিয়ে লাভ নেই। তবে যারা বেড়াতে আসে, তারা জানে যে বরং দেশের চাইতে বেশি কাজ করতে হয়। কিন্তু পরিশ্রম এমন একটি বিষয় যে শরীর তখন অভ্যাসের দাস হয়।

আমাদের বাবা মায়েরা যখন বেড়াতে আসে, প্রথমেই আশচর্যবোধক প্রশ্ন করে, ‘এত কষ্ট করতে হয়?’ দেশের বেশিরভাগ মানুষের ধারণা আমাদের অর্থযোগান দেয় গাছের পাতা, আর কাজ করে দেয় রোবট। আমরা আনন্দ উল্লাসে জীবনযাপন করি।

ঘরে পরিচারক ব্যবস্থায় জীবন সহজ হয় ঠিকই, হয় দরিদ্রের আর্থিক সংস্থান, কিন্তু প্রয়োজন যথাযথ আইন। এইক্ষেত্রে কিছু সংস্থা তৈরি করা যেতে পারে। যেখানে তালিকাভুক্ত থাকবে শহরের ঘরে ঘরে অবস্থানরত পরিচারক/পরিচারিকাদের নাম, বয়স, ঘরের কাজের তালিকা। শিশুদেরকে ঘরে রাখা চলবে কিনা তাও সরকার আইন প্রয়োগ করে বন্ধ করতে পারে। তাদের বেতনের হার ধার্য করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে মালিকশ্রেণীর সুবিধার্থে তাদের নাম, বয়স, ঠিকানা, ছবিসহ সংস্থাগুলোর কাছে জমা রাখতে পারে। নিবন্ধন ছাড়া কাউকে ঘরে নিয়োগ করা যাবে না, এমন ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বেতন ধার্য করে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের ঘন্টা নির্ধারণ করে দিতে হবে। তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে বছরে দুইবার, তাহলে যৌন হয়রানি কমে যাবে। লাজলজ্জা এবং ভয়ে অনেক প্রভূ সংযত হবেন। ব্যয়ভার মালিকপক্ষকে নিতে হবে। মাসে একবার সংস্থার সাথে যোগাযোগ বাধ্যতামূলক করতে হবে।

ভৃত্যদের সম্পর্কে কোন অভিযোগ থাকলে মালিকপক্ষ সংস্থাকে জানাবে, আইন নিজে হাতে তুলে নেবে না। আইনি ব্যবস্থা ছাড়া তো কোন পক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না কোনদিনই। ঘটনাগুলো নতুন নয়, অত্যাচারীরা জন্ম থেকে নিজের ঘরেই তৈরি হয়, সমাজ এদেরকে কখনো ধিক্কার দেয়নি। কৌশলে তৈরি হয়ে চলেছে চরম একটি শ্রেণীবৈষম্যের কাঠামো। কিন্তু আজকের সচেতন মানুষ এই অবস্থার উত্তরণের কী ব্যবস্থা নিচ্ছে সেটিই বিবেচ্য।

আমি আপনি সবাই ছোটকাল থেকে ঘরে কর্মসংস্থানের জন্যে আসা শ্রমিকটিকে দাস ভাবতে শিখি সামাজিক অবস্থাতেই। আমরা ক্লান্ত, তারা অক্লান্ত, এটাই স্বাভাবিক আমাদের শিক্ষায়। আমি মামা ডাকি, খালা ডাকি বা আপনি বলে সম্বোধন করি, তাতেই সব মিটে যায় না। বিষয়টি মালিক শ্রমিকের সম্পর্কের; বয়স কোন বিষয় না, না শ্রমিকের জন্য, না মালিকের জন্য।

এই সামাজিক অবস্থানটি মেনে নিয়ে আইন এবং সামাজিক প্রতিবাদ এবং প্রতিকূল ব্যবস্থায় প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। নাহলে প্রতিনিয়ত জানবেন অমানবিক ঘটনার সংবাদ, অনেকগুলো তো অজানাও থেকে যায়। আহাজারি কোন সমাধান নয়। আসুন, আমি আপনিও বিভিন্ন ক্ষেত্রে শ্রমিক, পাশাপাশি নিরাপদ থাকি সকল শ্রমিক।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

বিজ্ঞাপন