চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না

কেন দাঁড়াবো না গাঁ ঘেষে! মামার বাড়ির আবদার নাকি? আরে তোদের জন্ম হয়েছে আমাদের আনন্দ দেয়ার জন্য। আমাদের যেভাবে আনন্দ লাগে সেভাবে তোদের চলতে হবে, বলতে হবে, কাজ করতে হবে। তোদের মূল কাজ আমাদের বিনোদন দেয়া, ঘরে বাইরে সর্বত্র তোরা আমাদের বিনোদনের বস্তু। ভোগের বস্তু। তোরা থাকবি ঘরের মধ্যে বাইর হবি কেন? বাইরে যে মেয়েরা কাজ করে তারা কখনো ভাল না।

মেয়েদের আবার ভালো মন্দ? বাইরে বের হওয়া মেয়ে সর্বভোগের আর ঘরের মধ্যে থাকা মেয়ে একলা ভোগের। এই সামান্য কথা বুঝলেই তো মিটে যায়। বাইরে ঘুরবি আর তোদের টিপে দেবো না, চোখে ধর্ষণ করবো না, অশ্লীল কথা বলবো না। মনে মনে যা ইচ্ছে তাই করবো না তা হতে পারে? এই সমাজে বাঁচবি আমাদের ইচ্ছেই। তোদের আবার ইচ্ছে কী? আমাদের সুবিধার জন্য তোদের বাইরে কাজের অনুমতি মেলে। আমাদের দরকারে তোরা বাইরে যাবি। তোদের আবার প্রয়োজন কী রে? মেয়ে হয়ে জন্মেছিস তার আবার চাওয়া, পাওয়া ও মনোবাসনা আবার কী? তোদের একমাত্র চাওয়া হবে স্বামীকে বিছানায় খুশি করা আর পাওয়া হবে বাচ্চা ও তার লালন পালন, মনোবাসনা হবে স্বামীর কামনা, বাসনা চিরতার্থ করার জন্য যাবতীয় পদক্ষেপ নেয়া।

বাইরে বের হওয়া মেয়ে মানুষ মানে অঢাকা মিষ্টি যার উপর মাছি, পোকা, পিঁপড়া ধরবেই। ঘরের মধ্যে বোরখা পরিহিত নারীরা তুলনামূলক কিছুটা ভাল তাই তারা মুখ বুজে স্বামীর সেবা করে যায়। বাইরের মেয়েরা হল সকলের ভোগের ও বিনোদনের জন্য কারণ তারা বাজারি মেয়েছেলে। তারা নরকের দুয়ার, তারা পুরুষদের সাথে ডলাডলি করতেই বাইরে যায়, তারা পুরুষদের সাথে গাঁ ঘেঁষাঘেঁষি করতেই বাইরে যায়। এই সব মেয়েদের বাপ, ভাই, স্বামী ও ছেলে নেই। এরা নোংরা পরিবারের হারাম খাওয়া, নাইলে মেয়ে মানুষ কেন বাজারে যাবে? মেয়ে মানুষের উপার্জন কেন খেতে হবে? মেয়ে মানুষ কেন চেহারা বের করে ব্যাগ কাঁধে হেঁটে যাবে? মেয়ে মানুষ কেন মাথা উঁচু করে চলবে? মাথা নত না করে তারা কেন বুক পিঠ টান টান করে চলবে।

এরা নরকের দুয়ার, পুরা জাহান্নামি। নারীর ভূষণ লজ্জা, নারী সেই লাজলজ্জা ভুলে বলে কি না গাঁ ঘেঁষে দাঁড়াবেন না? কেন তোদের কি পাখনা গজাইছে নাকি সাপের পাঁচ পা দেখেছিস।এইসব বাজে মেয়েদের দেখে ঘরের মেয়েগুলা না জানি কথা বলা শিখে যায়? মেয়েদের রাখতে হবে লাঠি ও লাথির আগায়। মেয়ে মানুষ থাকবে মাথা নত করে। চাবি দেয়া পুতুলের মত, চাবি ঘুরিয়ে যতটুকু দম দেবো, ঠিক ততটুকু চলবে। যত টুকু মনে করবো ততটুকু অধিকার দেবো। যোগ্যতা আবার কি? মেয়ে মানুষকে কাজে রাখা হয়েছে তাই অনেক।

কী আশ্চর্য হলেন শুনে! এমনই ধারণা দেশের ৯০ ভাগ পুরুষের। ৯০ ভাগ পুরুষেরই নারীর প্রতি এ মনোভাব। নারীর যোগ্যতার প্রশ্নে, সমতার প্রশ্নে, নারীর মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে ৯০ ভাগ পুরুষেরই এই মনোভাব ধারণ করেন। ভুল মনে হচ্ছে? বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে? এ ধরনের কথা বলা অন্যায় মনে হচ্ছে? অসহ্য মনে হচ্ছে? আচ্ছা দিনের পর দিন সামিয়ানা টাঙ্গিয়ে, মাহফিল সাজিয়ে, মধ্যরাত পর্যন্ত মাইকে ওয়াজে এই কথাগুলি বলে, নারীর বিরুদ্ধে অপমানমূলক বক্তব্য দেয়, নারীকে পদে পদে ব্যভিচারী বলেই প্রমাণ করতে থাকে। আপনি কি তার প্রতিবাদ করেছেন? নাকি মজা নিয়ে শুনেছেন। এক একটা ওয়াজ মাহফিলে কত ভিড় হয় দেখেন তো। রাস্তা বন্ধ করে, পাড়ার মাঠে, মসজিদে। আপনার নারী সহকর্মী বিদ্যায়, মেধায়, কর্মে দক্ষ, আপনি তার উন্নতিতে খুশি নন, মানতেই পারেন না তার বেতন আপনার থেকে বেশী হতে পারে! তার কর্মদক্ষতা আপনার থেকে ভালো হলেও তার বদলে আপনি সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকেন।

মেয়েরা হাজার ভালো কাজ করলেও প্রতিনিয়ত তাকে পরীক্ষা দিয়ে যেতে হয়। তার কাজকে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নীচে বারে বারে খুঁটিয়ে দেখা হয়। নারীর পোশাক, কথা বলা, বসা, হাসা, খাওয়া চলাফেরা সব কিছু নিয়ে খুঁটিয়ে দেখা, পদে পদে তাকে উপহাস করা আর তাকে বিপাকে ফেলা পুরুষ কর্মীদের নিত্য বিষয়, অফিসে নারীকে বুলিং পুরুষদের জন্য নিছক মজা নেয়া।

আপনি এমন না? বাহ বেশ! আপনি তাহলে বাকি ১০ ভাগে পরেছেন। যে দেশের ওয়াজ মাহফিলের মূল আলোচনার বিষয় থাকে নারী, তার পোশাক, তার জীবনযাপন। প্রতি জুম্মার নামাজের খুতবায় নারীকে অবমাননা করা হয় সে দেশে ভিন্নমত আসলেই বিরল। নারীকে প্রতিটি বাক্যে দফায় দফায় অপমান সূচক কথা বলা, পরোক্ষভাবে তার কর্মদক্ষতাকে হেয় করা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা। পাড়া মহল্লায় তাকে নামে বেনামে উত্যক্ত করা মামুলি বিষয়। আপনি যেমনই হোন, আপনার তুলনায় হাজারগুণ বেশী যোগ্যতাসম্পূর্ণ মেয়েকে যেখানে সেখানে উত্যক্ত করতে পারেন। রাস্তা, বাসে, অফিসে, স্কুলে, ঘরে, বাজারে, কোর্টে, হাসপাতালে, মন্দির, মসজিদে, গির্জায় সর্বত্র নারীকে অবমাননা করা হচ্ছে, অসম্মান করা হচ্ছে।

ফেনী-নুসরাতের মরদেহ হস্তান্তরনুসরাত হত্যাকাণ্ড নিয়ে এক লাইন লিখিনি কোথাও, শুধু দেখছিলাম ঘটনাপ্রবাহ। নুসরাত নামের মেয়েটির শরীরের ৮০ভাগ পুড়ে মারা গেল। কিভাবে মারা গেল? কেন মারা গেল? কারা মারলো? কেন মারলো? কারণ নুসরাত বিশ্বাস করেছিল। বিশ্বাস করেছিল তার শিক্ষককে, তাই নির্দ্বিধায় গিয়েছিল শিক্ষকের ডাকে তার কক্ষে। কিন্তু শিক্ষক তাকে যৌন নিপীড়ন করে। সে বিশ্বাস রেখেছিল দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি তাই মামলা করেছিল। কিন্তু আইন তাকে নিরাপত্তা দেয়নি বরং তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। মেয়েটি সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতিই বিশ্বাস রেখেছিল, সেই অনুশাসন তাকে পুড়িয়ে মেরেছে। তাই মৃত্যু পথযাত্রী হয়েও প্রতিবাদ করেছিল, নিজের প্রতি হওয়া অন্যায়ে প্রতিবাদ করেছিল, প্রতিবাদ জানিয়েছিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষের করা যৌন হয়রানির। মামলা করেছিল নুসরাত তাকে যৌন হেনস্তাকারী সিরাজের নামের মাদ্রাসার অধ্যক্ষের নামে।  ৮০ভাগ পুড়ে যাওয়া যন্ত্রণাময় শরীর নিয়েও নুসরাত শেষবারের মত প্রতিবাদ করেছে।

নুসরাত হয়ত মানত না, এদেশে অন্যায় করলে শাস্তি হয় না, শাস্তি হয় অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে। এদেশে ন্যায়ের পক্ষে যত না লোক, তারও চারগুণ বেশী অন্যায়কারীর পক্ষে। এদেশে অপরাধী খোলা ঘুরে বেড়ায়। অসুখ দেখিয়ে জেল হাসপাতালে রাজার হালে ক্ষমতাবান অপরাধী থাকে যদিবা কখনো ধরা পরে। এদেশে ধর্ষককে “সম্মানিত’’ বলে ব্যানার নিয়ে মিছিল করার মানুষের অভাব নেই। এদেশে ক্ষমতাবান ধর্ষকের পাশে শিক্ষিত,অশিক্ষিত, ধনী, গরীব নির্লজ্জের মত দাঁড়িয়ে যায়। এদেশে মি টু নিয়ে মুখ খোলাদের হেনস্তার মুখে পরতে হয়, মিডিয়া ট্রায়াল ফেস করতে হয়, অহর্নিশি অপমান কুটকথা শুনতে হয়।

আমার মতে, বাংলাদেশের ক্ষমতাহীন আমজনতার অবস্থা নুসরাতেরই মত। কারন, আমাদের এদেশে নিরবিচ্ছিন্নভাবে নিপীড়িত নির্যাতিত হয়ে বেঁচে থাকা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে পুড়ে বা অন্য কোনভাবে নারকীয় যন্ত্রণা ভোগ করতে করতে মরতে হয়। অন্যায়কারী, দুর্নীতিবাজ, অসৎ সম্পদের মালিকরা গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়ান।  ৯০ সাল থেকে এদেশের রাষ্ট্রনায়ক নারী। আর এই নারী রাষ্ট্র নায়কেরা, দেশের নারীর উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। কিন্তু নারীর নিরাপত্তায় নেয়া পদক্ষেপগুলির যাথাযথ প্রয়োগ হয়নি। ধর্ষণের সাজা ফাঁসি করতে পারেনি। নারীর প্রতি সহিংসা কমেনি। নারীর উপর যৌন নিপীড়ন কমেনি।

নারীর উন্নয়নের জন্য দুই নারী শাসক বিগত বছরগুলিতে একাধিক উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু মূলধারায় নারীর ক্ষমতায়ন ও বাল্যবিবাহরোধে তেমন কোন পদক্ষেপ নেননি। নারী রাষ্ট্রনায়কের দেশে, নারী তৃণমূল থেকে উচ্চপর্যায় পর্যন্ত নিগৃহীত। কবি হয়ত এ কারনেই বলেছিলেন, রঙ্গে ভরা, বঙ্গ দেশ। দেশের বাইরে থাকলে দেশের টান কমেনি কখনো। সর্বদা ভেবেছি জলদি দেশে ফিরে যাবো, তখনই বন্ধু দম্পতি সাগর রুনি খুন হয় আপন ঘরে। ৪৮ ঘণ্টা আজো পার হয়নি। প্রশাসন কালক্ষেপন করেই চলেছে। তখন মনে হয়েছিল দেশে কি করে ফিরবো, যেখানে নিজের ঘরেও নিরাপদ নয় মানুষ। পদ্মা নদীতে আরো পলি পরেছে।

সাগর-রুনির পরে খুন হয়ে চলেছে নিরাপরাধ মানুষ, আগে খুন হওয়াদের নাম হয়ত আমাদের আর মনেও পরবে না। নুসরাতের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর মনে হল প্রবাসেই ভাল আছি কিন্তু কষ্ট বাড়ল দেশে থাকা স্বজনদের জন্য। কারণ তারা রইল হত্যা, ধর্ষণ লুঠ, জবরদখল, হুমকি ধামকি, মিথ্যা মামলা্র দেশে। দিন দিন বেড়ে চলা সড়ক ও নৌপথে মানুষের মৃত্যু যেন পায়ের নীচে পোকা মাকড় পিষে মেরে ফেলার মত সহজ কোন বিষয়। বিল্ডিং ধ্বসে মানুষ মারা যাওয়া ও আগুনে পুড়ে মরে যাওয়া যেন দস্তুর। দুদিন হৈচৈ তারপর সব ঠাণ্ডা। এই দেশে ৮০ভাগ পুড়ে যাওয়া নুসরাত কেন বাঁচবে? পঙ্গু হয়ে বিছানায় পরে থেকে দেখবে, সিরাজ উদ্দিন ও নুর উদ্দিনের আস্ফালন। গ্রেপ্তার হবে আবার সম্মানিত ধর্ষকের মুক্তির দাবীতে মিছিল হবে। মামলার দীর্ঘ সূত্রিতায় পাকে জেববার হবে জীবন।

কেউ কি আর দু দিন পরে খবর রাখে? কারণ কার মৃত্যুতে কতটা কষ্ট পেতে হবে তাও নির্ভর করে তার সামাজিক অবস্থানের উপর। বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নাতি-নাতনির হত্যাকাণ্ড ঘটলে মিডিয়াতে ঝড় বয়ে যায়, দেশ কেঁপে উঠে, গরীবের ঘরে কেউ মরলে আলোচনাতেও আসে না। আবার অন্যদিকে অনেক ঘটনা গভীরে যেয়ে বিবেচনা করলে উঠে আসবে তার পিছনে ব্যবসায়িক স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা। অনেক ক্ষেত্রে অন্যকে ভিকটিমাইজ করার জন্যও নানা ঘটনা ঘটানো হচ্ছে।

নুসরাত হত্যাকাণ্ডের পর মনে হচ্ছে এসব ঘটনাই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সম্পর্কিত। আমাদের কতটা স্বার্থপর তার বহিঃপ্রকাশও ঘটে এ ধরনের ঘটনার পর। আমরা ঠিক করি কাকে না কিসের সমর্থন করতে হবে, কোথায় চুপ থাকতে হবে,কখন প্রতিবাদ করতে হবে – তা খুব কমক্ষেত্রেই ওই ঘটনার গুরুত্বের উপর নির্ভর করে। আমাদের বিশ্বাস নিরভর করে কার কাছ থেকে বা এই ঘটনায় কোন পক্ষে থাকলে সুবিধা তার উপর, বিবেক ন্যায়নীতি বর্জিত সমর্থন, ব্যাপারটা ভয়াবহ। আর এ কারণে যখন আপনি আমি বিপদে পরি, কেউ নেই আমাদের জন্য ভাবার। সরকার, আইন, প্রশাসন কেউ না, এমন কি বন্ধু আত্মীয় পাশে পাবেন না।

রাষ্ট্রীয়ভাবে কোথাও কেউ নেই আমাদের জন্য ভাবার। কারণ একজন ‘নাগরিক’ হিসেবে নুসরাতের নিরাপত্তা বিধান যাদের দায়িত্ব ছিল – তারা সেই দায়িত্ব পালন করেনি। তাদেরকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর শক্তির আজ কারো নেই। আমার, আপনার আবেগ বুঝতে পারিনা তা নয়, কিন্তু নুসরাত তো একজন নয়, চারপাশে আমাদের নুসরাত, প্রায় রোজ একজন করে নুসরাতের ঘটনা দেখছি – কিসের শক্তিতে অপরাধীরা ও অভিযুক্তরা টিকে থাকে, তর্জনী তুলে শাসায় বুঝতে আমরা কি পারি না? নাকি বুঝতে চাই না? জানি বুঝেও চুপ করে থাকি নিরুপায় সেজে।

আজ নুসরাতকে হত্যা করার সাহস পেয়েছে আমাদের নীরবতার কারণে। এর আগে নুসরাতের জীবনে কী ঘটেছিলো আমরা জানতাম, জানি আরো অনেকেই কি এই রকম পরিস্থিতির শিকার। মৃত্যুর পরে শোকে বিহ্ব্ল হই, কিন্তু যারা বেঁচে আছে তাদের জন্যে কী করছি? মৃত মানুষের জন্যে আপনার আমার ভালোবাসা সমান কবে হবে? এখনো যে জীবিত তার জন্যে পুলিশ, প্রশাসন কি আছে? ওহে ক্ষমতাবান শাসক আপনারদের বিচারহীনতার সংস্কৃতির ব্যাপারে বিকারহীন থাকুন, এদিকে মানুষ হারকিউলিসের প্রতীক্ষায় প্রার্থনারত। ক্ষমতাসীনরা যখন যেনতেন প্রকারে টিকতে চান, তখন সর্বত্রই যে যার মতো করেই ভাগবাটোয়ারা করে – তাতে যে নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়, তার পরিণতি হচ্ছে এই অবস্থা।

নাগরিকের অধিকার, আইনের শাসন, বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান, জবাবদিহি ছাড়া বিচ্ছিন্নভাবে আপনার আমার সাথে ঘটা অন্যায়ের বিচার হবে কিনা জানি না। আমাদের পক্ষে আসলেই কেউ নেই, বেঁচে থেকেও নেই। আমাদের পাশে গাঁ ঘেঁষে কেউ দাঁড়ালে প্রতিবাদ করার কেউ নেই, পাবলিক বাসে পুরষাংগ বের করে নারীকে হেনস্তাকারীর পাশে মানুষ আছে কিনা হেনস্তার শিকার মেয়েটির পাশে কেউ নেই। নুসরাতদের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে, তালিকার প্রথম দিকের মানুষের কথা সবাই ভুলে গেছে। দুদিন পরে নুসরাতকেও ভুলে যাবে। আমরা সব ভুলে যাব কারণ আমাদের গোল্ডফিস মেমরি। নিজের পিঠ বাঁচিয়ে বেঁচে থাকি আরো কিছুদিন।

জার্মান কবি মার্টিন নিম্যোলার “ওরা প্রথমত এসেছিল” কবিতার কটা লাইন না বললেই না,
‘যখন ওরা প্রথমে কমিউনিস্টদের জন্য এসেছিল, আমি কোনো কথা বলিনি,
কারণ আমি কমিউনিস্ট নই।
তারপর যখন ওরা ট্রেড ইউনিয়নের লোকগুলোকে ধরে নিয়ে গেল, আমি নীরব ছিলাম,
কারণ আমি শ্রমিক নই।
তারপর ওরা যখন ফিরে এলো ইহুদিদের গ্যাস চেম্বারে ভরে মারতে,আমি তখনও চুপ করে ছিলাম,
কারণ আমি ইহুদি নই।
আবারও আসল ওরা ক্যাথলিকদের ধরে নিয়ে যেতে,আমি টুঁ শব্দটিও উচ্চারণ করিনি,
কারণ আমি ক্যাথলিক নই।
শেষবার ওরা ফিরে এলো আমাকে ধরে নিয়ে যেতে,
আমার পক্ষে কেউ কোন কথা বলল না, কারণ, কথা বলার মত তখন আর কেউ বেঁচে ছিল না।’

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)