চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

গাঁও গেরাম: সামনে দশ, পেছনে এক

রাজশাহী অঞ্চলের দশ নারীর গানের দল ‘গাঁও গেরাম’ এর পেছনে আছেন আসাদ সরকার…

‘গাঁও গেরাম’ শুনলেই সবার আগে যেসব দৃশ্যকল্প তৈরী হয়, সেটা কিছুটা এরকম- হালকা কুয়াশায় ঢাকা দূরের গ্রাম, কাকডাকা ভোরে ফসলের আঁকাবাঁকা আলপথ, কিংবা সবুজ ধানখেতে মুক্তাদানার মতো শিশিরের ফোঁটা, ছোট ছোট ঘর, বাজার কিংবা সাদামাটা কিছু মুখ! কিন্তু আদতে শুধু এই বাহ্যিক সৌন্দর্য ই নয়, গ্রাম মানে সরলতার প্রতীকও! সহজ সরল ভাবনারা যেখানে ডানা মেলে উড়ে!

নাগরিক জীবনের আবরণ থাকলেও গাঁও গেরামেই বেশির ভাগ মানুষের নাড়ি পোতা! তাইতো পপ কালচারে যতোই অভ্যস্ত হোক মানুষ, মাটির সুর কানে এলেই খসে পড়ে সমস্ত আস্তরণ। অস্থির হয়ে উঠে চিত্ত। মগ্ন হন গ্রাম বাংলার সহজ সরল সুরে। আর গাঁও গেরামের মানুষের মানুষের সহজ সরল ভাবনাগুলোই গানে কথায় সুরে ছড়িয়ে দেয়ার কাজটি করছেন রাজশাহী অঞ্চলের দশ নারীর গানের দল ‘গাঁও গেরাম’। পেছনে থেকে যাদের প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন রাজশাহী জেলার কালচারাল অফিসার মো. আসাদুজ্জামান সরকার।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা, উপস্থাপক ও সংগঠক শহীদুল আলম সাচ্চুর আমন্ত্রণে চ্যানেল আই স্টুডিওতে ‘গাঁও গেরাম’ এর পাঁচ নারী সদস্যকে নিয়ে আসেন আসাদ সরকার। আসন্ন একটি অনুষ্ঠানের জন্য গান রেকর্ড হয় তাদের। সেদিন রাতেই রাজশাহী রওনা হবেন, ফিরে যাওয়ার আগে কথা হয় পাঁচ নারী শিল্পী ও তাদের গুরু আসাদ সরকারের সাথে।

কথায় কথায় জানা যায়, ‘গাঁও গেরাম’ এর যাত্রাকালের কথা, কেনই বা দলের নাম ‘গাঁও গেরাম’। চ্যানেল আই অনলাইনকে একে একে নিজেদের শুরুর কথা বলছিলেন সাথী, বেবী, ওয়াহিদা, ইয়াসমিন ও সুমি। বলছিলেন কীভাবে ‘গাঁও গেরাম’ এর সাথে সম্পৃক্ত হলেন তারা!

বেবী বলেন, আমাদের দলে এই মুহূর্তে দশ জন নারী শিল্পী রয়েছি। প্রত্যেকে মৌলিক লোকগান করি। আর আমরা প্রত্যেকেই এসেছি গ্রাম থেকে, শুধু তাই নয়- আমরা আসলে আমাদের শেকড়টাকে ভুলে যেতে চাই না। এরকম উদ্দেশ্য নিয়েই ‘গাঁও গেরাম’ গানের দলটির যাত্রা।

দশ নারী কীভাবে একটি প্লাটফর্মে এক হলেন? এমন প্রশ্নে বেবী বলেন, এটা আসলে বিরাট এক জার্নির গল্প। কারণ ‘গাঁও গেরাম’ এর একেক সদস্যের বাড়ি একেক জেলাতে। সবাইকে আবিষ্কার করা এবং একই প্লাটফর্মে এনে দাঁড় করানোর কাজটি করেছেন আমাদের শ্রদ্ধেয় ও ভালোবাসার মানুষ আসাদ সরকার স্যার। তারজন্যই আমরা যেমন একটি প্লাটফর্ম পেয়েছি, তেমনি নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ পাচ্ছি।

বিজ্ঞাপন

এখন পর্যন্ত ১৭টি মৌলিক লোকগান গেয়েছে ‘গাঁও গেরাম’। যেগুলো তাদের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলেও প্রকাশ করা হয়েছে। সর্বশেষ ‘বলব না গো আর কোনো দিন ভালোবাসো তুমি মোরে’ গানের শিল্পী বাউল সুকুমারের ‘কী হবে আর মিথ্যে বলে তোমারে ভোলাইয়া’ নামে একটি গানের আয়োজন করেছে গাঁও গেরাম। এই দলের অন্যান্য মৌলিক গানের মতো বাউল সুকুমারের গানটিরও কথা ও সুর করেছেন আসাদ সরকার।

গান গাইতে গিয়ে কোনো সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি কি হতে হয়েছে তাদের? এমন প্রশ্নে ‘গাঁও গেরাম’ এর সদস্যরা বললেন, কোনো পথই মসৃণ নয়। ছোটখাট বাঁধার সম্মুখিন হয়েছি বটে, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা ই বেশি পেয়েছি। এখনও পাচ্ছি। যার দরুণ আমরা সবকিছু উতরে যেতে পেরেছি।

দলের কম বয়সী সদস্য ওয়াহিদা বিনতে রোকন বলেন, গান বিষয়টি আমার সাথে আছে একেবারে ছোটবেলা থেকেই। আমার বাবা শখ করেই আমাকে গান শিখিয়েছেন। সত্যি বলতে এখন পর্যন্ত পারিবারিক বা সামাজিক কোনো সমস্যার মুখোমুখি আমাকে হতে হয়নি। বরং উল্টো সবার উৎসাহ আমি পেয়েছি।

দশ জনের দল হলেও একটি গানে সাধারণত পাঁচ জনকেই পারফর্ম করতে দেখা যায়। এরমধ্যে একজন গানটি গান, আর বাকিরা কোরাস পাঠ করেন। এই কথার সূত্র ধরেই ওয়াহিদা বলেন, আসলে আমাদের দলে সবাই প্রধান গায়ক, আবার সবাই কোরাস করেন।

শুধু রাজশাহীতেই নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় গিয়ে গান করছে ‘গাঁও গেরাম’ এর শিল্পীরা। বছর দেড়েক হয়েছে ‘গাঁও গেরাম’ এর ইউটিউব চালু করেছেন আসাদ সরকার। ইউটিউবে এসেও মানুষ তাদের গান দেখছেন। এরমধ্যে সাথীর লিড ভোকালে জনপ্রিয়তা পেয়েছে ‘ঘুঘুর বাচ্চা’ নামের একটি গান। এই গানটিরও কথা ও সুর করেছেন আসাদ সরকার।

কী ভাবনা থেকে নারী শিল্পীদের নিয়ে এমন একটি গানের দল করার কথা ভেবেছিলেন আসাদ সরকার? কথা হচ্ছিলো তার সাথেও। জানালেন, কর্মসূত্রে আমি বিভিন্ন জেলাতে কাজ করেছি। কালচার নিয়েই যেহেতু আমার কাজ, তাই বিভিন্ন জেলাতেই এমন সেক্টরে প্রতিভাবানদের খুঁজে কাজ করার চেষ্টা করেছি। তাদের তৈরী করতাম। কিন্তু আমি সেই জেলা থেকে বদলি হলেই দুঃখজনকভাবে তরুণ প্রতিভাবানরা সেই পৃষ্ঠপোষকতা আর পেতেন না। তারাও বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতেন। সেই ভাবনা থেকেই মূলত স্থায়ী একটা দল গঠনের মানসিক প্রস্তুতি আমার ছিলো। সেই থেকেই ‘গাঁও গেরাম’ দলটি গঠন করি। যেন আমি বদলি হলেও এই দলের সদস্যরা বিচ্ছিন্ন না হন।

কথায় কথায় আসাদ সরকার জানালেন, দুই বছর ধরে ‘গাঁও গেরাম’ কাজ শুরু করেছে। এরমধ্যে করোনার কারণে তো প্রায় এক বছর চলেই গেল, করোনা না এলে হয়তো এতোদিনে দলটি আরো শক্তিশালী হয়ে যেত।

ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি আরো বলেন, সামনে আরো বিস্তৃত পরিসরে কাজ করার পরিকল্পনা করছি আমরা। দেশের ৬৪ জেলাতে লোকগানের যে উপাদান ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, সেগুলো সংরক্ষণ করবে ‘গাঁও গেরাম’। এরইমধ্যে বিভিন্ন জেলার বিয়ের গীত এবং আদিবাসীদের গান নিয়ে কাজ চলছে। শিগগির হয়তো সেগুলো ধারাবাহিকভাবে ‘গাঁও গেরাম’ এর ইউটিউব চ্যানেলেও পাওয়া যাবে।