চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

গবেষণায় তরুণদের এগিয়ে আসা লক্ষ্যে পৌঁছার বড় পর্যায়: ঢাবি উপাচার্য

ঢাবিতে দেশের ‘প্রথম স্টুডেন্ট রিসার্চ কনফারেন্স’ অনুষ্ঠিত

দেশের তরুণদের গবেষণায় এগিয়ে আসাটা লক্ষ্যে পৌঁছার বড় পর্যায় বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো: আখতারুজ্জামান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংসদ (ডিইউআরএস) এর আয়োজনে দেশের প্রথম আন্তর্জাতিক স্টুডেন্ট রিসার্চ কনফারেন্স (1st International Student Research Conference-2020) এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।

বিজ্ঞাপন

রোববার (৬ ডিসেম্বর) অনলাইন প্ল্যাটফর্ম জুমে সকাল ৯টায় শুরু হয়ে এ কনফারেন্স চলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।

দিনব্যাপী কনফারেন্সের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান।

বক্তব্যের শুরুতে ব্যতিক্রমী আয়োজনের জন্য তরুণ গবেষকদের প্রশংসা করেন ও ধন্যবাদ জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংসদ প্রতিষ্ঠার এতো স্বল্প সময়ে, বিভিন্ন দেশের তরুণ গবেষক ও শিক্ষকদের নিয়ে নিজেদের ভাবনা, গবেষণার উপাত্ত এবং চিন্তাগুলো পরস্পর বিনিময়ের জন্য এমন বড় আয়োজনকে তিনি লক্ষ্য পৌঁছানোর জন্য বড় পর্যায় বলে মনে করেন।

অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, আমরা বিশ্বের এই দু:সময়ে পারস্পরিক নতুন নতুন চিন্তা বিনিময় ও গবেষণার উপাত্ত দেশ-বিদেশে বিনিময়ের মাধ্যমে বর্তমান সময়ের দুর্যোগগুলোকে কাটিয়ে উঠতে পারি। আমরা যেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার করি এবং আমদেরকে অব্যশই প্লেজারিজমের ব্যাপারে সর্তক থাকতে হবে।

সর্বশেষ তিনি আমন্ত্রিত বিদেশি অতিথিদেরকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ বছরপূর্তি অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ জানান।

কনফারেন্সের প্রধান বক্তা ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রাজকুমার কুঠারী।বক্তব্যের শুরুতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংসদের বিগত বছরে পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শনের স্মৃতিচারণ করেন, সেই সাথে উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানান। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে এমন আয়োজননের জন্য শুভেচ্ছা জানান।

তার বক্তব্যে শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ গবেষণায় লিপ্ত সকলের দায় দায়িত্ব তুলে ধরে তিনি দেশে বিদেশে সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে গবেষণা কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন।

অধ্যাপক কুঠারী বলেন, বর্তমান মহামারী পরিস্থিতি আমাদেরকে সকলে মিলে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবেলা করতে শিখিয়েছে। কোভিড-১৯ এর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ছাড়াও বিশ্বব্যাপী বিরাজমান লিঙ্গ বৈষম্য, জঙ্গিবাদ, বর্ণবাদসহ নানা সামাজিক ব্যাধি মোকাবেলায় গবেষণা কার্যক্রমের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি।

তিনি আরও বলেন, গবেষণা কার্যক্রম হতে হবে জ্ঞান ভিত্তিক, এর লক্ষ্য- উদ্দেশ্য ও হতে হবে নির্বাচিত বিষয়ে প্রয়োজনীয় গভীর জ্ঞান অর্জন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সাইফুল্লাহ সাদেকের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় কনফারেন্স।

সবাইকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, আজ আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দমুখর দিন। কারণ এই দিনে গত ৪ বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করি আমরা এবং তখন থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য এমন একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজনের জন্য স্বপ্ন দেখে আসছি। আজ সেই স্বপ্নের শুরু হলো বলে ভালো লাগছে। এর জন্য আমাদের গবেষক দল সহ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সবার অক্লান্ত পরিশ্রম ও সহযোগিতার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।

বিজ্ঞাপন

কনফারেন্সে সভাপতিত্ব ও মডারেটরের দায়িত্ব পালন করেন গবেষণা সংসদের বর্তমান সভাপতি নাসরিন জেবিন।

এসময় তিনি সকলকে দিনব্যাপী এই আয়োজনে স্বাগত জানান ও প্রত্যেক অংশগ্রহণকারী, গবেষক, শিক্ষক ও সহযোগীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে আগামীতেও এমন আয়োজনের সঙ্গে থাকার আহ্বান জানান।

কনফারেন্সে ইরানের ইসলামিক ইয়াজদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. কাজেম কাহদুয়ী বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুমিত আল রশিদ তার বক্তব্য ফার্সি থেকে বাংলায় ভাষান্তর করে দেন।

অধ্যাপক কাজেম কাহদুয়ী ইরানে বিপুল পরিমাণ তরুণদের গবেষণায় অংশগ্রহণের তথ্য তুলে ধরে বলেন, বর্তমান ইরানের ৮৩ মিলিয়ন জনসংখ্যা ১৫-২৯ বয়সী যুব সমাজ থেকে ১৯ মিলিয়ন যুবক গবেষণার সাথে জড়িত আছেন। এতো সংখ্যক গবেষক আমরা পাচ্ছি যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস রুমের চাহিদার চেয়ে আরও বেশি ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। বর্তমানে ইয়াজদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ শতাধিক বিদেশি শিক্ষার্থী গবেষণার জন্য অধ্যয়ন করছেন। বাংলাদেশের তরুণদেরও এখানে বৃত্তি নিয়ে গবেষণার সুযোগ রয়েছে।

তিনি এসময় গবেষণা সংসদের তরুণ গবেষকদের ইরানে গবেষণা বৃত্তি ও উচ্চশিক্ষা বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, জ্ঞানটাকে সব সময় পবিত্র জিনিস হিসেবে ধরে নিবেন। খ্যাতির পেছনে না ঘুরে জ্ঞান চর্চার জন্য কাজ করতে হবে। আমাদেরকে যেকোনো কিছু বহি:চক্ষু দিয়ে না দেখে অন্তরচক্ষু দিয়ে দেখা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য তা জরুরি দরকার। জ্ঞানীদের ঘুম অশিক্ষিতদের ধন সম্পদের চাইতে অনেক বেশি শক্তিশালী।

কনফারেন্সে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ও ঢাবি গবেষণা সংসদের মডারেটর ড. মুহাম্মদ মনজুরুল করিম বলেন, আমি গবেষণা সংসদের শুরু থেকেই তরুণদের সাথে আছি। তরুণ গবেষকদের নিয়ে আজকের আয়োজনে থাকতে পেরে আনন্দিত ও গর্বিত হচ্ছি। গবেষণা সংসদ তাদের যাত্রার শুরু থেকে যেভাবে কাজ করে যাচ্ছে তা প্রশংসার দাবি রাখে। আশা করি তারা তাদের এই যাত্রা অব্যাহত রাখবে। এক্ষেত্রে আমরা সার্বিক সহযোগিতা করে যাবো।

বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের চেয়ারপারসন ও ঢাবি গবেষণা সংসদের মডারেটর ড. ফাজরিন হুদা বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য যেন হয় গবেষণার মান বাড়ানো, গবেষণার সংখ্যা বাড়ানো নয়। আমাদের তরুণ গষেকরা সেই মান বাড়ানোর কাজটাই করে যাচ্ছে। তরুণরা গবেষণায় এগিয়ে আসলে দেশের গবেষণা পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন অধ্যাপক ফাজরিন হুদা।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ড. মুমিত আল রশিদ বলেন, আমাদেরকে সব বিষয়ে পণ্ডিত হওয়ার দরকার নেই। নির্দিষ্ট বিষয়ে গবেষণা শুরু করতে হবে। নিজ নিজ পছন্দের জায়গায় গবেষণা করাটাই উত্তম কাজ। এভাবে আমাদের গবেষণার জায়গাটি প্রসারিত হবে। রিসার্চ সোসাইটি যে ধারা শুরু করেছে তা অব্যাহত থাকলে আমাদের মাঝে একটা দারুণ পরিবর্তন আসবে। গবেষণা সংসদের মতোই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এই জাগরণ তৈরি হতে পারে । এভাবে আমরা মূলত কিছু আলোকিত মানুষ চই। ভালো মানুষ চাই। আর গবেষণার মাধ্যমে দেশ এগিয়ে যাক, আলোকিত হোক।

শিক্ষার্থীদের কনফারেন্সে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. অনিল কুমার বিশ্বাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি ও বুড্ডিস্ট স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সুমন কান্তি বড়ুয়া। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে উপস্থিত ছিলেন গ্লোবাল সেন্টার ফর ইনোভেনশন অ্যান্ড লার্নিংয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী শাকিল মালিক এবং ইংল্যান্ডের টিসাইড ইউনিভার্সিটির প্রভাষক ড. মো: নাজমুল ইসলাম প্রমুখ।

ভারত, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের প্রায় ১৫০ জন তরুণ গবেষক, শিক্ষক ও স্কলার অংশ নিয়েছেন এই কনফারেন্সে। দিনব্যাপী কনফারেন্সে ৫টি টেকনিক্যাল সেশনে ৫০টি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়।

বিভিন্ন সেশনে চেয়ার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. দেবাশীষ নন্দী, কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মনজুরুল করিম,ঢাবি, অধ্যাপক ড. মোঃ হেলাল উদ্দিন আহমেদ, ঢাবি, সাইফুদ্দিন আহমেদ, ঢাবি ও ড. মুহাম্মদ মাহবুব আলম তালুকদার, বুয়েট।

কো-চেয়ার হিসাবে ছিলেন ড. শামসুর নাহার খানম, বিইউপি, ড.মাইনুল হোসাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ড.মহসীন রেজা, মডারেটর বিইউপি রিসার্চ সোসাইটি, কাজী সামীও শীশ, রিসার্চ পরিচালক, ডিইউআরএস, নাসির উদ্দিন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, শামীমা প্রধান, মি. জুয়েল রানা, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, তাওহীদা জাহান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ড.সাইয়ীদুল ইসলাম, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়,ভারত এবং ড. নাজমুল ইসলাম, টিসাইড বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডন।

সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ওপেন একসেস বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কনক মনিরুল ইসলাম, মুক্ত আসরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আবু সাঈদ সুরুজ, ওয়াইজটেকবিডি এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বেনজির আহমেদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম। সর্বশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করবেন ঢাবি গবেষণা সংসদের সাধারণ সম্পাদক মো. ইসতিয়াক উদ্দিন।

ভার্চ্যুয়াল কনফারেন্সের আইটি সহযোগিতায় ছিলো- Wiz Tecbd, রেডিও প্রচার সহযোগী হিসেবে Dhaka fm এবং কৌশলগত সহযোগী হিসেবে রয়েছে গ্লোবাল সেন্টার ফর ইনোভেশন অ্যান্ড লার্নিং, যুক্তরাষ্ট্র (Global Center for Innovation and Learning (GCFIL), ওপেন একসেস বাংলাদেশ এবং মুক্ত আসর।

‘রিসার্চ ফর এ বেটার ওয়ার্ল্ড’ স্লোগান নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর। মূলত প্রতিষ্ঠার চার বছর পূর্তিতে দেশে প্রথম শিক্ষার্থীদের নিয়ে এমন আন্তর্জাতিক গবেষণা সম্মেলনের আয়োজন করা হলো। আগামীতে এটি অব্যাহত রাখার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন আয়োজকরা।