চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে কঠোর পদক্ষেপ কেন নয়?

রাজধানীর বাড্ডায় একজন মা তার সন্তানকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির বিষয়ে কথা বলতে একটি স্কুলে গিয়েছিলেন। ওই এলাকারই সাবেক বাসিন্দা তিনি। অথচ তাকে ছেলেধরা সন্দেহে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কক্ষ থেকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেল একদল অতি উৎসাহী যুবক। এরপর যা হলো তা অকল্পনীয়। গণপিটুনিতে তাসলিমা বেগম রেনু নামের ওই নারীকে হত্যা করা হলো। কিন্তু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে ওই নারীর স্বজনরা জানালেন, আসলেই তিনি সন্তানকে ভর্তি করানোর জন্য খোঁজ নিতে ওই স্কুলে গিয়েছেন।

উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা শাহনাজ বেগম জানান, ওই নারী কী কারণে স্কুলে এসেছিলেন, তা জানার আগেই এলাকাবাসী তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কী কারণে তিনি স্কুলে এসেছেন একথা জানার আগেই কেন তাকে ছিনিয়ে নিতে হবে? কোনো ধরনের কথা না শুনেই একজন মানুষকে এভাবে পিটিয়ে হত্যাকে কেন খুন হিসেবে বিবেচনা করা হবে না?

বিজ্ঞাপন

একই দিন ছেলেধরা সন্দেহে আরেকটি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে নারায়ণগঞ্জে। সদর উপজেলার সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি এলাকায় প্লে গ্রুপের এক শিক্ষার্থীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সন্দেহে এ ঘটনা ঘটে। ওই যুবকও নিহত হয়েছেন।

প্রত্যক্ষদর্শী স্কুল শিক্ষক সাঈদ আহমেদ জানান: নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি আল আমিন নগর এলাকায় আইডিয়াল ইসলামীক স্কুলের সামনে থেকে সকাল আটটায় স্কুলের প্লে গ্রুপের এক শিক্ষার্থীকে এক যুবক জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। এ সময় তিনি স্কুলের সমানে একটি ফার্মেসিতে বসে ছিলেন। শিক্ষার্থী তাকে দেখে স্যার স্যার বলে চিৎকার করলে ওই যুবক নিজের মেয়ে বলে পরিচয় দেয়। কিন্তু তিনি শিক্ষার্থী ও তার প্রকৃত পিতাকে চেনেন বলে ওই যুবককে দাঁড়াতে বললে সে একটি রিকশা নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় আশপাশের লোকজন এসে তাকে আটক করে গণপিটুনি দেয়। খবর পেয়ে ডিউটি পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে তাকে উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ তিনশ’ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

পরে অবশ্য এই ঘটনার নিহতের পরিচয়ে জানা যায়, ওই শিশু তার সন্তান এবং তার মায়ের সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। ওই লোক বধির ছিলেন, সেজন্য গণপিটুনির সময় প্রতিবাদ করতে পারেনি।

শনিবার নারায়ণগঞ্জে আরও একটি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। মিজমিজি এলাকায় ছেলে ধরা সন্দেহে আসমা আক্তার নামে এক নারীকে আটক করে মারধর করেছে এলাকাবাসী। ওই মহিলা স্থানীয় ইটালী প্রবাসী বিল্লালের বাড়িতে আশ্রয় নিলে সেখানেও তাকে মারধর করা হয়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে।

এসব ঘটনায় বোঝা যায়, পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে এমন গুজব দেশব্যাপী কতোটা ভয়াবহ আকারে ছড়িয়েছে। এসব আবার বিশ্বাসও করছেন অনেক সাধারণ মানুষ। এর ভয়াবহ প্রভাব আরেকটি ঘটনায় বোঝা যাচ্ছে কিছুটা। রোববার সকালে নওগাঁর মান্দায় কয়েকজন মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। অথচ সেখানকার স্থানীয় লোকজন তাদেরকে ছেলেধরা বলে সন্দেহ করে। গণপিটুনি দিতে এখন এই সন্দেহের চেয়ে বেশি কিছু প্রয়োজন হয় না। যেই ভাবা সেই কাজ। ঘটনাস্থলে ৬ জন গণপিটুনির শিকার। এখানে অবশ্য কেউ নিহত হয়নি। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের উদ্ধার করেছে। কিন্তু পুলিশের সেখানে পৌঁছাতে দেরি হলে ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটতে পারতো।

এখানে উপরোক্ত ঘটনা কয়েকটা উদাহরণ মাত্র। দেশের প্রায় সবখানেই এখন ছেলেধরা আর কল্লাকাটা গুজব শেকড় ছড়িয়েছে। নেত্রকোণার ঘটনার পর গুজব রটনা ও বিশ্বাসকারীরা যেন হালে পানি পেয়েছে। ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে এসব গুজব ছড়িয়ে পড়ছে। আবার এ গুজবের শিকার হয়ে ভাগ্যক্রমে গণপিটুনির হাত থেকে রেহাই পাওয়াসহ গুজবের বিপরীত কথাও উঠে আসছে কোনো কোনো গ্রুপে।

এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে স্বয়ং পুলিশ সদস্যদের সাথে। গুজব কতোটা ভয়াবহ হলে নির্দোষ মানুষকে পিটিয়ে হত্যার মতো পরিস্থিতি হয় তা বুঝা যায় এই ঘটনা থেকে। এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির হাত থেকে রক্ষা পেয়ে যেয়াদ নামের এক পুলিশ সদস্য ফেসবুকে ‘উই আর বাংলাদেশ (ওয়াব)’ গ্রুপে লিখেছেন: ‘নিশ্চিত মাইর কিংবা গণপিটুনি খেয়ে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরলাম!’

বিজ্ঞাপন

তিনি আসলে ছুটিতে গ্রামে এসে পাশের গ্রামে তার ব্যাচমেট ও বন্ধুর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু রাস্তায় এক বাচ্চার কাছে তার বিষয়ে জিজ্ঞেস করার জন্য কথা বলতেই ‘কল্লাকাটা’ বলে চিৎকার শুরু করে। এরপর একে একে গ্রামের লোকজন জড়ো হয়ে ছেলেধরা সন্দেহে ধাওয়া দেয়। তিনি যতোই বলেন, ‘আমি কল্লাকাটা না, আমি মল্লিক বাড়ির ছেলে, এই এলাকার।’ কার কথা কে শোনে! অবস্থা বেগতিক দেখে পাশের ঘরের দরজায় গিয়ে তাদের কাছে পরিচয় দিলেও তারা দরজা বন্ধ করে দেয়। পরে অবশ্য উঠানে দাঁড়িয়ে অনেকবার বলার পর একজন দরজা খুলে বলল, ওকে চিনতে পেরেছি। নাহলে শেষ পর্যন্ত ওই পুলিশ সদস্যও লাশ হয়ে যেতে পারতেন। ছেলেধরা বা কল্লাকাটার বিষয়ে বেশিরভাগ কথাই এমন।

নিজ গ্রামে গিয়ে একজন পুলিশ সদস্য যেখানে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন, সেখানে সাধারণ মানুষ কতোটা অনিরাপদ তা সহজেই বুঝা যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। তবে শঙ্কার বিষয় হচ্ছে, এসব ঘটনায় পুলিশের যথাযথ ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। গণপিটুনিতে হত্যাকাণ্ডের পর কোনো জায়গায় এখনও খুনিদের ধরার খবর পাওয়া যায়নি। এক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে আরও গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা ঘটতে থাকবে বলেই শঙ্কা হয়।

তবে আশার খবর হচ্ছে, এসব ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা পুলিশ সদর দপ্তর আমলে নিয়েছে। তারা এ বিষয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে।

ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে’ বলে একটি গুজব ছড়ানোকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে মর্মান্তিকভাবে কয়েকজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। গুজব ছড়িয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রবিরোধী কাজের সামিল এবং গণপিটুনি দিয়ে মৃত্যু ঘটানো ফৌজদারী অপরাধ।

পুলিশ জানায়, ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয়ে এ পর্যন্ত যতগুলো নিহতের ঘটনা ঘটেছে পুলিশ প্রত্যেকটি ঘটনা আমলে নিয়ে তদন্তে নেমেছে। এসব ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গুজবে বিভ্রান্ত হয়ে ছেলেধরা সন্দেহে কাউকে গণপিটুনি দিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার জন্য সকলের প্রতি অনুরোধ জানানো হচ্ছে। গুজব ছড়ানো এবং গুজবে কান দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। কাউকে ছেলেধরা সন্দেহ হলে গণপিটুনি না দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দিন।

পুলিশের এই বিবৃতি সময়োপযোগী। কিন্তু শুধু বিবৃতি দিলেই তাতে যে কাজ হবে না তা ইতোমধ্যে প্রমাণিত। এজন্য কঠোর অ্যাকশনে যেতে হবে। কথিত সন্দেহের দোহাই দিয়ে গণপিটুনিতে যারা মানুষ মারছে, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে খুনের মামলা দায়ের করতে হবে। একইসঙ্গে যারা গুজব ছড়াচ্ছে তাদেরকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। এছাড়া বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই। কারণ, সভ্য সমাজে নির্বিচারে মানুষ খুন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

পুলিশের উপরোক্ত বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে গণপিটুনি দিয়ে কাউকে হত্যা করার আগে অন্তত একশ’ বার ভাবুন। গণপিটুনির নামে মানুষ হত্যা করে খুনের আসামী না হয়ে কেউ পার পেয়ে যাবেন বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। আবারও বলছি, এই গুজবকে সামনে রেখে শিশুপাচার চক্র যে ফায়দা লুটছে না তা বলা যায় না। এরপরও কাউকে সন্দেহ হলে পুলিশের হাতে তুলে দিন। শুধু সন্দেহের কারণে কাউকে খুন করে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বরং এটা অমানবিক কাজ। এছাড়া অতি আবেগে নিজেকে খুনের আসামী বানানোর কোনো মানে হয় না।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View