চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

গণপরিবহনে সুব্যবস্থাপনা আনতেই হবে

২৯ জুলাই রাজধানীর শহীদ রমিজউদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই শিক্ষার্থী দিয়া এবং রাজিবের রক্তে সিক্ত হয় ক্যান্টমেন্ট সংলগ্ন রাজপথ। ঐদিন অন্যান্য সহপাঠীর সাথে বাসের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন এই দুই শিক্ষার্থীও। কিন্তু হঠাৎ করেই ঘাতক জাবালে নূর পরিবহন নামের একটি বাস অতর্কিতে এসে দাঁড়িয়ে থাকা একাধিক শিক্ষার্থীকে চাপা দেয়। এই ঘটনায় শিক্ষার্থী দিয়া ও রাজিব নিহত হয়। পরবর্তীতে এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে শিক্ষার্থীরা ন্যায়বিচার দাবি করে। আস্তে আস্তে এই দাবি ছড়িয়ে পড়ে নগরীর সর্বত্র। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ, প্রতিবাদী শিক্ষার্থীরা নগরীর পুরো সড়কগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে পরিবহন নৈরাজ্য ঠেকাতে নিজেরাই ট্রাফিকের দায়িত্ব পালনে অবতীর্ণ। লাইসেন্সবিহীন চালক ও গাড়ি সনাক্ত, মেয়াদ উত্তীর্ণ লাইসেন্স সনাক্ত, পথচারীদের ফুটওভার ব্যবহার, জেব্রাক্রসিং দিয়ে রাস্তা পারাপার, লাইন ধরে গাড়ি, রিকসা চালানো-এসব কাজগুলো শিক্ষার্থীরাই করতে থাকে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের এই প্রতিবাদ পরিবহন নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে এক নতুন আন্দোলনের সূচনা তৈরি করে। সবশেষে নানা ঘটনা প্রবাহে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের আন্দোলন থকে সরে ক্লাসরুমে ফিরে যায়। আন্দোলনের মাঝখানে সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের সব দাবি মেনে নেওয়ার কথা ঘোষণা করে সরকার। সেই ধারাবাহিকতায় নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পুলিশের পক্ষ থেকে এখনও নগরীর সমস্ত সড়কেই অতিরিক্ত তৎপরতা লক্ষণীয়। এই তৎপরতা শুরু হয়েছে ‘ট্রাফিক সপ্তাহ’কে কেন্দ্র করে। পুলিশের পক্ষ থেকেও আপ্রাণ চেষ্টা করা হচ্ছে রাজধানীসহ সারাদেশে পরিবহন সেক্টরে এক ধরনের ব্যবস্থাপনাগত উন্নয়ন ঘটিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা। সেই লক্ষ্যে পুলিশের পক্ষ থেকে কিছু টার্গেটও নেয়া হয়েছে। পুলিশের তৎপরতার কারণেই আপাতত রাজধানীতে লাইসেন্সবিহীন গাড়ি আর বের হচ্ছে না। যেসব চালকের বৈধ লাইসেন্স নেই তারাও লাপাত্তা। পুলিশের সাথে রোভার স্কাউটদের তৎপরতার কারণে যাত্রীদের মধ্যে বেশ সচেতনতাও সঞ্চারিত হয়েছে। ফুটওভার ব্রিজের ব্যবহার আগের তুলনায় বেড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ মোড় বা চত্বরগুলোতে পুলিশ অতিরিক্ত তৎপর থাকার কারণে যত্রতত্র রাস্তা পার হওয়ার প্রবণতাও পথচারীদের মধ্যে কমে এসেছে।

একথা সত্য যে, রাজধানীর গণপরিবহনে এখন যে অব্যবস্থাপনা, নৈরাজ্য তা মোটেও নতুন নয়। বহুদিনের নৈরাজ্যের চূড়ান্ত ফলাফল আমরা দেখতে পাচ্ছি। এর আগেও বহুবার রাস্তায় শিক্ষার্থী পিষে মারার ঘটনা ঘটেছে। কোনো ঘটনার বিচার হয়েছে বলে জানা নেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সত্যিই নগরীর পরিবহন ব্যবস্থায় যেনো চূড়ান্ত ধস নেমেছিল। শুধু গণপরিবহন বলে কথা নয়, ব্যক্তিগত গাড়িওয়ালারাও যেনো আইন ভঙ্গের উৎসবে নেমেছিল। উল্টোপথে চলা, যত্রতত্র পার্কিং করা, রং সাইডে গাড়ি রেখে ড্রাইভারের উধাও হয়ে যাওয়া, ইচ্ছেমতো হর্ণ বাজানো-এ শহরের নিত্যনৈমত্তিক চেহারা দেখতে দেখতে মানুষের মধ্যে কেবল তীব্র ক্ষোভই জমা হয়েছে।

ক্ষুব্ধ নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা চোখে আঙুল দিয়ে গণপরিবহন ব্যবস্থার অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা দেখিয়ে গেলেও-আইন ভাঙার সংস্কৃতি এখনও লক্ষণীয়। বাসগুলো এখনও অতিরিক্ত পয়সা আর যাত্রী তোলার লোভে রাস্তার যেখানে সেখানে গাড়ি দাঁড় করিয়ে যাত্রী তোলার অভ্যাস ত্যাগ করতে পারেনি। অনেকেই এখন রসিকতা করে বলেন রাজধানীর গণপরিবহনগুলো যাত্রীদের জন্যে চমৎকার হোম সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে। কোনো যাত্রীকেই এখন আর কষ্ট করে স্টপেজে দাঁড়াতে হয় না। রাস্তায় যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে হাত তুললেই বাস দাঁড়িয়ে পড়ে। রাজধানীতে গণপরিবহনগুলোর এই হোম সার্ভিস নতুন কিছু নয়। খুব সম্ভবত পৃথিবীর মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেখানে যত্রতত্র দাঁড়িয়ে হাত তুললেই বাস থেমে পড়ে। তবে পাশাপাশি এও সত্য যে বছরের পর বছর কেটে গেলেও এখনও নগরীর বাসস্টপেজগুলো সেই অর্থে দৃশ্যমান নয়। আর তাই বাস ওয়ালারা নিজেরা নিজেরাই বিভিন্ন স্থানে বাসস্টপেজ বানিয়ে ফেলেছে। গণপরিবহনগুলোর সবচেয়ে বড় দোষ যত্রতত্র গাড়ি দাঁড় করে যাত্রী তোলা। মোহম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে আসাদ গেট-এর দূরুত্ব এক কিলোমিটার হবে না। অথচ এই এতটুকু রাস্তায় যাত্রী তোলার জন্য গণপরিবহন প্রজাপতি, মেশকাত, এমটিসিএল অন্ততপক্ষে দশ জায়গাতে যাত্রী তোলার জন্য দাঁড়িয়ে পড়ে।

নগরীর সব রাস্তার চিত্রই এরকম। কোথাও নিয়ম মানা হয়নি। এর আগে অনেক জায়গাতে লাইন ধরে যাত্রী তোলা হলেও সে নিয়মও বাদ দেওয়া হয়েছে। আবারও মোহাম্মদপুর এলাকার কথা বলি। একসময় এটিএলসহ প্রায় সব পরিবহনে যাত্রীরা লাইন ধরে উঠতো। কিন্তু পরিবহনওয়ালারাই এই নিয়ম ভেঙে দিয়েছে কয়েক বছর হলো।

পরিবহন সেক্টরের অব্যবস্থাপনা নিয়ে আগের শাসকদের অনেকেই এখন বড় বড় কথা বলছেন। কিন্তু সত্যটা হলো যে তারা যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন তারাও কিছুই করেননি। বরং পরিবহন শ্রমিকদেরকে রাজনৈতিক কাজকর্মে লাগানোর শত শত উদারহরণ আছে। বর্তমান সরকারের অন্যতম মিত্র সাবেক স্বৈরাচার হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ যতই অশ্রুসজল কণ্ঠে পরিবহন সেক্টরের নৈরাজ্য নিয়ে কথা বলুন না কেন উনি ক্ষমতায় থাকতে এই সেক্টরকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। আবার বিএনপি যখন ক্ষমতা ছিল তখন মির্জা আব্বাসদের কাছে পুজণীয় ছিল পরিবহন সেক্টরের শ্রমিক নেতরা। অসংখ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শ্রমিকদের ব্যবহার করার ঘটনাবলী ইতিহাস ঘাটলেই পাওয়া যাবে। সত্যটা হলো কেউই দুধে ধোয়া তুলশি পাতা নয়।প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

ইদানিং পরিবহন সেক্টরের অব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন টেলিভিশনে বড় বড় কথা বলছেন সাবেক বিএনপি নেতা এবং যোগাযোগ মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা। ভাগ-বাটোয়ারা কম হওয়ার কারণে বিএনপি থেকে তিনি সরে পড়েছেন। এখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলে ঢোকার জন্য কসরত করে বেড়াচ্ছেন। সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী হুদা সাহেবের মুখে কি পরিবহন সেক্টর নিয়ে কোনো সুদপদেশ মানায়? এই লোকটি ক্ষমতায় থাকার সময় পরিবহন সেক্টরে সীমাহীন দুর্নীতি হয়েছিল। শুধুমাত্র তার অযাচিত সিদ্ধান্তের কারণে সিএনজি চালকদের এখনও কষ্ট বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এই মানুষটিই সিএনজি চালকদের হাতে সিএনজির মালিকানা না দিয়ে অর্থলোভে মধ্যস্বত্বভোগী গড়ে তুলেছিলেন। আর সেই মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণেই এখনও যাত্রীদের অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে। অথচ তিনিই এখন বড় বড় উপদেশ প্রদান করছেন।

বিজ্ঞাপন

সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে হলে পরিবহন সেক্টরে সুশাসন, সু ব্যবস্থাপনা অবশ্যই আনতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে যেমন কিছু কঠিন কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে, তেমনি এই ক্ষেত্রে কিছু সুযোগ সুবিধাও তৈরি করতে হবে। এই সময়ে সরকারকে অবশ্যই যে কাজগুলো করতে হবে-

১. যাত্রীদের দাঁড়ানোর জন্য মূল রাস্তায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক যাত্রীছাউনি তৈরি করতে হবে। মূল রাস্তায় গাড়ির জন্যে যাত্রীদের দাঁড়ানো বন্ধ করতে হবে।

২. জেব্রাক্রসিং ব্যবহারে যাত্রীদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই জেব্রাক্রসিং-এর উপর কোনো গাড়ি দাঁড় করতে দেওয়া যাবে না।

৩. যত্রতত্র পার্কিং এবং সিগন্যাল অমান্যকারী গাড়ির বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

৪. গুলশান, বনানীসহ যেকোনো মূল সড়কে সব ধরনের লেগুনা চলাচল বন্ধ করতে হবে।

৫. নগরীর বড় বড় স্কুলে শিক্ষার্থী আনা নেওয়ার জন্যে পর্যাপ্ত নিজস্ব পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

বিজ্ঞাপন